শুধু আবেগ নিশ্চিত করবে না ধর্ষণের বিচার

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৬:১৭, অক্টোবর ০৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৫, অক্টোবর ০৯, ২০২০

রুমিন ফারহানা১. ধর্ষণ পৃথিবীর সবখানে হয়।
২. স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মতো অতি নারীবান্ধব দেশেও ... সংখ্যক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
৩. ধর্ষণ কোনও নতুন বিষয় নয়। অমুক সরকারের সময় এর চেয়েও বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
৪. পর পর এতগুলো ধর্ষণের ঘটনা মানেই এর মধ্যে কোনও ষড়যন্ত্র থাকতে পারে, খতিয়ে দেখছি।
৫. সন্ধ্যার পরে যে মেয়ে বাইরে থাকে তার সাথে এমন ঘটনা ঘটাই স্বাভাবিক।
৬. পোশাকের ‘শালীনতার’ অভাবই মেয়েটির ধর্ষিত হওয়ার কারণ।

৭. মেয়েটির অনেক ছেলে বন্ধু আছে।

এর কোনোটির একটিও যদি কোনও নারী নির্যাতিত হওয়ার পর আপনার মনে হয় তাহলে এই ধরনের অপরাধে আপনার মৌন সমর্থন আছে।

বাংলাদেশের নারীদের দুর্ভাগ্য তারা যে কেবল পুরুষতান্ত্রিক পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র কাঠামোতে বাস করে তাই না, এই সমাজ এবং রাষ্ট্র অতি নারীবিদ্বেষী। এর একটা প্রমাণ হলো, কোনও অপরাধে নারী এবং পুরুষ একত্রে যুক্ত থাকলে নারীর বয়স, চেহারা, পোশাক, ব্যক্তিগত জীবন এই সবকিছু অপরাধকে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে এবং এই সবকিছুর নিচে চাপা পড়ে যায় পুরুষের পরিচয়টি, এমনকি তাদের মূল অপরাধ পর্যন্ত। আবার সামান্য অপরাধে একজন নারীকে, তার পোশাক, চেহারা এবং ব্যক্তি জীবনকে যে রসালো ভাষায় ব্যবচ্ছেদ করা হয় সেটি একজন খুনের পুরুষ আসামির ক্ষেত্রেও কখনও করা হয় না। যতদিন কেবল মূলধারার গণমাধ্যম ছিল, ততদিন পর্যন্ত পত্রিকার মানের কথা চিন্তা করে হলেও এসব ক্ষেত্রে কিছুটা রাখঢাক ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেহেতু মান রক্ষার কোনও বিষয় নেই সে কারণে নারী ব্যবচ্ছেদ এখন অনেক সহজ এবং হচ্ছেও প্রচুর।

কথাগুলো আসছে এই কারণেই যে স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও যেখানে একজন পুরুষের জন্য একটি নিরাপদ রাষ্ট্রের নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারিনি সেখানে এই মানসিকতার একটা সমাজ নারীর জন্য কতটা বীভৎস হতে পারে সেটা বলাই বাহুল্য। আর তাই প্রতিদিনের গণমাধ্যম কিংবা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্ট যে পরিসংখ্যানই দিক, নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি সহিংসতা কিংবা ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যা যে তার কয়েকগুণ বেশি সেটি বলাই বাহুল্য।

প্রথমত ধর্ষণের মতো জঘন্য একটি অপরাধের সঙ্গে আমাদের দেশে নারীর ‘সম্ভ্রম’ বা ‘ইজ্জত’কে যুক্ত করে একটি ভিন্নমাত্রা দেওয়া হয় যা, ভিকটিম বা তার পরিবারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করে। অনেক নারী শুধু এই ট্যাবুর কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। অনেক পরিবার মামলা করে না শুধু এই ভেবে যে নির্যাতনের কথা প্রকাশ পেলে পরিবারের সম্মানহানি হবে। অথচ সম্মান বা ইজ্জত যদি কারো নষ্ট হয় সেটা হওয়ার কথা ধর্ষকের যে এই নোংরা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কিংবা তার পরিবার ও সমাজের, যে এমন বীভৎস অপরাধী তৈরি করেছে।

