X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

মহামারির সময় প্রয়োজন সবার পেশাদারিত্ব

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২১, ১৭:১০

ড. প্রণব কুমার পান্ডে গত ১৮ এপ্রিল ঢাকার রাস্তায় দুই জন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মধ্যে বাগবিতণ্ডার ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও সত্যিই আমাকে হতাশ করেছে। আমরা সকলেই জানি, বাংলাদেশসহ গোটা পৃথিবী এক দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে। করোনাভাইরাস মোকাবিলার জন্য আমাদের সরকার গত ১৪ তারিখ থেকে সর্বাত্মক লকডাউন বাস্তবায়নের কাজ করছে। লকডাউনের মধ্যে জনগণ ও সব পেশার মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ একান্তই কাম্য। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে পরিচয়পত্র দেখানোকে কেন্দ্র করে একজন ডাক্তারের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বাগবিতণ্ডার ঘটনা উপস্থাপিত হয়েছে। উক্ত ঘটনায় কে দায়ী সেটি খুঁজে বের করা আমার দায়িত্ব নয় বা সেদিকে দৃষ্টিপাত করতেও চাই না। তবে যেটি ঘটেছে সেটা কখনোই কাম্য নয়।

আমরা সবাই জানি যে এই মহামারির সময়ে সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে ডাক্তাররা জনগণকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে এক বছরের বেশি সময় ধরে। তাদের এই অবদান জাতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রাখবে। লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ডাক্তারদের ওপর নির্ভর করছে। এ কারণেই লকডাউনের সময় ডাক্তারদের চলাচল শিথিল করে সরকারি নির্দেশনা জারি হয়েছে। যে ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা একজন ডাক্তারের পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে উনি অত্যন্ত বাজেভাবে তার অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন। ভিডিওতে দেখা গেছে যে তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের অসম্মানজনকভাবে আক্রমণ করছেন, যা একজন দায়িত্ববান ডাক্তারের নিকট কখনোই কাম্য নয়।

এ ঘটনা আমাকে লোকপ্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার কথা মনে করিয়ে দেয়। সেটি হলো জেনারলিস্ট – স্পেশালিস্ট দ্বন্দ্ব। এই ধারণার মূল বিষয়টি হচ্ছে বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারা (ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বা কৃষি কর্মকর্তা) মনে করেন যে তারা তাদের যোগ্য সম্মান পান না। অন্যদিকে, সাধারণজ্ঞ কর্মকর্তারা মনে করেন তারা প্রশাসন পরিচালনা করে বিধায় তারা যা বলবে সেটাই শেষ কথা। অতীতে প্রশাসনে এই দ্বন্দ্ব প্রকট থাকলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দ্বন্দ্বের মাত্রা কিছুটা হলেও কমেছে। তবে এটি এখনও শেষ হয়ে যায়নি, যার প্রমাণ আমরা গত ১৮ তারিখ পেয়েছি, যখন আমরা ডাক্তারকে বারবার পুলিশ কর্মকর্তাদের মনে করিয়ে দিতে দেখেছি যে ডাক্তার হওয়া সবচেয়ে কঠিন কাজ এবং সবচেয়ে ভালো ছাত্রছাত্রীরা ডাক্তার হয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এই লকডাউনের সময় সকলেই বাজে সময় অতিবাহিত করছে। ডাক্তাররা একদিকে যেমন অব্যাহতভাবে সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে এটাও মনে রাখতে হবে পুলিশ এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সব সময় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ফলে, দায়িত্ববোধ থেকে প্রত্যেককে নিজেদের আচরণ সংযত করা অত্যন্ত জরুরি।

লকডাউনের সময় এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে সেই জন্য সরকারের কিছু সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। লকডাউনের প্রথম দিকে আমরা লক্ষ করেছি পরিচয়পত্র দেখানোর পরেও রাস্তায় কয়েকজন ডাক্তার কিছু পুলিশ সদস্যের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়েছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তারদের জরিমানা করা হয়েছে। আমরা এমনও দেখেছি যে পরবর্তীতে পুলিশ সদর দফতর থেকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাদের জরিমানা মওকুফ করা হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গের বাস্তবায়ন সংক্রান্ত নীতিমালা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকে। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা জারি না হলে এ জাতীয় ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

