হ্যাকারের পিণ্ডি কোচিং এর ঘাড়ে

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ২৩:১৭, এপ্রিল ২২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:০৫, এপ্রিল ২৩, ২০১৬


উদিসা ইসলামএক চোর রোজ রাতের মতোই চুরি করতে বের হলো। রাত্রি তখন দ্বিপ্রহর। এক বাসার জানালা খোলা পেয়ে উঁকি দিয়ে দেখলো জানালার পাশের দেয়ালে সদর দরজার চাবি ঝুলছে। সবাই ঘুমিয়ে পড়তেই সে চাবি দিয়ে সদর দরজা খুলে ভেতরে গেল। সিন্দুক তালাবদ্ধ না থাকায় অনায়াসে যাবতীয় অর্থকড়ি নিয়ে পালিয়ে গেলো। ঘটনা জানাজানি হলে পাড়ার পোংটা ছেলে-মেয়েরা বোকা বাড়িওয়ালাকে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক ছড়া কাটলো। পরদিন পাড়ার মোড়লরা চোর ধরার জন্য পুলিশকে তাগিদ না দিয়ে, অসাবধানতার জন্য বাড়িওয়ালাকে তিরস্কার না করে, সেই ছেলে-পেলেদের সব দোষ খোঁজার জন্য উঠে-পড়ে লাগলো!
এখন কেউ যদি সেই বাড়ির মালিকের সদর দরজায় তালা লাগানো অথবা সিন্দুক কিংবা বাড়ির আলমারির তালা খুলে রাখার মতো বোকামি নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাহলে কি ওই চুরির দায় তাকে নিতে হবে?
ঠিক এরকম কাণ্ডই ঘটছে দেশের অন্যতম ইংরেজি শেখানোর কোচিং সেন্টার সাইফুরস-কে নিয়ে।
কিছুদিন আগে সাইফুরস একটি বিজ্ঞাপন ছাপে এভাবে- বানান ভুল করায় আন্তর্জাতিক হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে আরও টাকা চুরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। স্যাটায়ার এই বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা বোঝাতে চেয়েছে যে, চুরির মতো অপরাধেও এই বিশ্বায়নের যুগে সঠিক ইংরেজি জানা কত গুরুত্বপূর্ণ! যে কেউ বুঝবেন তারা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরিকে সমর্থন দিচ্ছে না। কেবল ইংরেজি শেখার গুরুত্ব বোঝাতে ব্যতিক্রমী বিজ্ঞাপন ছেপেছে।

সমসাময়িক বিষয়কে বিজ্ঞাপনের ভাষায় ব্যবহার করে ভোক্তাকে আগ্রহী করে তোলার কৌশল আজকের নয়। একটি জাতীয় বিভ্রাটকে ঘিরে এ ধরনের বিজ্ঞাপন অনেকের অপছন্দ হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে কেনো? কেন তারা এমন বিজ্ঞাপন দিলো- তার ব্যাখ্যা তারাই ভাল দিতে পারবে। তাদের ‘পক্ষ’ নেওয়া আমার দায়িত্ব না।
সাইফুরস-এর এই হাস্যকর বিজ্ঞাপন নিয়ে রীতিমত ক্ষেপে গেলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি দুদককে বললেন তদন্ত করতে। আর আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশনও নেমে পড়লো সেই কাজে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পর সাইফুরস-এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রাথমিকভাবে যাচাই শেষে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। প্রশ্ন হলো- দুদক কী তদন্ত করতে চায়? হ্যাকার কীভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা নিয়ে গেলো? নাকি, সেই হ্যাকারদের সাইফুরস তৈরি করেছিলো কিনা? আর সেই হ্যাকার তৈরির মধ্য দিয়ে হ্যাকিং-এর কত টাকা এই কোচিং-এর ‘অবৈধ’ উপার্জনে গেল?

আরও পড়ুন ‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব’

বাংলাদেশে কোচিং সেন্টার নিয়ে বিস্তর কথা আছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সে ব্যাপারে খোঁজ নিতেই পারে। কিন্তু তাদের বিজ্ঞাপনের ভাষা তদারক করা কি শিক্ষামন্ত্রীর কাজ? ভাষা আপত্তিকর হলেও সেই সূত্রে তাদের হেস্ত-ন্যস্ত করা কি দুদকের কাজ? নতুন চেয়ারম্যানের অধীনে দুদক গত ক’মাসে বেশ কিছু প্রকৃত দুর্নীতির বিরুদ্ধে উঠে-পড়ে লেগেছে। ঠিক এমন সময়ে সাইফুরস-এর মতো ঘটনাতেও জড়িয়ে কি দুদককেই হেয় করা হচ্ছে না? এভাবে দেখলে তো ইউনিলিভারের হিসাব-পাতি নিয়েও টান দেওয়া দরকার। কারণ ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী’র বিজ্ঞাপন অনেককেই গভীরভাবে আহত করে।  ভাষার নানারকম বিকৃতির জন্যে তো টেলকোসহ নানা কোম্পানিকে দুদকে টানতে হবে!

যখন আমাদের দেশ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা নিয়ে একটা সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন সেটিকে ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দিয়ে সাইফুরস হয়তো দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে। সেটা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী দুদককে হেয় করে যেটা করছেন তা কোন দায়িত্বের পরিচয় দেয়?

দেশে যখন বাকস্বাধীনতা নিয়ে, আইসিটি অ্যাক্ট নিয়ে, প্রশ্নফাঁস নিয়ে নানা বিতর্ক বিদ্যমান, ঠিক তখন একটি বিজ্ঞাপনের ভাষা নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর এভাবে চড়াও হওয়াও রাষ্ট্রের ক্রমাগত অসহিষ্ণু মানসিকতার পরিচয় বহন করে।  এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আরও পড়ুন, কথোপকথন: কোথায় যেন সব গুলিয়ে গেল

রাষ্ট্রের কাজ আসল ও গুরুতর অপরাধের পেছনে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সামর্থ্য ব্যয় করা। হাস্যরসাত্মক বিজ্ঞাপন নিরোধের জন্যে দুদকের জন্ম হয়নি। দুদকের এই হঠকারী অনুসন্ধান অবিলম্বে প্রত্যাহার করা উচিত। না হলে মনে হবে, হ্যাকিং করে রাষ্ট্রীয় কোষাগার খালি করা এবং তা নিয়ে অসঙ্গত ব্যঙ্গ করা সমান অপরাধ। মনে হবে, এদেশে এখন হাসি ঠাট্টা করতেও মানা।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