X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

সংসদের কাজ কী, এমপিরা কী করেন?

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭:২৪

আমীন আল রশীদ জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু যেদিন (২৭ নভেম্বর) আক্ষেপ করে বললেন, সরকারের অতিমাত্রায় প্রশংসা করার কারণে জনগণ এখন তাদের (জাতীয় পার্টিকে) ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ বলে এবং যেদিন আরেকজন সংসদ সদস্য মহাসড়ক বিল পাসের সময় লালন সাঁইয়ের একটি বিখ্যাত গানকে (বামন চিনি পৈতা প্রমাণ বামনি চিনি কিসেরে) কবি জসিমউদদীনের লেখা বলে দাবি করে বক্তৃতা শুরু করলেন, তার পরদিনই গণমাধ্যমের খবর: লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলকে মানবপাচার মামলায় ৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন কুয়েতের একটি আদালত—যিনি এর আগেও এখানে অর্থ ও ঘুষের মামলায় চার বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন এবং যে কারণে তার সংসদীয় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।

গত বছরের ৬ জুন কুয়েতের অপরাধ তদন্ত বিভাগ পাপলুকে গ্রেফতার করে। সে সময় গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, পাপুলের বিরুদ্ধে কুয়েতের সরকারি কৌঁসুলিরা তিনটি অভিযোগ তুলেছেন। অভিযোগগুলো হলো, মানবপাচার, অবৈধ মুদ্রাপাচার এবং স্বদেশি কর্মীদের কাছে রেসিডেন্ট পারমিট বিক্রি।

২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন পাপুল। শুধু তা-ই নয়, স্ত্রী সেলিনা ইসলামকেও সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য করে আনেন তিনি। সুতরাং এটা মনে রাখা দরকার, শহিদ ইসলাম পাপুল শুধু একজন ব্যক্তি বা একজন ব্যবসায়ী নন। তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের আইন সভার সদস্য ছিলেন। ফলে বিদেশের মাটিতে একজন সংসদ সদস্যের এরকম গুরুতর অপরাধে দণ্ড পাওয়া শুধু একজন ব্যক্তির নয়, বরং পুরো দেশের জন্যই লজ্জার।

প্রশ্ন হলো, এমপিদের কাজ কী এবং তারা কেন বিতর্কিত হন? স্মরণ করা যেতে পারে, এ বছরের শুরুর দিকে পদ্মা সেতুকে পাঁচটি প্রশ্ন করেছেন—জাতীয় সংসদে এমন বক্তৃতা দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন একজন সংসদ সদস্য। আরেকজন সংসদ সদস্য একজন আইনজীবীকে শায়েস্তা করতে থানায় বোমা মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন ওসিকে—যে অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়। এই ঘটনার পর নিজের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন একজন আইনজীবী। প্রশ্ন হলো, একজন আইনপ্রণেতা কী করে একজন নাগরিককে ফাঁসাতে থানায় বোমা মারার নির্দেশ দেন? এরকম একজন ভয়ংকর লোক কী করে সংসদ সদস্য হলেন? নাকি সংসদ সদস্য হতে গেলে এ রকম ভয়ংকরই হতে হয়? সংসদ সদস্যরা প্রিভিলেজ বা বিশেষ সুবিধা পান। সেই সুবিধার অর্থ কি এই যে তারা যা খুশি তা-ই করতে পারেন বা বলতে পারেন? এমপি বা মেম্বার অব পার্লামেন্ট মানে যদি হয় আইনপ্রণেতা, তাহলে তারা আইন প্রণয়নে কতটা সময় দেন এবং এই কাজটি করার মতো যোগ্য লোকের সংখ্যা সংসদে কতজন আছেন?

আইন প্রণয়নে আগ্রহ কম:

বাস্তবতা হলো, সংরক্ষিত আসনসহ সংসদে সাড়ে তিনশ’ এমপির মধ্যে খুব সামান্য সংখ্যকই বিলের ব্যাপারে নোটিশ দেন। সরকারি দলের এমপিরা সাধারণত বিলে সংশোধনী আনার বিষয়ে কোনও নোটিশ দেন না বা এ বিষয়ে বক্তৃতা দেন না। যদিও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় বিরোধিতা করলেও কারও সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে না। কিন্তু বিলের বিরুদ্ধে সরকারি দলের এমপিরা বক্তৃতা দেন—তার রেওয়াজ নেই বললেই চলে। অধিকাংশই এ বিষয়ে একটা ভীতির মধ্যে থাকেন। অনেকের উৎসাহ নেই। তারা শুধু বিল পাসের সময় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলে দায়িত্ব শেষ করেন।

বিরোধীদলীয় সদস্যদের কেউ কেউ নোটিশ দিলেও অনেক সময় তারা বিল পাসের দিন সংসদে উপস্থিত থাকেন না। সবশেষ গত ২৭ নভেম্বরও মহাসড়ক বিলের ওপর সংশোধনী নোটিশ দিয়েছিলেন এমন বেশ কয়েকজন এমপিকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য স্পিকার নাম ঘোষণা করলেও দেখা গেছে তারা অনুপস্থিত। এর কারণ হয়তো এই যে এমপিরাও জানেন এই সংশোধনীর কোনও গুরুত্ব নেই। কারণ, কণ্ঠভোটে এসব সংশোধনী নাকচ হয়ে যাবে। ফলে সংসদে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তাদের আগ্রহ কম। বিলের ওপর সংশোধনী দেওয়া বিরোধীদলীয় এমপিদের দায়িত্ব বা রেওয়াজ, তারা মূলত সেটিই পালন করেন। খুব ব্যতিক্রম না হলে বিরোধীদের সব সংশোধনীই কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। কারণ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সংশোধনীর ওপর দেওয়া বক্তৃতায় গ্রহণ না করার বিষয়ে অনড় থাকেন।

কেন আগ্রহ কম?

কেন আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া এমপিদের আগ্রহ কম, তার একটি কারণ হয়তো এই যে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হলে যে পরিমাণ পড়াশোনা এবং গবেষণা দরকার, অধিকাংশ সংসদ সদস্য তা করতে চান না। অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রস্তাবিত বিলটি ভালো মতো পড়েও দেখেন না বা সেই সময় তারা দিতে চান না। অনেকের শিক্ষাগত যোগ্যতায়ও এটি কাভার করে না। বিদ্যমান আইন ও সংবিধানের (অনুচ্ছেদ ৬৬) আলোকে যেহেতু ২৫ বছর বয়সী এবং সুস্থ যেকোনও নাগরিকই সংসদ সদস্য হতে পারেন, এবং এক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা কোনও অন্তরায় নয়, ফলে আইন প্রণয়নের মতো একটি অ্যাকাডেমিক কাজ যখন পড়ালেখা না জানা লোকদের ওপর বর্তায়, সেটি তাদের জন্য কঠিন, কখনও অসম্ভব এবং আখেরে এটি সংসদ ও সংসদীয় ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে। একজন সংসদ সদস্য লালনের একটি গানকে কবি জসিমউদদীনের বলে চালিয়ে দিলেন এবং সংসদে উপস্থিত অন্য সদস্যরাও এটা সংশোধন করে দিলেন না বা কেউ হয়তো বিষয়টা খেয়ালই করলেন না—এটি সেই দুর্বলতারই একটি ছোট উদাহরণ।

কেউ এটা খেয়াল করেননি, কারণ এমপিদের মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় উন্নয়ন। অথচ স্থানীয় উন্নয়নের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সরকারের আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এমপিরা এসব প্রতিষ্ঠানেও খবরদারি করেন। মূলত স্থানীয় পর্যায়ের সব প্রতিষ্ঠানই, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও এমপিকে ঘিরে আবর্তিত হয়। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার কমিটিও এমপিদের নির্দেশনার বাইরে হয় না। অর্থাৎ এমপিদের মূল কাজ যে আইন ও নীতি প্রণয়ন, সংশোধন—সেই কাজটিই তারা সবচেয়ে কম করেন।

প্রশ্ন হলো, আইন প্রণয়ন এবং সরকারের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে বড় ভূমিকা রাখার কথা যে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর, সেখানেই বা এমপিরা কী করেন বা তারা সেই কমিটিতে কতটুকু নিরপেক্ষ ও সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন?

২০১৯ সালে টিআইবির একটি রিপোর্টে বলা হয়, জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত আলোচনাতেই সবচেয়ে কম সংখ্যক সংসদ সদস্য অংশ নেন। তাদের রিপোর্ট বলছে, দশম সংসদে শুধু কোরাম সংকটে ক্ষতি হয়েছে ১৬৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দশম সংসদের ২৩টি অধিবেশনে আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে মোট প্রায় ১৬৮ ঘণ্টা ১২ মিনিট সময় ব্যয় হয়েছে। যা অধিবেশনগুলোর ব্যয় হওয়া মোট সময়ের মাত্র ১২ শতাংশ।

বিতর্কে নিরুৎসাহ:

সংসদে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে বিলের ওপর সংশোধনী নোটিশ দেওয়া এবং বিতর্ক করা। কিন্তু অভিযোগ আছে, দলীয় নির্দেশনার বাইরে সরকারি দলের এমপিদের নোটিশ দেওয়া বা বিতর্ক করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। কেউ নোটিশ দিলেও তাদের চিফ হুইপের ভর্ৎসনা শুনতে হয়। নবম সংসদে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রফিকুল ইসলাম ন্যাশনাল অ্যানথেম বিলের ওপর সংশোধনী নোটিশ দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নোটিশ উত্থাপনের সময় তিনি সংসদে উপস্থিত ছিলেন না। শোনা যায়, তিনি চিফ হুইপের অনুরোধে ওই সময় আসন ছেড়ে বাইরে বসেছিলেন। দলীয় নির্দেশনার বাইরে নোটিশ দেওয়ায় ওই সংসদে জাসদের একজন এবং জাতীয় পার্টির একজন নারী সংসদ সদস্যকে ভর্ৎসনা করা হয়েছিল। বিমা বিলের ওপর নোটিশ দিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলেন সরকারি দলের এমপি আবদুল মতিন খসরু। এরকম আরও অনেক ঘটনা আছে। তার মানে বিল নিয়ে সংসদে খুব বেশি খোলামেলা আলোচনার সংস্কৃতি খোদ সংসদ সদস্যরাই চান না। ফলে অধিকাংশ সময়ই কোনও ধরনের বিতর্ক ছাড়াই শুধু সরকারি দলের সদস্যদের ‘হ্যাঁ’ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে বিলগুলো পাস হয়ে যায়। অনেক সময় একটি বিল পাস হতে পাঁচ মিনিটও সময় লাগে না।

বস্তুত আইন-কানুনের বিষয়ে অধিকাংশেরই আগ্রহ কম। আইন প্রণয়নে সংসদ সদস্যদের কম আগ্রহ বা তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতির কারণে আইন প্রণয়নের মূল ভূমিকা পালন করতে হয় আসলে নির্বাহী বিভাগকে। আরও স্পষ্ট করে বললে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের। তারাই প্রতিটি বিলের খসড়া তৈরি করেন এবং মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন।

বেসরকারি বিল পাস হয় না:

বিল দুই ধরনের। একটি হচ্ছে সরকারি বিল, যেটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সংসদে উত্থাপন করেন। আরেকটি হচ্ছে বেসরকারি বিল, যেটি যেকোনও সাধারণ সংসদ সদস্যই আনতে পারেন। কিন্তু বেসরকারি সদস্যদের বিল পাসের উদাহরণ খুবই কম। গত দশম সংসদেও এমপিরা বেশ কিছু বিল আনলেও তার একটিও পাস হয়নি। এর আগেও নয়টি সংসদের এমপিদের বিলগুলো পাসের নজির খুবই কম। দশটি সংসদে এমপিরা সরাসরি ২৭৩টি বিল আনলেও পাস হয় মাত্র ৯টি।

পঞ্চম জাতীয় সংসদে সবচেয়ে বেশি ৭৪টি বিল এনেছিলেন সংসদ সদস্যরা। যদিও পাস হয়েছিল মাত্র একটি। আর নবম সংসদে পাস হয়েছিল তিনটি (সিরাজুজ্জামান, জাগো নিউজ, ২৫ জুন ২০১৮)। এ যাবৎকালের পাস হওয়া বেসরকারি বিলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ২০১৩ সালের নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন যেটি এনেছিলেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পুরস্কারপ্রাপ্তি আনন্দের
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০২১পুরস্কারপ্রাপ্তি আনন্দের
প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান নিশ্চিতসহ ১০ প্রস্তাবনা
প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান নিশ্চিতসহ ১০ প্রস্তাবনা
মারুফা মিতার কবিতা
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০২১মারুফা মিতার কবিতা
দিপন দেবনাথের কবিতা
জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ২০২১দিপন দেবনাথের কবিতা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