X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

তাহমিমা আনামের গল্প

আপডেট : ১২ জুন ২০১৭, ১২:০৩

তসলিমা নাসরিন তাহমিমা আনামের কিছু কলাম পড়েছি, তার কোনও গল্প উপন্যাস আগে পড়িনি। এই প্রথম একটি গল্প পড়লাম। ‘গার্মেন্টস’ নাম। ফেসবুকে এই গল্পটি নিয়ে অনেকে ছিঃ ছিঃ করছে বলে। কেউ ছিঃ ছিঃ করলে, সত্যি বলতে কী, আমার আগ্রহ বেড়ে যায়। কোনও মেয়ের লেখা নিয়ে ছিঃ ছিঃ, কোনও মেয়ের পোশাক নিয়ে ছিঃ ছিঃ, কোনও মেয়ের চরিত্র নিয়ে ছিঃ ছিঃ, আঁকা নিয়ে ছিঃ ছিঃ। আমার জানতে আগ্রহ হয় কেন এই ছিঃ ছিঃ। আজ পর্যন্ত আমি দেখিনি মেয়েদের নিয়ে ছিঃ ছিঃ করার পেছনে আদৌ সত্যিকার কোনও কারণ আছে। গল্পটি পড়ে আমি কেঁপে উঠেছি। কী অসাধারণ গল্প! মেয়েদের এমন দুঃখ দুর্দশার গল্প আমি নিজেও লিখছি সেই আশির দশক থেকে। আমাকেও প্রচুর ছিঃ ছিঃ শুনতে হয়েছে। আমার  ‘নিমন্ত্রণ’ উপন্যাসে দেখিয়েছি প্রেমিক দ্বারা গণধর্ষণের শিকার হওয়া কিশোরী শীলার দুঃখময় জীবন। নিন্দুকেরা বলেছে, ছিঃ ছিঃ। নাক কুঁচকে বলেছে আমি পর্ন লিখেছি। আমার ‘শোধ’ উপন্যাসে দেখিয়েছি ঝুমুরের স্বামী ঝুমুরের সঙ্গে অন্য পুরুষের সম্পর্ক আছে বলে সন্দেহ করে, এই অপমানের প্রতিশোধ ঝুমুর নেয়। এই গল্প পড়েও অনেকে ছিঃ ছিঃ করেছে। ওখানেও নাকি মেয়েদের যৌনতার কথা অত্যন্ত প্রকটভাবে আছে। ‘ভ্রমর কইও গিয়া’ উপন্যাসে লিখেছি বিয়ে হওয়ার পর মেয়ে দেখে তার স্বামী উত্থানরহিত, মেয়েটি শেষ পর্যন্ত তালাক দেয় স্বামীকে, এবং পরে কাউকে বিয়ে করার আগে যৌন সম্পর্কে গিয়ে দেখে নেয় সে উত্থানরহিত কিনা। এই বইটি পড়েও পুরুষেরা ছিঃ ছিঃ করেছে। এটিকেও পর্ন বলেছে। 
বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানুষেরা চায় না কোনও মেয়ে মেয়েদের যৌনতা নিয়ে গল্প উপন্যাস লিখুক। তারা ভাবে মেয়েদের যৌনতা বলে কিছু নেই, আর থাকলেও থাকাটা উচিত নয়। যদি থাকেই যৌনতা, তা গোপন করা উচিত। তা নিয়ে গল্প উপন্যাস লেখা উচিত নয়। যদি লেখেও কেউ, লিখবে পুরুষেরা, পুরুষেরা এবং পুরুষেরা। লজ্জা পুরুষের  ভূষণ নয়, তারা লিখতেই পারে। যৌন ইচ্ছে, যৌন বোধ – এসব পুরুষের ব্যাপার। পুরুষেরা তা প্রকাশ করবে। মেয়েদের এসব না থাকারই কথা। প্রকাশ করার তো প্রশ্নই ওঠে না। পুরুষেরা  তাদের নিজের যৌন-ইচ্ছে মেয়েদের শরীরের ওপর মেটাবে। মেয়েরা প্যাসিভ থাকবে, পুরুষেরা আক্টিভ। মূলত যৌনতা ব্যাপারটি পুরুষের নিজস্ব এবং পুরুষের জন্যে। মেয়েদের জন্য যা আছে, তা হলো গর্ভধারণ করা, সন্তান জন্ম দেওয়া, সন্তান লালন পালন করা। এই সীমানার বাইরে পা বাড়ালে মেয়েরা নির্লজ্জ, মেয়েরা বেশ্যা।

