বিশ্ব খাদ্য দিবস ও ভেজাল খাদ্য

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৫:২২, অক্টোবর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৩, অক্টোবর ১৬, ২০১৯

সালেক উদ্দিন১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। প্রতিবছর এ দিনটি পালিত হয় নিরাপদ খাদ্যের শুভবার্তা নিয়ে। খাদ্য নিরাপত্তা বাড়ানোর অঙ্গীকারে পালিত হয়েছিল বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০১৭। ক্ষুধামুক্ত পৃথিবীর প্রত্যয়ে ২০১৮’র এই দিবসটি পালিত হয়েছে। প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘কর্ম গড়ে ভবিষ্যৎ, কর্ম গড়বে ২০৩০’-এ ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব। সে বছর বাণিজ্যমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কৃষি ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের অডিটোরিয়ামে আয়োজন করা হয়েছিল জাতীয় সেমিনার। চলেছে তিন দিনব্যাপী খাদ্যমেলা, বর্ণাঢ্য র্যা লি ইত্যাদি। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো—‘আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ,পুষ্টিকর খাদ্যেই হবে আকাঙ্ক্ষিত ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী’।
প্রতিবারের মতো এবারও নিশ্চয়ই সরকারিভাবে বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হবে। পুষ্টিকর খাদ্য নিয়ে জাতীয় সেমিনার হবে, খাদ্যমেলা বসবে, র্যা লি হবে। এছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৃত্তিকা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উদ্যোগে দেশব্যাপী চলবে নানা আয়োজন। নিশ্চয়ই মেলায় শোভা পাবে নানা প্রজাতির ফল ও খাবার, ফসল উৎপাদনের নানা প্রযুক্তি, চাষাবাসের বৈজ্ঞানিক কৌশল। এসব সভা-সমাবেশ-সেমিনারে উপস্থিত হয়ে কৃষিবিদ, সচিব, মন্ত্রীরা শুনাবেন অধিক খাদ্যপ্রাপ্তি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের কথা। দেশের মানুষের পুষ্টিকর খাবার জোগানোর পাশাপাশি তা সঠিকভাবে সরবরাহের গুরুত্ব দিয়ে যাবেন তারা।
মানুষ এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে খাদ্যের অধিকার নিয়ে। বিশ্বের প্রতিটি দেশ নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা সামনে রেখে এই দাবি বাস্তবায়নের কাজ করে এবং মানুষের বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাদ্য জন্মগত অধিকার নিশ্চিত করে।
মানুষের প্রধানতম মৌলিক চাহিদা হলো খাদ্য। সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাদ্য। সে বিবেচনায় ১৬ অক্টোবরের বিশ্ব খাদ্য দিবস গুরুত্বের দাবি রাখে। সন্দেহ নেই সারা বিশ্বের সব দেশ ও জাতি বিশুদ্ধ এবং পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা নিশ্চিতকল্পে এই দিবসটি উদযাপন করবে।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষের মতো আমরাও এই দিবসটি উদযাপনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবো না। তবে ওই পর্যন্তই। কারণ বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়া একটি কঠিন বিষয়ে রূপ নিয়েছে। অধিক মুনাফা অর্জনের সহজতম পথ হিসেবে আমাদের দেশের ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা ভেজালের পথে সদা সক্রিয় রয়েছেন। বেশি দামের খাদ্যের সঙ্গে কম দামের ভেজাল মিশিয়ে নিরাপদে বেশি দামে বিক্রির মতো সহজ ও লাভজনক ব্যবসা কীইবা আর হতে পারে!একটি সমাজের অধিকাংশ মানুষই যখন অপরাধ করে এবং অপরাধ করে পার পেয়ে যায়, তখন অপরাধ আর অপরাধের মতো মনে হয় না। সম্ভবত এমন মনস্তাত্ত্বিক কারণেই খাদ্যের মতো অতিপ্রয়োজনীয় জিনিসেও ভেজাল মেশাতে আমরা দ্বিধাবোধ করি না।
