হিমালয় কন্যা নেপালে বিধ্বংসী পাহাড়ি ঢলে প্রাণ গেছে ৬ শতাধিক মানুষের। চারপাশে কেবলই ধ্বংসস্তূপ আর স্বজন হারানোর হাহাকার। তবে এই বিভীষিকার মাঝেই অলৌকিক এক আশার আলো হয়ে ফিরে এলো ছয় বছরের এক শিশুকন্যা। হিমালয়ের দেশটিতে আকস্মিক বন্যায় সাড়ে ছয় শতাধিক মানুষের মৃত্যুর পর, শুক্রবার রসুয়া জেলায় মাটি ও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শিশুটিকে দীর্ঘ তিন দিন পর জীবিত উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা।
তিমুরে আটকে পড়া শিশুটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় যখন সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (এপিএফ) একটি দল ভোট কোশী নদীর প্লাবনে আটকে পড়া মানুষদের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছিল। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে হঠাৎ কান্নার শব্দ শুনতে পান তারা। এরপরই শনিবার তাকে পরবর্তী চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুতে নিয়ে আসা হয়।
বুধবার হিমবাহ ধসের ফলে তৈরি হওয়া এই আকস্মিক বন্যায় ধ্বংসলীলা চালায় উদ্ধারকারী দলগুলো। পাথর, বরফ, কাদা এবং পানির এক শক্তিশালী স্রোত পাহাড়ি নদী প্রণালির ওপর দিয়ে ধেয়ে এসে নেপালে অন্তত ৬৯১ জন এবং তিব্বতে ৭ জনের প্রাণ কেড়ে নেয়। একইসঙ্গে ধ্বংস করে দেয় ঘরবাড়ি, সেতু, রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো।
বর্তমানে নেপাল ও তিব্বতজুড়ে প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে নেপালেই প্রায় ২ হাজার ৪২৬ জন এবং তিব্বতের জিরোং কাউন্টিতে ৫৫৪ জন। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন কৈলাশ মানসরোবর যাত্রায় যাওয়া ভারতীয় পুণ্যার্থী। বৃষ্টি, কুয়াশা এবং নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে বন্যায় তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি উপচে পড়ার আশঙ্কায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছিল, তবে শনিবার আবহাওয়ার উন্নতি হলে পুনরায় তা শুরু হয়।
রসুয়ায় শিশুটিকে উদ্ধারের সময় তার কান্নার শব্দ শুনে পুলিশ সদস্যরা অবিলম্বে মাটি খোঁড়া শুরু করেন এবং একপর্যায়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা শিশুটিকে খুঁজে পান। সেখান থেকে তাকে তিমুরে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর বর্ডার আউটপোস্টে নেওয়া হলে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে দেখা যায়।
কর্তৃপক্ষ শুক্রবারই তাকে এয়ারলিফটের মাধ্যমে কাঠমান্ডু নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু অন্ধকার ও বৈরি আবহাওয়ার কারণে তা সম্ভব হয়নি। অবশেষে শনিবার বিকেলে তাকে বিমানে করে নেপালের রাজধানীতে নিয়ে আসা হয় এবং বর্তমানে সে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
উদ্ধারের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, কাদা, ভাঙাচোরা কাঠামো ও ধ্বংসস্তূপের এক বিশৃঙ্খল পরিবেশের মধ্যে সদস্যরা কাজ করে শিশুটির কাছে পৌঁছাচ্ছেন। উদ্ধারকারীদের অত্যন্ত সাবধানে চারপাশের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে শিশুটিকে পরম মমতায় বের করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে দেখা যায়। হাজার হাজার পরিবার যখন নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে দিশেহারা, তখন শিশুটির এই বেঁচে ফেরা দুর্যোগের মাঝে এক বিরল আশার আলো ফুটিয়েছে।
কর্তৃপক্ষ আবারও বড় আকারের অনুসন্ধান অভিযান শুরু করেছে। একই সঙ্গে ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞ দল উদ্ধার কাজ, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং কারিগরি সহায়তা দিতে নেপালকে সাহায্য করছে। বন্যার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি পুনর্নির্মাণ খরচ ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ধরা হলেও, সরকারের মূল নজর এখন জীবিতদের খুঁজে বের করা, ক্ষতিগ্রস্তদের চিহ্নিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়গুলোকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করার ওপর।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে









