X
শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪
১৮ ফাল্গুন ১৪৩০

মুসলিম বিশ্বে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু-মিত্র

মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
৩০ অক্টোবর ২০২২, ১৮:০৩আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২২, ১৮:০৩

মুসলিম বিশ্বে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু বা মিত্র রয়েছে। আবার মুসলিম বিশ্বের মধ্যে উভয় রাষ্ট্রের শত্রু রাষ্ট্রের অভাব নেই। আর এই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য মুসলিম বিশ্বের বিভক্তি দেখা যায়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের পূর্বে ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে। তবে ইসলামি বিপ্লবোত্তর ইরানের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে ওই সুসর্ম্পকের অবসান হয়।

এমন অবস্থায় মার্কিন সরকার মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগী হয়। তাদের ওই উদ্যোগ সফল হয়। ইতোমধ্যে কুয়েত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের তথা মুসলিম বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষিত মিত্রের মর্যাদা পেয়েছে। ওই সম্পর্ক ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধগুলো বাস্তবায়ন করতে পারছে।

ইরান প্রশ্নে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হলেও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির বদলের ফলে সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা যাচ্ছে। ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষয়টি সামনে এসেছে। সৌদি আরব এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে রাশিয়ার স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়ার প্রতি সৌদি আরবের পক্ষপাত তাই নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তাহলে কি ইরান ও সৌদি আরব তার দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে একসঙ্গে হাঁটতে চাইছে?

অবশ্য বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের শত্রুতার সম্পর্কই মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব শাসনকারী শাসকদের অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। ফলে বর্তমান সৌদি রাজতন্ত্র যতদিন ক্ষমতাসীন আছে ততদিন ইরানের সঙ্গে তারা সুসম্পর্ক গড়বে এমন সম্ভবনা ক্ষীণ।

সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বের অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইরানের যে সম্পর্কের দূরত্ব রয়েছে তার দায় যুক্তরাষ্ট্রের নয় বরং ইরানের নিজের। কারণ ইসলামি বিপ্লবোত্তর ইরান সরকার প্রতিবেশি মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তেমন মনোযোগী হয়নি।

বিশেষ করে খোমেনী যুগে ইরানের ‘একলা চলো’ পররাষ্ট্রনীতি মুসলিম বিশ্ব থেকে ইরানকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন করে রাখে। এছাড়া সুন্নি মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর শিয়া মতবাদ ও ইসলামি বিপ্লবের জাতীয়তাবাদী চেতনা ভীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কথিত ইসলামি রাষ্ট্রগুলো পারতপক্ষে ইরানকে এড়িয়ে চলে।

ইরানের প্রতিবেশি মুসলিম রাষ্ট্র তুরস্কের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক প্রথম থেকেই ছিল ‘সন্দেহ প্রবন’। কারণ অটোম্যান সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তুপে বেড়ে ওঠা তুরস্কের সরকার তার অভ্যন্তরের কুর্দি (বর্তমানে স্বাধীকার বা স্বাধীনতাকামী পিকেকে, তুরষ্কের ভাষায় বিছিন্নতাবাদী) বিদ্রোহের জন্য সর্বদা ইরানকে দায়ী করে। আর কুর্দিরা বারবার ইরানিদের সহানুভূতি লাভ করছে। বিশেষ করে কুর্দি নেতা নেচেরভান বারযানীর ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আহমেদিনেযাদ ইরানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বারযানী ইরান সফর করেন। বিদ্রোহী কুর্দি নেতার ওই সফর তুরস্ক ভালোভাবে গ্রহণ করেনি।

প্রথম থেকেই আধুনিক তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সু-সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়া ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।

তবে তুরস্কের বর্তমান ইসলামপন্থী সরকার মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। তারই ধারাবাহিকতায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে তুরস্ক ও ব্রাজিলের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের একটি বিকল্প পন্থা উদঘাটনের প্রচেষ্টায় তুরস্কের সঙ্গে ইরান কাজ করছে। ফলে এই নতুন প্রকল্পে যুক্ত হবার মাধ্যমে ইরাকে তুরস্ক এই বার্তা দিতে চাইছে, শান্তিপূর্ণ যে কোনও পদক্ষেপের ক্ষেত্রে তুরস্ক ইরানকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছে।

তুরস্কের মতোই ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। সৌদি আরব ও পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ ইরানকে ধর্মীয় এবং নিকটবর্তী পরাক্রমশালী প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ হিসেবে বিবেচনা করলেও দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরানের সাদ্দাম বিরোধী অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী আরব রাষ্ট্রসমূহও তার প্রতি অনেকটা উদার। যদিও এখন পর্যন্ত এসব তেল সমৃদ্ধ আরবরাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক রয়েছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের ফলে বিশ্বে তেলের দাম যাতে বৃদ্ধি না পায় সে জন্য উক্ত রাষ্ট্রগুলোকে আমেরিকা সর্বদা তার বলয়ে রাখতে চায়। ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধে সারাবিশ্বে তেলের যে সংকট তৈরি হয়েছে তার ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে তার রিজার্ভে থাকা তেল বাজারজাত করতে হয়েছে।

