রোহিঙ্গা নির্যাতন: আন্তর্জাতিক আদালতের মুখোমুখি অং সান সু চি

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:৪৭, ডিসেম্বর ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫১, ডিসেম্বর ১০, ২০১৯

আনিস আলমগীরইসলামি ঐক্য সংস্থা ওআইসির সমর্থনে গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে মামলা দায়ের করা হয়েছে, তার শুনানি মঙ্গলবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ শুরু হচ্ছে। মামলার শুনানিতে অংশ নিতে নেদারল্যান্ডসের হেগে পৌঁছেছেন দেশটির শীর্ষ নেত্রী অং সান সু চি। তিনি সোমবার ৯ ডিসেম্বর আইনজীবীদের একটি প্রতিনিধিদলসহ নেদারল্যান্ডসে অবতরণ করেন বলে মিয়ানমারের গণমাধ্যম জানিয়েছে। অন্যদিকে, পররাষ্ট্রসচিব মোহাম্মদ শহীদুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ থেকে ২০ জনের একটি প্রতিনিধিদল এই মামলার শুনানি পর্যবেক্ষণের জন্য হেগে উপস্থিত থাকছেন।
আদালত মানেই দীর্ঘসূত্রতা। হেগের আন্তর্জাতিক আদালতও তার ব্যতিক্রম নয়। মিয়ানমারের বিপক্ষে দায়ের করা এই মামলার নিষ্পত্তি হতে কয়েক বছর সময় লাগবে। তবে এর মধ্যে আদালত রাখাইনে রোহিঙ্গাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিতে হয়তো মিয়ানমারকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে কানে তুলা দিয়ে আদালতের কথা উপেক্ষা করার কোনও সুযোগ থাকবে না মিয়ানমারের। কারণ ১৯৫৬ সালে মিয়ানমার জাতিসংঘের গণহত্যা সনদে স্বাক্ষর করেছে। এই সনদে স্বাক্ষরকারী কোনও দেশ আন্তর্জাতিক আদালতের কোনও নির্দেশনা উপেক্ষা করতে পারে না।

মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আদালতের রায় উপেক্ষা করলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে। কারণ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ওপর আদালতের এমন নির্দেশ কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত ১১ নভেম্বর রোহিঙ্গাদের গণহত্যা, অত্যাচার ও ধর্ষণের অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করেছিল পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষুদ্র দেশ গাম্বিয়া। গাম্বিয়া ওআইসির সদস্য দেশ। বাংলাদেশও ওআইসির সদস্য।

হেগ শহরের পিস প্যালেসে আন্তর্জাতিক আদালতে ১০ ডিসেম্বর গাম্বিয়ার বক্তব্য প্রদানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মামলার কার্যক্রম। গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তাম্বাদো তাদের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। মিয়ানমারের সৈন্যরা কী নৃশংসভাবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দমন অভিযান চালাচ্ছে, গ্রাফিক্স-এর মাধ্যমে তার বিস্তারিত বিবরণসহ জাতিসংঘের কাছে পেশ করা একটি রিপোর্ট সংযুক্ত করে বিচারের আবেদন জানানো হয়েছে।

২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনী প্রায় ২৪ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করে। আর ৩৪ হাজার রোহিঙ্গাকে পুড়িয়ে মারে। ১৮ হাজার রোহিঙ্গা নারীকে ধর্ষণ করেছে। আমেরিকার স্যাটেলাইট সর্বপ্রথম বিশ্ববাসীকে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর দেয়। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। যদিও শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন ও গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার। এবারও যথারীতি নিজেদের দোষ ঢাকারই চেষ্টা করছে সু চি’র দেশ।

আদালতে ১১ ডিসেম্বর বক্তব্য প্রদান করবে মিয়ানমার। এরপর ১২ ডিসেম্বর মিয়ানমারের বক্তব্যের পাল্টা জবাব দেবে গাম্বিয়া। মিয়ানমারের পক্ষে বক্তব্য রাখবেন অং সান সু চি। সু চি এক সময় জাতিসংঘেও চাকরি করেছেন, যখন জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন মিয়ানমারের উথান্ট। আগামী বছর ২০২০ সালে মিয়ানমারের নির্বাচন। সুতরাং দেশকে অভিযুক্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা চালানো ছাড়া অং সান সু চির ভিন্ন কোনও পথ নেই। তাই মিয়ানমারকে আদালতে ডিফেন্ড করবে সু চি নিজেই।

মিয়ানমারের আগের নাম ছিল বার্মা। সামরিক শাসকেরা নাম পরিবর্তন করে মিয়ানমার রেখেছে। পূর্বে রাজধানী ছিল রেঙ্গুন। তা এখন অন্যত্র স্থানান্তর করেছে। এখন রাজধানী নেপিদো। বার্মা পূর্বে ভারত উপমহাদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশরা ভারত থেকে বিভক্ত করে শাসন কাজের সুবিধার জন্য পৃথক গভর্নর জেনারেলের অধীনে ন্যস্ত করেছিল বার্মাকে। মিয়ানমারের আয়তন ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৫৭৫ বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি। ১৩৫টি নৃতাত্ত্বিক জাতি রয়েছে মিয়ানমারে। তারা কখনও শান্তিতে ছিল না। নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর প্রায় সবাই মিয়ানমারের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী।

