করোনার একমাত্র কষ্ট ছিল মাকে ছুঁতে না পারা

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৬:৫৯, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০১, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২০

রুমিন ফারহানামার্চে বাংলাদেশে করোনা আসার পর থেকে যে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি এবং নিয়মাবলি আমি মাসের পর মাস মেনে চলছিলাম তাতে আমার করোনা হতে পারে এর ন্যূনতম আশঙ্কার কথাও আমার মাথায় আসেনি। আমি বাইরে গেছি খুবই কম, লোকসমাগম পরিহার করেছি এবং আনুষঙ্গিক যে স্বাস্থ্যবিধি আমি পালন করেছি সেটা আমাকে শুধু করোনা কেন, প্রায় যেকোনও অসুখ থেকেই শত হস্ত দূরে রাখার কথা ছিল। তারপরও এক বিকেলে হঠাৎ লক্ষ করলাম গলায় বেশ ব্যথা। গলাব্যথা আমার পুরনো সমস্যা, কখনও যে তেমন মনোযোগ দিয়েছি, তা না। পরদিন সকালে জ্বর, তাও খুব বেশি না, ১০০ থেকে ১০১ ডিগ্রি। সেটাকেও পাত্তা দেওয়ার কোনও কারণ ছিল না। যেহেতু চরমভাবে সব নিয়ম পালন করেছি, তাই সত্যি বলতে কী, করোনার কথা আমার মাথায় আসেনি একবারের জন্যও। যেহেতু আমি মায়ের সঙ্গে থাকি, তাই কোনোরকম দুশ্চিন্তা না হলেও ফোন দিলাম পারিবারিক বন্ধু ডাক্তার মোসলেউদ্দিনকে। উনি শুনেই বললেন, ‘পারলে আজকে রাতেই করোনা পরীক্ষা করান।’
বললেই তো আর পরীক্ষা হয় না, আর বাংলাদেশে পরীক্ষা অত সহজও না। যাই হোক সংসদ সদস্য হওয়ার সুবাদে সংসদে জানালে সেখান থেকে আমাকে একটি নম্বর দিয়ে দায়িত্ব সারা হয়। নম্বরটি ছিল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের (এনআইএলএমআরসি) পরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল খায়ের মোহাম্মদ সামসুজ্জামানের। তার মতো আন্তরিক, দায়িত্ববান আর পেশাদার মানুষ আমি খুব বেশি দেখিনি। তিনি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন এবং আমার দেওয়া সময় অনুযায়ী একটি চমৎকার টেকনিশিয়ান পাঠান যিনি অতি যত্নের সঙ্গে আমাদের নমুনা সংগ্রহ করেন এবং সেদিনই সন্ধ্যায় আমরা রিপোর্ট পেয়ে যাই। ডা. খায়ের নিজেই আমাকে ফোন করেন এবং কিছুটা বিষণ্ণ কণ্ঠে আমাকে জানান বাসার সবার রিপোর্ট নেগেটিভ হলেও আমার পজিটিভ, এবং প্রাথমিক কিছু নিয়ম-কানুনের ব্যাপারে আমাকে অবহিত করেন। 

সত্যি কথা বলতে কী, পাঠক হয়তো অবাক হবেন, আমি বড় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলাম, কারণ আমার মা তখনও পর্যন্ত নিরাপদ। আমি সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঘরে আবদ্ধ হয়ে যাই, সঙ্গে নেই ঘর পরিষ্কারের সরঞ্জাম আর একটা ইলেকট্রিক কেতলি। বাড়িতে আমি ছাড়া তখন ছিলেন মা আর একজন মাত্র গৃহকর্মী, যাকে ছাড়া মা আক্ষরিক অর্থেই এক পাও হাঁটতে  পারেন না। তাই আমার সিদ্ধান্ত ছিল গৃহকর্মীকেও আমার কাছ থেকে অনেক দূরে রাখতে হবে, কারণ সে যদি নিজে আক্রান্ত নাও হয়, সে আমার কাছ থেকে ভাইরাস বহন করে মাকে ছড়িয়ে দিতে পারে। মায়ের যে বয়স এবং শারীরিক অবস্থা, তাতে করোনা তার জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক হতো। অবাক হয়ে লক্ষ করি আমাদের তরুণ প্রজন্মের অনেকেই করোনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাবার ছলে কোনোরকম সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়াই পথে-ঘাটে অপ্রয়োজনে ঘুরে বেড়ান। তাদের কি একবারও মনে পড়ে না, পরিবারের বৃদ্ধ এবং নানান রোগে আক্রান্ত সদস্যের কথা, যারা করোনা আক্রান্ত হলে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে?

