প্রতিষ্ঠান স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কিন্তু শিক্ষক বেতনমুক্ত!

Send
এ এন রাশেদা
প্রকাশিত : ১৮:১৫, জানুয়ারি ০৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৪, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

এ এন রাশেদাউন্নয়নের মডেল–চমৎকার এক দেশে আমরা বাস করছি। ‘সব মানুষের সমান অধিকারের দেশ’। সেই দেশ গড়ার লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে ৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে সংবিধান অনুমোদন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ভাষণে বলেছিলেন– ‘কেউ খাবে, কেউ খাবে না­– তা হতে পারে না’। তিনি বলেছিলেন– ‘আইনের চোখে সাড়ে সাত কোটি মানুষের যে অধিকার সরকারি কর্মচারীদেরও সেই অধিকার। মজদুর-কৃষকের টাকা দিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মাইনে, খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করা হয়। মজদুর-কৃষকদের যে অধিকার, সরকারি কর্মচারীদের সেই অধিকার থাকবে। এর বেশি অধিকার তারা পেতে পারেন না। সরকারি কর্মচারীদের মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে–তারা শাসক নন, সেবক।’
অথচ ৪৬ বছর পর আমরা কী দেখছি? বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ এবং তার কন্যা যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়– তখন দফায় দফায় পারিশ্রমিক বাবদ বেতন-ভাতার জন্য শিক্ষকদের রাস্তায় দিনের পর দিন অনশন করতে হচ্ছে ২০১৩, ২০১৫ এবং ২০১৭-২০১৮ সালেও। এ এক নির্মম পরিহাস। আবার অন্যদিকে সরকারের আমলারা তাদের বেতন ভাতা ১ বছরে ৩ বার বৃদ্ধি করে নিয়েছেন।
সংবিধান অনুমোদনের দিন প্রমোশনের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু বলছেন– প্রমোশনের ব্যাপারে গরিব, অল্প বেতনভোগী কর্মচারীদের অধিকার থাকবে। গরিব কর্মচারীদেরও অধিকার থাকবে। গরিব কর্মচারীদের গায়ে কেউ হাত দিতে পারবে না। ‘... তাদের অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে সংবিধানে ...’ । অথচ সর্বক্ষণ ‘সংবিধান’ ‘সংবিধান’ বলে যারা বিলাপ করছেন শুধু নির্বাচন বিষয়ে– তারা ইতোপূর্বে শিক্ষকদের বেধড়ক পিটিয়ে বিদায় দিয়ে কোন সংবিধান রক্ষা করেছিলেন?

প্রশ্ন আছে– এইসব শিক্ষকদের সংবিধানের কোন ধারামতে লিখিতভাবে বলা হয়েছিল ‘ছয় বছর বেতন দিতে পারব না’। একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনের শ্রম, কষ্ট এবং ভালোবাসার টানে– শিক্ষকরা হয়ত রাজি হয়েছিলেন। তাই শিক্ষামন্ত্রীকে কি প্রশ্ন করা যায় না–সাংবিধানিক উপায়ে লিখিতভাবে এই কাজ করা যায় কি? দেখা যাচ্ছে– শুধু ৬ বছর না, ৯ বছরও পার হয়ে গেছে এই সরকারের শাসনামলে। আর তার আগেরও ধারাবাহিকতা ধরে কারও কারও ২৬ বা ২৮ বছর হতে চলেছে। এভাবে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৪২টিতে। বিনা বেতনে শিক্ষকতা, সত্যিই সেলুকাস!

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায় :

ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা।

খ) কর্মের অধিকার অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মুজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার।

গ) যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার এবং

ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতৃপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতি জনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য লাভের অধিকার।

এইসব আমাদের সংবিধানে প্রদত্ত অধিকার। তাই স্পষ্টত যে, এইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা দান করলে প্রতিষ্ঠান সমূহ যেমন উন্নত রূপে গড়ে ওঠার সুযোগ পেত, তেমনি সংবিধানের ১৫ নং ধারাও রক্ষিত হত। শতভাগ মানুষকে শিক্ষিত করার যে কষ্টকর প্রচেষ্টা সরকারকে করতে হতো– সেখানে এই ব্যক্তি উদ্যোগ গুলোকে সহায়তা করাই হতো বুদ্ধিমানের কাজ। বিদ্যুৎ উৎপাদন যদি পাবলিক প্রাইভেট ওনারশিপে হতে পারে- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন নয়? ‘শিক্ষা বাঁচলে দেশ বাঁচবে’- এই কথা কি সরকার মনে করে না?

