আনিসুজ্জামান: একটি বাঙালিবৃক্ষের বিদায় ও সামনের অতিকায় অন্ধকার

Send
মাসুদা ভাট্টি
প্রকাশিত : ১৯:০৩, মে ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৪, মে ১৬, ২০২০

মাসুদা ভাট্টিপরিণত বয়সে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান চলে গেলেন, তার এই যাত্রা আরও বর্ণিল ও উৎসবময় হতে পারতো কিন্তু এই করোনাকালে তা সম্ভব ছিল না। উপরন্তু তিনি করোনাক্রান্তও ছিলেন, ফলে তার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে উপস্থিতির কড়াকড়ি আরোপও জরুরি ছিল। রাষ্ট্র যথাযোগ্য মর্যাদায় আনিসুজ্জামানকে বিদায় জানিয়েছে। কারণ আনিসুজ্জামান ও তার প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি নানাভাবে ঋণী। এ ঋণ কেবলমাত্র আনিসুজ্জামান সংবিধানের বাংলা অনুবাদ করেছেন বলে নয়, কিংবা তিনি ‘বাঙালি মুসলমান মানস’ নিয়ে গবেষণা করেছেন বলে নয়, একটি সুনির্দিষ্ট বিশ্বাসকে লালন করে তা সাধারণ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে নয়, বরং বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত বাঙালির যে মুক্তিযুদ্ধ চলমান ছিল তার একজন সৈনিক হিসেবে এবং স্বাধীনতা পরবর্তী পর্বে বাংলাদেশের চার মূলনীতির পক্ষে অনবরত বয়ান তৈরি করে যাওয়া একজন পথিকৃত হিসেবে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ আনিসুজ্জামানের কাছে ঋণী। দুঃখজনক সত্য হলো, জাতির এ ঋণস্বীকারে কার্পণ্যও দৃশ্যমান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে আনিসুজ্জামানের মৃত্যু-পরবর্তী সম্মান প্রদর্শনও যেমন প্রকাশ্য তেমনই তার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন এবং তার জীবন ও কর্মকে নিন্দার কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চিত্রও অপ্রকাশ্য নয়। তার কর্ম, বিশ্বাস ও জীবনকাল সমালোচনার বাইরে সেকথা বলা হচ্ছে না, কিন্তু তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাঙালি-চিন্তার উৎকট বিভাজনটি আরও উৎকটভাবে দৃশ্যমান এবং বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে।

আনিসুজ্জামান-পাঠে কিংবা তার সঙ্গে দীর্ঘদিনের জানাশোনা থেকে আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে যেভাবে চিনেছি বা বুঝেছি তাতে আমার মনে হয়েছে, এক ভয়ানক সাম্প্রদায়িক ডামাডোলে এপার-ওপার হওয়া ‘উদ্বাস্তুদের’ দলে যুক্ত হওয়া আনিসুজ্জামান কিংবা তার কালের আরও অনেকেই সারাজীবন সবচেয়ে বড় ভয় করেছেন সাম্প্রদায়িকতাকে, বা বলা ভালো ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে। ওপারে  ভালো অবস্থানে থাকা শিক্ষিত মুসলিম সম্প্রদায় এপারে এসে তাই ঢাকা-কেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন যাদের মূল ও মৌলিক প্রশ্ন ছিল কী করে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে পূর্ববাংলাকে পাকিস্তানের মৌলিক সাম্প্রদায়িকতা চর্চার বাইরে রাখা যায়। তাদের এই প্রচেষ্টায় বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক ও স্বাধীকার আন্দোলনের রাজনীতি যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয় ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। আমরা লক্ষ্য করি যে, বঙ্গবন্ধুর জাতীয় চার মূলনীতি প্রণয়নেও এরা সক্রিয় ছিলেন এবং পরবর্তীতে তাদের অনেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী দর্শনে খ্যাত হয়েছেন এবং বাংলাদেশে তার চর্চাকে অব্যাহত রাখার চেষ্টা করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, ওপার থেকে আসা ‘আশরাফ’-রা যখন বাংলাভাষাকে কেন্দ্র করে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছেন তখন ওপার থেকে আসা ‘আতরাফ’ মুসলমানের মনে কিন্তু ভয়ঙ্কর আতঙ্ক, সবকিছু আবার হারানোর কিংবা ‘মার খাওয়ার’ (একাধিক স্মৃতিচারণ থেকে এর উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে) ভয়ে ভীতগ্রস্ত এই বিশাল জনগোষ্ঠী কিন্তু নিজেদের চেতনাকে সর্বাংশে অসাম্প্রদায়িক রাখতে পেরেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। সে আলোচনা আজ নয়, তবে ছোট্ট করে বলে রাখি যে, পাকিস্তানপ্রীতিতে কিংবা পরবর্তীকালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে এরা অগ্রগন্য ভূমিকা রেখেছিল বলে প্রমাণ রয়েছে।

