কন্যাশিশুর সুরক্ষা: ঝুঁকি কি শুধু দরিদ্র পরিবারের?

রতন মালো
১১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০০ আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০০

কন্যাশিশুদের ঘিরে বাংলাদেশে অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে। স্কুলে যাওয়ার পথে নিরাপত্তা, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ— এসব পুরোনো উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্রতারণা, যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট, ডিজিটাল প্রতারণা, পাচার, নিখোঁজ হওয়ার মতন নতুন নতুন ঝুঁকি। কন্যাশিশুর সুরক্ষা এখন শুধু দরিদ্র বা প্রান্তিক পরিবারের সমস্যা নয়। ডিজিটাল যুগে এটি এখন মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল পরিবারেরও উদ্বেগের বিষয়।

প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ১১ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। এই দিনে কন্যাশিশুদের কণ্ঠস্বর, উদ্যোগ ও নেতৃত্বকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করুন এবং কন্যাশিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ করুন’। বাংলাদেশ সরকার ‘জাতীয় কন্যা শিশু দিবস ২০২৬’ উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামী ৮ অক্টোবর।

শিশু সুরক্ষা কী?

ইউনিসেফ-এর চাইল্ড প্রোটেকশন স্ট্রাটেজি ২০২১-২০৩০ অনুযায়ী, “শিশু সুরক্ষা হলো শিশুদের প্রতি শোষণ, নির্যাতন, অবহেলা, ক্ষতিকর প্রথা ও সহিংসতা প্রতিরোধ এবং এসবের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।” শিশুদের ওপর সহিংসতা বাড়ি, স্কুল, কমিউনিটি এবং অনলাইন— সব জায়গাতেই ঘটতে পারে এবং অনেক সময় শিশুর পরিচিত ও বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিরাই অপরাধী হতে পারে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ও কন্যাশিশুর সুরক্ষা বিষয়ে উদ্বেগ

কন্যাশিশুর সুরক্ষার বিষয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০২৫ সালের সংবাদপত্রভিত্তিক পর্যবেক্ষণে এক ভয়াবহ বাস্তবতার চিত্র সামনে এনেছে। ২০২৫ সালে সংগঠনটি ৭৮৬ জন নারী ও কন্যাশিশুকে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হিসেবে নথিভুক্ত করে। এর মধ্যে ৫৪৩ জনই ছিল ১৮ বছরের নিচে। একই প্রতিবেদনে কন্যাশিশুদের মধ্যে ১৪২টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা, ২০৩টি আত্মহত্যা এবং ১১৭টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়।

চলতি বছরে পরিস্থিতি আরও নাজুক। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম আট মাসেই নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে মোট ১৯১৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮৪টি ঘটনায় ভুক্তভোগী কন্যাশিশু। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩৩১টি ধর্ষণের ঘটনায় ২৪০ জন ছিল কন্যাশিশু; ধর্ষণের পর হত্যার ৩৩টি ঘটনার মধ্যে ২২ জন ছিল কন্যাশিশু। ১৩৬টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় ১১২ জন ভুক্তভোগী ছিল কন্যাশিশু।

আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্বেগ

বাংলাদেশে কন্যাশিশুর সুরক্ষা সংকটের একটি আশঙ্কার দিক হলো— শিশুর জন্য নিরাপদ বিবেচিত স্থানগুলোও নিরাপদ নয়। ইউনিসেফ বাংলাদেশ ২০২৫ সালের মার্চে দেশের শিশুদের ওপর, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ২০২৬ সালের মে মাসেও সংস্থাটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যাসহ সহিংসতার ঘটনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।

ইউনিসেফ বলেছে, শিশুদের নিরাপত্তার জন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, প্রতিবেশী এবং সেবাকেন্দ্রসহ— সব জায়গায় সুরক্ষা ব্যবস্থা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করা প্রয়োজন। অর্থাৎ, কন্যাশিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নটি কেবল রাস্তাঘাট বা অপরিচিত ব্যক্তির ঝুঁকিতে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তি, সামাজিক সম্পর্ক এবং এমনকি শিশু যে পরিবেশে আস্থার সঙ্গে যায়, সেখানেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কন্যাশিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণ উদ্বেগজনক

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী মানবপাচারের ওপর ‘ট্রাফিকিং ইন পারসন (টিআইপি)’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে পর পর তিন বছরের টিআইপি প্রতিবেদন বলছে, ‘‘বাংলাদেশে শিশু যৌনপাচার এখনও ব্যাপক আকারে বিদ্যমান; ধারণা করা হয়— প্রায় ৩০ হাজার কন্যাশিশু যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে।’’

প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, পাচারকারীরা চাকরি বা আয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারী ও কন্যাশিশুদের প্রলুব্ধ করে এবং বাণিজ্যিক যৌন শোষণের দিকে ঠেলে দেয়। ইউনিসেফফের ২০২৫ সালের ‘স্টপিং দ্য ট্রাফিক’ প্রতিবেদনে দারিদ্র্য, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, বাল্যবিবাহ, সামাজিক বৈষম্য ও দুর্বল সুরক্ষা ব্যবস্থা পাচারের ঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

