জেন্ডার বাজেট: বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধক ‘ধর্মীয় কুসংস্কার’

উদিসা ইসলাম
০২ জুন ২০২৩, ১০:০০আপডেট : ০২ জুন ২০২৩, ১০:০০

বাজেটে জেন্ডার সম্পৃক্ততা সরকারের সুনাম অর্জনকারী পদক্ষেপগুলোর একটি। এরমধ্যে জেন্ডার বাজেট বরাদ্দ সামান্য কমলেও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক যে উদ্যোগ ও সম্ভাবনা সেগুলোর দিকে দেশীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত নজরদারি রয়েছে। প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক নারী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবন্ধকতাগুলো উল্লেখ করতে বারবাবরই উঠে এসেছে ‘ধর্মীয় কুসংস্কার’, ‘ধর্মের অপব্যবহার’ এর কথা। এছাড়া কারণ হিসেবে পাওয়া গেছে— প্রচলিত সমাজব্যবস্থা, রক্ষণশীল মানসিকতা এবং বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক অবস্থা, নারী-পুরুষ বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক জীবনধারায় অভিন্ন মানসিকতার অভাব।

প্রতিটা মন্ত্রণালয়ই সেই প্রতিবন্ধকতার জায়গাগুলো উতরানোর জন্য যথাযথ সুনির্দিষ্ট উদ্যোগেরও উল্লেখ করেছে।

বাংলাদেশ ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে জাতীয় বাজেটে জেন্ডার সম্পৃক্ততা নিরূপণ করে আসছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে মোট বাজেট বরাদ্দ ছিল ১,১০,৫২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে নারী উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল ২৭,২৪৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ২৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০২৩- ২৪ অর্থবছর পর্যন্ত নারী উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে মোট বরাদ্দ হলো ৭,৬১,৭৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে জেন্ডার সম্পৃক্ত বরাদ্দের পরিমাণ ২,৬১,৭৮৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৪.৩৭ শতাংশ।

মোট বাজেট পর্যালোচনায় লক্ষ্য করা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রকৃত ব্যয়ে নারী হিস্যা ছিল ৩৪ শতাংশ যা ২০২২-২৩ অর্থবছরের মূল বাজেট ও সংশোধিত বাজেটে একই পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেন্ডার সম্পৃক্ত বাজেটের শতকরা হার কিছুটা হ্রাস পেয়ে মোট বাজেট বরাদ্দের ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট বরাদ্দের তুলনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেন্ডার সম্পৃক্ত বরাদ্দ ১২,৩১৯ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২৩-২৪ অর্থবছর ও বিগত দুই বছরের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায় যে মোট বরাদ্দের শতকরা হারে কিঞ্চিৎ হ্রাস-বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হলেও প্রতিবছরই টাকার অঙ্কে মোট বাজেট বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নারী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবন্ধকতাগুলো উল্লেখ করতে গিয়ে বলছে, মসজিদভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষা কার্যক্রমে নারী শিক্ষকের অপ্রতুলতা; বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে নারীর অধিকার সম্পর্কে যে সকল ব্যাখ্যা আছে তার যথাযথ প্রচার ও প্রসারের ঘাটতি রয়েছে। একইসাথে ধর্মীয় গোঁড়ামি; এবং সকল পাবলিক প্লেসে নারীদের প্রার্থনা কক্ষের অভাবের কথা বলছে তারা।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবন্ধকতাগুলো উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব এবং ধর্মীয় কুসংস্কার, ধর্মের অপব্যবহার, পুরুষশাসিত সমাজের রক্ষণশীল মনোভাব, অধিকার বিষয়ে নারীর অসচেতনতা প্রভৃতি কারণে নারী উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলোর নিজস্ব ভবন না থাকায় ভাড়াবাড়িতে পরিচালিত হয়, এতে দাফতরিক কার্যক্রমে অসুবিধা হয়; মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি মাঠ পর্যায়ে তদারকি করার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের সংকট রয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের নারী উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবন্ধকতাগুলো অংশে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরীতে নারীযাত্রীদের সংখ্যা বিবেচনায় বিআরটিসি বাসের সংখ্যা অপ্রতুল। এ কারণে নারীদের যাতায়াতে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। তাছাড়া বিআরটিসি ও অন্যান্য বাস সার্ভিসের মধ্যে নারী, শিশু এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ১৫টি। তবে বাস্তবে এসব আসন কখনই সংরক্ষিত রাখা সম্ভব হয় না।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের প্রতিবন্ধকতা অংশে উল্লেখ আছে যে কয়টি বিষয়— তার মধ্যে অন্যতম হলো প্রথাগত পাশ্চাত্পদ ধারণাগত কারণে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর অনাগ্রহ, বিরাজমান সামাজিক ও রক্ষণশীল মানসিকতা এবং বিদ্যমান আর্থ সামাজিক অবস্থা, নারী-পুরুষ বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক জীবনধারায় অভিন্ন মানসিকতার অভাব।

নারী অধিকার নেত্রী খুশী কবীর মনে করেন এই ধরনের প্রতিবন্ধকতার কথা যখন সরকার তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করে তখন সেখান থেকে উত্তরণের উপায়গুলোর প্রতিফলন বাজেটে সুস্পষ্টভাবে থাকতে হবে। তিনি বলেন, বাজেট হলো অর্থ বরাদ্দ। কোন কোন খাতে একবছরে আমরা কোথায় যেতে চাই। সেটা বলতে গিয়ে জেন্ডার সম্পৃক্ততার জায়গায় যখন প্রতিবন্ধকতার কথা বলছি তখন একইসাথে তাকে প্রতিরোধের প্রতিফলন বাজেটে কাঙ্ক্ষিত। ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের অগ্রগতিকে যারা বাধা দিচ্ছে তাদের এই প্রচেষ্টা রুখে দেওয়ার দায়িত্বও সরকারের। নারীর জন্য অবমাননাকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হতে হবে। অনেক সময় আমরা কাগজে-কলমে অনেক সুবিধার কথা উল্লেখ করে থাকি, বাস্তবতা ততোটা জেন্ডার সংবেদনশীল হয়নি এখনও।

/এমএস/
টাইমলাইন: bajet24
সম্পর্কিত
অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নে পিছিয়ে বাংলাদেশ
দুর্গম চরে নিরাপদ মাতৃত্বে নতুন দিগন্ত
ঢাকার যেসকল মসজিদে থাকছে নারীদের ঈদের নামাজ পড়ার ব্যবস্থা
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম