আলু ভর্তাকে বিলাসী খাদ্য হয়ে উঠতে দেখার ‘সৌভাগ্য’

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৭:৪৬, অক্টোবর ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫০, অক্টোবর ২২, ২০২০

রুমিন ফারহানাবেশি করে ভাত খান, আলুর ওপরে চাপ কমান’–এই শ্লোগানটি এরশাদ সরকারের সময়ে খুব প্রচারিত একটা শ্লোগানকে উল্টে দিয়ে বানানো।‌ সেই সময়ের শ্লোগানটি ছিল–‘বেশি করে আলু খান, ভাতের ওপর চাপ কমান’। এই মুহূর্তে আলু কেজিতে মোটা চালের চাইতে অন্তত পাঁচ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তাই ভাতের পরিবর্তে আলু খাওয়াকে সাশ্রয়ী বলে মনে হতেই পারে। আমি জানি ভাতের পরিবর্তে আলু এই দেশের মানুষ কোনও দিন খায়নি, কার্বোহাইড্রেট হলেও আলু এই দেশে ব্যবহৃত হয় মূলত সবজি হিসেবে। সেই কারণে আলুর দাম আরও বাড়তে পারে, এই আশঙ্কা যৌক্তিক।
আলু এখন কেজি ৫০ টাকা বা তার বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। ৫০ টাকা কেজির আলু, ১২০ টাকা কেজি পেঁয়াজ, আর ২৫০ টাকা কেজির কাঁচামরিচ দিয়ে যে খাবারটি (সরিষার তেল হিসাব থেকে বাদ দিলেও) তৈরি হয়, সেটি নিশ্চয়ই আর হতদরিদ্রের খাবার নয়। আলু ভর্তা এখন একটা মোটামুটি বিলাসী খাবারে পরিণত হয়েছে।
আলু ভর্তা বিলাসী খাবার হয়ে পড়ার প্রভাব তার জীবনে কীভাবে পড়েছে সেটা কয়েকদিন আগে বিবিসি বাংলার রিপোর্টে বলছিলেন একজন গৃহকর্মী। রিপোর্টটি ছিল আলুর দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে। তিনি জানিয়েছিলেন প্রতি মাসের শেষ কয়েকদিন আলুর বিভিন্ন পদ (আলু ভর্তা, আলু ভাজি) দিয়ে ভাত খেয়ে দিন কাটানো তার নিয়মিত চর্চা। দুয়েকটি ছাড়া বাজারের আর সব সবজির দাম ১০০ টাকা ছুঁয়ে ফেলার পর আলু দিয়ে ভাত খাবার দিনের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল আরও। আলুর দাম ৫০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় তার পরিবারের সদস্যরা এখন একরকম খেয়ে না খেয়ে জীবন-যাপন করছেন। এই গল্প এখন এই দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনের গল্প। ভাতও কি তারা খেতে পারছে যথেষ্ট পরিমাণ? দেশে এখন মোটা চালের কেজি ৪৫ টাকা।
পরিস্থিতি এতটাই খারাপ এখন টিসিবি খোলাবাজারে কেজি ২৫ টাকা দামে আলু বিক্রি করবে শোনার পর পণ্য বিক্রি ট্রাকের পেছনে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি নিউজ পোর্টালের এই সংক্রান্ত একটি খবরের কিছু অংশ এরকম–কচুক্ষেত এলাকায় টিসিবির পণ্য কেনার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন চাকরি থেকে অবসরের পর এখন ব্যবসায়ী ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ মাহমুদ শফিউল্লাহ। তার সামনে তখন প্রায় ২০ জন ছিল। তিনি বলেন, ‘কখনও টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনিনি। আলুও বিক্রি হচ্ছে শুনে লাইনে দাঁড়ালাম। প্রায় দুই ঘণ্টা হয়ে গেলো। এখন আর সামনে গিয়ে আলু পাবো কিনা সন্দেহ।’
হ্যাঁ আলু এখন এমন মানুষকেও টিসিবির ট্রাকের সামনে নিয়ে আসছে, যারা আগে কখনও এই স্বল্প মূল্যের পণ্য কেনার কথা ভাবেননি।
এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এমন একটা সময় যখন এই দেশের মানুষের আর্থিক অবস্থা স্মরণকালের সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে রয়েছে। করোনার অঘোষিত লকডাউনের সময় এই দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গিয়েছিল, এটা আমাদের জানিয়েছিল সিপিডি, সানেম এবং ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে’ নামের মুখোশের আড়ালে সবকিছু সরকার খুলে দিলেও এখনও মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড করোনাপূর্ব অবস্থার চাইতে অনেক দূরে আছে। এর খুব বড় একটা প্রমাণ হচ্ছে সরকার তার রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ভীষণভাবে পিছিয়ে আছে।
এই দেশে কখনও কোনও মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা আকাশ থেকে বজ্রপাতের মতো পড়ে না। প্রতিটা ক্ষেত্রে পূর্বানুমান করা যায়। বিশেষজ্ঞ হবার দরকার নেই, একজন সচেতন নাগরিক কিছুটা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এবং কিছু খোঁজখবর রাখলেই খুব ভালোভাবে বুঝতে পারেন কোন পণ্যের দাম কখন বাড়তে পারে। কিছুদিন আগে পেঁয়াজের অনেক বেশি মূল্যবৃদ্ধির পর বাংলা ট্রিবিউনে লেখা কলামেই দেখিয়েছিলাম গত বছর যেমন অনেক আগে থেকেই অনুমান করা যাচ্ছিল ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে ভারত পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ করে দেবে, এই বছরও একই পরিস্থিতি হতে পারে, সেই অনুমান করা যাচ্ছিল। কিন্তু গত বছর যেমন কোনও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, এই বছরও পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য কোনও আগাম পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এবার দেশের বড় একটি অংশে দীর্ঘ সময় থেকে বন্যা ছিল। স্থায়িত্বকালের বিবেচনা করলে এবারকার বন্যা এমনকি ছাপিয়ে দিয়েছিল ১৯৮৮ সালের বন্যাকেও। এর অনিবার্য ফল হিসেবে দেশের সবজির মূল্য বেড়ে গেছে ভীষণভাবে। দুই একটি সবজি ছাড়া ১০০ টাকার নিচে বাজারে কোনও সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনিবার্যভাবেই চাপ পড়েছে আলুর ওপরে। আলু মূলত একটি কার্বোহাইড্রেট খাবার হলেও এই দেশে দীর্ঘকাল থেকে এটি একটি সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আলুর দাম বাড়ার আগেই যখন সবজির দাম অনেক বেড়ে গিয়েছিল, তখনই এটা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল যে আলুর দাম বাড়তে যাচ্ছে। আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সাধারণ মানুষরাই জানি যখন মাছ মাংসের দাম বেড়ে যায় তখন ডিমের দাম বাড়ে, কারণ তখন মানুষ তুলনামূলক কম দামে প্রোটিনের প্রয়োজন মেটাতে ডিমের দিকে ঝোঁকে।
প্রতিবার বিভিন্ন জিনিসের দাম গগনচুম্বী হয়ে ওঠার পর সরকার কতগুলো পপুলার স্টান্টবাজি করার চেষ্টা করে; আলুর দাম বাড়ার পরও করছে। সরকার আলুর খুচরা দাম বেঁধে দিয়েছে (প্রথমে ৩০ টাকা পরে ৩৫ টাকা), সেই বেঁধে দেওয়া দামে আলু বিক্রি হচ্ছে কিনা তার জন্য কখনও কখনও কিছু সরকারি কর্মকর্তা বাজারে গিয়ে তদারকি করছেন। নির্ধারিত দামে আলু বিক্রি না হলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে জরিমানা করছেন।
দীর্ঘকাল থেকে বাজার ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেন যারা সেই সব অর্থনীতিবিদ সুস্পষ্টভাবে বলেছিলেন এসব পদক্ষেপ বাজারকে স্থিতিশীল করা দূরেই থাকুক, জিনিসপত্রের দামকে আরও বাড়িয়ে বাজারকে আরও অস্থির করে তোলে। সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে জোর করে কিছু বিক্রেতাকে দিয়ে ৩০ টাকা কেজিতে আলু বিক্রি করিয়েছেন, কাউকে জরিমানা করেছেন। এখন এর ফল হয়েছে পাইকারি বাজার থেকে প্রকাশ্যে আলু উধাও হয়ে গেছে; এক ধরনের কালোবাজারি চালু হয়ে গেছে। দোকানের সামনে আলু না থাকলেও দামে মিলে গেলে ভেতরের কোথাও থেকে আলু এনে দেওয়া হচ্ছে। এভাবে বাজারে আলু লুকিয়ে ফেলার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও সংকট তৈরি হবে। এতে দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
সরকারের কৃষিমন্ত্রী আলুর দাম বাড়ার কারণ নিয়ে জানিয়েছিলেন করোনার সময় সরকার এবং অন্যান্য সংস্থা যে বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গাদের অনেক ত্রাণ দিয়েছে, তাতে আলু ছিল অনেক বেশি পরিমাণে। এই কারণেই আলুর মজুতের ওপরে প্রভাব পড়েছে। তর্কের খাতিরে ধরে নেই এই কথাটি সঠিক। তাহলে প্রশ্ন আসে আলুর মজুত ত্রাণের কারণে যদি কমে গিয়েই থাকে তাহলে সেই ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে? আলুর দাম ৫০ টাকা হওয়ার আগেই কেন আলুর রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়নি? এসব দায়িত্ব কার? অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কায় ভারত গত বছর এবং এই বছরও পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে, আমরা কেন আলু রফতানি বন্ধ করিনি? রফতানি বন্ধ করা যথেষ্ট না হয়ে থাকলে পর্যাপ্ত পরিমাণ আলু আমদানি করে রাখা হয়নি কেন?
