X
বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২
২২ আষাঢ় ১৪২৯

এক চিলতে জমি নিয়ে পুলিশ আর সাধারণের ‘অসম যুদ্ধ’

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২২, ১৭:৪৩

ডা. জাহেদ উর রহমান নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী ও দোকান কর্মচারীদের সঙ্গে ঢাকা কলেজ ছাত্রদের মারামারিতে ওই এলাকাটা রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল দুই দিন। দ্বিতীয় দিন সকালে যখন আবার তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায় দুই পক্ষের মধ্যে তখন নিউ মার্কেট থানা অত্যন্ত কাছাকাছি থাকার পরও অবিশ্বাস্যভাবে ২ ঘণ্টার বেশি সময় পুলিশের দেখা মেলেনি। আমরা কি কল্পনা করতে পারি একটি আধুনিক রাষ্ট্রে হাজার হাজার মানুষ পরস্পরকে যেকোনোভাবে ধ্বংস করতে মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধংদেহি অবস্থান নিয়ে আছে কিন্তু সেখানে যাবার প্রয়োজন মনে করছে না পুলিশ।

পুলিশ না আসার সময়টিতে আহত হয়েছেন অনেকে। আহতদের মধ্যে মারা গেছেন দুজন। এদের কেউ মারামারির ইটপাটকেলের মধ্যে পড়ে মারা যায়নি। অন্তত একজনকে তো বীভৎসভাবে কুপিয়ে হত্যা করার দৃশ্য আমরা দেখেছি। এমন একটা পরিস্থিতিতে পুলিশ নাকি তার কৌশল হিসেবে দেরি করে ঘটনাস্থলে গেছে।

ছাত্রলীগ হেলমেট পরে মারামারি করলেও একজন বিএনপি নেতাকে ধরে নিয়ে রিমান্ডে নেওয়ার মতো ঘটনাসহ নিউ মার্কেটের ঘটনাটি নিয়ে এখনও আছে নানামুখী আলোচনা। নিউ মার্কেটের ঘটনা নিয়ে এই কয়েকটি কথা বললাম, কারণ ঘটনাটি আমার মনে পড়ছে ২৪ এপ্রিল কলাবাগানে ঘটা ঘটনাটির পর। হাজার হাজার মানুষ দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পরস্পরকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, এমন পরিস্থিতি যে পুলিশের জন্য ব্যবস্থা নেবার জন্য যথেষ্ট সমস্যা নয়, সেই পুলিশকে অসাধারণ করিৎকর্মা দেখা গেলো কলাবাগানে।

সৈয়দা রত্না কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। তিনি আরও অনেকের সঙ্গে সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছেন পুলিশের কবল থেকে মাঠটি রক্ষা করার জন্য। কলাবাগান থানা তাদের স্থায়ী অবকাঠামো তৈরির জন্য এই মাঠ দখলে নিতে যাবার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ। সর্বশেষ একটি ফেসবুক লাইভ করার অপরাধে তাকে আটক করা হয়।

সৈয়দা রত্নার লাইভ ভিডিওটি নিয়ে এত ঘটনা ঘটলো দেখলাম সেটি। যারা দেখেছি তারা জানি বেশিক্ষণ লাইভ তিনি করতে পারেননি, সাকুল্যে দেড় মিনিটের মতো। বারবার ভিডিওর বক্তব্য আমি শুনেছি। সৈয়দা রত্নার বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ বোঝার চেষ্টা করেছি। এবং তিনি কী ভঙ্গিতে কথাগুলো বলেছেন (ইনফ্লেকশন) বুঝতে চেয়েছি সেটাও। আমি বুঝতে চাইছিলাম তার বক্তব্যে এমন কিছু কি ছিল, যেটা তাকে চরম আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বাধা দিয়ে তুলে থানায় নিয়ে আসার জন্য যথেষ্ট ছিল? শুধু তাই নয়, তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল রত্নার ১৭ বছর বয়সী কিশোর পুত্র পিয়াংশুকেও।

এই ঘটনা নিয়ে বিবিসি বাংলার রিপোর্টে নিউ মার্কেট অঞ্চলের উপ-কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ ফারুকুজ্জামান সৈয়দা রত্নার অপরাধ হিসেবে বলছিলেন, ‘উনি সরকারি কাজে বাধা প্রদান করেছিলেন এবং হেইট স্পিচ প্রকাশ করছিলেন’। থানা পর্যায়ের পুলিশ নয়, একজন উচ্চপদস্থ বিসিএস ক্যাডার পুলিশ বলছেন এটা।