আমাদের দেশে খাদ্যে ভেজাল এখন ওপেন সিক্রেট। সবাই খাদ্যে ভেজাল মেশায় এবং আমরা সবাই ভেজাল খাদ্য খাই, এটাই এখন সত্য। এ সংক্রান্ত কয়েকটি পত্রিকার অনুসন্ধানী রিপোর্টের কিছু তথ্য তুলে ধরা যেতে পারে। একটি পত্রিকার রিপোর্টে এসেছে—মাছ ও শাক-সবজিতে ফরমালিন ও ইউরিয়ার ব্যবহার প্রসঙ্গ। পচন রোধের জন্য আড়তগুলোতে মাছের স্তূপ দিয়ে তার ওপর প্রকাশ্যে ফরমালিন ছিটানোর মতো অথবা স্প্রে করার মতো ঘটনার বিবরণ দিয়েছে পত্রিকাটি। রিপোর্টে উঠে এসেছে বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবার ও ফলমূল আকর্ষণীয় করে তা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার জন্য ক্ষতিকর কার্বাইড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রং, ফরমালিন ইত্যাদি ব্যবহারের কথা। শুধু তাই নয়, ফরমালিন মিশ্রিত বরফ দিয়ে মাছ তরতাজা রাখার কৌশলও যে অধিকাংশ বাজারে সচরাচর দেখা যায়, তাও উল্লেখ করতে ভুল করেননি প্রতিবেদক। এই ফরমালিন মানবদেহে ক্যানসার ও লিভার সিরোসিসের অন্যতম প্রধান কারণ।
আরেকটি পত্রিকার অনুসন্ধানী রিপোর্টে পড়লাম, বাজারে যে গুঁড়ামশলা রয়েছে, তার অধিকাংশই বিষাক্ত। ভেজাল মশলা উৎপাদনকারীরা গুঁড়া মরিচের সঙ্গে মেশায় ইটের গুঁড়া, হলুদে দেয় মটরডাল, ধনিয়ায় কাঠের গুঁড়া, পোস্তাদানায় সুজি। এসব মশলার রং-কে আরও আকর্ষণীয় করতে বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল রং মেশানো হয় এবং মশলার ওজন বাড়াতে ধানের ভুসি যোগ করা হয়, যা কিডনি ও লিভারের জন্য ক্ষতিকারক।
কলা-আম-পেঁপে-পেয়ারাসহ অন্যান্য ফলমূলের রং ক্রেতাদের নজর কাড়ার জন্য উজ্জ্বল রাখতে, স্বাদ বাড়াতে, পচন রোধ করতে মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল। ইথাইলিন ও হরমোনজাতীয় ইথরিল অতিমাত্রায় স্প্রে করে এবং ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহারের মাধ্যমে ফলমূলকে রীতিমতো বিষে পরিণত করা হয়। দেখা গেছে, বাগান থেকে আম পাড়ার পর কমপক্ষে তিনবার বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য স্প্রে করা হয়। আমে ফরমালিন স্প্রে করা হয় ও ক্যালসিয়াম কার্বাইড মেশানো হয়। মুড়িকে লম্বা সাদা ও আকর্ষণীয় করতে লবণের পরিবর্তে ইউরিয়ার মতো বিষ দেওয়া হয়।
নকল দুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ঘটনা বেশি পুরনো নয়। এই দুধ তৈরিতে গাভীর দুধের প্রয়োজন হয় না। নকল দুধ তৈরির কারখানাগুলোতে ছানার পানি, থাইসোডা, ময়দা, ভাতের মাড় ও চিনি মিশিয়ে আগুনে ফোটানো হয় এবং পরে কাটিংওয়েল ও অ্যাসেন্স মিশিয়ে দুধের সুবাস দেওয়া হয়। পরে আকর্ষণীয় মোড়কে প্যাকেটজাত দুধ হিসেবে বাজারে আসে এই নকল বিষাক্ত দুধ। গুঁড়া দুধের ওজন বাড়াতে মেশানো হয় ময়দা সুজি ও অন্যান্য দ্রব্য। এছাড়া চা পাতার সঙ্গে কাঠের গুঁড়া ও শুকনো পাতার গুঁড়া দিয়ে প্যাকেটজাত করা হয়। মিষ্টিজাতীয় দ্রব্যাদিতে বেশি বেশি চালের গুঁড়া ও ময়দা মেশানো হয়।
