সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জীবনধারাকেও মিলিয়ে চলতে হয়। ইতিহাস শিখিয়েছে, যারা সময়ের পরিবর্তনকে মেনে নিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে হেঁটেছে, তারাই টিকে থেকেছে যুগের পর যুগ। একইভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইন যেমন মানুষকে সভ্যতার বাঁধনে বেঁধে রেখেছে, তেমনি পরিবর্তনের মাধ্যমেও সূচনা করেছে শৃঙ্খলার ধারা। এমন ধারাবাহিকতার প্রভাবে পেশার জন্য নির্ধারিত বিধানের সংস্কারও হতে পারে সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত। সে বিশ্লেষণ থেকে দেখলে, সারা দেশের আইনজীবীদের সনদ প্রদানকারী ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের বিধিবিধানের যুগোপযোগী সংস্কার জরুরি হয়ে উঠেছে।
মূলত এই সংস্থাটি ‘বাংলাদেশ লিগ্যাল প্রাকটিশনারস অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২’ দ্বারা পরিচালিত হয়। এটি প্রেসিডেন্ট অর্ডার বা অধ্যাদেশ দিয়ে গঠিত একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকার থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সংস্থাটির মূল কার্যক্রম নিয়ে সারা দেশের আইন শিক্ষার্থী-আইনজীবীদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব দেখা যায়। ‘অর্থের বিনিময়ে অ্যাডভোকেট হওয়া যায়’, ‘বার কাউন্সিলের সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেই হবে’, ‘জুডিশিয়ারিতে চান্স পেলাম, কিন্তু বারের পরীক্ষায় পাস করা সত্ত্বেও ফেল দেখালো’ ইত্যাদি এমন অনেক অভিযোগ শোনা যায়। তবে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে চিহ্নিত হয়ে থাকার ভয়ে অনেক পরীক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেছেন।
শুধু পরীক্ষার ক্ষেত্রেই নয়। একজন আইন শিক্ষার্থীর শিক্ষানবিশকাল বা প্রাথমিক পেশাজীবন-মর্যাদা-দক্ষতা বৃদ্ধিতে সংস্থাটির উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম কখনোই বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারেনি। শুধু ‘বার কাউন্সিল অর্ডারে নেই’ অজুহাতে বিগত সময়ে অনেক সমস্যাকে ‘সমস্যা’ হিসেবেই থেকে যেতে দেখেছি।
প্রাতিষ্ঠানিক সময় থেকেই হোক শুরু
আইন পেশার মানোন্নয়নের জন্য বার কাউন্সিলের কার্যক্রম শুরু হওয়ার দরকার ছিল শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক জীবন থেকেই। এক্ষেত্রে সারা দেশের আইন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে প্রতিটি ক্যাম্পাসে বার কাউন্সিলের সমন্বয়ে বছরে অন্তত দুটি সেমিনার আয়োজন করা; আইন বিষয়ে সব কোর্স চার বছর নির্ধারণ করা; ইংলিশ মিডিয়াম ছাড়াও বাংলা মিডিয়াম প্রতিষ্ঠানগুলোতে আইনের ইংরেজি টার্ম পড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা; এলএলবি-পাস কোর্স সম্পন্নের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের তালিকা সঙ্গে সঙ্গে বার কাউন্সিলে পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করা; আইন পাস করা প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ইন্টিমেশন ফরম জমা করার বিষয়ে সচেতন করে তোলার মতো কার্যপ্রণালি নির্ধারণ করতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।
শিক্ষানবিশকাল যেন অবহেলার না হয়
