জামায়াতে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা: ইতিহাসের আয়নায় এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন 

সালেক উদ্দিন
০৫ মে ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ০৫ মে ২০২৬, ১৪:০০

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু প্রশ্ন আছে—যেগুলো যতবার উচ্চারিত হয়, ততবারই ইতিহাসের গভীর থেকে উঠে আসে অস্বস্তি, দ্বিধা এবং অমীমাংসিত সত্য। “জামায়াতে ইসলামীতে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা আছেন”—এই দাবিটি ঠিক তেমনই এক প্রশ্ন, যা কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, এটি আমাদের জাতীয় স্মৃতি, নৈতিক অবস্থান এবং ইতিহাসবোধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সাম্প্রতিক সংসদ বিতর্ক এই প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। একদিকে বলা হয়েছে—জামায়াতে কোনও মুক্তিযোদ্ধা নেই, অপরদিকে দলটির পক্ষ থেকে সরাসরি দাবি এসেছে—“হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা” তাদের সঙ্গে যুক্ত। দলটির এক শীর্ষ নেতা অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, “জামায়াতে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা আছেন। সরকারি গেজেটে তালিকাভুক্ত এসব মুক্তিযোদ্ধা দলটির সঙ্গে রয়েছেন এবং ভাতা পাচ্ছেন।”

এই বক্তব্য নিছক রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি নয়, এটি একটি বড় ঐতিহাসিক দাবি—যা যাচাইযোগ্য হওয়া জরুরি।

প্রাপ্ত তথ্য ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাস্তব চিত্র অনেক বেশি সীমিত ও জটিল। বর্তমান সংসদে জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত ৬৮ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র দুজন গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত। এই পরিসংখ্যান নিজেই একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলে—যদি সংসদীয় প্রতিনিধিত্বে এই বাস্তবতা হয়, তাহলে ‘হাজার হাজার’ সংখ্যাটি কোথা থেকে এলো?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ১৯৭১ সালে—বাংলাদেশের জন্মমুহূর্তে। ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে জামায়াতে ইসলামী তখন পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে অবস্থান নেয়। তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে— যা স্বাধীনতার পর বহু গবেষণা, দলিল এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় আলোচিত হয়েছে। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারে দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা দণ্ডিত হন। এই প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে বর্তমানের কোনও দাবি মূল্যায়ন করা কঠিন।

তবে বাস্তবতা একরৈখিক নয়—এ কথাও স্বীকার করতে হবে। ইতিহাস কেবল সংঘাতের নয়, রূপান্তরেরও সাক্ষী। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস ঘটে। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ১৯৭৯ সালে বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন—এসবের ফলে বহু ব্যক্তি তাদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। কেউ পূর্বের দল ছেড়ে নতুন দলে যোগ দিয়েছেন, কেউ দীর্ঘদিন অরাজনৈতিক থেকে পরে সক্রিয় হয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে কিছু মুক্তিযোদ্ধা যদি পরবর্তীকালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই বিবেচ্য।

এমন যুক্তিও সামনে এসেছে যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, বরং স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিকভাবে দলটিতে সম্পৃক্ত হয়েছেন। এই ব্যাখ্যা আংশিকভাবে বাস্তবতাকে স্পর্শ করে, কিন্তু পুরো প্রশ্নের সমাধান দেয় না। বরং এখান থেকেই নতুন কয়েকটি প্রশ্ন তৈরি হয়—যেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

প্রথমত, সংখ্যার প্রশ্ন। ‘হাজার হাজার’—এটি একটি বিশাল ও নির্দিষ্ট ইঙ্গিতবাহী দাবি। এমন দাবির পক্ষে নির্ভুল তালিকা, যাচাইযোগ্য উপাত্ত এবং প্রকাশ্য তথ্য থাকা জরুরি। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই ধরনের সুস্পষ্ট তালিকা জনসম্মুখে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই সংখ্যা কি বাস্তব পরিসংখ্যান, নাকি রাজনৈতিক ভাষার অলংকার?

দ্বিতীয়ত, মুক্তিযোদ্ধার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারি তালিকা একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে—রাজনৈতিক প্রভাব, সুপারিশ, কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অপ্রকৃত ব্যক্তিরাও তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন—এমন ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্তির অভিযোগও একেবারে অনুপস্থিত নয়। যদিও এসব অভিযোগের সবকটি প্রমাণিত নয়, তবু বারবার যাচাই-বাছাই, তালিকা সংশোধন এবং বাতিলের ঘটনাগুলো ইঙ্গিত করে—এই খাতটি পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত নয়।

এই বাস্তবতায় ‘হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা’ ধরনের বৃহৎ দাবি আরও বেশি স্বচ্ছতা দাবি করে। প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই সংখ্যার মধ্যে কতজন প্রকৃত, যাচাইকৃত এবং সর্বজনস্বীকৃত? আর কতজন বিতর্কিত বা পরবর্তীকালে অন্তর্ভুক্ত?

