করোনার ‘উলেমা ডাক্তার বিজ্ঞানী’

Send
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
প্রকাশিত : ১৪:১৯, এপ্রিল ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২১, এপ্রিল ২৫, ২০২০

মো. আবুসালেহ সেকেন্দার১৯২০ সালে মাওলানা আবদুল বারী, মাওলানা শওকত আলী ও মাওলানা আবুল কালাম আযাদের নেতৃত্বে ভারতকে ‘দারুল হরব’ ঘোষণা করে হিজরত বা দেশত্যাগের ফতোয়া জারি করা হয়। ওই ফতোয়ায় বলা হয়, ভারতীয় মুসলিমদের পুলিশ ও সেনাবিভাগের চাকরি বর্জন করে ভারত ত্যাগ করে দারুল ইসলামে হিজরত করা ধর্মীয় কর্তব্য। সেই ফতোয়া অনুসরণ করে ভারতের লাখ লাখ মুসলমান দেশ ত্যাগ করেন। সরকারি হিসাব মতে, আনুমানিক পাঁচ লাখ থেকে বিশ লাখ মুসলিম দেশ ত্যাগ করেন। অনেকে চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি বিক্রি করে আফগানিস্তানের সীমান্তে গিয়ে জয়ায়েত হন। আমির আমানুল্লাহ খানের নেতৃত্বে তৎকালীন আফগান সরকার হাজার হাজার মুসলিমকে আশ্রয় প্রদানে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। ফলে ক্ষুধা, উত্তাপ, রোগ ও ক্লান্তিতে বহু মুসলিম মৃত্যুবরণ করেন। যারা দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন, তারা দেশে এসে কর্মহীন হয়ে পড়েন। (বাঙলায় খিলাফত অসহযোগ আন্দোলন, পৃ. ১৫) আন্দোলনে সচ্ছল পরিবারের অনেকে ধন-সম্পদ হারিয়ে পথের ফকির বনে যায়। এই বিপর্যয় থেকে মুসলিমরা সবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, তখনই আরেক ফতোয়া জারি করা হয়। ১৯২১ সালে লক্ষ্ণৌ, দেওবন্দ ও অন্যান্য স্থানের ৫০০ জন আলিম স্বাক্ষরিত আরেক ফতোয়ায় বলা হয়: ইসলাম ধর্ম মতে ব্রিটিশদের সহযোগিতা করা হারাম। কোর্টে চাকরি ও ওকালতি করা অবৈধ, পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে চাকরি করা ইসলামবিরোধী, ব্রিটিশ প্রদত্ত উপাধি গ্রহণ করা কাফিরের কাজ। (বাঙলায় খিলাফত, পৃ. ১৭) ফলে উলেমাদের ফতোয়া অনুসরণ করে সরকারি চাকরি ত্যাগ এবং কোর্ট-কাছারি বর্জন করে হাজার হাজার মুসলিম বেকার হয়ে পড়েন। একই সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করলেও মুসলিমদের ছেড়ে দেওয়া কাজ ও চাকরিগুলো অচিরেই তাদের অধিকারে চলে যায়। তথা মুসলিমদের ছেড়ে দেওয়া সরকারি চাকরিগুলোয় তারা যোগ দেয়। তাই মুসলিম উলেমাদের এমন ফতোয়ার ফলে মুসলিমদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায়।

ভারত উপমহাদেশের মুসলিমদের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে এক শ্রেণির উলেমা যুগে যুগে ইসলামের নামে অদ্ভুত ফতোয়া প্রদান করে মুসলিমদের দুর্দশায় ফেলেছেন। এমনকি উলেমাদের ফতোয়ার কারণে মুসলিমরা দলে দলে মারা পড়েছেন।

১৯০২ সালের বোম্বের প্লেগ রোগের মহামারির ঘটনা এক্ষেত্রে বড় প্রমাণ। ১৯০২ সালে বোম্বেতে প্লেগ রোগ প্রথম পর্যায়ে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় দেখা দেয়। ফলে কিছু উলেমা আজকে করোনাভাইরাসকে যেমন ‘আল্লাহর সৈনিক’ বলছেন, তেমনি সেদিন প্লেগ রোগকে ‘আল্লাহর সৈনিক’ অভিহিত করে ফতোয়া দেন যে, মুসলিমদের শত্রু হিন্দুদের দমনের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে এই সৈনিকদের (রোগ) পাঠানো হয়েছে। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা এই কিছু উলেমার ফতোয়ায় খুশি হয়ে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেন। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মুসলিমের আগমনের ফলে কয়েকদিনের মধ্যে প্লেগ রোগ মুসলিমদের মধ্যে মহামারি রূপে ছড়িয়ে পড়ে। প্লেগ রোগে হাজার হাজার মুসলিম মারা যান।

এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডের বহু উদাহরণ দেওয়া যাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, কিছু উলেমার ওইসব কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড থেকে সাধারণ মুসলিমরা আজও শিক্ষা গ্রহণ করেননি। বরং বর্তমান সময়ও একশ্রেণির উলেমা করোনাভাইরাসকে ‘আল্লাহর সৈনিক’ বলছেন। অমুসলিমদের নিধনে করোনা আল্লাহর গজব মানা। করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কারের আজগুবি ফর্মুলা বলা অথবা মাস্ক পরা ও সাবান দিয়ে হাত ধুতে নিষেধ করা এবং সুরা পড়ে ফুঁ দেওয়া বা শুধু অজু করলেই করোনা মুক্ত হওয়া যাবে ইত্যাদি ফতোয়া বা বক্তব্য বলে দেয় এ যুগের কিছু উলেমা বা কিছু ধর্মনেতাও সাধারণ মুসলিমের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে এক অদৃশ্য মৃত্যুর খেলায় মেতেছেন।

মক্কা ও মদিনাসহ করোনা আক্রান্ত প্রায় সব মুসলিম দেশে মসজিদে জুমা ও জামাতে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করলেও বাংলাদেশ সরকারকে উলেমাদের বুঝিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে কয়েক সপ্তাহ লেগেছে। সরকারি নির্দেশের পরও অনেক উলেমা ওই নির্দেশের বিরোধিতা করছেন এবং গ্রাম বা শহরের গলির ভেতর মসজিদগুলোয় অথবা বিকল্প হিসেবে বাসার ছাদে এখনও জুমা ও জামাতে নামাজ পড়া চলছে আগের মতোই। যদিও এই দেশের উলেমারা ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশকে দারুল হরব ঘোষণা করে ধর্মীয় দৃষ্টিতে ঈদ ও জুমার নামাজ পড়া হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। ফরায়েজি আন্দোলন তার বড় উদাহরণ। ফরায়েজিদের নেতা হাজী শরীয়ত উল্লাহর ফতোয়ায় উৎসাহিত হয়ে বর্তমান বাংলাদেশের প্রায় অধিকাংশ এলাকায় তার অনুসারীরা ব্রিটিশ শাসনের অধীন ঈদ ও জুমার নামাজ নিষিদ্ধ বলে প্রচারণা চলিয়েছেন এবং নিজেরা দীর্ঘদিন ঈদ ও জুমার নামাজ পড়া থেকে বিরত থেকেছেন। (Eastern Bengal, p. 22) । সেদিন ওই নামাজ নিষিদ্ধ কতটা প্রয়োজন ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও আজ যখন প্রকৃতপক্ষে করোনা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার নীতি মেনে গণজমায়েত থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে রাখা দরকার, তখন তারা জুমার নামাজ চালু রাখতে নানা বাহানা খুঁজছেন।

বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের মধ্যে কিছু বোকা মানুষকে আমার চোখে পড়েনি। এদেশের অনেক মানুষকে ধর্মের নামে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো যায়। এক্ষেত্রে শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ নেই। অনেকেই ধর্মের জুজুর ভয়ে সর্বদা তটস্থ থাকেন। সেই কারণে দুই ক্লাস মাদ্রাসায় পড়া একজন শিক্ষার্থীও ধর্মের নামে অনেককে নাকানি চুবানি খাওয়াতে পারেন। যদিও আল্লাহ আল কোরআনে ঘোষণা করেছেন: কোরআনকে সহজ ভাষায় নাজিল করা হয়েছে যাতে মানুষ তা বুঝতে পারে। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে যুগ যুগ ধরে এদেশের কিছু মানুষ উলেমাদের ‘দাসে’ পরিণত হয়েছেন। সেই ‘দাসত্ব’ থেকে যেন কোনোভাবেই তারা বেরিয়ে আসতে পারছেন না।

যদিও ইসলাম ধর্মে উলেমা বলে বিশেষ কোনও শ্রেণি নেই। ইসলামের প্রাথমিক যুগে উলেমা বলে বিশেষ কোনও সম্প্রদায়েরও অস্তিত্ব ছিল না। পরবর্তী সময়ে মুসলিম শাসকরা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে ধর্মের নামে তাদের অধর্মীয় কাজকে বৈধতা দিতে উলেমা নামের একটি শ্রেণিকে রাষ্ট্রীয় অর্থে লালন পালন করেন। তাই উলেমা সম্প্রদায়ের ইতিহাসের পরতে পরতে খুব বেশি সুখকর কথা লেখা নেই।

সাধারণভাবে আলিম শব্দের বহুবচন হচ্ছে উলেমা। আলিম শব্দের দ্বারা ইলম, জ্ঞান, শিক্ষাসম্পন্ন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। ইসলামি বিশ্বকোষে আলিম বলতে উচ্চমাত্রায় বিজ্ঞানের জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকে বোঝানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। (খণ্ড: ৬, পৃ. ৩৩৩)। করোনাভাইরাস মোকাবিলার প্রেক্ষাপটে বলা যায় যে বিজ্ঞানী ও ডাক্তারদের কেবলমাত্র ওই উচ্চমাত্রায় বিজ্ঞানের জ্ঞান আছে। আমরা যাদের উলেমা বলে জানি তাদের মধ্যে কিছু ধর্মীয় নেতার প্রায় শতভাগের ওই বিজ্ঞানের জ্ঞান ঠনঠন। তাই করোনা মোকাবিলায় আপনার আমার উলেমা হচ্ছেন ডাক্তার ও বিজ্ঞানী। তাই করোনা মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের ডাক্তার ও বিজ্ঞানীদের পরামর্শ গ্রহণ করা একমাত্র ধর্মীয় কর্তব্য।

