X
রবিবার, ১৪ জুলাই ২০২৪
৩০ আষাঢ় ১৪৩১

রাসেলস ভাইপার নিয়ে মিডিয়া কি অহেতুক আতঙ্ক ছড়াচ্ছে? 

আমীন আল রশীদ
২১ জুন ২০২৪, ১৫:৫৩আপডেট : ২১ জুন ২০২৪, ১৬:৪১

সম্প্রতি ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার হেতালবুনিয়া এলাকায় আমাদের এক আত্মীয় ঘরের ভেতরে সাপের দংশনে মারা গেছেন। 

খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে তিনি ঘরের কাজ করছিলেন। অন্ধকারে গায়ে পাড়া দিলে সাপ তাকে দংশন করে। তার মানে ঘরের নিচতলায় সাপটি কোনও ফাঁকা বা জানালা দিয়ে আগেই ঢুকেছিল।

নানারকম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে থাকা এবং পরিশ্রমে অভ্যস্ত গ্রামের নারীরা শহুরে নারীদের চেয়ে বেশি সাহসী হয়ে থাকেন। ফলে সামান্য তেলাপোকা বা মাকড়শা দেখলে তারা ভয়ে চিৎকার করেন না।

হ্যাপি আক্তার নামে ওই নারীও বুঝতে পেরেছিলেন সাপ তাকে দংশন করেছে। কিন্তু তারপরও তিনি আতঙ্কিত হননি। বিষয়টি ঘরের লোকেরা জানার পরে তাকে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে যথারীতি জানতে পারেন সাপের বিষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য অ্যান্টিভেনম সেখানে নেই। 

একটা সময় সাপে দংশন করলে গ্রামের মানুষ আহত ব্যক্তিকে ওঝার কাছে নিয়ে যেতো। কিন্তু ওঝা যে সাপের বিষ নামাতে পারে না সেই সচেতনতা মানুষের মধ্যে এসেছে। কিন্তু সেই সচেতনতায় লাভ কী হচ্ছে সেটি বিরাট প্রশ্ন।

কেননা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা না পেয়ে হ্যাপিকে নেওয়া হয় জেলা সদর হাসপাতালে। যথারীতি সেখানেও অ্যান্টিভেনম নেই। বাধ্য হয়ে তাকে নিয়ে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রওনা হন আত্মীয়-স্বজনরা। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন।

প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যুর দায় কার? মানুষের অসচেতনতাকে দায়ী করার কোনও সুযোগ নেই। কেননা তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু উপজেলা তো বটেই, জেলা সদর হাসপাতালেও সাপেকাটা রোগীর চিকিৎসা হবে না কেন?

বাংলাদেশের মতো জলাভূমি অধ্যুষিত দেশে সাপের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান প্রাচীনকাল থেকে। সাপ এখানের শিল্পসাহিত্যেও বারবার এসেছে। সাপের দংশনে এখানে প্রতি বছরই অনেকের প্রাণ যায়। তার অর্থ এই নয় যে মানুষ সব সাপ পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। 

সাপের দংশনের চেয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক বেশি মানুষ নিহত হয়। তার অর্থ এই নয় যে মানুষ রাস্তায় বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বা সব রাস্তা কেটে ফেলেছে। বরং কীভাবে সড়কে প্রাণহানি কমানো যায়, সরকারকে সে বিষয়ে বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়।

কিন্তু সম্প্রতি সাপ, বিশেষ করে রাসেলস ভাইপার নামে একটি বিষধর সাপ নিয়ে গণমাধ্যমে যে ধরনের খবর আসছে, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে যাওয়া বা ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন কনটেন্ট যেভাবে সংবাদ আকারে প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছে, সেটি জনমনে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। 

বর্ষাকালে আবাসস্থল তথা গর্তে পানি ঢুকে গেলে সাপ গাছের ডালে এবং অনেক সময় কাছাকাছি বাড়িঘরেও ঢুকে যায়। অনেক সময় বন্যার পানিতে সাপ ভেসে আসে এবং শুকনো স্থানের খোঁজ করতে গিয়ে মানুষের বাড়িঘরে ঢুকে পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় দীর্ঘকালের। 

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশে যত সাপ দেখা যায় বা এখানে যত ধরনের সাপের বসবাস, তার প্রায় ৯০ শতাংশই নির্বিষ। অর্থাৎ দংশন করলেও তাতে মানুষের মৃত্যু হয় না। এর বাইরে গোখরো, চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার) বা এরকম সাপের সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু সম্প্রতি সাপ নিয়ে যেভাবে আতঙ্ক ছড়িয়েছে তাতে বিভিন্ন স্থানে ঢোঁড়া সাপ কিংবা পুকুর ও ঘেরে মাছ খেয়ে অভ্যস্ত অনেক নির্বিষ সাপও দেখামাত্রই মেরে ফেলার প্রবণতা শুরু হয়েছে। এর পেছনে আছে দুয়েকটি মৃত্যু এবং তার ফলে সৃষ্ট সংবাদ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া অর্ধসত্য কনটেন্ট। 

রাসেলস ভাইপার কিংবা অন্য কোনও সাপ নিয়ে রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে পেশাদারির যথেষ্ট অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেক রিপোর্টের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এই ধরনের রিপোর্টিং এবং সাপ ইস্যুটা সোশ্যাল মিডিয়ায় যেভাবে ভাইরাল হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। 

ঈদের ছুটিতে গ্রামে এসেছি। সেখানেও লোকজনের মুখে রাসেলস ভাইপারের নাম শুনছি। অনেকে এটাকে বলছেন ‘রাসেল ভাইরাস’! অথচ রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া আমাদের দেশে বহু বছর ধরেই আছে এবং এটি এই জনপদের খুব অপরিচিত কোনও সাপ নয়। 

যদি সত্যিই এটির উপদ্রব বেড়ে থাকে তাহলে প্রশ্ন হলো, সাম্প্রতিক সময়ে সারা দেশে এই সাপের দংশনে কতজন নিহত হয়েছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান কি আছে? বিগত বছরের তুলনায় সংখ্যাটি কি অনেক বেশি? বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি যত সাপ মারা হয়েছে, তার সবগুলো কি রাসেলস ভাইপার?