এরপরও কি কেউ বলবেন– শিক্ষকরা অন্যায় আবদার করছেন? নতুন বই উৎসবকে বাধা দিচ্ছেন–ইত্যাদি ইত্যাদি।

এমপিও সম্পর্কে যাদের ধারণা নেই তাদের জ্ঞাতার্থে বলা প্রয়োজন যে শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান না, পুরনো প্রতিষ্ঠানেও কেউ কেউ নন-এমপিওভুক্ত। অর্থাৎ পাঠদানের জন্য মাত্র একজন শিক্ষক সরকারি কোষাগার থেকে বেতন পাবেন। কিন্তু কোনও প্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংখ্যা দু'শ, আড়াইশ’, ৫শ’ হলেও প্রতিষ্ঠান দু-জন শিক্ষককে নিয়োগ দিলেও একজন শিক্ষকই সরকারি বেতন পাবেন তবে শুধু প্রারম্ভিক বেতন। সঙ্গে এক হাজার টাকা বাসা ভাড়া, ৫০০/- চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা আধা+আধা = এক, বৈশাখী ভাতা নেই। জীবনের কোনও সময় কোনও ইনক্রিমেন্ট তিনি পাবেন না, শুধু ওই প্রারম্ভিক বেতন। বছর বছর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি হলেও বেতনের কোনও নড়চড় হবে না। আর আছে এক সার্ভিস রুল– যা এনাম কমিটির রিপোর্ট নামে পরিচিত। যেখানে পদোন্নতি পেতে ২২ থেকে ৩০ বছরও লেগে যায় কলেজ পর্যায়ে পূর্ববর্তী শিক্ষকের মৃত্যু না ঘটলে বা অবসরে না গেলে। অবশ্য মাদ্রাসার বেলায় তা হয় না। স্কুল পর্যায়ে তো কোনও পদোন্নতিই নেই। বেসরকারি শিক্ষকদের বঞ্চনার কাহিনি অনেক দীর্ঘ।

আমাদের দেশে সরকারে বা বিরোধী পক্ষে থেকে যারা যখন দেশ পরিচালনা করেছেন, তারা কেউই সংবিধান মেনে চলেননি কিন্তু নির্বাচনের সময় ‘সংবিধান সংবিধান’ বলে তীব্র স্বরে চেঁচামেচি করেছেন, আন্দোলন করেছেন, হরতাল করেছেন।

শিক্ষামন্ত্রী বর্তমানে শিক্ষকদের বেতনের দাবিতে আমরণ অনশন সম্পর্কে বললেন– ‘অর্থমন্ত্রণালয় টাকা দিলে বা থাকলে বিধি মোতাবেক বিবেচনা করবেন’। এটি তো প্রকৃত কোনও মানুষের বক্তব্য হতে পারে না।

শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘যারা আন্দোলন করছেন, তারা কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক স্বীকৃতি নেওয়ার আবেদনে নিজেরাই অঙ্গীকার করেছেন– তারা অনুমতি পেলে কখনও এমপিওভুক্ত হতে চাইবেন না। আমরাও সেই শর্তে তাদের স্বীকৃতি দিয়েছি। অথচ স্বীকৃতি পেয়েই তারা এমপিও ভুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন।’

এখানেই প্রশ্ন–ওই এলাকায় ওই প্রতিষ্ঠানের যদি প্রয়োজন না থাকে তাহলে উদ্যোগীরা এগিয়ে এলেও সরকার কেন অনুমোদন দেবে আবার বিনা বেতনে? সংবিধান যা অনুমোদনই করে না। আরও উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল ২০১৩ সালের পরে স্বীকৃতি-পাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ওই শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এই শর্ত অবশ্যই বেআইনি-যা কোনও সরকারই করতে পারে না। এদের বেতন দিলে বর্তমানে খরচ পড়বে নাকি ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা– শিক্ষা মন্ত্রাণালয়ের হিসেবে অনুযায়ী। বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদন অনুসারে যখন হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়, ব্যাংক লুট হয়, ওভার ব্রিজ বানাতে দফায় দফায় বাজেট বাড়ানো হয়– তখন এই ১৩০০ কোটি টাকা বেশি হবে কেন? গত শিক্ষাবাজেটে জাতীয় আয়ের ২.২ থেকে কমিয়ে ১.৮ করলো এবং তার সঙ্গে বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় যুক্ত করলে শিক্ষাখাতে টাকা আর থাকে কী? কিন্তু ইউনেস্কোর সুপারিশে সিগনেটরি বাংলাদেশ– শিক্ষাখাতে জাতীয় আয়ের ৭ শতাংশের নিচে বরাদ্দ করলে শিক্ষকদের বেতন হবে কিভাবে?

তবে আজ বেতন থেকে শুধু শিক্ষকরাই বঞ্চিত তা নয়। বঞ্চিত  শ্রমিক, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কর্মী, মিউনিসিপালিটির কর্মচারীবৃন্দসহ অনেকেই–যারা ইতোমধ্যে আন্দোলনে নামার কথা সমাবেশ করে সরকারকে জানিয়ে দিয়েছেন। কী জবাব দেবেন ৭২-এর সংবিধান-এর দাবিদার দলটি?

লেখক : সম্পাদক শিক্ষাবার্তা, সাবেক অধ্যাপক নটরডেম কলেজ।     

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