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলো এক্ষেত্রে আশানুরূপ সাড়া দেয়নি। ফলে ওই তেল সমৃদ্ধ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা প্রয়োজন তা আবারও সামনে এসেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র তার মধ্যপ্রাচ্য নীতি পুনর্মূল্যায়ণ করে সৌদি আরবসহ তেল সমৃদ্ধ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আরও আগ্রহী হবে তা বলা যায়।

লেবাননের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক থাকলেও ২০০৬ সালের জুলাই মাসে হিযবুল্লাহ-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলের প্রতি প্রকাশ্যে অবস্থানের কারণে উক্ত মুসলিম রাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী এবং ইরানের প্রতি সমর্থন বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী রাষ্ট্র লিবিয়ার সাথে গাদ্দাফির শাসনামলে ইরানের সুসম্পর্ক ছিল। কারণ গাদ্দাফি ছিলেন সর্বদা মার্কিনদের বিরোধী। কিন্তু গাদ্দাফির পতনের পর আমেরিকাপন্থী নতুন সরকার ইরানের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেবে ওই বিষয়টি তাদের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে স্পষ্ট।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক সবর্দা ভালো ছিল না। পাকিস্তানের তুলনায় বরং পাকিস্তানের ‘শত্রু রাষ্ট্র’ ভারতের সঙ্গে ইরান সর্বদা সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। আর পাকিস্তানও ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে খুব বেশি আগ্রহী হয়নি। উপরন্তু পাকিস্তান সবর্দা ছিল ইরানের বিপরীত মার্কিন বলয়ে। ফলে এই প্রতিবেশি মুসলিম রাষ্ট্রদ্বয়ের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তবে সম্প্রতি ওই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। পাকিস্তানের দীর্ঘ দিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ভারতমুখী নীতি গ্রহণ করায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব আগের মতো নেই। ফলে অসহায় পাকিস্তান তার প্রতিবেশিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে তৎপর হয়ে উঠেছে। ফলে ইরানের সঙ্গেও পাকিস্তান নিজেদের প্রয়োজনে সুসম্পর্ক গড়তে চায়। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইরানের একত্রে ত্রিপাক্ষীক সম্মেলন আয়োজন এমন বার্তাই দেয়।

পাকিস্তানের মতো আফগানিস্তানও ইরানের প্রতিবেশি। তালেবান শাসনামলে ইরানের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক ভালো ছিল না। কারণ ওই সময় আফগানিস্তান ছিল পাকিস্তান বলয়ে। তবে সোভিয়েত রাশিয়া যখন আফগানিস্তান দখল করেছিল তখন ইরান আফগানদের রাশিয়ার বিরুদ্ধে গোপনে সহযোগিতা করে। তবে শেষপর্যন্ত ইরানপন্থী মিলিশিয়ারা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করতে না পারার কারণে ইরানের সঙ্গে আফগানিস্তানের গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা আফগানিস্তানে প্রবেশ করলে পূর্বের মতোই আফগানিস্তানের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠা দুরূহ হয়ে পড়ে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার আফগানিস্তানের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্ক স্থাপনের পথ তৈরি হয়েছে। একই কথা ইরাকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যদিও ইরাক-ইরান যুদ্ধের ফলে দুই দেশের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে ইরান ও ইরাক অতীতের ওই স্মৃতি ভুলে গিয়ে নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে পরস্পর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্র– বিশেষ করে মধ্যএশিয়া এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ সমৃদ্ধশালী অথবা দুর্বল মুসলিম রাষ্ট্র যাদের সরকার প্রধানদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক রয়েছে তারা তাদের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ের বাইরে গিয়ে ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে চাইবে না। ফলে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা যে সফল হবে না তা বলা যায়। বরং আগের মতোই মুসলিম বিশ্বের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় থাকবে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
নির্বাচনে কারচুপির প্রতিবাদে পিটিআইয়ের বিক্ষোভ, পুলিশের সাথে সংঘর্ষ
নির্বাচনে কারচুপির প্রতিবাদে পিটিআইয়ের বিক্ষোভ, পুলিশের সাথে সংঘর্ষ
‘বিদেশফেরত কর্মীদের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই’
‘বিদেশফেরত কর্মীদের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই’
বিয়ের পরদিন নিখোঁজ, সপ্তাহখানেক পর মরদেহ মিললো সরিষাক্ষেতে
বিয়ের পরদিন নিখোঁজ, সপ্তাহখানেক পর মরদেহ মিললো সরিষাক্ষেতে
ডিএনএ পরীক্ষা ও আদালতের নির্দেশ ছাড়া অভিশ্রুতি বা বৃষ্টির লাশ হস্তান্তর নয়
ডিএনএ পরীক্ষা ও আদালতের নির্দেশ ছাড়া অভিশ্রুতি বা বৃষ্টির লাশ হস্তান্তর নয়
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