আমরা সবাই জানি যে মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের জাতির সূর্যসন্তান। তাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা বাংলাদেশ পেয়েছে। এ ঘটনা থেকে যে বিষয়টি আমার সবচেয়ে খারাপ লেগেছে সেটি হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা রাস্তায় নিয়ে এসে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছি। একদিকে যেমন ডাক্তার ম্যাডাম বারবার বলার চেষ্টা করছিলেন যে তিনি একজন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তাকে কেন এ ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। অন্যদিকে, দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাও নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বলে দাবি করেছেন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হওয়া উভয়ের জন্যই গর্বের বিষয়। কিন্তু, এ পরিস্থিতিতে তাদের মুক্তিযোদ্ধা পিতার পরিচয় ব্যবহার করা কতটুকু সমীচীন হয়েছে সেটাও ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। মুক্তিযোদ্ধারা যখন দেশ স্বাধীন করেছিলেন উনারা কি সত্যিই এজন্য দেশ স্বাধীন করেছিলেন? এ বিষয়টি আমাদের আসলে ভাবা দরকার।
এ ঘটনায় আরেকটি বিষয় আমাকে মর্মাহত করেছে, সেটি হলো এক ধরনের অপসাংবাদিকতা। এ ধরনের সাংবাদিকরা যেকোনও ধরনের ঘটনা ঘটলে তার ভিডিও ধারণ করে ভাইরাল করে দিচ্ছেন। এতে সেই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত মানুষদের যেমন সম্মানহানি হচ্ছে, তেমনি ওই পেশার মানুষ সম্পর্কে অন্যদের খারাপ ধারণা হচ্ছে। এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত থাকা উচিত।

এখন এই মুহূর্তে যে জিনিসটি সবচেয়ে প্রয়োজন সেটি হচ্ছে সবার সহনশীলতার পরিচয় দেওয়া। রাস্তায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যদি কোনও ব্যক্তি বা কোনও ডাক্তারের কাছে পরিচয়পত্র দেখতে চান- সেটি তাদের অপরাধ নয়। বরং এটি তাদের দায়িত্বের অংশ। আর যাদের কাছে দেখতে চাওয়া হচ্ছে, পরিচয়পত্র দেখানোটা তাদের দায়িত্বের অংশ। আমাদের মনে রাখতে হবে এই লকডাউনের সময় অনেকে আইন ভাঙার জন্য বিভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করতে পারেন। ফলে, নিজেদের অহংবোধকে প্রাধান্য না দিয়ে সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে রাস্তায় চলাচল করা প্রয়োজন।

বর্তমান মহামারির সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সেটি হচ্ছে সবাই একসঙ্গে মিলে কাজ করা। পৃথিবীতে এর আগেও অনেক ধরনের মহামারি আবির্ভূত হয়েছে। সবাই একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে সেসব মহামারি থেকে মুক্তি লাভ করা গেছে। ফলে, নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার সময় এখন নয়। এখন সময় একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়ে নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করা। আর যদি আমরা তা করতে না পারি তাহলে এই মহামারি থেকে উত্তরণ খুব কঠিন হবে। আমরা দায়িত্বশীল পেশায় কর্মরত থেকে যদি নিজেদের আচরণ সংযত করতে না পারি তাহলে সঠিকভাবে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা কঠিন। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এইটা আমার প্রত্যাশা যে এই মহামারির সময় সবাই নিজেদের আচরণ সংযত রেখে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।

লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

এবার হারমনি আর মন্দিরা নিয়ে হাজির... (ভিডিও)
এবার হারমনি আর মন্দিরা নিয়ে হাজির... (ভিডিও)
নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস আজ
নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস আজ
বাঙালির চিত্রশিল্পী, জীবনের শিল্পী
জয়নুল আবেদিনবাঙালির চিত্রশিল্পী, জীবনের শিল্পী
ভেড়ার মাংসে পাওয়া গেছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট: গবেষণা
ভেড়ার মাংসে পাওয়া গেছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট: গবেষণা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