আমাদের ক্ষোভের সীমানাও সরকারেরই বেঁধে দেওয়া

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ২১:০২, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:০৩, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

রুমিন ফারহানাকিছুদিন পরপর একেকটা ঘটনা ঘটে, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় চলে, তারপর আবার নতুন ঘটনার তোড়ে ভেসে যায় সবকিছু। যেমন, এই মুহূর্তে চলছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের সাবেক ডিজি এএইচএম এনায়েত হোসেনের ড্রাইভার আব্দুল মালেককে নিয়ে; যিনি পেশায় একজন গাড়িচালক হয়েও কোটি কোটি টাকাসহ ঢাকায় অন্তত ১০টি প্লট-ফ্ল্যাট এবং বাণিজ্যিক ভবন, গবাদি পশুর খামার, মাছের ঘের এবং পরিবহন ব্যবসার মালিক হয়েছেন। তার এই বিপুল বিত্ত বৈভবের দেখাশোনা করেন তার ছোট ভাই আব্দুল খালেক যিনি অধিদফতরের পিয়ন হিসেবে কর্মরত। গণমাধ্যমে এসেছে, মালেকের উত্থানের মূলে ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক শাহ মুনীর হোসেন। চার বছর এই মহাপরিচালকের গাড়ি চালিয়ে তিনি এই মহাপরিচালকের ‘কালেক্টর’ উপাধি পেয়েছিলেন। তারপর থেকে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
দুর্নীতির কোনও খবর প্রকাশিত হলে আমাদের রিঅ্যাকশন দেখলে আমার ‘আসহাবে কাহফ’-এর কথা মনে হয়। নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য সাতজন যুবকের একটি গুহায় আশ্রয় নেওয়া এবং সেখানে ঘুমিয়ে পড়া আর তাতে ৩০০ বছর কেটে যাবার কাহিনি আমরা ছোটবেলা থেকে জানি। স্বাভাবিকভাবেই ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর সেই যুবকরা ৩০০ বছর পরের পৃথিবী দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়। বাংলাদেশের দুর্নীতির খবরে আমাদের আচরণে আমার এই গল্পটি মনে পড়ে; দুর্নীতির খবরে স্তম্ভিত হওয়াদের দেখে আমার মনে হয় এই মানুষগুলো যেন সেই যুবকদের মতো ঘুমিয়ে ছিলেন। সম্রাট-জি কে শামীম-পাপিয়াদের দেখে তারা স্তম্ভিত হন, তারপর আবার ঘুমিয়ে যান। তারপর সামনে আসে সাহেদ-ডা. সাবরিনা, সবাই আবার ঘুম থেকে জেগে ওঠে আবার অবাক হন এবং এরপর আবার ঘুমিয়ে পড়েন। এখন নতুন করে উদয় হয়েছেন মালেক। অথচ এরই মধ্যে টিআইবি দেশের ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, পারিবারিক এবং ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ে দীর্ঘ গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, কিন্তু সেদিকে কারও ভ্রূক্ষেপ নেই।

বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটি ২০০৯ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি আমাদের সামনে আসে। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারিকে পাত্তা না দিয়ে ‘পিনাট’ বলেছিলেন। এখন এই কেলেঙ্কারি হলে অবশ্য জনগণও এটাকে হয়তো ‘পিনাট’ই মনে করতো। কিন্তু তারা সেটা মনে করেনি, কারণ তখনও বাংলাদেশে কোনও জেলা বা থানা লেভেলের নেতার ২ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা কিংবা ঢাকা শহরে ১২৫টি ফ্ল্যাট আর বাড়ি থাকার খবর মানুষের সামনে আসেনি।

হলমার্কের পর থেমে থাকেনি ব্যাংক লুটেরাদের ‘জয়যাত্রা’। একের পর এক কেলেঙ্কারি ঘটে গেছে এবং দেশের ব্যাংকিং খাত একেবারে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। একথা শুধু সরকারবিরোধীরা বলেন তা না, একথা বলেন সরকারের সমর্থক অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকাররাও। এদের মধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ দুইজন মানুষ অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম এবং ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ।

সারা পৃথিবীতেই ব্যাংকে কিছু মানুষ ঋণখেলাপি হয়। সেটা হচ্ছে কোনও মানুষ সৎ উদ্দেশ্যে নেওয়া ঋণ ফেরত দিতে পারেনি তার ব্যবসা কিংবা চাকরির সংকটের কারণে। কিন্তু আমাদের দেশে প্রধান ঋণখেলাপিরা হচ্ছেন ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’। অর্থাৎ এরা প্রথম থেকেই জানতেন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ তারা ফেরত দেবেন না। তাই সেই ঋণ তারা নেওয়ার ক্ষেত্রেও নানারকম কারসাজি করেন।

এখানে যে সকলের যোগসাজশে ঘটনা ঘটছে তার প্রমাণ একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যেগুলো ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শাস্তির আওতায় আনা দূরেই থাকুক আরও ঋণ পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা অবিশ্বাস্যরকম কমানো হয়েছে, এই ব্যাংকের গভর্নর এখন ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি-এর নির্দেশনামতো চলেন। এবং এই গভর্নর ব্যাংক মালিকদের এতই প্রিয়ভাজন যে রীতিমতো আইন পরিবর্তন করে বর্তমান গভর্নরকে পুনঃনিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