এই যদি মানসিকতা, তখন তাহমিমা আনামের গল্প নিয়ে লোকে মন্দ কথা বলবে, এ তো স্বাভাবিক। তাহমিমার ‘গার্মেন্টস’ গল্পে দেখি মেয়েদের অসহায়তা, পুরুষের যৌনবস্তু হতে মেয়েদের বাধ্য হওয়া, পুরুষ দ্বারা তাদের নির্যাতিত হওয়া। বাংলাদেশের মেয়েদের জীবনই এমন। এটির তাদের বাস্তবতা। প্রায় সব মেয়েই, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত যে বিত্তেরই হোক না কেন, শিক্ষিত কী অশিক্ষিত—অসহায়। পুরুষের যৌনবস্তু হতে তারা বাধ্য। এমনকী উত্থানরহিত পুরুষের যৌনবস্তু হতেও। শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার প্রায় সব মেয়েই। মেয়েদের প্রেম ভালোবাসা নিয়ে গল্প লেখো, ঠিক আছে। মেয়েরা পুরুষদের ভালোবেসে জীবন বিসর্জন দেবে, চমৎকার। মেয়েরা সন্তানদের দুঃখে ভাত খাওয়া বন্ধ করে দেবে, তুমি সাবাস বাহবা বলবে। কিন্তু মেয়েরা নির্যাতন না সইতে চাইলে, মেয়েরা স্বামীকে ত্যাগ করলে, এমনকী অত্যাচারী স্বামীকেও, তুমি পছন্দ করবে না। মেয়েরা নির্যাতনের প্রতিবাদ করলে, চিৎকার করলে তোমার রাগ হবে। মেয়েরা নিজেদের যৌনতার কথা লিখলে, সেই লেখা বিদেশের বড় পুরস্কার পেলেও তুমি ছিঃ ছিঃ করবে। তুমি বলবে এ আমাদের কালচার নয়। তোমাদের কালচারে মেয়েরা মুখ বুজে থাকবে, সাত চড়েও রা করবে না, যৌন ইচ্ছের কথা ভুলেও কখনও প্রকাশ করবে না। সুতরাং এমনই মুখ বোজা মেয়ের চরিত্র যে গল্পে ফুটে ওঠে, সে গল্প তোমার কালচারের গল্প। কিন্তু তোমার কালচারে বড় হয়েও কোনও কোনও মেয়ে রুখে উঠতে পারে। তুমি পছন্দ না করলেও রুখে উঠতে পারে।
তাহমিমা আনাম যদি তাহমিম আনাম হতো, মেয়ে না হয়ে পুরুষ হতো, তাহলে সম্ভবত তার গল্প নিয়ে নিন্দের হিড়িক পড়তো না। মেয়েরাই জানে মেয়েদের যন্ত্রণা। মেয়েরা যত সত্য করে তা তুলে ধরতে পারে, পুরুষেরা সেভাবে পারে না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের লেখা গল্প উপন্যাসে নিজ স্বার্থ ত্যাগ করে স্বামী সেবা করা মেয়েরা ভালো মেয়ে, ঘর সংসারে মনোযোগী মেয়েরা ভালো মেয়ে, সন্তান লালনে ব্যস্ত থাকা মেয়েরা ভালো মেয়ে। কিন্তু কোনও মেয়ে যদি বলে দেয় তারা  নির্যাতন সইবে না,  পুরুষের যৌনবস্তু হবে না, উত্থানরহিত পুরুষের সঙ্গে শোওয়ার কোনওরকম ইচ্ছে তাদের নেই, এমনকী সে পুরুষ তার বিয়ে করা স্বামী হলেও নয়-- তখন পিলে চমকে ওঠে পুরুষদের। তারা ভয় পায় তাদের প্রেমিকারা, স্ত্রীরা এমন আত্মবিশ্বাসী হলে তাদের প্রভু-দাসির সাজানো ঘর ভেঙে পড়বে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকে নির্যাতনে সিদ্ধহস্ত পুরুষেরা।