ইসলামের নবি মুহাম্মদের (সা.) জীবন দর্শনও বলে, মহামারির চিকিৎসা সংক্রান্ত সব বিষয়ের জন্য ধর্মনেতাদের নয় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া মুসলিমদের ধর্মীয় কর্তব্য। যাদুল মা’আদ (৪/১২১) ও মুয়াত্তা ইমাম মালিক (রেওয়ায়াত নং ১২) সূত্রে জানা যায়, একদা মুহাম্মদ (সা.)-এর সামনে একজন ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত হলে তিনি বনী আনবার গোত্রের দুইজন ব্যক্তিকে ডেকে আনতে অন্য একজনকে প্রেরণ করেন। ওই ব্যক্তিদের চিকিৎসা বিষয়ক জ্ঞান ছিল। অন্যদিকে হজরত সাদ ইবনে আবি (রা.) বলেন, একদা তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হলে হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাকে ওই বিষয়ের চিকিৎসক সাকিফ গোত্রের অধিবাসী হাবিস উবনে কালাদারের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ প্রদান করেন। (আবু দাউদ: ৩৮৩৫ ও মাজমাউস মাওয়াইদ: ৮৩০০, যাদুল মা’আদ: ৪/১২১)। অন্য এক হাদিস থেকে জানা যায়, হজরত যিয়াদ বিনে আলাকা (রা.) বলেন: আমি নবির খেদমতে উপস্থিত ছিলাম, তখন কয়েকজন বেদুইন এসে নবিকে প্রশ্ন করেন: আমরা চিকিৎসা গ্রহণ না করলে কি আমাদের গুনাহ হবে? নবি (সা.) বলেন: হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর। (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮১৫, আত তিরমিযী: ১৯৮৮, ইবনে মাজাহ: ৩৪৩৬)।

উপরের বিবরণ থেকে বোঝা যায়, হজরত মুহাম্মদ (সা.) সবসময় অসুস্থতায় চিকিসৎকদের পরামর্শ গ্রহণ করাকে উৎসাহিত করেছেন। অন্যদিকে নবি হওয়া সত্ত্বেও হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও চিকিৎসকের নিকট থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। সহিহ মুসলিম শরিফের হাদিসে (নং ৪০০৭) বলা হয়েছে, নবি মুহাম্মদ (সা.) আবু তায়রাহ (রা.) থেকে শিঙ্গা লাগিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করেন এবং চিকিৎসার বিনিময়ে তিনি অর্থ প্রদান করেন।

করোনায় সুরা পড়ে ফুঁ দেওয়া বা মসজিদে নামাজ পড়লে করোনামুক্ত থাকা যাবে অথবা করোনা ‘আল্লাহর গজব’ বলে যেসব উলেমা ফতোয়া দিচ্ছেন, মুসলিমদের উচিত হবে তাদের বর্জন করা। করোনার ঝুঁকি বা প্রতিষেধক সম্পর্কে ওইসব উলেমার কোনও জ্ঞান নেই। তাই করোনার দিনগুলোয় মুসলিমদের উচিত হবে ডাক্তার ও বিজ্ঞানীদের পরামর্শ গ্রহণ করা। সরকারেরও উচিত হবে মসজিদে পুনরায় সাধারণ মানুষের জন্য জামাতে নামাজ ও জুমার নামাজ চালু করার বিষয়ে উলেমাদের নয় ডাক্তার ও বিজ্ঞানীদের পরামর্শ গ্রহণ করা। যখন ডাক্তার ও বিজ্ঞানীদের থেকে ছাড়পত্র পাওয়া যাবে যে গণজমায়েত হলেও আর করোনা ছড়ানোর ঝুঁকি নেই, তখনই কেবল জামাতে ও জুমার নামাজ সীমিত করার নির্দেশ প্রত্যাহার করা যেতে পারে।

আল কোরআনের সুরা জুমারে (আয়াত: ০৯) বলা হয়েছে: ‘যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান? বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে।’ আল কোরআনের ওই আয়াতকে ভিত্তি করে সাধারণ মুসলিমদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই: করোনা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখা ডাক্তার ও বিজ্ঞানী আর বিজ্ঞানের জ্ঞানহীন কথিত ধর্মনেতারা কি সমান? এখন আমরা কতটা বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষ তা নির্ভর করছে করোনা বিষয়ে আমরা কার উপদেশ গ্রহণ করছি, তার ওপর। পরিশেষে, সময় এখন ধর্মান্ধতা বর্জন করে বিজ্ঞানকে সঙ্গে নিয়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়বার। আর সেই লড়াইয়ে আপনার অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