এলএলবি/এলএলএম উত্তীর্ণ হওয়ার পর একজন আইন শিক্ষানবিশের জীবন কঠিন সময়ের মধ্যে নিমজ্জিত হয়। তাই এ সময়টাতে শিক্ষানবিশদের পাশে দাঁড়াতে—আইন পাস করা প্রতিটি শিক্ষার্থী ইন্টিমেশন ফরম জমা করার পর তাদের নামে একটি অনলাইন প্রোফাইল তৈরি করা, যা সময়ে সময়ে আপডেট করা যাবে এবং এসব প্রোফাইল ওই শিক্ষার্থী ও বার কাউন্সিল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করা; বার কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় সব নমুনা ফরম এবং ফি পদ্ধতি সহজীকরণ। আইন পেশায় প্রবেশের জন্য আগে থেকেই বয়স নির্ধারণ করা, নয়তো নৈর্ব্যক্তিক ও লিখিত পরীক্ষায় পাস করার পরও ভাইভা বোর্ডে বয়সকেন্দ্রিক লজ্জাজনক প্রশ্ন উত্থাপন না করা এবং প্রতিবছর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য একটি ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করা। অর্থাৎ অনুকূল পরিস্থিতিতে প্রতিবছর কোন মাসে পরীক্ষা হবে এবং নৈর্ব্যক্তিক, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা যথাক্রমে কতদিনের ব্যবধানে হবে, তা নির্ধারণ করা (হাইকোর্ট পারমিশন পরীক্ষার ক্ষেত্রেও); বিধান অনুসারে বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীরা অন্তত চারজন শিক্ষানবিশকে জুনিয়রশিপ করাচ্ছেন কিনা, বার অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে বার কাউন্সিল কর্তৃক তা তদারকি করা; বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীরা তার জুনিয়রদের মাসিক/দৈনিকভাবে তুলনামূলক খরচ সরবরাহ করছেন কিনা, বার অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে বার কাউন্সিল কর্তৃক তা তদারকি করা; প্রয়োজনে জুনিয়র ফি বিবেচনায় সিনিয়রদের আয়কর নথিতে রেয়াত সুবিধা চালু করা; একজন শিক্ষানবিশের প্রতি সিনিয়রদের আচরণ ও সিনিয়রদের প্রতি শিক্ষানবিশদের আচরণবিধির যুগোপযোগী পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন প্রণয়ন করা এবং সব শিক্ষানবিশের (বিশেষ করে নারীদের জন্য) একটি মর্যাদাপূর্ণ এবং হয়রানি-মানসিক নির্যাতনমুক্ত আইনাঙ্গন নিশ্চিত করা।
পরীক্ষাকালীন কিছু পরিবর্তনে নজর দেওয়া
পরীক্ষাকালীন সময়ে প্রশ্ন কেনাবেচা বা খাতা পরিবর্তনের শঙ্কা-অভিযোগ খুবই পুরোনো। তাই এই শঙ্কা এড়াতে বার কাউন্সিল কর্তৃক আয়োজিত সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো শাস্তি প্রদানের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। পরীক্ষা-সংক্রান্ত নোটিশে নতুন কিছু সংযোজন করা হলে সে সম্পর্কে পরামর্শমূলক ভিডিও নির্মাণ করে প্রচার করা; পরীক্ষার্থীদের যেকোনো প্রয়োজনে তথ্য ও অনুসন্ধানের জন্য ২৪ ঘণ্টার একটি কল সেন্টার সুবিধা চালু করা; একসঙ্গে অনেকে প্রবেশের ফলে ওয়েবসাইটের অচলাবস্থা দূর করা; পরীক্ষার হলগুলোতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও খাতা রাখার উপযুক্ত বেঞ্চ সুবিধা আগে থেকেই নিশ্চিত করা; প্রক্সি বন্ধে সংস্থাটির কঠোর অবস্থান ধরে রাখা; প্রতিটি পরীক্ষায় প্রাপ্ত পাস মার্ক ওই শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট প্রোফাইলে প্রকাশ করে দেওয়া; এবং ফি নির্ধারণের মাধ্যমে পরীক্ষার খাতা রিভিউ করার পদ্ধতি চালু ও এজন্য আইনের সংশোধনী আনা।
আইনজীবীদের দক্ষতা ও আর্থিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বৃদ্ধি করা
আইনজীবী হওয়ার পর ক্রান্তিকাল যেন আরও বেড়ে যায়। আইনজীবী হওয়া মানেই অনেক টাকার মালিক হয়ে যাওয়া বলে মনে করেন অনেকে। এ সময়ে তাদের প্রতি পরিবার-পরিজনের প্রত্যাশা যেমন বেড়ে যায়, তেমনি তারাও পেশাগত ধাক্কা সামলে উঠতে হিমশিম খেয়ে যান। তাই বার কাউন্সিলের উচিত—আইনজীবী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বার অ্যাসোসিয়েশনে অন্তর্ভুক্তিতে বড় অঙ্কের বেনেভোলেন্ট ফান্ডের চাঁদা নির্ধারণের বিষয়টি নির্ধারণ করে দেওয়া। প্রয়োজনে কয়েক ধাপে