আনিসুজ্জামান কিংবা তার মতো অনেককে আমাদের চিনতে বা বুঝতে কষ্ট হয় না, কারণ তারা কখনও নিজেদের চিন্তাচেতনাকে লুকিয়ে রাখেননি। প্রকাশ্যই রেখেছেন। যেমন, রবীন্দ্রনাথকে তারা এদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার কেন্দ্রে রেখেছেন, আগলে রেখেছেন পাকিস্তানি আঘাত থেকে যেমন, তেমনই স্বাধীন বাংলাদেশের নব্য ধর্মচেতনাবাদী রাজনীতি থেকেও সব সময় রবীন্দ্রনাথকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। আনিসুজ্জামান তার ‘বাঙালি মুসলমান’ পরিচয়কে অগ্রাহ্য করেননি, কিন্তু ধর্মকে আলাদা রেখে তার ‘বাঙালি-পরিচয়’কে প্রাধান্য দিয়েছেন। প্রকাশ্যেই পাকিস্তানপন্থার বিপরীতে ভারতীয় নৈকট্যকে জারি রেখেছেন। এও এক আন্দোলনের মতোই, কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতির এই মোটা-বিভাজনে ‘বাঙালিত্ব’ বজায় রাখাটাই আসলে ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে খ্যাত হওয়ার জন্য যথেষ্ট, আনিসুজ্জামান এখানেই আলাদা, তিনি তার এই ভারতসঙ্গ কখনোই গোপন করেননি এবং যথেষ্ট উচ্চকিত থেকেই তিনি এই ভারতসঙ্গ বজায় রেখেছেন। তার মূল্য তাকে দিতে হয়েছে বার বার, তিনি সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হয়েছেন, এমনকি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেরও কেউ কেউ তার এই ‘ভারতসঙ্গের’ কারণে তাকে বাতিল করে দিয়েছেন এই বলে যে, ‘ও তো আসলে সব তরকারির হলুদ, চিরকালের প্রধান অতিথি’। এতে আনিসুজ্জামানের নিজস্ব আন্দোলন যাকে আমি ‘বাঙালায়ন’ (বেঙ্গলাইজেশন) বলি, তা কখনও কখনও বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে এবং তার মৃত্যুর পর তার সমালোচকরাও আনিসুজ্জামানকে ঠিক এখানেই আঘাতটি করছেন সবচেয়ে বেশি।