সকাল-দুপুর-রাত তিন বেলাই খাবার রেখে দেওয়া হতো আমার দরজার বাইরে। খাবার দেখলেই শরীর খারাপ লাগতো, কিন্তু ডাক্তারদের কঠোর নির্দেশনা ছিল প্রচুর পরিমাণে প্রোটিনসহ স্বাভাবিক সব খাবার পরিমাণে আগের চেয়েও বেশি করে খেতে হবে। আমাকে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে হবে, মাকে ভালো রাখতে হবে, কারণ মায়ের দেখাশুনা আমি করি। ভেতরের এই প্রচণ্ড তাড়নায় ভীষণ অরুচি নিয়েও আমি জোর করে খাবার খেয়ে গেছি। ধীরে ধীরে লক্ষ করলাম শরীর অল্পতেই ক্লান্ত এবং অবসন্ন হয়ে আসে, কিন্তু তারপরও নিয়মিত ব্রিদিং এক্সারসাইজ সহ অন্যসব ব্যায়াম চালিয়ে গেছি। দিনে তিন/চার বার গরম পানির ভাপ নিতাম, গড়গড়া করতাম। 

এক রাতের কথা খুব মনে পড়ে। করোনার চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে রাত ১২টায় শেষবারের মতো পানি ফুটিয়ে ভাপ নেবার জন্য যাচ্ছিলাম। অসাবধানতা কিংবা সারাদিনের ক্লান্তিতে অনেকটা পানি ছলকে পড়ে আমার হাতে। মুহূর্তে ঝলসে যায় হাতের চামড়া। কী অবর্ণনীয় সেই যন্ত্রণা, সেটা লেখায় প্রকাশ করা সম্ভব না। অত রাতে কাকে বলবো ওষুধের কথা আর বাসায় পোড়ায় দেওয়ার ওষুধ নেই, সেটাও আমি জানি। অগত্যা কলের জলে হাত ডুবিয়ে রেখেছিলাম বহুক্ষণ। 

করোনার এই দুঃসময়ে যেসব চিকিৎসক তাদের মূল্যবান সময় এবং উপদেশ দিয়ে আমার পাশে থেকেছেন, দিনে রাতে ২৪ ঘণ্টা যেকোনও সময় ফোন করবার অনুমতি দিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করলেই নয়। এদের মধ্যে আছেন ডা. আবদুল্লাহ, ডা. মোসলেউদ্দিন, ডা. আমান, ডা. রিজভী, ডা. রফিক, ডা. ডোনার, ডা. জাহিদ, ডা. সোমা, ডা. এলিজাবেথ প্রমুখ। এর মধ্যে একজনের নাম আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, তিনি হলেন ডা. সাজিদ, যিনি সার্বক্ষণিকভাবে আমার পাশে থেকে সাহস, শক্তি এবং কনসালটেশন দিয়েছেন। 

এই সকল ডাক্তারের সঙ্গে একটি মজার ঘটনা ঘটতো আমার। প্রথমে তারা সবাই আমাকে অভয় দেওয়ার জন্য বলতেন মনে সাহস রাখার জন্য, আমি যেন কিছুতেই ভয় না পাই। আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার পরই বেশ খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বলে উঠতেন অসুখটা আমি যত হাল্কা মনে করছি সেটি ঠিক ততটা হাল্কা নয়। আমার কিন্তু এখন মনে হয় খুব সহজভাবে নিয়েছিলাম বলেই মাত্র ১৩ দিনের মাথায় নেগেটিভে হতে পেরেছিলাম। 

অসুস্থতা, ক্লান্তি, অবসাদ, জ্বর, গলা ব্যথা, হাল্কা ডায়রিয়া, খাবারে অরুচি, স্বাদ বা গন্ধ চলে যাওয়া এর কোনও কিছুকেই আমার তেমন কষ্টকর মনে হয়নি যতটা কষ্টকর মনে হয়েছে মা’র কাছ থেকে আমার দূরে থাকা। দিনের বেশ কিছু সময় এবং বিশেষ করে রাতে ঘুমাতে যাবার আগে মাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকা আমার বহু বছরের অভ্যাস। ২০০৪ সালে বাবা অসুস্থ হওয়ার পর থেকে ২০১২ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি রাতে যতবার ঘুম ভাঙতো বাবার ঘরে গিয়ে তাকে দেখে আসা, তার ঘুমের মধ্যে কপালে চুমু খাওয়া আমার নিত্য দিনের রুটিন ছিল। 

