কবে বন্ধ হবে অমানবিক নিয়োগ প্রক্রিয়া?

Send
কাবিল সাদি
প্রকাশিত : ১৬:৫৩, সেপ্টেম্বর ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:২০, ডিসেম্বর ২১, ২০১৯

কাবিল সাদিঅর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও ব্যাংকের নতুন শাখা বাড়ার ফলে বছরে প্রায় ৮-১০ হাজার কর্মচারী নিয়োগ হচ্ছে। এই খবর প্রায় ২৬ লাখ বা তারও বেশি  বেকারের জন্য এটি সুখবর হলেও তার সুফল হয়তো ভুক্তভোগীরা ততটা পাচ্ছে না যতটা তারা আশা করেছিলেন। এর অন্যতম কারণ—সনাতন নিয়োগ-প্রক্রিয়া, প্রতিযোগী বেশি হওয়ায় ভারতীয় ওয়েবসাইট বা লেখকদের কথিত অতি আধুনিক প্রশ্নপত্র আমদানি, ঘন ঘন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ইত্যাদির অভিযোগ।
সময়ের চাহিদায় এই নিয়োগ প্রক্রিয়া যদি আপডেট করা যায়, তাহলে হয়তো বেকার ও দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার মঙ্গল ছাড়া অনিষ্ট হওয়ার কথা নয়। দেখা যাক, কীভাবে তা সম্ভব, সেই হিসাবটা মিলিয়ে নেই। এই নিয়োগপরীক্ষা আলাদাভাবে না নিয়ে একসঙ্গে নিলে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সুবিধা হতো। ধরুন, ১০ হাজারের বিপরীতে ভাইভার জন্য টিকাতে হতো ৩০,০০০। আবার লিখিতের জন্য প্রিলিতে টিকাতে হতো ৯০,০০০। এরপর মেধার ভিত্তিতে প্রথমে সিনিয়র অফিসার, তারপর অফিসার এবং শেষে অফিসার ক্যাশ, থাকবে ব্যাংকগুলোর পছন্দক্রমও। বিসিএসসহ অন্যান্য চাকরিতে চলে গেলেও প্যানেলটাও কঠিন কিছু ছিল না।এছাড়া ছয় মাস (বছরে দুবার পরীক্ষা নিলে) পর নতুন নিয়োগ-প্রক্রিয়া গ্রহণ করলে প্যানেলও নিতে হবে না।

প্রাইভেট ব্যাংকগুলোও এখান থেকে চাহিদাপত্র দিয়ে কর্মী নিতে পারতো মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার আদলে।

আর যারা নিয়মিত পড়াশোনার সঙ্গে আছেন, তারা অবশ্যই এই ভাইভা দেওয়া ত্রিশ হাজারেই থাকতেন। এর ভেতর যারা থাকতেন না, তারা হয়তো ব্যাংক চাকরির আশা ছেড়ে অন্য কিছুতে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারতেন। কিন্তু সনাতন নিয়োগ প্রক্রিয়ার ফলে একই ব্যক্তিই যোগ্য হিসেবে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যের জন্য অভিশাপ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। একজন যখন গ্রুপে পোস্ট দেন আমি সোনালির সিনিয়র, রূপালির অফিসার অথবা একসঙ্গে চারটি ব্যাংকে চাকরি পেলাম, তখন অন্য প্রান্তে আরেকজন বেকার হয়তো হিসাব মেলাচ্ছেন আর ক’দিন বাকি আছে তার চাকরির আবেদন করার, সেই সময়। এরফলে নিজেদের মধ্যেই শোষণ ও অসমতা তৈরি হচ্ছে।

প্রতি শুক্রবার পরীক্ষা দিতে আসা বেকারদের নাভিশ্বাস উঠছে যেখানে গাড়ি ভাড়ার খরচ মেলাতে, সেখানে ঢাকার বাইরে থেকে আসা প্রার্থীদের যাতায়াত ব্যবস্থা আরও শোচনীয়। না থাকা যাচ্ছে ঢাকায় বাসা নিয়ে, না বিরক্ত করতে ইচ্ছে করছে মেসে বা সাবলেট থাকা আরেক বেকার বন্ধুকে।

কেউ কেউ সারারাত জার্নি করে সরাসরি পরীক্ষার হলে চলে আসেন—এমন ঘটনা নিত্য ঘটছে। নারী প্রার্থীরা তাদের নিরাপত্তার জন্য গার্ডিয়ান নিয়ে আসতে এক ধরনের বাধ্যই হন। যা একদিকে ব্যয়বহুল, অন্যদিকে কোনও আত্মীয়ের বাসায় নির্লজ্জ বিড়ম্বনায় পড়াও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার কখনো কখনো একই দিন তিন থেকে চারটি চাকরির পরীক্ষা থাকে, এতে প্রার্থী কোনও পরীক্ষায় অংশ নেবে আর কোনটা বাদ দেবে, তা নিয়েও যথেষ্ট মানসিক চাপে ভোগে। এসব পরীক্ষার্থীর প্রস্তুতি ও মানসিক অবস্থা চাকরি পাওয়ার জন্য কতটা অমানবিক, তা ভাবতে কারও কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

একই ব্যক্তি বারবার চাকরি পাওয়ার ফলে নিয়োগকৃত ব্যাংক তাকে বাদ দিয়ে নতুন কর্মী নিতে যেমন বিড়ম্বনায় পড়ছে, তেমনি আবার নতুন ব্যাংকে যোগদান-প্রক্রিয়া জটিলতায় পড়ছে।

নিয়োগে প্রচুর অর্থও অপচয় করতে হচ্ছে সরকারকে, অন্যদিকে বেকারদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কৃত্রিম প্রতিযোগিতার সুফল নিচ্ছেন নীলক্ষেত দোকানদার ও মুনাফাখোর বইলেখকরা। প্রতিনিয়ত আংশিক পরিবর্তন করে লাল-নীল বই বের করছেন আর বেকাররাও পকেট ফাঁকা করছেন। সেইসঙ্গে আছে কোচিংগুলোর দৌরাত্ম্য।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যদি এভাবে ভাবতে পারেন, তাহলে যে বিষয় দাঁড়াবে, তা হলো– সারাবছর পরীক্ষা নেওয়ার ঝামেলা ও খরচ দুইটাই কমবে। বেকারদের যাতায়াত ও বই ক্রয় বাবদ খরচ কমবে। প্রতি সপ্তাহে ঢাকা না এসে নিয়মিত পড়াশোনা করে ভালো প্রস্তুতি নিতে পারবেন। যারা অন্য বেসরকারি চাকরি করেন, তাদেরও বার বার ছুটি সংক্রান্ত জটিলতা থাকবে না। মুনাফাখোর লেখক ও কোচিং ব্যবসায়ীদের দ্বারা বেকার চাকরি প্রার্থী সর্বস্ব হারাবেন না। অযোগ্যরা অন্য জায়গায় নিজেকে পরিপূর্ণভাবে নিয়োজিত করতে পারবেন।

আলোচনার উপসংহারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই—এই অমানবিক নিয়োগ-প্রক্রিয়া সংস্কার করে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড আশীর্বাদপুষ্ট এই তরুণ ও যুব সমাজকে অভিশাপের হাত থেকে বাঁচিয়ে সত্যিকারের উন্নত সোনার বাংলা গড়ে তুলতে এগিয়ে আসুন।

লেখক: তরুণ নাট্যকার

[email protected]

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