মজার ব্যাপার হলো, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আনিসুজ্জামান কিংবা তার মতো অসাম্প্রদায়িক বাঙালি হওয়ার চেষ্টাকে সম্মুন্নত রাখায় বিশ্বাসীদের ধারে-কাছেও নেই (অন্তত দলের ভেতরকার একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে এই কথাটি সত্য) কিন্তু বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধু-কন্যা দু’জনেই তার নিকট-রাজনীতিবিদদের নিয়ে আনিসুজ্জামানের মতোই ধর্মকে জাতীয়-পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্নই রাখেন/রাখতেন বলে আনিসুজ্জামানের নৈকট্য বলি আর সমর্থন বলি কিংবা আনিসুজ্জামানের রাজনীতিই বলি, সর্বসম্মুখে আনিসুজ্জামানের মতো চিন্তাভাবনা পোষণকারীদের সকলকেই ‘আওয়ামী সমর্থক’ বলে ধরে নেওয়া হয়, অন্তত সাধারণ্যে কিংবা আওয়ামী-বিরোধী শিবিরে। কিন্তু দুঃখের কথা হলো, আনিসুজ্জামান কিংবা তার মতাদর্শে বিশ্বাসী কিংবা দোলাচালে থাকা ‘বাঙালি’-দের ধারণ করবে, পৃষ্ঠপোষকতা দেবে কিংবা এই মতাদর্শকে প্রচার করে তাকে কেন্দ্র করে একটি রাজনীতিকে নির্মাণ করার মতো কোনও রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে নেই, এমনকি নিজেদের অসাম্প্রদায়িক বলে দাবি করা কমিউনিস্ট পার্টিও নয়। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই আনিসুজ্জামান কিংবা তার মতো করে যারা ভাবেন তাদের অনেককেই রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়েছে, আওয়ামী লীগের উত্থানে আনন্দিত হতে হয়েছে, পতনে বিষাদগ্রস্ত হতে হয়েছে এবং কখনও মৃদু কখনও কড়া সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বিরাগভাজন হতে হয়েছে; যেহেতু আর কোথাও দাঁড়াবার জায়গা নেই সেহেতু ‘মন্দের ভালো’ বলে আওয়ামী লীগকেই সমর্থন দিতে হয়েছে। ২০১৪’র পর থেকে ‘শেখ হাসিনা না থাকলে বাংলাদেশের কী হবে’- এই দুঃশ্চিন্তায় ভোগা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ক্রমশ কোণঠাসা হতে দেখছি এবং তাদের একেকজনের চিরবিদায় নেওয়ার পর তাদেরকে খারিজ করে দেওয়া-দের দীর্ঘ তালিকা দেখে মনে হচ্ছে, এই বুদ্ধিজীবীকূলের অপরাধ বহুমাত্রিক; প্রথমত, তারা পাকিস্তান-বিরোধী এবং তার মানেই ভারতঘনিষ্ঠ, দ্বিতীয়ত, তারা আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক ভাবে সমর্থন করে (বেশিরভাগ সময়ই উপায় নেই বলে), এবং তৃতীয়ত, তারা বাংলাদেশকে একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় না বলে। এই তালিকা থেকে আনিসুজ্জামানের গত হওয়া তাই ও-পক্ষের জন্য আনন্দের কারণ অন্ততপক্ষে একটি কলম/একটি আওয়াজতো বন্ধ হলো।

আমার কাছে এটাই সবচেয়ে দুঃখের ও কষ্টদায়ক মনে হয়েছে যে, এরা আসলে কারা যারা আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে উচ্ছ্বসিত? তাকে নাস্তিক, ভারতের দালাল কিংবা আওয়ামীপন্থী বলে খারিজ করে উল্লাস প্রকাশ করে যাচ্ছেন? এরা কি তারাই যাদের পিতা-পিতামহদের একসময় আনিসুজ্জামান ও তার সময়ের সঙ্গীরা পরাজিত করেছিলেন?

