মেধাপাচার নাকি মেধার গতিশীলতা? 

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে
০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০

প্রশ্নটি নতুন নয়। তবে বাংলাদেশের তরুণদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা যত বাড়ছে, প্রশ্নটির গুরুত্বও তত বাড়ছে। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজতে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি তরুণ বিদেশে যাচ্ছেন। কেউ এটিকে ‘মেধাপাচার’ হিসেবে দেখছেন; অন্যরা বলছেন এটি বিশ্বায়নের স্বাভাবিক ফল—‘মেধার গতিশীলতা’ বা ব্রেন সার্কুলেশন। বাস্তবতা সম্ভবত এই দুই ধারণার মাঝামাঝি। তাই আবেগের পরিবর্তে তথ্য ও সম্ভাবনার দিক থেকে বিষয়টি দেখা দরকার।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতা যে দ্রুত বাড়ছে, তার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় ইউনেস্কোভিত্তিক তথ্য থেকে। ২০০৮ সালে প্রায় ১৬ হাজার ৬০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন। ২০২২ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯ হাজার ১৫১ জনে,অর্থাৎ প্রায় তিন গুণ। ২০২৩ সালে সংখ্যাটি আরও বেড়ে ৫২ হাজার ৭৯৯ জনে পৌঁছায় বলে ইউনেস্কোভিত্তিক তথ্য উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ কাউন্সিল জানিয়েছে।

তবে ২০২৪-পরবর্তী প্রবণতা বোঝার জন্য শুধু এই সামগ্রিক সংখ্যা যথেষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৫৬৩ জন। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে তা বেড়ে ১৭ হাজার ০৯৯ জনে দাঁড়ায়—এক বছরে প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি। অর্থাৎ বিদেশে যাওয়ার প্রবণতাকে সাময়িক কোনও ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কমছে। বাংলাদেশের তরুণদের একটি অংশ ক্রমেই বৈশ্বিক শিক্ষা ও শ্রমবাজারকে নিজেদের ভবিষ্যতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

এর একটি কারণ দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগের সম্প্রসারণ সত্ত্বেও মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সুযোগের সীমাবদ্ধতা। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ও শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু একইসঙ্গে গবেষণার সুযোগ, উন্নত গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং উচ্চমানের অ্যাকাডেমিক পরিবেশের প্রয়োজনও বেড়েছে।

ফলে যে শিক্ষার্থী উন্নত গবেষণা বা বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন করতে চান, তাঁর কাছে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থানের প্রশ্ন। উচ্চশিক্ষিত তরুণরা শুধু একটি ডিগ্রি চান না; তাঁরা এমন একটি কর্মপরিবেশও চান— যেখানে তাঁদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও গবেষণার সুযোগ কাজে লাগবে। ফলে বিদেশে যাওয়া অনেকের কাছে শুধু দেশত্যাগ নয়; বরং নিজের সম্ভাবনাকে বৃহত্তর পরিসরে কাজে লাগানোর একটি পথ।

তবে এখানেই ‘মেধাপাচার’ ধারণাটি সামনে আসে। একজন দক্ষ তরুণ বিদেশে গিয়ে যদি স্থায়ীভাবে সেখানেই থেকে যান এবং তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার সঙ্গে বাংলাদেশের কোনও সম্পর্ক না থাকে, তাহলে দেশের জন্য সেটি নিঃসন্দেহে একটি সুযোগ-ক্ষতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু বিদেশে যাওয়া মানেই কি মেধাপাচার? সবসময় নয়। বিশ্বায়নের যুগে মানুষ, জ্ঞান ও দক্ষতার চলাচল একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। একজন বাংলাদেশি গবেষক বিদেশে কাজ করতে পারেন, আবার বাংলাদেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণায় যুক্ত হতে পারেন। একজন প্রযুক্তিবিদ বিদেশে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও দেশে বিনিয়োগ করতে পারেন। একজন শিক্ষক বিদেশে থেকেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের অনলাইনে পড়াতে বা গবেষণায় সহযোগিতা করতে পারেন। অর্থাৎ শারীরিকভাবে দেশে না থেকেও একজন প্রবাসী পেশাজীবী দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন। এখানেই ব্রেন সার্কুলেশন ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য এই সম্ভাবনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ প্রবাসী বাংলাদেশিরা ইতোমধ্যে দেশের অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৩৫.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭.৩ শতাংশ বেশি। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক রেমিট্যান্স গ্রহণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ শীর্ষ দেশগুলোর একটি।