ধর্ষিতার প্রতি সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু যে নারীর জীবনহানির কারণ হয় তাই না; এটা নারীদের ধর্ষণের বিচার চাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে। মামলা করার পর সমাজ একজন ধর্ষণের শিকার নারীকে যে চোখে দেখে, মামলা চলার সময় আদালতে প্রতিপক্ষের আইনজীবীর যেসব প্রশ্নের মুখোমুখি তিনি হন, সেসব বিষয় এমন মামলা করা এবং সেটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় ভিকটিম বাধ্য হয়ে আপসের পথ বেছে নেয়। আর ধর্ষণের সঙ্গে যেহেতু ক্ষমতা সরাসরি যুক্ত, হতে পারে সেটা অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতা, তাই অনেক সময়ই তথাকথিত সমাজপতি বা রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তির চাপে নারী বাধ্য হয় মামলার পরিবর্তে আপসে যেতে।

সাহস করে যে নারী মামলার পথ বেছে নেন তার ক্ষেত্রে পথটি বড় বন্ধুর। আছে বিচার নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা এবং জনমনে পুলিশের দক্ষতা আর সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন। মামলা জট আমাদের এক পুরনো সমস্যা। ধর্ষণের মামলাও তার ব্যতিক্রম নয়। বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘোরার পর একজন নারীর না থাকে আর্থিক, না মানসিক শক্তি। এক পর্যায়ে সে যদি নাও চায়, পরিবারের চাপে বাধ্য হয় মামলা তুলে নিতে। দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে নিম্ন আদালতে রায় পাওয়া গেলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে ভিকটিম পড়ে আরও বড় বিপদে। সেখানে মামলা জটে বছরের পর বছর ঘুরতে থাকে, বিচার হয় না।

আর দুঃখজনক হলেও সত্য বেশিরভাগ মামলা বা বিচার হয় সেসব ঘটনার ক্ষেত্রেই যেখানে সেটি নিয়ে তোলপাড় হয়েছে প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং পরে মূল ধারার মিডিয়াতে। আবার এমন ঘটনাও আমরা জানি যেটি সামাজিক মাধ্যমে কিছু দিন তোলপাড় তোলার পর থিতিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে সময়ের সাথে, যেমন তনুর ঘটনাটি।

১৩০ বছরের পুরনো ব্রিটিশ আমলের আইনে ধর্ষণের যে সংজ্ঞা ছিল, এখনও সেটাই ভিত্তি ধরে বিচার করা হয়। যদিও ২০০০ সালে কঠোর অনেক ব্যবস্থা রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন করা হয়েছে। এটি ধর্ষণের শিকার ক্ষতিগ্রস্তকে জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করায়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বেশ কিছু ধারায় নারীর প্রতি সহিংসতার জন্য অনেক কঠিন সাজার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু ধর্ষণের যে সংজ্ঞা সেটি খুঁজতে ঠিকই দ্বারস্থ হতে হয় ১৮৯০ সালের দণ্ডবিধির। প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো যে সংজ্ঞা সেটি যে কেবল বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথে বেমানান তাই নয় এমনকি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যৌন অপরাধের যে সংজ্ঞা তার সঙ্গেও যায় না।

পুরনো সংজ্ঞার কারণে ভিকটিমের মেডিক্যাল রিপোর্টের ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়ার ফলে দেখা যায় যদি নারীর শরীরে কোনও ইনজুরি না থাকে কিংবা এমন কোনও চিহ্ন না থাকে যাতে বোঝা যায় যে নারী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে তখনই মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে নারী ভয়ে জ্ঞান হারান অথবা ঘটনার আকস্মিকতায় বাধা দেওয়ার অবস্থাতেও থাকেন না। সেসব ক্ষেত্রে মামলা প্রমাণ বাদীর জন্য আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

পুরো বিষয়টির সঙ্গে ‘ইজ্জত ট্যাবু’ এমনভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে ভিকটিম ঘটনা ঘটার দ্রুততম সময়ের মধ্যে গোসল করে যেটি তার মেডিক্যাল রিপোর্টকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে এবং ভিকটিমের জন্য নেগেটিভ হিসাবে কাজ করে। পুরনো এই সংজ্ঞার কারণে এমনকি ছেলে শিশু ধর্ষণের শিকার হলে তাকে ধর্ষণ না বলে বলাৎকার বলতে হচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতনে বিশেষ আইন থাকা সত্ত্বেও ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনা পেনাল কোডের আওতায় নিতে হয়। নারী সংগঠনগুলো কিংবা মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার এই পুরনো সংজ্ঞার পরিবর্তন চাইলেও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক অবশ্য এতে কোনও সমস্যা দেখছেন না। তার মতে আইন যুগোপযোগী।