চাঁদা নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা; নবীন অস্বচ্ছল আইনজীবীদের জন্য শর্তসাপেক্ষে প্রাথমিকভাবে কিছু বই বা পোশাক-পরিচ্ছদ কেনার জন্য এককালীন অনুদান বা সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা রাখা; কোনো নবীন আইনজীবীকে বার অ্যাসোসিয়েশনে অন্তর্ভুক্তিতে অস্বীকৃতি জানালে তা তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা; নবীন আইনজীবীদের জন্য বার কাউন্সিল ও সংশ্লিষ্ট বার অ্যাসোসিয়েশন থেকে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। সেসব প্রশিক্ষণের মূল্যায়নে উত্তীর্ণদের বাইরের দেশেও প্রশিক্ষণে পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা; বহুল ব্যবহৃত বিশেষ আইনগুলোর ওপর বার কাউন্সিলে পেইড কোর্স চালু করা এবং আসন পূর্ণ হওয়া সাপেক্ষে অনলাইন ও অফলাইনে সারা দেশের আগ্রহী আইনজীবীদের জন্য অভিজ্ঞ বিচারক ও আইনজীবীদের সমন্বয়ে এই কোর্স পরিচালনা করা।
বেনেভোলেন্ট ফান্ডের চাঁদা পরিশোধের শেষ সময়ের অন্তত এক মাস পূর্বে আইনজীবীকে এসএমএসের মাধ্যমে মনে করিয়ে দেওয়া; জীবদ্দশায় যেন বেনেভোলেন্ট ফান্ডের সুবিধা পাওয়া যায়, সে বিষয়ে কয়েকটি স্কেল নির্ধারণ করা; অসুস্থতা বা বিশেষ কোনো প্রয়োজনে শর্তসাপেক্ষে ঋণ প্রদানের সুব্যবস্থা রাখা; আইনজীবীরা তাদের পেশায় নিয়মিত আছেন কিনা, সে বিষয়ে তদারকি করা; অধস্তন আদালত বা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী না হয়েও কালো টাই বা ব্যান্ড-কলার ব্যবহারকারীদের বিষয়ে নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে ড্রেস কোড অনুসরণে সতর্ক করা। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা ব্যান্ড-কলার পরে বাজার বা জন্মদিনে যাওয়া বা ড্রেস কোডের অবমাননা করছেন কিনা, সে বিষয়েও তদারকি করা; প্রতিবছর গ্রীষ্মকালীন ড্রেস কোড নির্ধারণ করা; অন্তত ৫ বছর প্র্যাকটিসের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর প্রতিবছর সব আইনজীবীকে ন্যূনতম ২টি মামলা বিনামূল্যে পরিচালনা করার নির্দেশনা জারি করা। এজন্য সেসব আইনজীবীকে উৎসাহ প্রদানে বিভিন্ন রকম পুরস্কার ও সার্টিফিকেটের আয়োজন করা; বার অ্যাসোসিয়েশনের রাজনীতিতে আদালত ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলে চিহ্নিতদের বের করে ক্ষতিপূরণ আদায় করা; আদালত ভবনে বার নির্বাচনের কোনো স্টিকার ও পোস্টার ঝুলালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আইনজীবীদের ভোটে তিন বছরের জন্য নির্বাচিত হন বার কাউন্সিলের ১৪ জন সদস্য। তাদের দ্বারা গঠিত কমিটির (নির্বাহী, আর্থিক, আইন শিক্ষা কমিটি প্রভৃতি) সদস্যরা নির্ধারিত সভায় উপস্থিত না থাকার অসংখ্য নজির রয়েছে। অবশ্যই প্রতিষ্ঠানটির নেতৃবৃন্দের এমন স্বেচ্ছাচারিতা দূর করে জবাবদিহিতার সুযোগ তৈরি করতে হবে। বার কাউন্সিলকে রাজনীতির জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করে আইন শিক্ষার্থী-শিক্ষানবিশ ও আইনজীবীদের কল্যাণে একটি পূর্ণাঙ্গ পেশাজীবীদের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসা জরুরি। এর প্রয়াস হিসেবে বার কাউন্সিল অর্ডারটি সংশোধন ও নেতৃবৃন্দের চিরাচরিত মনোভাবকে সংস্কার করে সংশ্লিষ্টদের জন্য যুগোপযোগী একটি পূর্ণাঙ্গ সংস্থা উপহার দিতে হবে। আর এই সংস্কারের পরামর্শ হাইকোর্টেরও। নীলফামারীর বাবু ক্ষিতিশ চন্দ্র রায়ের করা এক আপিল মামলার রায়ে বার কাউন্সিলের যুগোপযোগী সংস্কারের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন উচ্চ আদালত।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।