তবে রেমিট্যান্সের গুরুত্বের পাশাপাশি একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। বাংলাদেশের বিদেশগামী শ্রমিকদের বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে low ও semi-skilled কর্মী। ফলে রেমিট্যান্সের আলোচনাকে শুধু উচ্চশিক্ষিত প্রবাসীদের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক হবে না।

বরং শিক্ষিত ও দক্ষ প্রবাসীদের অবদানকে রেমিট্যান্সের বাইরেও দেখতে হবে—জ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্যোক্তা নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে তার প্রবাসী জনগোষ্ঠীকে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্ঞান ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে। ভারতীয় সরকারি নথিতেও প্রবাসীদের মাধ্যমে প্রযুক্তি ও দক্ষতা হস্তান্তর, বিনিয়োগ এবং উদ্যোক্তা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগের কথা বলা হয়েছে।

চীনও বিদেশে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি তাঁদের বিভিন্নভাবে দেশের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৪ সালে চীন বিদেশফেরত শিক্ষিতদের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, গবেষণা সহযোগিতা ও বিভিন্ন ধরনের পেশাগত সম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য নতুন নীতিগত নির্দেশনা দেয়।

বাংলাদেশের জন্য তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু ‘কীভাবে তরুণদের বিদেশে যাওয়া বন্ধ করা যায়?’ বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—‘যাঁরা বিদেশে যাচ্ছেন, তাঁদের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়?’ এ জন্য কয়েকটি উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিক্ষার মান উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শুধু নতুন ভবন নয়, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবেশাধিকার, প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, দেশে এমন একটি অ্যাকাডেমিক ও পেশাগত পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যেখানে দক্ষ তরুণরা নিজেদের যোগ্যতা কাজে লাগানোর সুযোগ পাবেন। মেধাভিত্তিক নিয়োগ, স্বচ্ছ পদোন্নতি এবং গবেষণার স্বাধীনতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের নিয়ে একটি কার্যকর ‘Knowledge Diaspora Network’ গড়ে তোলা যেতে পারে। এর মাধ্যমে তাঁরা দেশে না ফিরেও যৌথ গবেষণা, অতিথি শিক্ষকতা, পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।

চতুর্থত, যারা বিদেশ থেকে দেশে ফিরতে চান, তাঁদের জন্য বিনিয়োগ, গবেষণা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও পেশাগত পুনঃসংযোগের ক্ষেত্রে সহজতর ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিদেশফেরত মেধাবীদের জন্য জটিলতা কমানো গেলে অনেকেই দেশে ফিরে কাজ করার আগ্রহ দেখাতে পারেন।

সবশেষে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন দরকার। একজন তরুণ বিদেশে গেলেই তিনি বাংলাদেশের জন্য হারিয়ে গেলেন—এমন ধারণা এখন আর পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। আবার বিদেশে যাওয়া মানেই দেশের জন্য লাভ—এমন ধারণাও ঠিক নয়। আসল বিষয় হলো, দেশের সঙ্গে তাঁর জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্কের সম্পর্কটি কতটা সক্রিয় রাখা যাচ্ছে।

তাই মেধাপাচার নাকি মেধার গতিশীলতা—এই বিতর্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ কীভাবে তার বৈশ্বিক মেধাসম্পদকে কাজে লাগাবে। তরুণদের বিদেশযাত্রা পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা দরকার, যেখানে তাঁরা বিদেশে গিয়ে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন এবং সেই জ্ঞান, বিনিয়োগ ও যোগাযোগের একটি অংশ বাংলাদেশের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তাহলেই বিদেশমুখী মেধা শুধু ‘ক্ষতি’ হিসেবে দেখা হবে না; বরং তা বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনায় পরিণত হতে পারে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
হোটেলে আগুন, গ্রেফতার আ.লীগের ৭ নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি
হোটেলে আগুন, গ্রেফতার আ.লীগের ৭ নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি
৫০০ বছরের ইতিহাসের শহর গর্লিৎস
৫০০ বছরের ইতিহাসের শহর গর্লিৎস
বিলের প্রতিকূলতা পেরিয়ে দেয়ালচিত্রে শিক্ষার নতুন পাঠ
বিলের প্রতিকূলতা পেরিয়ে দেয়ালচিত্রে শিক্ষার নতুন পাঠ
মিরপুর-১০ এর ফুটপাত দখল রোধে মনিটরিং টিম গঠন 
মিরপুর-১০ এর ফুটপাত দখল রোধে মনিটরিং টিম গঠন 
সর্বশেষ সর্বাধিক