বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে ছাত্রলীগকে কী শিক্ষা নিতে হবে

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ১২:২৭, আগস্ট ২৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৪, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৭

স্বদেশ রায়বঙ্গবন্ধু পৃথিবীর অনেক বড় রাজনৈতিক নেতার মতো অনেক কিছু লিখে রেখে যাওয়ার সময় পাননি। ৫৪ বছর ৫ মাসের জীবনে একটি জাতি সৃষ্টি ও জাতির জন্যে নির্দিষ্ট স্বাধীন ভূখণ্ড শুধু দেননি, যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশকে গড়ে তুলতে যা কিছু প্রয়োজন সবই করেছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছরে। কাজ আর তাঁর জীবনের সময় সীমা যদি হিসাব করা হয় তাহলে যে গতিবেগ তার সামগ্রিক কাজের ভেতর দেখা যায়-  তা কাজের মানের অনুপাতে আলোর গতির থেকে বেশি ছাড়া কম নয়। বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে ছাত্রলীগের তাই প্রথম শিক্ষা হলো, জীবনকে গতিশীল করা। জীবনে কাজের গতি যেন আলোর গতির সমান হয়।
বঙ্গবন্ধুর জীবন কত গতিশীল তা আমরা তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে প্রতিটি স্তরে দেখতে পাই। তাঁর ছাত্র জীবনে অর্থাৎ তরুণ জীবনে কখনই কোনও কাজ শেষ করার জন্যে বা শুরু করার জন্যে কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেননি। নিজে যেটা ভালো মনে করেছেন, সেটাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ও করেছেন। ১৯৪৮ সালে বঙ্গবন্ধুর ঢাকার রাজনৈতিক জীবনের বয়স মাত্র কয়েক মাস। তিনি সবেমাত্র কলকাতা থেকে ঢাকা এসেছেন। তিনি যখন ঢাকায় এসেছেন তখন ভাষা আন্দোলন ছিল অনেকখানি বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের ভেতর সীমাবদ্ধ। হরতাল করে, সচিবালয়ের সামনে পিকেটিং করে, নিজে গ্রেফতার হয়ে সেই ভাষা আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের ভেতর নিয়ে যেতে বঙ্গবন্ধু বড় নেতা বা মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের নেতাদের জন্যে অপেক্ষা করেননি। বরং একটা পর্যায়ে তাঁর সঙ্গেই সরকার একটি চুক্তিতে আসতে বাধ্য হয়েছে। এ জন্যে প্রকৃত অর্থে যদি কেউ ছাত্রলীগ করে, প্রকৃত অর্থে যদি কেউ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হয়, তাকে বড় কোনও কাজ করার জন্যে, ভালো কোনও কাজ করার জন্যে কারো মুখাপেক্ষী হওয়া সাজে না। সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে, নিজেই জীবন পণ করে যে কোনও কাজ করতে পারে।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আন্দোলনের একজন ছাত্রকর্মী ছিলেন। তাঁর ওই সময়ের জীবন থেকে ছাত্রলীগের অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে। বঙ্গবন্ধু যখন ইসলামিয়া কলেজের একজন ছাত্র ওই সময়ে তাঁর নিজ জেলা ফরিদপুরে ওই ভাবে মুসলিম লীগের কোনও প্রভাব ছিল না, পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কেও বিশেষ কোনও ধারণা সেখানকার মানুষের ছিল না। বঙ্গবন্ধু নিজে উদ্যোগ নিয়ে কলকাতা থেকে বড় নেতাদের এনে তাঁর নিজ জেলায় পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম লীগের পক্ষে মানুষকে নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধু কেন সে সময়ে এটা করতে পারেন। তিনি পারেন দুটি কারণে- এক. নিজ এলাকায় তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে, আচরণের মাধ্যমে ও সততার গুণে সবার কাছে প্রিয় ছিলেন। দুই. ঠিক একই ভাবে কলকাতাতে তিনি কাজ, আচরণ ও সততার কারণে বড় নেতাদেরও প্রিয় ছিলেন। সর্বোপরি, তাঁর অভিষ্ট লক্ষ্য ছিল তিনি যে রাজনীতি করেন, যে দল করেন, যে আদর্শে বিশ্বাস করেন সেটা এগিয়ে নেওয়ার। এছাড়া রাজনীতির মাধ্যমে অন্য কোনও ফায়দা লোটার কোনও ইচ্ছে তাঁর ভেতর বিন্দু মাত্র ছিল না।

ছাত্রলীগের একজন তরুণ যদি বঙ্গবন্ধুকে তার জীবনের আদর্শ মেনে নেয় তাহলে তাকে প্রথম সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনীতি করবো মানুষের স্বার্থে, আদর্শের স্বার্থে। অন্য কোনও স্বার্থে নয়। আর তাকে তার আচরণ দিয়ে, সততা দিয়ে ও কাজ দিয়ে নিজ এলাকায় সকলের প্রিয় হয়ে উঠতে হবে, তেমনি তাকে প্রিয় হয়ে উঠতে হবে কাজের মাধ্যমে, সততার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে। কেন্দ্রীয় নেতারা অনেক সময় নিজ স্বার্থে ছাত্রলীগের তরুণদের ব্যবহার করতে যাবে, তাকে সে চেষ্টা প্রতিরোধ করে বঙ্গবন্ধুর মতো নিজ আদর্শে অটল থাকতে হবে। মনে মনে বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে নিজ এলাকায় এমনভাবে কাজ করতে হবে যেন তার কারণেই ছাত্রলীগ শুধু নয় আওয়ামী লীগ তার এলাকায় মানুষের মন জয় করতে পারে।

বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মী হিসেবে মুসলিম ছাত্রলীগ করেছেন তখন কিন্তু এত ছাত্রলীগ কর্মী ছিল না। তারপরেও তারা এক একজনই জয় করেছেন বিশাল একটা এলাকার মানুষের মন। আজকের ছাত্রলীগের দশভাগ কর্মী যদি সত্যি অর্থে সারা দেশে নিজ নিজ এলাকায় বঙ্গবন্ধু ছাত্র জীবনে তার নিজ এলাকায় যেভাবে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে মুসলিম লীগের রাজনীতি করেছিলেন ওই ভাবে এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে তাহলে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি ভিন্ন মাত্রা পাবে। এক বছরেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির চরিত্র বদলে যাবে। এমনকি আওয়ামী লীগের যে সব নেতা বা এমপিরা রাজনীতির মাধ্যমে নিজস্ব অর্থ বিত্ত গড়ে তুলতে চেষ্টা করছেন তারাও কিন্তু এদের ভয়ে হাত গুটাতে বাধ্য হবেন। বঙ্গবন্ধু অর্থাৎ ওই সময়ের তরুণ শেখ মুজিবের কারণে মুসলিম লীগের অনেক নেতা তাদের স্বার্থান্বেষী হাত গুটাতে বাধ্য হয়েছিলেন সে সময়ে।