ফলমূলে কার্বাইড ব্যবহার, মুড়িতে ইউরিয়া, পচনশীল খাদ্যে ফরমালিনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক কেমিক্যাল ব্যবহারের প্রমাণ বহন করে আমাদের নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য। যেটাতে হাত দেওয়া যায় সেটাই ভেজালে ভরা। আর এই ভেজাল খাদ্যগুলো শরীরে প্রবেশ করার পর নীরবে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে থাকে। খাদ্যে ভেজালের কারণে এদেশে মানুষের বিভিন্ন রকমের ক্যানসার, লিভার সিরোসিস, কিডনি ফেইলিওর, হার্ট অ্যাটাক, হাঁপানি ইত্যাদি রোগ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। জন্ম নিচ্ছে বিকলাঙ্গ শিশু।
জাতিসংঘের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতিদিন ব্যবহৃত জিনিসপত্রের ভেজালের কারণে সৃষ্টি হতে পারে হরমোন সংক্রান্ত ক্যানসার, ডায়াবেটিস, শিশুর ত্রুটিপূর্ণ জন্ম ও মানসিক বিকারগ্রস্তসহ বিভিন্ন মারাত্মক রোগ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছে। দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনধারণের জন্য খাদ্যের সংস্থান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রকে খাদ্য সংস্থানের পাশাপাশি সে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্য ভেজালমুক্ত করতে হলে রাষ্ট্রের কঠিন আইনের প্রয়োজন রয়েছে, আইনের ব্যবহার নিশ্চিতকরণের প্রয়োজন রয়েছে এবং সর্বোপরি সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা ও অংশগ্রহণের অত্যাবশ্যকীয়তার প্রয়োজন রয়েছে।
খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি প্রতিবছরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে এবং কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও ভেজাল খাদ্যের ব্যাপকতা অব্যাহত থাকে। ভেজাল মিশ্রণ করলেও ভেজালকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না।
আমাদের দেশে ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশে সর্বোচ্চ এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন  ২০০৯-এ সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-তে জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করে অনূর্ধ্ব ৫ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক দশ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান করা হলেও এখানে সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়নি। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যাবজ্জীবন, পাকিস্তানে ২৫ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আমাদের দেশে কঠোর আইনের অভাব এবং বিদ্যমান আইনের সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়া ভেজাল প্রতিরোধে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে বলে প্রতীয়মান হয়।
একটি দেশে খাদ্যে ভেজাল এভাবে চলতে থাকার অর্থই হলো অনেকটা আত্মহত্যার প্রস্তুতি নেওয়া। এই খাদ্যে ভেজাল প্রবণতা থামাতেই হবে। এর জন্য প্রয়োজন কঠোর আইন এবং সেই আইনের সঠিক প্রয়োগ। সঙ্গে সঙ্গে জনসচেতনতা। পণ্যে ভেজালকারীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত যদি করা যায় এবং ভেজাল মেশালে শাস্তি পেতেই হবে—এমন দৃষ্টান্ত যদি স্থাপন করা যায়, তবেই ভেজালের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। আর যে পর্যন্ত এই কাজগুলো না হবে, ততদিন বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে সভা সমাবেশ সেমিনার বর্ণাঢ্য র্যা লি খাদ্য মেলা যাই করা হোক না কেন, এর কোনও সুফল পাওয়া যাবে না।
আমরা আশা করবো এখনই খাদ্যে ভেজালবিষয়ক  জিরো টলারেন্সের একটি কর্মসূচি নেওয়া হবে এবং তা বাস্তবায়ন করা হবে, যা মোটেই দুঃসাধ্য ব্যাপার নয়।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