একই পরিবার থেকে দুইজনের পরিবর্তে চারজন পর্যন্ত পরিচালক রাখা এবং পরিচালকের মেয়াদ পরপর দুইবারে সর্বোচ্চ ছয় বছরের পরিবর্তে পরপর তিনবারে সর্বোচ্চ নয় বছর থাকার বিধান করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অতি সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ এর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিককালে অবিশ্বাস্যভাবে ২% ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করে ঋণখেলাপিদেরকে আবার‌ও ঋণ নেওয়ার সুযোগ দান করা হয়েছে।

ব্যাংক মালিকদের চাপে ব্যাংকের করপোরেট কর হার আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমায়। পাশাপাশি সরকারি তহবিলের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সুযোগ দেয় সরকার। 

বর্তমান সময়টা কতটা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি বান্ধব সেটার প্রমাণ দেখা গেলো কিছুদিন আগে সংসদেও। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রেরিত তিনশত ঋণ খেলাপির তালিকা প্রকাশ করা হলেও, সেখানে শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ এই তালিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনেক ব্যক্তিই একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়েছে এবং খেলাপি হয়েছে। কিন্তু যেসব ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ গ্রহণ করেছে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। আবার যারা একাধিকবার রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ করে পুনরায় ঋণখেলাপি হয়েছে, তাদের নামও কখনও প্রকাশ করা হয় না।

অর্থাৎ এটা খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায় ব্যাংক মালিক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বাংলাদেশ ব্যাংক) এবং সরকার এই তিন পক্ষ ব্যাংকে গচ্ছিত সম্পদ যে জনগণের সেটা ভুলে গিয়ে খেলাপিদের ক্রমাগতভাবে সুযোগ করে দিচ্ছে।

এসব ঘটনা একটার পর একটা আমাদের সামনে এসেছে, কিন্তু আমরা থাকছি একেবারেই নির্বিকার। তীব্র প্রতিবাদ দূরে থাকুক আমরা খুব সাধারণভাবেও এই বিষয়গুলো নিয়ে অন্তত ফেসবুকে কথাবার্তা বলিনি। বর্তমান ক্ষমতার চরিত্রের কাছে চুনোপুঁটিও না এমন একজন আব্দুল মালেককে নিয়ে আমরা মেতে আছি। আব্দুল মালেকের বাড়ির কারুকার্য খচিত জমিদারির স্টাইলের দরজা আমাদের চোখে লাগে খুব, কিন্তু ব্যাংকের টাকা মেরে দেওয়া এসব রাঘববোয়ালের বাড়ির দরজার ছবি কেন আমাদের সামনে আসে না, সে প্রশ্ন কি আমরা করি? 

একজন গাড়িচালকের ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হওয়া নিয়ে আমরা খুব কথা বলি, কিন্তু হাতে গোনা কিছু মানুষ মিলে ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ৩ লাখ কোটি টাকা যে আত্মসাৎ করেছেন সেটা কেন আমাদের একটুও গায়ে লাগে না? 

জনাব মালেক তার আত্মসাৎ করা টাকা দিয়ে এই দেশেই সম্পত্তি বানিয়েছেন বলে সেটা আমরা দেখতে পারি, সেটার হিসাব নিতে পারি এবং চোখ কপালে তুলতে পারি। কিন্তু এসব ঋণখেলাপি এই দেশের টাকা বিদেশে নিয়ে গিয়ে কানাডায় বেগম পাড়া বানায়, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম গড়ে, সে খবর কি রাখি না আমরা? 

আমরা কি এটা দেখিনি, গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির হিসাবে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর অন্তত ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়, যেটা প্রকৃত পাচারকৃত টাকার একটা ভগ্নাংশ মাত্র? এসব বিষয়ে আমাদের চোখ কপালে ওঠে না। এসব বিষয়ে আমরা অন্তত ফেসবুকেও শোরগোল করি না। এমনকি মালেকের মালিকের নাম জিজ্ঞাসার সাহস পর্যন্ত দেখিনি কারও মধ্যে।  

সরকার এই দেশের মানুষের প্রতিক্রিয়াকে, প্রতিবাদকে খুব বেশি গোনায় ধরে, সেটা মনে করি না। কিন্তু তারপরও খেয়াল করেছি মানুষ কোনও বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে সামষ্টিকভাবে বিক্ষোভ দেখালে সরকার কিছুটা হলেও চাপে পড়ে এবং কখনও কখনও কিছু ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। 

দেশের সব অর্থনীতিবিদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে এই কলামে উল্লিখিত দুইজন মানুষ বারবার আমাদের জানিয়েছেন এই ব্যাংকিং খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একেবারে ভেঙে ফেলতে পারে যেকোনও দিন। এসব কথা তো মূল ধারার মিডিয়ায় নিয়মিতই আসছে। তাহলে আমরা এসব নিয়ে কথাও বলি না কেন? আমরা কি এসবের গুরুত্ব বুঝি না? নাকি বুঝি একটু বেশিই–এসব মানুষকে নিয়ে কথা বলে হজম করতে পারবো না? সেজন্যই আমাদের ক্ষোভের দৌড় সরকার যাদের ধরছে (সম্রাট-শামীম-পাপিয়া-সাহেদ-সাবরিনা-মালেক) তাদের পর্যন্তই। যারা সমাজের একেবারেই প্রান্তিক মানুষ, অন্ত্যজ জন। অথচ এদের ওপরে তাকানোর সাহস বা শক্তিই নেই আমাদের। তাই সরকারের ঠিক করে দেওয়া ব্যক্তিদের ওপরই যত ক্ষোভ, আমাদের দৃষ্টির সীমানা ঠিক ততটুকুই যতটুকু সরকার চায়, তার বেশি এক ইঞ্চিও নয়। 
লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