X
শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২২, ১৪ মাঘ ১৪২৮
সেকশনস

শিল্পকলায় দুর্নীতি: পর্দা, প্লেট, সোফা কার জন্য কে কিনলো!

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২১, ১৩:৪৪

২৬ কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগের পর এবার শিল্পকলা একাডেমিতে পাওয়া গেলো লক্ষাধিক টাকার ভুয়া ভাউচার।

শিল্পকলা একাডেমির নামে তানিয়া বেডিং-এর একটি ভাউচারে দেখা গেলো পর্দা কেনা হয়েছে সাড়ে ১৫ হাজার টাকায়। বিক্রেতার নাম হামিদ। দোকান মালিক মাসুদ রানা। রানার নম্বরে কল করলে তিনি হামিদকে চেনেন না বলে জানান। চলতি বছর ২৭ জুন শিল্পকলা একাডেমিতে পর্দা বিক্রি করেছেন কিনা জানতে চাওয়া হলে সময় নেন মাসুদ। তারপর বলেন, তিনি কোনও পর্দা বিক্রি করেননি। তবে তার দোকান থেকে একটা স্লিপ নিয়ে গেছে একজন। বুঝতে বাকি থাকে না, ওটা ছিল ভুয়া ভাউচার।

প্রতিবছর শিল্পকলা একাডেমির তথাকথিত ‘সিন্ডিকেট’ ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা তুলে নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। একই তারিখে একাধিক ভাউচারে (২৭ জুন) তুলে নেওয়া হয়েছে লক্ষাধিক টাকা। একাডেমির কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, ভুয়া ভাউচারে অর্থ উত্তোলন একাডেমিতে বহুল চর্চিত প্রক্রিয়া।

সম্প্রতি শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক (ডিজি) লিয়াকত আলী লাকীর বিরুদ্ধে অনিয়ম করে নানা প্রয়োজন দেখিয়ে সরকারের ২৬ কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।

একাডেমির সচিবের পদ শূন্য হলে চুক্তিভিত্তিক একজন কর্মকর্তাকে সচিবের দায়িত্ব দিয়ে এ অর্থ উত্তোলন করেন বলে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। ডিজির এই আর্থিক অনিয়মসহ স্বেচ্ছাচারিতার ঘটনা সংসদীয় কমিটির সুপারিশে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

ভুয়া ভাউচার

যার অফিসের কেনাকাটা, তিনিই জানেন না

সংগীত বিভাগের সহকারী পরিচালক ফারহানা রহমানের কক্ষে ব্যবহারের জন্য পর্দা ও ফার্নিচার বাবদ চেক নং ২৬৭০৫৩১-৩২-এর মাধ্যমে এক লাখ ৪১ হাজার ৫০০ টাকা তুলে নেওয়া হয়। বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে এসব ভাউচারের বিপরীতে কোনও মালামাল কেনার প্রমাণ মেলেনি।

নথির নোটে ক্রয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন নেওয়া হয় এ বছর ৩০ জুন। অথচ বিল ভাউচারের তারিখ দেওয়া তিন দিন আগের—২৭ জুন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ভাউচারগুলো ভুয়া প্রমাণ হয়।

সংগীত ও নৃত্য বিভাগের সহকারী পরিচালক খন্দকার ফারহানা রহমানের নামে করা বিলের বিবরণীতে লেখা হয়, একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা বিভাগের পরিচালক মহোদয়ের দফতর কক্ষের জন্য পর্দা ও সোফাসেট ক্রয় বাবদ ব্যয় মোট ১ লাখ ৪০ হাজার ৫২০ টাকা। এই মালামাল তার কক্ষে পৌঁছেছে কিনা জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ রকম কিছু আসেনি। যদি আমার নাম করে কেনা হয়ে থাকে তাহলে হয়তো এখনও কোনও কারণে হস্তান্তর হয়নি।’

তিনি এ ধরনের কোনও কেনাকাটার রিকুইজিশন দিয়েছিলেন কিনা জানতে চাইলে ফারহানা রহমান বলেন, ‘মনে করতে পারছি না।’

ভুয়া ভাউচার

সরেজমিন ম্যানেজকরা ভাউচারের দোকান

৩০ জুন অর্থ হিসাব ও পরিকল্পনার সহ-পরিচালক, উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব ও মহাপরিচালকের স্বাক্ষর দেখা যায় একটি ভাউচারে। তাতে দাবি করা হয়, তানিয়া বেডিং থেকে সাড়ে ১৫ হাজার টাকার পর্দা কেনা হয়। কিন্তু দোকান মালিক মাসুদ রানার সঙ্গে যোগাযোগ করলে বেরিয়ে আসে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র। তানিয়া বেডিং নামের দোকান খুঁজে পাওয়া গেলেও তানিয়া ক্রোকারিজ পাওয়া যায়নি। অথচ সেখান থেকে ৭ হাজার ৩২০ টাকা ব্যয়ে চায়ের প্লেট থেকে শুরু করে চামচ কেনার ‘কাগজ’ পাওয়া গেছে।

খিলগাঁওতে ফার্নিচার মার্কেটের যে ভাউচার পাওয়া গেছে, সেখানে কোনও ফোন নম্বর ছিল না। সরেজমিন ওই দোকানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

২৫ হাজার টাকা ব্যয়ে কেনা সোফার দোকানের মালিক আব্দুস সালামকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। একই দোকান থেকে চারটি গেস্ট চেয়ার ২২ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে পৃথক ভাউচারে।