অনলাইনে বাড়ছে কন্যাশিশুর ঝুঁকি

ইউনিসেফ বাংলাদেশ ২০২৫ সালে একটি ১১ বছর বয়সী মেয়ের ঘটনা তুলে ধরেছিল, যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের পর নিখোঁজ হয়েছিল এবং পরে বাড়ি থেকে অনেক দূরে উদ্ধার হয়।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক চারটি বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির ৪৫৬ জন শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৩.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী জীবনের কোনও পর্যায়ে অন্তত এক ধরনের অনলাইন যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, গবেষণায় শহরের শিশুদের অনলাইন যৌন নিপীড়নের ঝুঁকি গ্রামীণ শিশুদের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশে কন্যাশিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার চিত্র নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সাম্প্রতিক তেমন আলোচনা না থাকলেও, বিদ্যমান গবেষণাগুলো অনলাইনে শিশুদের যৌন নিপীড়ন, গ্রুমিং, স্টকিং, সেক্সটিং ও ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলের ঝুঁকির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।

অনলাইনে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা ঝুঁকির ক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবারের শিশুর চাইতে মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল পরিবারের অভিভাবকদের উদ্বেগের জায়গাটি বেশি। দামি স্মার্টফোন, ভালো স্কুলে পড়াশোনা, যেখানে সবার হাতে দামি মোবাইল কন্যাশিশুর সুরক্ষার পরিবর্তে তার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল পরিবারের কন্যাশিশুরা কিন্তু এক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশে ২০২৫ সালে একটি যুব জরিপ পরিচালনা করে। সেটিতে প্রায় ২৯ হাজার শিশু ও তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করে। জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ অংশগ্রহণকারী জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া সংবাদ, ভুল তথ্য তাদের মানসিক চাপের কারণ হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে কন্যাশিশুর জন্য সতর্কবার্তা

বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও দেখা প্রয়োজন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ইউনিসেফ’র এক নতুন গবেষণায় ২১টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় প্রতি পাঁচজন শিশুর একজন—অর্থাৎ আনুমানিক ২ কোটি শিশু এক বছরের মধ্যে প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত কোনও না কোনও ধরনের যৌন সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

ইউনিসেফের তথ্য আরও বলছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬৫ কোটি নারী ও কন্যাশিশু শৈশবকালে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন— যা প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন। তাদের মধ্যে ৩৭ কোটিরও বেশি নারী ও কন্যাশিশু শৈশবকালে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত যৌন নির্যাতনের শিকার কন্যাশিশুদের ৪০ শতাংশেরও বেশি কখনোই বিষয়টি কারও সঙ্গে শেয়ার করেনি। আর ১ শতাংশেরও কম ভুক্তভোগীর ঘটনা পুলিশ, সমাজকর্মী বা হেল্পলাইনের মতো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয়েছে। বিশ্বব্যাপী শিশুরা নীরব থাকার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হিসেবে জানিয়েছে— তারা জানে না কোথায় যেতে হবে বা কাকে বিষয়টি জানাতে হবে।

বাংলাদেশে আইনি অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা উদ্বেগজনক

২০২৬ সালে বাংলাদেশে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে নতুন আইন হয়েছে। অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এ ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি / অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত যৌন ছবি বা ভিডিও প্রকাশ এবং যৌন কনটেন্ট ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল-সংক্রান্ত অপরাধের বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আইনি কাঠামোও নতুন ঝুঁকির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু আইন থাকা এবং কন্যাশিশুর বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার বাস্তবতায় তফাৎ দেখা যাচ্ছে।

কন্যাশিশুর সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব কার?

কন্যাশিশুর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত কে করবে? এটি একটি বড় প্রশ্ন। সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নাকি অভিভাবক, প্রতিবেশী, নাকি অন্যকেউ? কন্যাশিশুর সরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব আসলে সকলের। কন্যাশিশুকে শুধু বাইরে যেতে নিষেধ করা নয়। তাকে নিরাপদে কথা বলার পরিবেশ দেওয়া, অনলাইন ও অফলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা, বিপদের সময়ে দোষারোপ না করে তার পাশে দাঁড়ানো জরুরি।

একটি কন্যাশিশুর নিরাপত্তা শুধু তাকে একটি মাত্র অপরাধ থেকে সুরক্ষা দেয়া নয়। বরং তার চলাফেরা, শিক্ষা, বন্ধুত্ব, প্রযুক্তি ব্যবহার, ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছুর জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সে ভয় নয়, নিরাপত্তা ও আস্থার সঙ্গে বড় হতে পারে।

লেখক: একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত এবং একজন ফ্রিল্যান্স গণমাধ্যমকর্মী

ইমেইল: [email protected]

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
চিকিৎসাসেবার ছদ্মবেশে গিয়ে ধরলো ভেজাল দুধের কারবার
চিকিৎসাসেবার ছদ্মবেশে গিয়ে ধরলো ভেজাল দুধের কারবার
জেলেনস্কি যথেষ্ট করছেন না, ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন: ট্রাম্প
জেলেনস্কি যথেষ্ট করছেন না, ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট প্রয়োজন: ট্রাম্প
মোহাম্মদপুরের বসিলায় অটোরিকশা চালকদের সড়ক অবরোধ
মোহাম্মদপুরের বসিলায় অটোরিকশা চালকদের সড়ক অবরোধ
‘পুষ্টি বাদ দেন, খেয়ে বেঁচে থাকতে পারলেই হলো’ 
‘পুষ্টি বাদ দেন, খেয়ে বেঁচে থাকতে পারলেই হলো’ 
সর্বশেষ সর্বাধিক