শুধু ধর্ষণের সংজ্ঞাই নয়, বিপত্তি আছে সাক্ষ্য আইনেও। এই আইনের ১৫৫ ধারার ৪ উপধারা অনুযায়ী বিবাদী পক্ষের আইনজীবী ধর্ষণের শিকার নারীকে ‘কুচরিত্রা’ প্রমাণের চেষ্টা করে থাকে। এর অনেক ইমপ্যাক্ট আছে। এই ধারা বহু নারীকে এমন ভীতির মুখোমুখি দাঁড় করায় যে বহু নারী মানসিকভাবে মামলা চালানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে। ‘কুচরিত্রা’ প্রমাণ করতে পারলেই ধর্ষক ধর্ষণের অভিযোগ থেকে বেঁচে যেতে পারে।

এই আইনের সুযোগ গ্রহণ করে মামলায় জেরা করার সময় ধর্ষণের শিকার নারীকে অনেক সময় অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রাসঙ্গিক এমন অনেক প্রশ্ন করা হয়, যার সঙ্গে বিচারাধীন মামলার কোনও সম্পর্ক নেই। এতে নির্যাতনের শিকার নারী ন্যায়বিচার বঞ্চিত হয়। সে কথা মাথায় রেখেই ভারতীয় আদালত স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়েছে যাতে আদালত অবশ্যই নিশ্চিত করে যে ধর্ষণের শিকার নারীকে হয়রানি বা অপমানিত করার জন্য জেরা করা হচ্ছে কিনা। এই ধরনের জেরা ইংল্যান্ডের আদালতেও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেখানে এমন কোনও প্রশ্ন করা যাবে না যাতে নির্যাতনের শিকার নারীর অতীত যৌন জীবন আলোচনার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়।

আইনের ফাঁকফোকর বাদ দিলেও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব আছে। কারণ, কোথাও দেখা যাচ্ছে পুলিশি তদন্তে ত্রুটি থাকছে আবার কোথাও পাবলিক প্রসিকিউটর ঠিকভাবে ভূমিকা রাখছেন না। অনেক ক্ষেত্রে মামলা দিনের পর দিন পড়ে থাকছে।

অনেকেই ধর্ষণের সমাধান হিসাবে বিচারবহির্ভূত হত্যার কথা বলছেন, বলছেন ক্রসফায়ারে দেওয়ার কথা। এই কথাগুলো প্রমাণ করে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার কিংবা সুশাসনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার কথা। ধর্ষণ ভয়ঙ্কর ফৌজদারি অপরাধ– এটি যেমন সত্য, তেমনি সত্য একটি অপরাধ দিয়ে কখনই আর একটি অপরাধ দমন করা যায় না। কেউ কেউ বলছেন ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড করার কথা। সাজা মৃত্যুদণ্ড হোক কিংবা যাবজ্জীবন, যদি তদন্ত সঠিক না হয়, নির্যাতনের শিকার নারীকে বিচার চাইতে এসে দ্বিতীয়বার নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়, সাজার হার যদি ৩-৪ শতাংশেই আটকে থাকে, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা যদি না কাটানো যায়, নির্যাতনের শিকার নারীকে যদি ভয়ভীতি দেখিয়ে আপসের চাপ দেওয়া হয় কিংবা সমাজপতিরা সমঝোতার দিকে নিয়ে যায় তাহলে কখনোই ধর্ষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।

কোনও বীভৎস ঘটনার কথা জেনে বা সেটা দেখে আমাদের আবেগাপ্লুত করে। সে কারণে আমাদের মধ্যে তীব্র আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়া হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়, যেমনটা হচ্ছে এখন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, শুধু ধর্ষণ নয়, যেকোনও অপরাধের দ্রুত, সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসন, আইন এবং বিচারিক কাঠামোটিকে শুদ্ধ করার জন্য কাজ করতে হবে।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 
 
/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