খামেনির দাফন হলেও চাপা পড়বে না তার কট্টরপন্থা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৫ জুলাই ২০২৬, ২০:১৫ আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ২০:১৫

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হওয়ার চার মাসেরও বেশি সময় পর, অবশেষে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছয় দিনব্যাপী শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। তেহরান ও কোম নগরী হয়ে প্রতিবেশী ইরাকের শিয়া পবিত্র স্থান নাজাফ ও কারবালা ঘুরে মাশহাদে গিয়ে শেষ হবে এই দাফন প্রক্রিয়া। একে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় আয়োজন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে, এতে প্রায় ২ কোটি মানুষ অংশ নেবেন। শেষকৃত্য নির্বিঘ্ন করতে দেড় লক্ষাধিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, বন্ধ রাখা হয়েছে দেশের আকাশসীমার একাংশ এবং ঘোষণা করা হয়েছে সরকারি ছুটি।

তবে এই বিশাল ব্যবস্থাপনার আড়ালে তেহরানের এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। ইরানের কাছে খামেনির এই শেষকৃত্য কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; বরং এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সাজানো একটি রাজনৈতিক ক্ষমতার রূপান্তর। এর লক্ষ্য হলো, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী নেতাকে হারানোর পরও ইসলামি প্রজাতন্ত্র যে ঐক্যবদ্ধ, টেকসই এবং পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তা বিশ্বমঞ্চে ফুটিয়ে তোলা। ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর সবচেয়ে বিপজ্জনক সামরিক সংঘাত থেকে সবেমাত্র বেরিয়ে আসা এই দেশটির জন্য এটি এক বড় পরীক্ষা। একই সঙ্গে খামেনির ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির ক্ষমতা গ্রহণের পর, এটিই হতে যাচ্ছে ইরানের নতুন নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের কর্তৃত্ব জাহিরের প্রথম বড় সুযোগ।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইতোমধ্যে এই আয়োজনকে ‘শতাব্দীর সেরা শেষ বিদায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফসহ প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধির অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়া, চীন ও ভারত থেকেও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল যোগ দেবে। এর বিপরীতে, ইরান ইউরোপীয় দেশগুলোকে এই অনুষ্ঠান থেকে সুনির্দিষ্টভাবে বাদ দিয়েছে এবং সদ্য সমাপ্ত যুদ্ধে তারা ‘ইতিহাসের ভুল পক্ষে’ দাঁড়িয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে।

শেষ বিদায়ের ইরাক অংশটিও সমভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরাকের ধর্মীয় নেতা, উপজাতীয় প্রধান ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অনুরোধেই নাজাফ ও কারবালায় এই জানাজার আয়োজন করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি একে প্রতীকীভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বলেছেন, এর মাধ্যমে খামেনির আন্তসীমান্ত প্রভাবই পুনর্ব্যক্ত হচ্ছে। মক্কা ও মদিনার পর শিয়া ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই কেন্দ্রে এই জানাজার আয়োজন করার একটি ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। এর মাধ্যমে তেহরান সমগ্র শিয়া বিশ্বে তার ধর্মীয় বৈধতা সুসংহত করতে চায় এবং বার্তা দিতে চায় যে, খামেনির রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার কেবল ইরানের সীমানায় আবদ্ধ নয়।

অভ্যন্তরীণভাবে, বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক সংকট, দেশব্যাপী বিক্ষোভ, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং এক বছরেরও কম সময়ে দুটি টানা যুদ্ধের ধকল সত্ত্বেও সরকার যে ব্যাপক জনসমর্থন ধরে রেখেছে, এই জনস্রোতকে তারই প্রমাণ হিসেবে হাজির করতে চায় দেশটির নেতৃত্ব। কর্মকর্তারা এই অংশগ্রহণকে নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রতি আনুগত্যের এক নতুন অঙ্গীকার হিসেবে দেখছেন।

আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘতম ও প্রভাবশালী নেতৃত্বের অবসান ঘটিয়েছেন খামেনি। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর, তিনি সর্বোচ্চ নেতার পদটিকে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবিসংবাদিত কেন্দ্রে পরিণত করেন। পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ছিল তার হাতেই; আর নির্বাচিত সরকারগুলো চলত তার বেঁধে দেওয়া কঠোর সীমানার মধ্যে।

খামেনির নেতৃত্ব এমন বহু সংকট থেকে টিকে গেছে, যা অন্য যেকোনও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারত। ১৯৯৯ সালের ছাত্র বিক্ষোভ, ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট, ২০১৯ সালের দেশব্যাপী বিক্ষোভ, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রাণঘাতী বিশৃঙ্খলা, সবই তার আমলে শক্তি প্রয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং আইআরজিসির বর্ধিত ভূমিকার মাধ্যমে দমন করা হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের নীতি বজায় রাখেন এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক প্রতিরোধের অক্ষ-এর সম্প্রসারণ ঘটান।

তবে আদর্শের চেয়েও ক্ষমতার ভারসাম্যের ব্যবস্থাপনায় খামেনি ছিলেন অনন্য। তিনি কট্টরপন্থি দলগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতেন, প্রতিদ্বন্দ্বী কোনও শক্তিকে মাথাচাড়া দিতে দিতেন না এবং যেকোনও বড় বিরোধে নিজেকে চূড়ান্ত সালিসকারী হিসেবে ধরে রেখেছিলেন। ৩৭ বছর ধরে গড়ে তোলা তার এই ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জন করা সম্ভব নাও হতে পারে।

অবশ্য খামেনির মৃত্যু কোনও সাংবিধানিক সংকট তৈরি করেনি। তার ছেলে মোজতবা খামেনির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত মসৃণ ও দ্রুত, যা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই উত্তরাধিকারের জন্য আগে থেকেই নিঃশব্দে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে ইরান ভেঙে পড়ার বদলে ধারাবাহিকতাই প্রদর্শন করেছে।

তবে ধারাবাহিকতা মানেই ক্ষমতার সুসংহতকরণ নয়। আলী খামেনি সর্বোচ্চ নেতার সাংবিধানিক ক্ষমতার বাইরেও রাজনৈতিক দল, আইআরজিসি এবং নির্বাচিত সরকারের মধ্যকার অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ইতোমধ্যে রাজনৈতিক মহলে ফাটলের আভাস মিলছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক নিয়ে মতবিরোধ জনসমক্ষে চলে এসেছে, যেখানে কট্টরপন্থি রাজনীতিবিদ, ধর্মগুরু ও বিশেষজ্ঞ পরিষদের (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) সদস্যরা কূটনীতির পরিধি নিয়ে খোলামেলা বিতর্ক করছেন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে বারবার এই আলোচনার পক্ষে সাফাই গাইতে হচ্ছে এবং আলোচনার অনুমোদনের জন্য তিনি পদত্যাগের হুমকি দিয়েছিলেন, এমন দাবিও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, বরং খামেনি আগে যে সিদ্ধান্তগুলো গোপনে নিয়ন্ত্রণ করতেন, সেগুলো এখন জনসমক্ষে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। এই বিবর্তনটি পররাষ্ট্রনীতিতে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে। খামেনি সবসময় ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনাকে কৌশলগত পছন্দের চেয়ে ‘কৌশলগত প্রয়োজন’ হিসেবে দেখাতেন। মোজতবা খামেনি যুদ্ধোত্তর ইরানে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

খামেনির শেষ বিদায়টি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা তাকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে স্থায়ী ‘বিপ্লবী প্রতীকে’ রূপান্তর করবে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইতোমধ্যেই তাকে ‘শহীদ ইমাম’ হিসেবে উল্লেখ করা শুরু করেছে। দেশজুড়ে এখনও তার প্রতিকৃতি শোভা পাচ্ছে, যা নতুন সর্বোচ্চ নেতা ও আয়াতুল্লাহ খোমেনির ছবির পাশাপাশি রেখে অবিচ্ছিন্ন নেতৃত্বের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।

তা সত্ত্বেও, খামেনি-উত্তর যুগে ইরান প্রবেশ করছে এক বিধ্বস্ত অর্থনীতি, অমীমাংসিত সামাজিক ক্ষোভ, আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে এক নাজুক কূটনৈতিক পথ সামনে নিয়ে; যা একটি ব্যয়বহুল যুদ্ধের পর ইরানের সামরিক ও গোয়েন্দা দুর্বলতাগুলোকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

খামেনির তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত অক্ষত রয়েছে। আইআরজিসি এখনও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি এবং রাষ্ট্র কোনও দৃশ্যমান বিশৃঙ্খলা ছাড়াই ক্ষমতার রূপান্তর ঘটাতে পেরেছে। তবে আসল ও কঠিন পরীক্ষাটি সামনে। বিগত প্রায় চার দশক ধরে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেবল প্রতিষ্ঠানের ওপর নয়, বরং একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল, যিনি কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিতে পারতেন। তার শেষকৃত্য সাংগঠনিক শক্তি এবং আনুগত্যের চমৎকার প্রদর্শন হতে পারে, কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, এই আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর ১৯৮৯ সালের পর প্রথমবারের মতো খামেনিকে ছাড়াই ইরান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক এই গভীর সংকটগুলো কীভাবে মোকাবিলা করবে।

সূত্র: আল-মনিটর

/এএ/
টাইমলাইন: আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়
০৫ জুলাই ২০২৬, ২০:১৫
খামেনির দাফন হলেও চাপা পড়বে না তার কট্টরপন্থা
০৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩২
০৩ জুলাই ২০২৬, ১৭:০৭
সম্পর্কিত
ইরান যুদ্ধে মার্কিন সেনা নিহতের সংখ্যা কি বাড়ছে? নতুন হিসাব পেন্টাগনের
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি
ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের পর হাসপাতাল ছাড়লেন ক্রিস্টা পাইক, আবারও ফিরলেন কারাগারে
সর্বশেষ খবর
কর অঞ্চল-৩ ঢাকায় ৪৭ জনের নিয়োগ, আবেদন শুরু ১২ অক্টোবর 
কর অঞ্চল-৩ ঢাকায় ৪৭ জনের নিয়োগ, আবেদন শুরু ১২ অক্টোবর 
রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্র মোছার চেষ্টা: আয়াসসহ ৪ জনকে রিমান্ডে চায় পুলিশ
রবীন্দ্রনাথের দেয়ালচিত্র মোছার চেষ্টা: আয়াসসহ ৪ জনকে রিমান্ডে চায় পুলিশ
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে পরিকল্পনা করছে সরকার: শিক্ষামন্ত্রী
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে পরিকল্পনা করছে সরকার: শিক্ষামন্ত্রী
 সৌদি আরবে নিহত দুই বাংলাদেশি, আহত ৪ জন আইসিইউতে
 সৌদি আরবে নিহত দুই বাংলাদেশি, আহত ৪ জন আইসিইউতে
সর্বাধিক পঠিত
ম্যাকবুক উপহার দি‌য়ে জার্মান পর্যট‌কের দুঃখ ঘোচা‌লেন একজন
ম্যাকবুক উপহার দি‌য়ে জার্মান পর্যট‌কের দুঃখ ঘোচা‌লেন একজন
আলহামদুলিল্লাহ, আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন: কেয়া পায়েল
আলহামদুলিল্লাহ, আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন: কেয়া পায়েল
স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা, কার ডাকে কক্সবাজার গেলো কিশোরী?
স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা, কার ডাকে কক্সবাজার গেলো কিশোরী?
বিমানের পাইলট ও সহ-পাইলট একই খাবার খান না কেন?
বিমানের পাইলট ও সহ-পাইলট একই খাবার খান না কেন?
খোলা হয়েছে লালনের আখড়াবাড়ির দানবাক্স, কত টাকা পাওয়া গেলো?
খোলা হয়েছে লালনের আখড়াবাড়ির দানবাক্স, কত টাকা পাওয়া গেলো?