নবাবপুর ইলেকট্রিক মার্কেটে ৩০টি দোকানে জানতে চেয়েও ভাউচারে উল্লেখ করা তানিয়া ক্রোকারিজের খোঁজ মেলেনি। অন্য দোকানিরা জানান, এ নামে কোনও দোকান থাকলে সেটার কথা কেউ না কেউ জানতো।

সংগীত ও নৃত্য বিভাগের সহকারী পরিচালক খন্দকার ফারহানা রহমানের নামে করা বিল

ভাউচার ‘ম্যানেজ’ করা হয়েছে

শিল্পকলা একাডেমির কেয়ারটেকার (প্রশাসন) সাইদুর রহমান স্বীকার করেন, এসব ভাউচার তিনি ‘ম্যানেজ’ করেছেন। তিনি বলেন, এগুলো ২৭ জুনের তারিখে টাকা তুলে রাখা হয়েছে, ধীরে ধীরে কেনা হবে।

সরকারি অফিসে এটা কেনাকাটার নিয়ম কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, নিয়ম মেনে হয়নি। আগামীতে আর এভাবে কাজ করবো না। এই কেনাকাটা সচিব ম্যাডামের অনুমতিতে দ্রুত করার জন্য এভাবে করা হয়েছিল। কিন্তু এভাবে করা ঠিক হয়নি। তানিয়া বেডিং থেকে আগেও জিনিস নিয়েছি। এবার ভাউচার নিয়েছি।

মনিকা ফার্নিচারের ভাউচারে লেখা ঠিকানায় গিয়ে দোকান পাওয়া যায়নি কেন জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, ‘আছে দোকান। এগুলো ছোটখাটো কেনাকাটা। আমরা এভাবেই কিনি।’ মনিকা ফার্নিচারের মালিকের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না। ভাউচারটা আমি ম্যানেজ করেছি।’

এই পর্দা, ক্রোকারিজ, ফার্নিচার কেনার নামে যে এক লাখ ৪০ হাজার ৫২০ টাকার ভুয়া ভাউচার- সেটি ম্যানেজ করেছেন শিল্পকলার দায়িত্বশীল কেয়ারটেকার (প্রশাসন) সাইদুর রহমান। তিনি সেটি বাংলা ট্রিবিউনের কাছে স্বীকারও করেছেন। ম্যানেজকৃত ভাউচারের বিষয়টি জানা আছে কিনা এমন প্রশ্নে মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী বলেন, এ বিষয়ে তার জানা নেই। তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার পক্ষপাতি আমি নই।’

তিনি কী করবেন কিংবা এমনটা তার আগে দেখা উচিত ছিল কিনা সেটা নিজেই বুঝবেন বলে মহাপরিচালক বলেন, ‘আর কত পদ্ধতির ভেতর যাবো? রিকুইজিশন ওখান থেকেই যায়। সব চাহিদা যে আমরা পূরণ করতে পারি, তা-ও নয়। সিরিয়াল মেইনটেইন না করে যৌক্তিকতার জায়গায় যেতে বলেছি। কিন্তু হাবলু সাহেব বলছেন উনি কোনও রিকুইজিশন দেননি।’ তার মালামাল দেখানো হলো কী করে প্রশ্নে মহাপরিচালক বলেন, ‘উনি সকালে এক কথা বিকালে আরেক কথা বলেন।’

খন্দকার ফারহানাও একই কথা বলেছেন—তিনি কোনও রিকুইজিশন দেননি। এ বিষয়ে মহাপরিচালক আবারও উপ-সচিব জাকির হোসেনের দিকে আঙুল তুলে বলেন, বিষয়টি আমি ধরতে পেরেছি। তবে প্রতিবেদকের সামনে ব্যাখ্যা করেননি।

/এফএ/এমওএফ/
টাইমলাইন: শিল্পকলায় অনিয়ম
০৩ অক্টোবর ২০২১, ২৩:৩০
শিল্পকলায় দুর্নীতি: পর্দা, প্লেট, সোফা কার জন্য কে কিনলো!
সম্পর্কিত
চাঁদাবাজির ইন্ধনদাতারাও নজরদারিতে
চাঁদাবাজির ইন্ধনদাতারাও নজরদারিতে
বেড়েছে শীতের তীব্রতা, রাতের তাপমাত্রা কমতে পারে আরও
বেড়েছে শীতের তীব্রতা, রাতের তাপমাত্রা কমতে পারে আরও
স্বর্ণ ও মুদ্রাসহ সৌদিতে বিমান বাংলাদেশের কেবিন ক্রু আটক
স্বর্ণ ও মুদ্রাসহ সৌদিতে বিমান বাংলাদেশের কেবিন ক্রু আটক
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
চাঁদাবাজির ইন্ধনদাতারাও নজরদারিতে
চাঁদাবাজির ইন্ধনদাতারাও নজরদারিতে
বেড়েছে শীতের তীব্রতা, রাতের তাপমাত্রা কমতে পারে আরও
বেড়েছে শীতের তীব্রতা, রাতের তাপমাত্রা কমতে পারে আরও
স্বর্ণ ও মুদ্রাসহ সৌদিতে বিমান বাংলাদেশের কেবিন ক্রু আটক
স্বর্ণ ও মুদ্রাসহ সৌদিতে বিমান বাংলাদেশের কেবিন ক্রু আটক
সাড়ে ৩ কেজি সোনাসহ বিমানের নিরাপত্তা কর্মী আটক
সাড়ে ৩ কেজি সোনাসহ বিমানের নিরাপত্তা কর্মী আটক
© 2022 Bangla Tribune