X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২৩ আষাঢ় ১৪২৯

হেফাজতে ইসলামের হেফাজত

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২১, ১৫:৫৭

মো. জাকির হোসেন শিক্ষিত-অশিক্ষিত, গ্রাম-শহর এবং প্রায় চার দশকের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতায় আমার ধারণা জন্মেছে যে, এ দেশের ৭০-৮০ শতাংশের বেশি মানুষ কোরআন পড়তেই জানে না, কিংবা পড়তে পারলেও সহিহভাবে পড়তে পারেন না, জানলেও পড়েন না, কিংবা জীবনে একবার হলেও অর্থ বুঝে সমগ্র কোরআন পড়েননি। মুসলমানের জীবন বিধান কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক যখন এমন, হাদিস বা অন্যান্য পাঠ্য বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শিথিল বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে ইচ্ছাকৃত নামাজ ছেড়ে দিলে যে মুসলমান হিসেবে শামিল থাকেন না, কিংবা রাসুল (সা.)-এর ঘোষণা অনুযায়ী সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ পালন না করে মৃত্যু যে, ইহুদি-নাসারার মৃত্যুসম, কিংবা রোজার হক আদায় না করে রোজা রাখা যে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয় সে ব্যাপারে আমরা উদাসীন রয়েছি। তার মানে মুসলমানের ঘরে জন্ম হলেও অনেকেই আমরা ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ দূরের কথা, কত শতাংশ প্রবেশ করেছি সে প্রশ্নও জানা নেই। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “হে ইমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সুরা বাকারা: ২০৮)

মানুষের জীবনে যে ঘটনা সুনিশ্চিত ঘটবে, তা হলো মৃত্যু। আল্লাহ তা’আলা মৃত্যুর আগে যে বিষয়টির প্রতি মানুষকে আবশ্যিক তাগিদ দিয়েছেন তা হলো – “হে ইমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাকো। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।” (সুরা আল-ইমরান: ১০২)। আবার কোরআন পড়লে, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত আদায় করলেই যে তিনি মুসলমানিত্বে দাখিল হয়েছেন তা নয়। আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন – ‘আমার (ইন্তেকালের) পরে আমার উম্মতের মধ্যে অথবা (বলেছেন) অচিরেই আমার পরে আমার উম্মতের মধ্যে থেকে একটি গোষ্ঠীর আবির্ভাব হবে। তারা কোরআন পাঠ করবে, কিন্তু (কোরআনের মর্ম ও আহকামের বুঝ) তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না, (তা অন্তরে প্রবেশ করা-তো আরও পরের কথা)। তারা (একসময়) দ্বীন থেকে এমনভাবে (ছিটকে) বেরিয়ে যাবে, যেভাবে তীর শিকারকে ভেদ করে (অপর দিক দিয়ে) বেরিয়ে (চলে) যায়। তারা আর তাতে ফিরে আসবে না। ওরা হচ্ছে নিকৃষ্ট সৃষ্টি ও সৃষ্ট-প্রাণী’। (মুসলিম, ১০৬৭; ইবনে মাজাহ, ১৭০)

যারা ইসলামে পরিপূর্ণ দাখিল হয়নি কিংবা যারা বেরিয়ে গেছে তাদের ডাকার জন্য একটি দল থাকা দরকার। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, “অতঃপর তাদের প্রতিটি দল থেকে কিছু লোক কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বিনের গভীর জ্ঞান আহরণ করতে পারে এবং যখন আপন সম্প্রদায়ের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, তখন তাদের সতর্ক করতে পারে, যাতে তারা (গুনাহ থেকে) বেঁচে থাকে”। (সুরা তওবা: ১২২)

বাংলাদেশে ইসলামের নামে যেসব রাজনৈতিক দল ও অরাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে তাদের অধিকাংশই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা অন্য কোনও স্বার্থের দ্বারা এমনভাবে প্রভাবিত হয়েছে যে অন্যদের ইসলামের দিকে ডাকা দূরে থাক, তাদের নিজেদের ইসলাম চর্চা নিয়েই নানা বিতর্ক রয়েছে। এ অবস্থায় হেফাজতে ইসলাম নির্মোহভাবে মানুষকে সঠিক ইসলামের দিকে ডাকতে পারতো। ‘পারতো’ শব্দ ব্যবহার করেছি এজন্য যে, হেফাজতে ইসলাম নিজেদের হেফাজত করতে পারেনি; বরং রাজনীতির চোরাগলিতে পথ হারিয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের ঢাকার উপকণ্ঠ ঘেরাও কর্মসূচি পালনের অনুমতি নিয়ে হঠাৎ করে শাপলা চত্বরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের আড়ালে রাজনীতির এজেন্ডা ছিল। এরপর সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে শাপলা চত্বরে কিছু সময় অবস্থানের অনুমতি নিয়ে সরকারের পতনের উদ্দেশ্যে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের সিদ্ধান্ত সুস্পষ্ট ওয়াদার বরখেলাপ। এটি অপরাজনীতির এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য করা হয়েছিল। হেফাজতের সাবেক নেতারা অভিযোগ করেছেন, শাপলা চত্বরে সংঘটিত পুরো ঘটনার দায়ভার হেফাজতে ইসলামের ওই সময়ের মহাসচিব ও বর্তমান আমির জুনাইদ বাবুনগরীর। তারা অভিযোগ করেছেন- ‘তৎকালীন আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে না জানিয়ে হেফাজতের নেতাকর্মীদের রাতভর শাপলা চত্বরে রেখে দেন বাবুনগরী। আল্লামা শফী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলবে; কিন্তু তিনি হুজুরকে না জানিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। তার ধারণা ছিল, সারা রাত শাপলা চত্বরে অবস্থান নিতে পারলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী নামতে বাধ্য হবে’। অর্থাৎ অরাজনৈতিক তকমাধারী হেফাজতের কোনও কোনও নেতা সরকার উৎখাতের অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন। এ কথার প্রমাণ মেলে গত ১৯ এপ্রিল ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে দেওয়া হেফাজতের ঢাকা মহানগর কমিটির সাবেক প্রচার সম্পাদক মুফতি ফখরুল ইসলাম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে। তিনি জানিয়েছেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে যাওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ আগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছিলেন সংগঠনটির তৎকালীন মহাসচিব বাবুনগরী। বৈঠকে হেফাজতের প্রোগ্রাম শাপলা চত্বরে স্থায়ী হলে বিএনপি ও জামায়াতও যোগ দেবে বলে আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, দু’জন বিএনপি নেতা এবং একজন জামায়াত নেতা তাদের অর্থ সহযোগিতা করছে। আরেক সাবেক হেফাজত নেতা মাওলানা সলিমুল্লাহ বাবুনগরীর উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, তিনি শাপলা চত্বরের ঘটনায় প্রয়াত বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা নিয়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের নানা প্রান্তে তাণ্ডবের বিষয়ে বাবুনগরী সাংবাদিকদের বলেছেন ‘আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, হেফাজত কোনও তাণ্ডব চালায়নি; বরং ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের সন্ত্রাসীদের দিয়ে গুপ্ত হামলার তাণ্ডব চালিয়ে রাজনৈতিকভাবে এখন হেফাজতকে দোষারোপ করা হচ্ছে। সরকারের লোকজন এবং কতিপয় ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়া এখন আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নিয়ে মিথ্যাচার করছে।’ ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের নানা প্রান্তে হেফাজত কর্মীরা থানাসহ রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি স্থাপনা ও হিন্দুদের মন্দিরে তাণ্ডব চালিয়ে প্রায় হাজার কোটি টাকার সম্পদ আগুনে পুড়িয়েছে, ভাংচুর করেছে। টেলিভিশনসহ সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে হেফাজত কর্মীদের এ অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ভিডিও ও স্থিরচিত্র প্রকাশিত হয়েছে। শাপলা চত্বরের মতো সাম্প্রতিক তাণ্ডবেও হেফাজত বাংলাদেশের দু’টি রাজনৈতিক দল ও বাংলাদেশ বিরোধী একটি রাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে সরকার পতনের জন্য কাজ করেছে বলে গোপন তথ্য প্রকাশ হতে শুরু করেছে। তারপরও বাবুনগরীর সত্যকে অস্বীকার। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম হেফাজত কোনও তাণ্ডব চালায়নি। কিন্তু হাটহাজারী মাদ্রাসার অভ্যন্তরে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা শাহ আহম্মদ শফীর জীবনের শেষ তিনদিনের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা রীতিমত ভয়ংকর। আল্লামা শফীর প্রতি চরম বেয়াদবি করা হয়েছে। তার কক্ষের দরজা-জানালা-আসবাবপত্র ভাংচুর করা হয়েছে। গৃহবন্দি করে নির্যাতনের মাধ্যমে নেতৃত্ব পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। খাবার-ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, অক্সিজেন নল খুলে ফেলা হয়েছিল, অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেওয়া হয়েছিল এমন অভিযোগ ওঠেছে। এই অভিযোগগুলো যদি মিথ্যা হয় তাহলে এই মিথ্যার দায়ও হেফাজতের প্রতিপক্ষ গ্রুপের আলেমদের। কারণ, আলেমরাই এই অভিযোগগুলো উত্থাপন করেছেন। এ বিষয়ে মামলা করেছেন। পুলিশ ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে অভিযোগপত্রও দাখিল করেছে। ধরে নিলাম এগুলোও মিথ্যা। কিন্তু আল্লামা শফীর কক্ষসহ হাটহাজারী মাদ্রাসায় ব্যাপক হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে, কয়েকজন মাদ্রাসা শিক্ষককে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। কোরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি সংবলিত অসংখ্য কিতাব ছিঁড়ে খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়েছে যার ছবি, ভিডিও এখনও ইন্টারনেটে সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে। মাদ্রাসার ভিতরে এই তাণ্ডব ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগ করেছে? স্বভাবতই প্রশ্ন, আহম্মদ শফীর নেতৃত্ব পরিবর্তনে এমন নিষ্ঠুর ‘অনৈসলামিক’ পন্থা বেছে নেওয়া হয়েছিল রাজনীতির কোন অদৃশ্য হাতের ইশারায়? আর একটি অরাজনৈতিক সংগঠন সরকার উৎখাতের জন্য মতিঝিলে ও সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের নানা প্রান্তে মরিয়া হয়ে উঠেছিল কেন?

গতকাল রাত ১১টার দিকে এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের কমিটি বিলুপ্ত করে সাড়ে ৩ ঘণ্টার মধ্যে গভীর রাতে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। আবারও বাবুনগরীকে আহ্বায়ক করে ও বিলুপ্ত কমিটির প্রধান উপদেষ্টা বাবুনগরীর মামা মহিববুল্লাহ বাবুনগরী ও বিলুপ্ত কমিটির মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদীকে নিয়ে আহ্বায়ক কমিটি হয়েছে। একই বলে ‘যেই লাউ, সেই কদু’। শেষ রাতে অবশ্য আরও দুইজনকে কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে। এদিকে গতকাল বিকালে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রচলিত সব ধরনের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রশ্ন হলো, এই শিক্ষকদের নিয়েই তো হেফাজতে ইসলামের কমিটি হবে। তদুপরি, অপরাজনীতির খেলায় যুক্ত থাকা বিলুপ্ত কমিটির ব্যক্তিদের নিয়েই তো অস্থায়ী কমিটি হয়েছে। তাহলে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রচলিত সব ধরনের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকার সম্ভাবনা কতটুকু? হেফাজতে ইসলামকে নিজেদের মূল্যায়ন ও সংস্কার করার জন্য কিছু আত্ম জিজ্ঞাসার অবতারণা করছি। একটি অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলের নেতা কিংবা কোন রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়া ব্যক্তিরা থাকলে তা কখনই তার অরাজনৈতিক চরিত্র বজায় রাখতে পারে না। রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাই হেফাজতে ইসলাম তার অরাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও এ থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা কম। অস্থায়ী কমিটির গঠন তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে। উলামায়ে দেওবন্দ ইমাম নুরুল হুদা হজরত মাওলানা উবাইদুল্লাহ আনোয়ার, মুফতি নিজামুদ্দিন শামজায়ী শহিদ, মাওলানা মুহাম্মদ হাকীম আখতার, মুফতি হামিদুল্লাহ জান সাহেব, মাওলানা ফজলে মুহাম্মদ দামাত, মাওলানা ইউসূফ লুধিয়ানভী, শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী, মাওলানা ইদরিস কান্ধলভী, মাওলানা মাহমুদুল হাসান গাঙ্গুহী, মুফতি আবু লুবাবা শাহ মানসুর দামাত, আল্লামা সাইয়্যেদ সোলাইমান নদভী, মাওলানা সাইয়িদ আতাউল মুহসিন শাহ বুখারীসহ শতাধিক আলেম গণতন্ত্রের মূলনীতিসমূহ সুস্পষ্টভাবে শিরক এবং কুফরি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ এ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মেনে নিয়ে যারা রাজনীতি করছেন তেমন রাজনৈতিক দলের নেতাদের হেফাজতের কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করা হয়েছিল কেন?

হেফাজতে ইসলাম যে রাষ্ট্র কায়েম করতে চান তার রূপরেখা কী হবে? আপনাদের একজন সাবেক নেতা সিলেটের বুলবুলি হুজুর নামে খ্যাত মুফতি হাবিবুর রহমান নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামি এবং তালিবানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা নিজেই স্বীকার করেছেন। ২০০৪ সালে ইসলামী বিপ্লব নামে একটি বুলেটিনে সাক্ষাৎকারে তিনি প্রকাশ করেন যে, তার সঙ্গে ওসামা বিন লাদেন ও হারকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামির সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি সেই সাক্ষাৎকারে বলেন, “হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামির আমন্ত্রণের কারণেই আমার আফগানিস্তান ভ্রমণ সম্ভব হয়েছে। ...আমরা যারা আফগানিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্র ভ্রমণ করছি তারা হলেন, শাইখুল হাদিস আজিজুল হক, আতাউর রহমান খান (কিশোরগঞ্জ-ত আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সাবেক এমপি), চট্টগ্রামের সুলতান যাউক, ফরিদপুরের আবদুল মান্নান, নোয়াখালীর হাবিবুল্লাহ, আমি নিজে এবং আরও তিনজন।”

আফগানিস্তানে তালেবানরা যে রাষ্ট্র কায়েম করেছিল তা কিছু দিন মাত্র টিকেছিল। এমনকি মুসলিম রাষ্ট্রসমূহও তালেবানদের অনেক ক্ষেত্রেই সমর্থন করেনি। তালেবান রাষ্ট্র গঠন ও এর বিলুপ্তির প্রক্রিয়ায় কত হাজার হাজার নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এর দায় কার? মিসরে মুরসি সরকার গঠনের পর অল্প কয়েক দিন টিকে ছিল। পাকিস্তান প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্রসমূহের কাতারে। এটি খিলাফতের মডেল হতে পারে না। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে উত্তরাধিকার সূত্রে শাসক হওয়া অনৈসলামিক। এ অবস্থায় হেফাজতকে খিলাফত প্রতিষ্ঠার আগে রাষ্ট্রের রূপরেখা তৈরি করতে হবে। রাষ্ট্র চালাতে হলে, টিকে থাকতে হলে ইহুদি, নাসারা, মুশরিক এমনকি নাস্তিকদের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখতে হবে। Gallup International-এর জরিপে চীনের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ নাস্তিক। আমরা যে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, চিকিৎসা সামগ্রীসহ নানা ইলেকট্রনিক ও অন্যান্য দৈনন্দিন জীবনের পণ্যসামগ্রী ব্যবহার করি তার বিরাট অংশ আসে চীন থেকে। চীন সাপ্লাই চেইন তথা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় পৃথিবীকে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে যে চাইলেও সহজে এ থেকে নিষ্কৃতি নাই।

ফেসবুকসহ নানা ভার্চুয়াল মাধ্যম তথা তথ্য প্রযুক্তি ইহুদি-নাসারাদের হাতে। মাসলা-মাসায়েলভিত্তিক শিক্ষায় বিজ্ঞান শিক্ষা যুক্ত না করলে তথা নিজেরা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি না করলে ইহুদি-নাসারা-নাস্তিকদের থেকে মুক্তির সুযোগ আছে কী? একুশ শতকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক আইন তথা সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক আইন এবং প্রাকৃতিক ও ভৌতবিজ্ঞান অধ্যয়ন আবশ্যক। একুশ শতকে সব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে বিচ্ছিন্নভাবে কোনও রাষ্ট্রের টিকে থাকার সুযোগ নেই। তাহলে আপনারা পাঠ্যসূচি পরিবর্তনে প্রস্তুত আছেন?

বিএনপি ও জামায়াতের সাথে হেফাজতে ইসলামের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও আল্লামা শফীর ওপর নির্যাতন বিষয়ে সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা সলিমউল্লাহ মুফতি ফয়জুল্লাহ, মাওলানা মাঈনুদ্দীন রুহী, ঢাকা মহানগর কমিটির সাবেক প্রচার সম্পাদক মুফতি ফখরুল ইসলাম, মুফতি আবদুর রহিম কাসেমীসহ বেশ কিছু হেফাজত নেতার বক্তব্য-স্বীকারোক্তিকে আপনারা মিথ্যা, সরকারের শিখিয়ে দেয়া বলে দাবি করছেন। প্রশ্ন হলো, এমন মিথ্যাবাদী আলেমদের নিয়ে কিভাবে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করবেন? মুসলমানদের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ভয়ংকর খুনে বিদ্বেষ। এক অপরকে অশ্লীল গালাগাল করছে, নানা হুমকি দিচ্ছে। এদের মধ্যে এমনকি মুখ দেখাদেখিও বন্ধ। বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হয়েছে বিভিন্ন উপদলের কোন্দলে। ওলামাদের বেশ কয়েকটি গ্রুপ আপনাদের খারেজী বলে অভিহিত করছে। এমন বিভেদ নিয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠা কেমনে হবে, আর হলেও উপদলীয় কোন্দলে যে, ভয়ংকর রক্তপাত হবে না তার গ্যারান্টি কী? হেফাজত নেতা মুফতি ওয়াসেক বিল্লাহ নোমানী ওয়াজে বলেছেন, “যদি খিলাফত কায়েম করতে পারি, আল্লাহর কসম, আল্লাহর কসম, সংবাদ দেখার টাইম পাবি না, সংবাদ দেখার টাইম পাবি না। একটা একটা করে ধরবো আর জবাই করবো, জবাই করবো, ইন শা আল্লাহ।” শিশু বক্তা খ্যাত রফিকুল ইসলাম মাদানীও এক ভিডিওতে ‘জবাই করার কথা, কতল করার কথা, হত্যার প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা’ বলেছেন। হেফাজত কি মানুষ জবাই করার জন্য খিলাফত কায়েম করবে? ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি, জার্মান মাধ্যম ডয়েচে ভেলে সহ দেশি-বিদেশি অনেক সংবাদ মাধ্যমে মাদ্রাসায় নারী শিক্ষার্থী ধর্ষণ ও বলাৎকারের অসংখ্য সংবাদ ছাপা হয়েছে। সময় যত যাচ্ছে এ প্রবণতা বাড়ছে বৈ কমছে না। সরকারের প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন মাদ্রাসাগুলোতে তো আপনাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। বলতে গেলে মাদ্রাসাগুলো রাষ্ট্রের মধ্যে আরেক রাষ্ট্র। এখানে সমকামিতা, ধর্ষণের মতো ভয়ঙ্কর গুণাহের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন কীভাবে? বঙ্গবন্ধু কন্যার সরকার তো ইসলামবিরোধী নয়। বরং বঙ্গবন্ধুর ইসলাম প্রচার ও প্রসারের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু কন্যা বাংলাদেশে ইসলাম ও আলেম সমাজের জন্য যা কিছু করেছেন, অন্য কোনও সরকার তা করে নাই। বঙ্গবন্ধু কন্যার নির্দেশে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় মডেল মসজিদ নির্মাণ হচ্ছে। দেশে প্রায় এক লাখ মসজিদভিত্তিক মকতব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। খতিব-ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জাতীয় স্কেলে বেতন নির্ধারিত হয়েছে। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আলেমদের দীর্ঘ সময়ের দাবি কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আপনাদের দাবি অনুযায়ী সাধারণ শিক্ষার পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন করা হয়েছে। তাহলে এই সরকারের প্রতি কেন এত বিদ্বেষ?