 সৈয়দা রত্নার ভিডিওটি দেখে যে কেউ বুঝতে পারবেন তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক মার্জিত ভাষায় মাঠটিতে পুলিশ এসে জড়ো হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলেন সেই লাইভে। সেই লাইভ আর তাতে দেওয়া বক্তব্য যদি সরকারি কাজে বাধা আর ‘হেইটস স্পিচ’ হয় তাহলে আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না এই দেশ কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। আগের আইসিটি অ্যাক্ট আর এখনকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এই এক প্রভাব পড়েছে পুলিশ বাহিনীর ওপর। তারা কার্যত যেকোনও কিছু বলাকেই অপরাধ হিসেবে আমলে নিয়ে সেটার জন্য যে কাউকে গ্রেফতার করতে পারে।

সৈয়দা রত্নার নিরীহ লাইভের একপর্যায়ে সাদা পোশাক পরা মানুষ (নিশ্চিতভাবেই পুলিশ) তাকে অত্যন্ত বাজেভাবে বাধা দেয় এবং বলেন তাদের অনুমতি ছাড়া এখানে ভিডিও করা যাবে না। সেখান থেকেই পরে তাকে এবং তার ছেলেকে তুলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

এই ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে পড়ে। তারপরই প্রতিটি মূলধারার মিডিয়া সংবাদ প্রকাশ করে ঘটনাটি নিয়ে। পরে রাতে কলাবাগান থানার বাইরে প্রতিবাদকারীরা জড়ো হন। শেষ পর্যন্ত বেশ কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখার পর মা এবং তার সন্তানকে পুলিশ ছেড়ে দেয় ‘মুচলেকা নিয়ে’। একেবারে গণতান্ত্রিক একটি প্রতিবাদের জেরে একজনকে মুচলেকা দিতে হয়– কেমন লাগছে এই দেশকে দেখে?

কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ বলছি আমরা যাকে, সেটি আসলে এক চিলতে জমি। এই দেশের এক বীভৎস সময়ে ঢাকা শহরে এখন এই এক চিলতে জমিকেই মাঠ বলে মনে হয়। ওই এক চিলতে জমি এলাকার শিশু-কিশোরদের খেলার একমাত্র জায়গা। ওই এলাকার শিশু-কিশোররা তাও কিছুটা সৌভাগ্যবানই ছিল, খেলা যায় এমন সামান্য জমিটুকুও ফাঁকা থাকে না ঢাকার প্রায় সব এলাকায়। মাঠে গিয়ে খেলা কী জিনিস সেটা জানে না ঢাকার প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিশু-কিশোররা। এমন শহর আমরা তৈরি করেছি যেখানে প্রতিটি ইঞ্চি ব্যবহার করা হয়েছে স্থাপনা তৈরির কাজে। যেটুকু মাঠ ছিল সেটুকু বেদখল হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত।

একটি জেলা শহরের কিংবা গ্রামাঞ্চলের শিশু যখন স্কুল ফাঁকি দিয়ে মাঠে খেলতে চায় তখন অবিশ্বাস্যভাবে ঢাকার শিশুরা স্কুলে যেতে পছন্দ করে। কারণ স্কুলে গেলে তাদের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয় এবং কিছুটা খেলার সুযোগ তৈরি হয়। 

এই কলাবাগানেই একটি বড় মাঠ নিয়ে দীর্ঘকাল আন্দোলন হয়েছিল মাঠটিকে যেন উন্মুক্ত রাখা হয়। কিন্তু সফল হয়নি সেটা, চলে গেছে ক্লাবের দখলে। ফলে শিশু-কিশোর তরুণরা আর সে মাঠে খেলার সুযোগ পায় না। পেশাগতভাবে যারা খেলবে না, তাদের খেলার কোনও দরকার নেই– এই রাষ্ট্রের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের কি ধারণা সেটাই?

একটা সময় শিশুরা খেলতে না পেরে বসে বসে টিভি দেখতো। আজ তাদের প্রায় সবাই ডিভাইসনির্ভর হয়ে পড়ছে। তাদের সামনে ইন্টারনেটের মাধ্যমে জগৎ উন্মুক্ত হয়ে পড়ায় এক ভয়ংকর প্রভাব দেখতে যাচ্ছি আমরা নিশ্চয়ই। অনেক কম বয়স থেকেই পর্নো আসক্তি, মাদকাসক্তি থেকে শুরু করে নানা রকম সাইবার অপরাধের জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অনেকের ক্ষেত্রে এটা ঘটছেও।

