X
বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
৯ ফাল্গুন ১৪৩০

আসামে নাগরিকত্ব সংকট: ভবিষ্যৎ কী?

আনিস রায়হান
০৬ জানুয়ারি ২০১৮, ১৬:২০আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০১৮, ১৯:০৬

আনিস রায়হান সম্প্রতি আসামে ‘বৈধ নাগরিকদের’ একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ‘ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস’ (এনআরসি) নামক বহুল-আলোচিত এই তালিকা প্রকাশের বাধ্যবাধকতা ছিল। নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে পাওয়া গেলো ১ কোটি ৯০ লাখ বৈধ নাগরিকের নাম। বিপরীতে আবেদন করেছিল ৬৮ লাখ পরিবারের ৩ কোটি ৩৫ লাখ বাসিন্দা। এর মধ্যে ২ কোটির তথ্য যাচাই করে প্রথম তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী এই তালিকার কাজ চলছে। আসাম পাবলিক ওয়ার্কার্স নামে একটি সংগঠন প্রদেশের ভোটার তালিকা থেকে ৪১ লাখ ‘অবৈধ বাংলাদেশির’ নাম বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে ‘জনস্বার্থে’ যে আবেদন করেছিল ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট তা গ্রহণ করে ২০১৪ সালে। আর তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে নাগরিকদের আবেদন শুরু হয় ২০১৫ সাল থেকে।
বিজেপি নেতৃত্বাধীন আসামের প্রাদেশিক সরকার আশঙ্কা করেছে, এই তালিকা প্রকাশের ফলে রাজ্যজুড়ে জাতিগত উত্তেজনা দেখা দিতে পারে। ভারতে যেসব রাজ্যে মুসলিমদের আনুপাতিক সংখ্যা বেশি, তাদের মধ্যে আসামের অবস্থান দ্বিতীয়। এজন্য তালিকা প্রকাশের আগে গোটা আসামজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্তত পঁয়তাল্লিশ হাজার নিরাপত্তাকর্মী গোটা রাজ্যে মোতায়েন রয়েছে, সেনাবাহিনীকেও ‘স্ট্যান্ডবাই’ রাখা হয়েছে।

আদালতের নির্দেশে ১৯৫১ সালের পর আসামে এবারই প্রথম আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায়ই বৈধ নাগরিকদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হলো। আগামী এপ্রিল নাগাদ আদালতের এক শুনানি থেকে তালিকার দ্বিতীয় কিস্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হবে ২০১৮ সালের মধ্যে। টাইমস অব ইন্ডিয়া এক প্রতিবেদনে ৩৮ লাখ অবৈধ নাগরিক চিহ্নিত হওয়ার কথা জানিয়েছে।

আসামের বিজেপি সরকার বলছে, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর যারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে, তাদের অবশ্যই ফেরত পাঠানো হবে। ২০১৪ সালের যে নির্বাচনে মোদি সারাদেশে জয়লাভ করছিল, ওই সময় জাতিগত সংঘাতের কবলে পড়ে আসামের নির্বাচন। ৪০ জনেরও বেশি মানুষ সে দাঙ্গায় নিহত হয়। তখন আসামে এক নির্বাচনি প্রচারণাকালে মোদি অবৈধ অভিবাসীদের ব্যাগ গুছিয়ে তৈরি থাকতে বলেছিলেন। ক্ষমতায় এলেই তাদের ফেরত পাঠানো হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

এটা দাবি করা অসঙ্গত হবে যে, আসামে কোনও বাংলাদেশি নেই। আসাম একসময় বাংলার সঙ্গে যুক্ত ছিল। সেখানকার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের যোগাযোগ প্রাচীন ও অত্যন্ত নিবিড়। ফলে ১৯৭১ সালে নির্যাতিত ও আতঙ্কিত বাংলাদেশিরা অনেকেই আসাম পাড়ি দিয়েছিলেন।

কিন্তু ভারতে বিগত কয়েক বছরের ব্যবধানে ধর্মীয় উগ্রবাদ চরম রূপ ধারণ করছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এটা ঘটছে। ফলে আসামে থাকা বাংলাদেশিরা বৈধ না অবৈধ, তা নির্ণয় করা হচ্ছে ধর্মীয় পরিচয় দেখে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা আসামের সব মুসলিমদেরই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে সেখানকার মুসলিম অধ্যুষিত বরপেটা, দুবরি, করিমগঞ্জ, কাছাড় জেলার বাসিন্দারা। পশ্চিমবঙ্গেও অবৈধ বাংলাদেশি নাম দিয়ে মুসলিমবিরোধী প্রচারণা চলছে।