তৃতীয়ত, আদর্শগত প্রশ্ন— যা সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল। রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক বয়ানে মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণত স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা এবং জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। অপরদিকে, যে রাজনৈতিক দলটির অতীত ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে, সেই দলের সঙ্গে একজন মুক্তিযোদ্ধার অবস্থান একটি স্বাভাবিকভাবেই জটিল ও বহুস্তরীয় প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

এখানে সরলীকরণ নয়—বরং বাস্তবতার বহুমাত্রিকতা স্বীকার করাই প্রয়োজন। একজন ব্যক্তি তার জীবনের বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারেন—এটি গণতান্ত্রিক বাস্তবতার অংশ। কিন্তু যখন সেই ব্যক্তিগত অবস্থান একটি বৃহৎ দলীয় দাবি হিসেবে উপস্থাপিত হয়, তখন তা কেবল ব্যক্তির নয়—সমষ্টিগত ইতিহাসের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

চতুর্থত, রাজনৈতিক কৌশলের প্রশ্ন। রাজনীতিতে প্রতীক অত্যন্ত শক্তিশালী একটি উপাদান। ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় একটি নৈতিক বৈধতা তৈরি করে— যা জনমত প্রভাবিত করতে সক্ষম। ফলে কোনও দল যদি নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এই পরিচয়কে সামনে আনে, সেটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই ব্যবহার যদি অতিরঞ্জিত, অস্পষ্ট বা যাচাইহীন তথ্যের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে তা ইতিহাসের সঙ্গে এক ধরনের অসততা তৈরি করে।

এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে— নীরব রূপান্তর। একটি দল সময়ের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে, অতীতের ভুল থেকে সরে আসতে পারে—এটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি স্পষ্ট স্বীকারোক্তি, আত্মসমালোচনা এবং দায়বোধের মাধ্যমে না আসে, তাহলে নতুন দাবিগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে নতুন পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত প্রশ্নই বাড়ায়।

সবশেষে, এই পুরো বিতর্ক আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি সত্য তুলে ধরে—তথ্যের অস্পষ্টতা যত বাড়ে, ইতিহাস ততই রাজনৈতিক বয়ানে পরিণত হয়।

যদি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা এবং তাদের স্বীকৃতি একটি নির্ভুল, স্বচ্ছ ও সর্বজনস্বীকৃত কাঠামোর মধ্যে থাকতো—তাহলে ‘হাজার হাজার’ বনাম ‘কেউ নেই’—এই চরম দ্বন্দ্ব তৈরি হতো না।

সুতরাং, এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, প্রয়োজন নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধান। কারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সংখ্যা কত, তাদের স্বীকৃতির মানদণ্ড কী—এবং তারা কোন রাজনৈতিক অবস্থানে আছেন—এই প্রশ্নগুলোর স্বচ্ছ উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি। কারণ, মুক্তিযুদ্ধ কোনও দলের সম্পত্তি নয়, এটি পুরো জাতির আত্মপরিচয়। আর সেই পরিচয়ের ভেতর যদি অস্পষ্টতা থেকেই যায়, তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যাবে—‘জামায়াতে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা’— এটি কি বাস্তব, নাকি ইতিহাসের ওপর নির্মিত এক অস্বস্তিকর রাজনৈতিক বয়ান?

লেখক:  সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক,কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
গুলি করতে করতে চিকিৎসককে অপহরণ, মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেলেন
গুলি করতে করতে চিকিৎসককে অপহরণ, মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেলেন
আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বদলেছে বিএনপির অবস্থান?
আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বদলেছে বিএনপির অবস্থান?
কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে প্রথমবার সফল এনজিওপ্লাস্টি
কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে প্রথমবার সফল এনজিওপ্লাস্টি
অচল সম্পদকে উৎপাদনে ফেরাতে বড় উদ্যোগ সরকারের
অচল সম্পদকে উৎপাদনে ফেরাতে বড় উদ্যোগ সরকারের
সর্বশেষসর্বাধিক