এই সময়ের আলু নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে সেটার জায়গায় আর যে কোনও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের নাম বসিয়ে দেওয়া যায়। সবক্ষেত্রে ঘটনাটা এক‌ই ঘটে। একেবারে জানা কিছু পদক্ষেপ, যেগুলো নিলে এই সংকট হয় না, বা হলেও এত প্রকট হয়ে ওঠে না, কিন্তু সেই পদক্ষেপগুলো সরকার নেয় না।
প্রতিটি পণ্য নিয়ে যখন এইরকম অস্থিরতা তৈরি হয় তখন সিন্ডিকেট নামে একটা শব্দ আমাদের সামনে আসে। আমাদের বলার চেষ্টা করা হয় এই সিন্ডিকেটই সব নাটের গুরু। এটা অনেকাংশেই সঠিক। বর্তমানে যে ধরনের মুক্তবাজার অর্থনীতি ব্যবস্থা চলছে তাতে কোনও ব্যবসায়ীকে তার মুনাফা সর্বোচ্চকরণে বাধা দেওয়া কঠিন। আগে বলেছি জোরজবরদস্তি করে সে ধরনের চেষ্টা করতে যাওয়াটা বরং হিতে বিপরীত করে। কিন্তু যেটা করা যায় সেটা হচ্ছে সিন্ডিকেটকে সিন্ডিকেট হয়ে উঠতে না দেওয়া। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সরকারের।
বিদ্যমান বাজার ব্যবস্থার সরকারের কাজ হচ্ছে ‘রুলস অব দ্য গেম’ ঠিক করা এবং সেটা যাতে সব পক্ষ মেনে চলে সেটা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ তার ভূমিকা এক রকম রেফারির। কৃষি পণ্যের বিপণন এর ক্ষেত্রে এমন একটা অবস্থা সরকারকে তৈরি করতে হবে যেখানে উৎপাদক, বড় ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা সবার স্বার্থের মধ্যেই একটা ভারসাম্য বজায় থাকে।
আমাদের দেশে সেটা হয় না। এদেশে উৎপাদককে খুব কম লাভে, এমনকি অনেক সময় লোকসানে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে হয়। এই যে এখন আলুর এতটা দাম হলো এর সুফল কিন্তু কৃষকরা পায়নি, পেয়েছে কোল্ডস্টোরেজ মালিক আর সেখানে আলু মজুত করা বড় বড় ব্যবসায়ীরা। আবার ওদিকে এই আলু অতি চড়া দামে কিনে ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থাৎ দুই বিরাট জনগোষ্ঠী উৎপাদক আর ভোক্তা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আর‌ও ফুলে-ফেঁপে উঠেছে অল্প কিছু ধনী ব্যবসায়ী। এমনকি করোনার মতো ভয়ঙ্কর সংকটেও এদের বিরুদ্ধে সরকারের কোনও আন্তরিক পদক্ষেপ নেই।
এটা এবার আলুর ক্ষেত্রে দেখা গেলেও একেবারেই স্বাভাবিক ঘটনা আর সব পণ্যের ক্ষেত্রেও। হোক সেটা পেঁয়াজ, চাল কিংবা আর অন্য কিছু। কোনও দেশের সরকার যখন একই ক্ষেত্রে থাকা বিভিন্ন রকম মানুষের মধ্যে রেগুলেটর হিসেবে কাজ না করে একটি পক্ষের হয়ে কাজ করতে থাকে ক্রমাগত, তখন যেটা হয় তা কিছুদিন পরপরই দেখতে পায় বাংলাদেশ। বহু কিছু দেখা এই জাতির আলু ভর্তাকে বিলাসী খাবার হয়ে উঠতে দেখা বাকি ছিল, এবার তাদের সেই ‘সৌভাগ্য’ হলো।
লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 

 
/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