ছাত্রলীগ এই ১৫ আগস্টের পরে আগামী ১৫ আগস্ট যখন পালন করবে তখন সাধারণ নির্বাচন হতে আর মাত্র চার মাস বাকি থাকবে। অর্থাৎ এ ১৫ আগস্টের পরের পনেরই আগস্ট পালিত হবে পুরো নির্বাচনি আবহাওয়ার মধ্যে বসে। আগামী ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের বা ২০১৯ সালের জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচন বাংলাদেশের প্রগতিশীল শক্তির একটি অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন। এই নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগ ও তার জোট পরাজিত হয়, যদি বিএনপি জামায়াত জোট জয়লাভ করে তাহলে এক কোটির ওপর প্রগতিশীল মানুষকে বিএনপি ও জামায়াত জোট হত্যা করবে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ একশত বছর পিছিয়ে যাবে। এখানে ধর্মীয় আবরণে এমন অন্ধত্ব সৃষ্টি করা হবে যার ভেতর ধর্ম তো হারিয়ে যাবে আর প্রগতিশীল চিন্তার চির বিদায়ের ঘণ্টা যাবে বেজে। এই যে কালো অধ্যায় দেশের ওপর নেমে আসবে এর ফলে সব থেকে ক্ষতি হবে দেশের তরুণ সম্প্রদায়ের। কারণ এর ভেতর দিয়ে তাদের সুন্দর আগামী শেষ হয়ে যাবে। শেষ হয়ে যাবে একটি উন্নত বাংলাদেশে বাস করার সব আশা আকাঙ্ক্ষা ও সুযোগ।  আগামী এ নির্বাচন ঘিরে অনেক ষড়যন্ত্র হবে, অনেক কালো টাকার খেলা হবে। এই ষড়যন্ত্রকে পরাজিত করার ও কালো টাকার খেলাকে পরাজিত করার একমাত্র পথ, তরুণ সম্প্রদায়কে পরিশ্রম ও ত্যাগের রাজনীতি করা। আগামী নির্বাচনের প্রচারে এবং মানুষের মন পরিবর্তনে তাদেরকে তাই রাখতে হবে প্রধান ভূমিকা।

এই প্রধান ভূমিকা রাখার জন্যে তাদেরকে আদর্শ হিসেবে নিতে হবে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান কিভাবে পাকিস্তান সৃষ্টির জন্যে ১৯৪৬ সালের ভোটে নির্বাচনি প্রচারে কাজ করেছিলেন। ছাত্রলীগের সব কর্মী বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়েছে কিনা আমি জানি না। তবে আমার ধারণা সব কর্মী পড়েনি। কারণ, সব কর্মী যদি এই বই পড়তো তাহলে এ বইয়ের বিক্রি কোটিতে গিয়ে দাঁড়াতো। ছাত্রলীগের এ মুহূর্তের কাজ  হবে প্রতিটি কর্মী যেন অবিলম্বে এক কপি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী কিনে খুবই মনোযোগের সঙ্গে পাকিস্তান আন্দোলনের ভোটের জন্যে অর্থাৎ ১৯৪৬ সালের ভোটে ছাত্রকর্মী তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান কিভাবে কাজ করেছিলেন ওই অংশটুকু বার বার পড়া। ওই অংশটুকু বার বার পড়ে ওর প্রতিটি শব্দের ভেতর দিয়ে বুঝতে হবে কিভাবে সমস্ত চিন্তা বিসর্জন দিয়ে বঙ্গবন্ধু নির্বাচনের জন্যে কাজ করেছিলেন। ছাত্রলীগের প্রতিটি কর্মী যদি সেটা উপলব্ধি করে, বঙ্গবন্ধুর ওই পরিশ্রমকে আদর্শ হিসেবে নিয়ে আগামী নির্বাচনের জন্যে নিজ নিজ এলাকায় কাজ করে তাহলে দেশের পরিস্থিতি বদলে যাবে। বদলে যাবে নির্বাচনে অন্য সকল দলের হিসাব নিকাশ।  আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতায় আসবে না, বাংলাদেশে চিরদিনের জন্যে প্রগতিশীল শক্তি তাদের আসন গেড়ে নেবে। কারণ, আরেকবার আওয়ামী লীগ বিপুল মেজরিটি নিয়ে ক্ষমতায় এলে প্রতিক্রিয়াশীলদের অস্তিত্ব নিয়ে টান পড়বে। তাদের আর এমন কোনও শক্তি থাকবে না যে, আগামী পঞ্চাশ বছরের ভেতর মাথা তুলে দাঁড়ায়। তাই এ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে ছাত্রলীগকে এ শিক্ষা নিয়ে, বঙ্গবন্ধুকে আদর্শ হিসেবে সামনে রেখে নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক জনকণ্ঠ

[email protected]  

এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X