গণমাধ্যমের কাজ আতঙ্ক ছড়ানো নয়। বরং উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালেও অ্যান্টিভেনম আছে কিনা, সে বিষয়ে রিপোর্ট করা এবং সত্যিই কাউকে বিষাক্ত সাপে দংশন করলে তাকে যাতে দ্রুত যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া যায়, সেটি নিশ্চিত করাই গণমাধ্যমের কাজ।

রাসেলস ভাইপারকে গ্রামের মানুষ এই নামে চেনে না। বিভিন্ন এলাকায় তাকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। এই সাপ গোখরোর মতো বনে জঙ্গলে থাকে না। বরং তার পছন্দ তুলনামূলক খোলা, ঘাস আছে বা ছোট ঝোপ আছে এমন জায়গা। এই সাপের প্রিয় খাবার ইঁদুর। ফসলের শুকনো জমিতে যেহেতু ইঁদুর বেশি থাকে, ফলে সেসব এলাকায় এই সাপের বিচরণ বেশি। বিশেষ করে দেশের বরেন্দ্র এলাকায় রাসেলস ভাইপার বেশি দেখা যায়। তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, স্রোতের সঙ্গে কচুরিপানায় ভেসে এগুলো নিম্নাঞ্চলে চলে গেছে। শরীয়তপুরের বিভিন্ন এলাকা, এমনকি মানিকগঞ্জের নিম্নাঞ্চলেও এই আতঙ্ক ছড়িয়েছে। 

মুশকিল হলো, এখন পর্যন্ত এই সাপের ছোবলে যাদের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে তাদের অধিকাংশই কৃষক। তারা ফসলের মাঠে আক্রান্ত হয়েছেন। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষকদের মধ্যে যদি এটা নিয়ে বড় আকারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে তাহলে সেটি দেশের কৃষি ব্যবস্থায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। 

বলা হয়, সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য মানুষের অনিশ্চয়তা কমায়। বিপরীতে অপতথ্য, অর্ধ সত্য খবর কিংবা গুজব মানুষকে বিভ্রান্ত করে। ভীতসন্ত্রস্ত করে। 

অতএব সরকারের দায়িত্ব হলো, সত্যিই রাসেলস ভাইপার বা অন্য কোনও বিষধর সাপের উপদ্রব বেড়েছে কিনা এবং বাড়লে কোন কোন এলাকায় বেড়েছে এবং সম্প্রতি সত্যিই কতজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে- সেই পরিসংখ্যানটি জানানো। এজন্য বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধান প্রয়োজন। কোনও তথ্য লুকানো কিংবা অতিরঞ্জিত করে প্রকাশের প্রয়োজন নেই। বরং মানুষ যাতে সঠিক প্রস্তুতি নিতে পারে, সেজন্য তার সঠিক তথ্য প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে গণমাধ্যমের দায়িত্ব অনেক বেশি। তার কাজ শুধু সংবাদ বা কনটেন্ট ভাইরাল করে ডলার কামানো নয়। ডলার কামানোর চেয়ে সঠিক তথ্য দিয়ে মানুষের জানমাল রক্ষা করা অনেক বেশি জরুরি। 

দ্বিতীয়ত, বিষধর সাপের উপদ্রব বাড়ুক বা না বাড়ুক, উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও অ্যান্টিভেনম মজুত রাখতে হবে। 

কোনও এলাকার কৃষকদের মধ্যে যদি বেশি আতঙ্ক ছড়ায়, তাহলে ক্ষেতে কাজ করার সময় তাদের গামবুটসহ অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া দরকার। সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে এসব উপকরণ বিনামূল্যে বা অতি কম মূল্যে বিতরণ করা দরকার।

সর্বোপরি, সাপের শক্র বেজি, গুইসাপ, চিল ও ঈগল রক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সবার আগে প্রয়োজন মানুষের মন থেকে ভয় দূর করা এবং গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া যাতে ভাইরাল ও ক্লিক সাংবাদিকতা করতে গিয়ে মানুষের মনে অহেতুক আতঙ্ক না ছড়ায়, সে বিষয়ে সরকার তো বটেই, গণমাধ্যমকর্মীদেরও সচেতন থাকতে হবে। তার ভিউ ব্যবসার কারণে কোনও একটি বিষয়ে যদি জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, সেটি পুরো দেশের জন্যই বিপদ। নিজের ব্যবসার জন্য গণমাধ্যম নিশ্চয়ই দেশের ক্ষতি করবে না।

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কে এই ৪০০ কোটি টাকার পিয়ন?
কে এই ৪০০ কোটি টাকার পিয়ন?
ট্রাম্পের ওপর হামলা: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে
ট্রাম্পের ওপর হামলা: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে স্প্রিং-২০২৪ শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠিত
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে স্প্রিং-২০২৪ শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠিত
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা করা ঠিক নয়: জিএম কাদের
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যবসা করা ঠিক নয়: জিএম কাদের
সর্বশেষসর্বাধিক