রোহিঙ্গাদের নিবাস ছিল আকিয়াবে। পূর্বে আকিয়াব এবং বৃহত্তর চট্টগ্রাম রোসাং রাজার রাজ্য ছিল। এই রাজ্যটি কখনও বার্মা রাজার অধীনে ছিল না। রোসাং রাজ দরবারে বাংলা সাহিত্য চর্চা হতো। কবি আলাওল, মাগন ঠাকুর প্রমুখ রাজার সভাকবি ছিলেন। ১৯৩৬ সালে নাফ নদী দিয়ে ভারত সীমান্ত সাব্যস্ত করে। ব্রিটিশরা খামখেয়ালিভাবে আরাকানকে বার্মার অন্তর্ভুক্ত করেছিল।

বার্মায় সামরিক শাসন জারি হয় ১৯৬২ সালে। জেনারেল নে উইন সামরিক শাসন জারি করেছিলেন। তিনি প্রায় সবকিছু জাতীয়করণ করে সোশ্যালিজমের নামে এক অদ্ভুত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আর ভারতের মতো এনআরসি করে সব বিদেশিকে বার্মা থেকে বিতাড়িত করেছিলেন।

রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগের শুরু জেনারেল নে উইনের সময় থেকে। ১৯৬২ সালের আগে বার্মায় মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থা ছিল। পার্লামেন্ট ছিল। আর ওই পার্লামেন্টের রোহিঙ্গাদের ছয় জন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিও ছিল। সামরিক শাসন জারির পর জেনারেল নে উইন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে দেয়। ১৯৬২ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে বার্মার সামরিক বাহিনী। ১৩৫ উপজাতিও সুখে নেই। মিয়ানমারে উপজাতি লোকদের দেখলে কোনও কোনও ক্ষেত্রে গুলি করে হত্যা করার আদেশ রয়েছে। যদি না মরে তবে সেনা সদস্যদের শাস্তি হয়। বার্মিজ জনগোষ্ঠীর কিশোরদের পর্যন্ত সামরিক বাহিনীতে যোগদান করতে হয়।

বার্মা অনেকটা লৌহ যবনিকার দেশ। কোনও লিটারেচার সীমান্ত দিয়ে বিশ্ববাসীর হাতে পৌঁছে না। এলেন ক্লেমেন্স নামক জনৈক বিদেশি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে বৌদ্ধবিহারে বৌদ্ধ ধর্ম শেখার জন্য বার্মায় প্রবেশের অনুমতি পান। তিনি এক বছরব্যাপী সু চি এবং তার দুই সহকর্মীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। সেই সাক্ষাতের ভিত্তিতে ‘দি ভয়েস অব হোপ’ নামে গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এই লেখক জেনারেল নে উইনকে একজন উন্মাদ নির্মম শাসক বলে বর্ণনা করেছেন তার বইতে।

তিনি লিখেছেন, ১৯৮৮ সালের ২৬ আগস্ট অং সান সু চি রেঙ্গুনের এক প্যাগোডায় জড়ো হওয়া প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সমাবেশে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বার্মা এসেছেন। সু চি দীর্ঘ ১৫ বছর গৃহবন্দি ছিলেন। প্রথম নির্বাচনের ফল তার পক্ষে এলেও সামরিক বাহিনী তা বাতিল করে দেয়। আর দ্বিতীয় নির্বাচনে তার দল আরও বেশি আসন পায়। এরপর তিনি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হতে পারেননি। তাকে যে পদ দেওয়া হয়, তাকে বলা হয় স্টেট কাউন্সিলর। বলা হচ্ছে এটি প্রধানমন্ত্রীর মতোই একটি পদ।

আমরা আশ্চর্য হই নোবেল বিজয়ী বর্তমান অং সান সু চির ভূমিকা দেখে। আমরা দেখেছি রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সামরিক জেনারেলদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন তিনি। বার্মার সামরিক বাহিনীর সিনিয়র জেনারেল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের বেড়াজালে আটকে আছেন। পশ্চিমা বিশ্ব তাদের জন্য অবরুদ্ধ। সুতরাং বলা যায় সু চি চেষ্টা চালালেও আদালতের বিচার থেকে জেনারেলদের বাঁচানো সম্ভব হবে না।

শুনানিতে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে সু চি থাকায় অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী যোগাযোগ রয়েছে সু চি’র, এমন অনেক ঘনিষ্ঠজন এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এতে করে বিদেশে সু চি’র ভাবমূর্তি আরও কালিমালিপ্ত হবে।

এদিকে হেগের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পর থেকেই সু চি’র সমর্থনে বিশাল সমাবেশ করেছে মিয়ানমারের জনগণ। রবিবারও নেপিদোতে সু চি’র সমর্থনে বিশাল সমাবেশ হয়। সেখানে সু চি’র মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনা করা হয়। এছাড়া সু চি ‘জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় লড়ার জন্য’ যাবেন বলে জানিয়েছে তার দফতর। সু চি’র দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র মিও নায়ান্ত বলেন, ‘মিয়ানমারের মতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মতের পার্থক্য রয়েছে। উত্তর রাখাইনে আসলেই কী ঘটেছে, তা তিনি (সুচি) ব্যাখ্যা করবেন।’

যা হোক গাম্বিয়া একটি ছোট গরিব দেশ। তারা যে রোহিঙ্গাদের সাহায্যে এগিয়ে এলো, তার জন্য হাজারও ধন্যবাদ গাম্বিয়াকে। গাম্বিয়ার উদ্যোগ কামিয়াব হোক, এটা আমাদের সবার প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