তাহমিমা আনামের বিরুদ্ধে যারাই কথা বলেছে, নারীবিরোধিতায় অথবা নিরাপত্তাহীনতাবোধে ভোগা পুরুষ বলেই তাদের আমার মনে হয়েছে। নারীবিদ্বেষ আর পুরুষিক-নিরাপত্তাহীনতাবোধ পুরুষতন্ত্র বা পিতৃতন্ত্র নামের রোগের উপসর্গ। এই রোগ থেকে সমাজ যতদিন মুক্তি না পাবে উপসর্গ রয়েই যাবে।

অনেকে বলছে গার্মেন্টসের মেয়েরা এত অসহায় নয় যে বাড়ি পাওয়ার জন্য বিয়ে করতে হবে। তাদের জন্য মেসের ব্যবস্থা আছে। না হয় আছে। তাহমিমা কিন্তু কোনও তথ্যনির্ভর প্রবন্ধ লেখেননি। তিনি গল্প লিখেছেন। গল্পে কল্পনা থাকে। তারপরও আমি বলবো, বাংলাদেশের অসহায় গরিব মেয়েরা শুধু খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য অথবা মানুষের গালি গালাজ শোনা বন্ধ করার জন্য অহরহই বিবাহিত পুরুষ, বাপের বয়সী পুরুষ, মাথা-খারাপ পুরুষ, পঙ্গু পুরুষ, চরিত্রহীন পুরুষ, অক্ষম পুরুষকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়। তাহমিমা আনামের গল্পের মেয়েরা শুধু একটু ঘর ভাড়া পাওয়ার জন্য বিয়ে করতে বাধ্য হয়। কিন্তু একটি মেয়ে উত্থানরহিত স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে চাইছে না। সেই মেয়েই খুব নিঃশব্দে একটি প্রতিবাদ করে। সে একা থাকে,  নিজের যৌনতা নিয়ে ভাবে। এই মেয়েকে, এই মেয়ের গল্পের রচয়িতাকে তাই নারীবিদ্বেষী লোকদের ভালো লাগছে না। কিন্তু কারও নিন্দেয় ভয় না পেয়ে, কারও তিরস্কারে কুণ্ঠিত না হয়ে তাহমিমার মেয়েদের একান্ত গোপন গল্প আরও প্রকাশ করুন, চাই। পুরুষেরা মেয়েদের গল্প এতকাল বলেছে। মিথ্যে গল্প বলেছে। এবার মেয়েরা বলুক। সত্যটা বলুক।

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পশুর অবৈধ হাট বসানোয় ৪০ হাজার টাকা জরিমানা
পশুর অবৈধ হাট বসানোয় ৪০ হাজার টাকা জরিমানা
ঈদে বাইকারদের হয়রানি করলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে
যাত্রী কল্যাণ সমিতির দাবিঈদে বাইকারদের হয়রানি করলে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে
র‍্যাবের সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষে আহত ৩
র‍্যাবের সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষে আহত ৩
বাড়ির পথে গায়ে আগুন দেওয়া ব্যবসায়ীর মরদেহ
বাড়ির পথে গায়ে আগুন দেওয়া ব্যবসায়ীর মরদেহ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