২০১২ সালে বাবার মৃত্যুর পর ২০১৪ সাল থেকে যখন মা অসুস্থ হওয়া শুরু করলেন তখন থেকে প্রতি রাতে একইভাবে মা’কে আদর করে আসা ছিল আমার রুটিন। করোনা এই রুটিনে তীব্র নিষ্ঠুরভাবে আঘাত হানে। আমার মা ডিমেনশিয়ার রোগী, যারা কিছুই মনে রাখতে বা বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারেন না। আমার অসুস্থ থাকাকালীন সময় উনি কিছুতেই বুঝতে পারেননি আমার আসলে কী হয়েছে, কিংবা আমি আদৌ অসুস্থ কিনা। কিন্তু বুঝতে পারতেন আমি তার কাছে যাচ্ছি না, তাকে জড়িয়ে ধরছি না। মা মেয়ের এই কষ্টের কোনও সীমা পরিসীমা ছিল না। শেষের দিকের কয়েক দিন আমি ডবল মাস্ক পরে মা’র ঘর থেকে অন্তত ২০ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে ছোট্ট শিশুদের যেভাবে আদর করে মায়ের সঙ্গে ঠিক সেভাবেই কথা বলতাম।

অসুস্থ বাবা, মা নিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর একদম একা এই নিষ্করুণ পৃথিবীতে চলার ফল হয়েছে কোনও কিছুতেই আমার চোখে পানি আসে না। তবে দূরে দাঁড়িয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় আমার দুই চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়তো, কিন্তু দূরত্ব আর মাস্ক থাকার কারণে কিছুই বুঝতে পারতেন না মা। আমার করোনার আসল কষ্ট ছিল সেটাই। 

যাক ১৩ দিনের মাথায় পরীক্ষা করে করোনা নেগেটিভে আসলে আমি সিদ্ধান্ত নেই প্লাজমা দেওয়ার। 

সামনে করোনার দ্বিতীয় ওয়েভ আসছে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। শীতকালে ঘটবে বলে এটা অনেক বেশি ভয়ঙ্কর হবে–এটা যেমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেমনি বলছেন ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকও। এর মধ্যেই বাংলা ট্রিবিউন খবর দিয়েছে হাসপাতালে জটিল রোগীর সংখ্যা আবার দ্রুত বাড়ছে। কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে কোনও আইসিইউ শয্যা খালি নেই, আইসিইউ শয্যা পাওয়া যাচ্ছে না বেসরকারি হাসপাতালেও। এই সময় আমরা যারা করোনা থেকে সেরে উঠেছি, তাদের একেকজনের দেওয়া প্লাজমা পাঁচজন জটিল রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে। আইসিইউ-ভেন্টিলেটরের ভয়ঙ্কর ব্যয় থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে।

প্রতিটা অসুস্থতা আমাদের জীবনকে নতুনভাবে দেখার দৃষ্টি দেয়। আমরা যখন সুস্থ থাকি তখন সুস্থতাকে মূল্যায়ন করি না। অসুস্থতা আমাদের সেই মূল্যটা বোঝায়। শুধু সেটাই না, আমাদের পারিবারিক সম্পর্কগুলো আমাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা আমরা বুঝে উঠতে পারি না সব সময়। এটার একটা চমৎকার দিক দেখালো করোনা। আর সব অসুখের চাইতে উল্টো ব্যাপার ঘটলো এতে– দূরে থাকতে হলো প্রিয় মানুষের কাছ থেকে। করোনায় অনেক মৃত মানুষের পরিবার তাদের প্রিয় মানুষটিকে শেষ দিকে হাসপাতালে কিংবা মৃত্যুর পর শেষ দেখাটিও দেখতে পারেননি। মায়ের ছোঁয়া বঞ্চিত হওয়া ১৩টি দিন আমাকে আবার দেখালো মানবিক সম্পর্কগুলোর চাইতে মূল্যবান কিছু নেই আর পৃথিবীতে।

 

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X