আসামের মুসলিমরা অবশ্য কেবলই আতঙ্কগ্রস্ত নন, তারা আন্দোলনও করছেন। তাদের দাবি, ১৯৭১ সালের আগে থেকে আসামে বাস করে এলেও নিরক্ষরতা ও অসচেতনতার জন্য তাদের পিতৃপুরুষরা অনেকেই কোনও কাগজপত্র তৈরি করেননি। তাই এখন তারা বিপদের মুখে আছেন। ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’ এই আন্দোলনের নেতৃত্বে আসার চেষ্টা করছে। ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে ভাগ করার অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ আমলে দীর্ঘদিন আন্দোলন করে সংগঠনটি। এর বর্তমান নেতা মাওলানা সৈয়দ আরশাদ মাদানি দিল্লিতে গত নভেম্বরের মাঝামাঝি ‘দিল্লি অ্যাকশন কমিটি ফর আসাম’ আয়োজিত এক সেমিনারে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেছেন, ‘ভারতীয় নয় বলে এই মুসলিমদের যদি আপনি বের করার চেষ্টা করেন, তাহলে তো বলব আসামের বিজেপি সরকার এটাকেও আর একটা মিয়ানমার বানানোর চেষ্টা করছে।’

ভারতে মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপির সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুদের ক্ষেত্রে অবশ্য ভিন্ন নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের জন্য নাগরিকত্ব পাওয়া সহজ করেছে মোদি সরকার। আইনে এমন সংশোধনী আনার প্রস্তাবও করা হয়েছে যে ২০১৬ সালের আগে যে হিন্দুরা, কিংবা মুসলিম ব্যতীত অন্য সংখ্যালঘুরা ভারতে এসেছেন, তাদের অবৈধ অভিবাসী বলে গণ্য করা হবে না।

অবশ্য আসামের বাংলাদেশি খেদাও আন্দোলনে কেবল বিজেপি নয়, জড়িয়ে আছে কংগ্রেসের নামও। ১৯৮৫ সালে প্রয়াত রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস সরকারের আমলে ‘আসাম চুক্তি’ সই হয় কেন্দ্রীয় সরকার, আসাম সরকার, সর্ব আসাম ছাত্র ইউনিয়ন ও সর্ব আসাম গণসংগ্রাম পরিষদের মধ্যে। ছয় বছর আন্দোলনের পর পক্ষগুলো সমঝোতায় পৌঁছাতে সমর্থ হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ১৯৭১-এর ২৪ মার্চের পর যেসব বিদেশি অবৈধভাবে আসামে অভিবাসী হিসেবে ঢুকেছে, তাদের শনাক্ত করে ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে স্বদেশে ফেরত পাঠাতে হবে। ইতোপূর্বে চুক্তিটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ না দেখা গেলেও বিজেপি এটিকে হাতিয়ার করেই ক্ষমতায় এসেছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেই সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেছিলেন, তার সরকারের প্রথম কাজই হবে অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানো ও বাংলাদেশ-আসাম সীমান্তের চূড়ান্ত চিহ্নিতকরণ।

বিজেপির উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হিন্দুদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা গেলে তারা আজীবন বিজেপির ভোটব্যাংক হয়ে থাকবে। আর মুসলমানদের তাড়ানো গেলে বিরোধী ভোট কমে যাবে। তবে এর সঙ্গে যোগ আছে অসমীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেরও। বাংলাদেশিদের উপস্থিতিতে তারা বঞ্চিত বোধ করছে। দেখা যাচ্ছে, আদালতও এই বোধকে আমলে নিয়েছেন।

বাংলাদেশের ভূমিকা এই ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। অথচ আসামের ‘বাংলাদেশি খেদাও আন্দোলন’ সম্পর্কে এ দেশের সরকারের কোনও ভাষ্য নেই। চূড়ান্ত তালিকার কাজ ধাপে ধাপে শেষ হওয়ার পথে। এরপরই শুরু হবে বহিষ্কার। কিন্তু বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক একটি সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, এভাবে অবৈধ বাংলাদেশিদের বহিষ্কার করার ব্যাপারে ভারত সরকারের কাছ থেকে কোনও তথ্য তারা পায়নি।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সবকিছু ঘটে যাওয়ার পর সরকার হয়তো টের পাবে। কিন্তু আসামের এই বিষয়টি আদালতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় রাজনৈতিক সমঝোতা দিয়ে যে এর বিহিত করা যাবে না, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এখন থেকেই যদি সরকার কার্যকর ভূমিকা না নিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশকে অবশ্যই আসাম ফেরত মুসলমানদের জায়গা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অনুমিত সংখ্যাগুলো সঠিক হলে এটা রোহিঙ্গা সংকটকেও ছাড়িয়ে যাবে।
লেখক: সাংবাদিক

 

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
শর্ত না মানলে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
শর্ত না মানলে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
‘৭৫ সালের পর এবারই সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
‘৭৫ সালের পর এবারই সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
স্পিকারের সঙ্গে গ্লোবাল পার্টনার্স গভর্ন্যান্সের পরিচালকের সাক্ষাৎ
স্পিকারের সঙ্গে গ্লোবাল পার্টনার্স গভর্ন্যান্সের পরিচালকের সাক্ষাৎ
সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে: ওবায়দুল কাদের
সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে: ওবায়দুল কাদের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