এসব ডিভাইসনির্ভর থাকা শিশুদের মানসিক বিকাশের পক্ষে এক বিরাট অন্তরায় হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। আর শারীরিক খেলার অভাবজনিত কারণে শিশুদের মুটিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে নানা রকম রোগে ভোগার পরিমাণ এখন খুব দ্রুত বাড়ছে।

একটা রাষ্ট্রের সবচেয়ে লাভজনক হচ্ছে শিশুদের ওপর বিনিয়োগ। শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং তাকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য এক অতি জরুরি বিনিয়োগ। বিনিয়োগটা অনেক বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি, কিন্তু এটাই রাষ্ট্রকে পাল্টে দিতে পারে।

একটা রাষ্ট্র যদি ঠিকঠাক হবে না চলে থাকে, একটা রাষ্ট্র যদি মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে ওঠে ক্রমাগত তাহলে বুঝতে হবে সেই রাষ্ট্রের শিশুদের ওপরে বিনিয়োগ করেনি ঠিকমতো। আজ যারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে গিয়ে নানা রকম গণবিরোধী পদক্ষেপ নেন তারাও একসময় শিশু ছিলেন। কোনও না কোনও ক্ষেত্রে তাদের ওপরে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ঘাটতি ছিল।

একটা ন্যূনতম মানবিক রাষ্ট্র হলে কথা ছিল রীতিমতো ভূমি অধিগ্রহণ করে দরকার হয় মানুষকে ভালো পরিমাণের ক্ষতিপূরণ দিয়ে কিছু স্থাপনা ভেঙে পাড়ায় পাড়ায় খেলার মাঠ তৈরি করা। যেখানে এলাকার শিশুরা খেলতে যাবে প্রতিদিন। অথচ এই দেশে ন্যূনতম এক চিলতে জায়গাকেও বরাদ্দ দিয়ে দেওয়া হয় পুলিশের কাছে। পুলিশের থানা লাগবে না নিশ্চয়ই সেটা নয়, সেটা কোনোভাবেই শিশুদের খেলার মাঠ নষ্ট করে হতে পারে না।

মাঠটি নিয়ে দীর্ঘদিন এলাকাবাসী আন্দোলন করেছেন। সে আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ছিল অনেক সংগঠন এবং আরও অনেক মানুষ যারা ওই এলাকায় থাকেন না। এই তীব্র কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন পারেনি সরকারকে সিদ্ধান্ত থেকে টলাতে। এই যে মাঠ নিয়ে যা হলো, অসন্তুষ্ট শুধু এলাকার মানুষ কি করেছে তা নয়, অসন্তুষ্ট করেছে সারা দেশের মানুষকে। কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই সরকারের। তাদের প্রতি মনোযোগ দেবার প্রয়োজন মনে করছে না সরকার।

এটা শুধু এখনই নয়, গত বেশ কয়েক বছর ধরে সরকারকে আমলা এবং পুলিশনির্ভর হতে দেখা যাচ্ছে। সরকারের আমলা নির্ভরতা এখন আর শুধু বিরোধীদের বক্তব্য নয়, এটা এখন তোফায়েল আহমেদের মতো ভেটারান রাজনীতিবিদ এবং সংসদ সদস্যসহ সরকারি দলের অন্য সদস্যরাও বলেন। তারা রীতিমতো সংসদেও বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর সামনে।

নানা ক্ষেত্রে বিরোধী দল এবং বিরোধী মতকে দমন-পীড়নের কাজে পুলিশ ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই পুলিশ এখন অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে রাষ্ট্রের শিশুদের চাইতে। তাই শিশুদের খেলার মাঠ নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে পুলিশের লড়াইটা একেবারেই অসম এখন।

নিশ্চয়ই পুলিশ আধুনিক রাষ্ট্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু আর সবকিছুকে ছাপিয়ে এই বাহিনীর ক্রমাগত অনেক বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ এবং সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা নাগরিকদের জন্য ভয়ের বিষয়।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সমর্থন আদায়ে মঙ্গোলিয়া সফরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী
সমর্থন আদায়ে মঙ্গোলিয়া সফরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী
রশিদ ছাড়া হাসিল আদায়
রশিদ ছাড়া হাসিল আদায়
শখ করে বন্ধুরা ফেললেন জাল, ধরা পড়লো ৩২ কেজির বাগাড়
শখ করে বন্ধুরা ফেললেন জাল, ধরা পড়লো ৩২ কেজির বাগাড়
বরিস জনসনের পদত্যাগ চান যুক্তরাজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ: জরিপ
বরিস জনসনের পদত্যাগ চান যুক্তরাজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ: জরিপ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