ইতিহাস নির্মম, আনিসুজ্জামান ও তার সঙ্গীসাথীরা পাকিস্তান-ভাঙার আন্দোলনে যাদের বিরোধিতা করেছিলেন তারা আর পরে ঠিক উঠে দাঁড়াতে পারেননি বিশেষ করে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে। কবিতায় বা সাহিত্যে ‘এছলামী ভাষা’ প্রয়োগ কিংবা ‘মহাশশ্মান’কে কেটে দিয়ে ‘গোরস্থান’ লেখায় আগ্রহী বুদ্ধিজীবীকূল; পাকিস্তান ভাঙা মানে ইসলামকে বাদ দিয়ে পৌত্তলিকতাকে বরণ করে নেওয়া- চিন্তার বিরাট সংখ্যক সমর্থক; বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের বিতাড়ন করে দেশটাকে পুরোপুরি মুসলমানের করে ফেলার রাজনীতির সমর্থক- এদের সম্মিলিত নেতিবাচক রাজনীতির বিপক্ষে আনিসুজ্জামান ও তার সময়ের সঙ্গীরা জয়লাভ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু ও তার আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকেই। কিন্তু পঁচাত্তর-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের যেমন পেছনে হাঁটতে হয়েছে তেমনই আনিসুজ্জামানদেরকেও একের পর এক ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। জীবনের শেষ বেলায় এসে তাদের নির্মিত বাংলাদেশে একসময় যারা তাদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন তাদেরই ‘নাতিপুতিদের’ ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনার বিস্তার ও কেবলমাত্র ধর্মই তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠার এই চিত্র নিঃসন্দেহে আনিসুজ্জামানদের জন্য সুখকর ছিল না। যে বাংলাদেশকে তিনি রেখে গেছেন তাকে কোনোভাবেই তার আদর্শের বাংলাদেশ বলা যাবে না। আগেই বলেছি, এ আমার সম্পূর্ণ নিজস্ব বিশ্লেষণ।

তবে আনিসুজ্জামান চলে গিয়ে একপ্রকার ভালোই হয়েছে, হয়তো তার চিন্তাচেতনার বাংলাদেশের সামনে যে ক্রান্তিকাল অপেক্ষা করছে সেটা তার পক্ষে গ্রহণ করাও কষ্টকর হতো খুব। তিনি এ বিষয়ে অচেতন ছিলেন তা নয়, ব্যক্তি আলাপে কিংবা বক্তৃতা-বিবৃতিতে তিনি এই আশঙ্কার কথা বার বার বলেছেন, রাষ্ট্রনীতি প্রণয়কদের সাবধান করেছেন, সমালোচনা করেছেন, নিজের জীবনকে বিপন্ন করেছেন, হুমকি-ধামকি পেয়েছেন, পেয়েছেন মৃত্যু-পরোয়ানা তবু তিনি তার কথা বলেছেন, যখন যেভাবে পেরেছেন। এর বেশি তার পক্ষে করা সম্ভবপর ছিল না, কারণ তিনি বিপ্লবী নন, তিনি সমাজের অংশ, সমাজ নামক ঘরের একটি ‘খাম’, বিশ্বাসে-চেতনা-প্রকাশে তিনি ‘বাঙালিবৃক্ষ’ হয়ে অবিচল থাকার চেষ্টা করে গেছেন, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে গিয়েছেন বাংলাদেশ নামক ঘরের একেকটি ‘খাম’ হওয়ার জন্য, মনে-মননে ‘বাঙালিত্ব’কে ধারণ করে, যে বাঙালিত্বে রয়েছে অসাম্প্রদায়িকতা এবং আন্তর্জাতিকতা। আনিসুজ্জামান এখানেই অনন্য, ভয়ঙ্কর কোনো বিপর্যয়ে বাংলাদেশে যদি কোনোদিন আনিসুজ্জামানদের চেতনার পরাজয়ও ঘটে তবুও আনিসুজ্জামান ও তার সময়ের সঙ্গীদের এই প্রচেষ্টার কথা ইতিহাসে গাঢ় কালিতেই চিত্রিত থাকবে আর তার বিরোধীতাকারীরা আগের মতোই পাদটীকাই থেকেই যাবেন; পাদটীকা মূল ইতিহাস কখনোই নয়।

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