সহিংসতার আশ্রয় নিয়ে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কিংবা অপরাজনীতির হাতিয়ার ব্যবহার করে খেলাফত প্রতিষ্ঠা নয়, বরং সহনশীলতা ও ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতে থাকুন, দেখবেন মানুষরা নিজেরাই উদ্বুদ্ধ হয়েছে। আরব্য জাহিলিয়্যাতের যুগে রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসা, ক্ষমা ও উদারতায় মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেছে। জাহিলিয়াতের যাবতীয় অন্ধকার দূর করে রাসুল (সা.) পুরো আরবজুড়ে ছড়িয়ে দিলেন ইসলামের আলো। দাওয়াত পৌঁছে গেল আরবের বাইরের তৎকালীন পরাশক্তিদের নিকটও। স্বজাতির জুলুম-নির্যাতনে নিজের ভিটেমাটি মক্কা ছেড়ে রাসুল (সা.) হিজরত করেছিলেন মদিনায়, ছেড়ে এসেছিলেন প্রাণপ্রিয় কাবা ঘর। কিন্তু ক্ষমা-ভালোবাসা-সহনশীলতা-উদারতা দিয়ে মক্কা বিজয়সহ কায়েম করেছিলেন বিশাল আলোকিত রাষ্ট্র। ষড়যন্ত্র-ঘৃণা নয়, ভালোবাসা দিয়েই সব কিছু জয় করা যায়। খিলাফতও কায়েম করা যায়।

পুনশ্চ: আগের লেখাগুলোর অভিজ্ঞতায় অনুমান করছি আমার এ কলামের কারণে হেফাজত সমর্থক অনেকে আমাকে অশ্লীল গালি দিবেন, আক্রমণাত্মক মন্তব্য করবেন। গালাগাল দেন, অনুরোধ থাকলো আগে পড়ুন, অনুধাবন করার চেষ্টা করুন মুসলমান আমি আপনাদের শত্রু কী? ভুল ধরিয়ে দেওয়া ও সংস্কারের পরামর্শ কী বৈরিতা? এমনকি ইমাম নামাজে ভুল করলে মুসল্লিরা সংশোধনসূচক ধ্বনি উচ্চারণ করে ইমামকে সংশোধনের সুযোগ করে দেন। এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এক মুসলমান আরেক মুসলমানের আয়নাস্বরূপ।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঈদ কেনাকাটায় ‘নগদ’ পেমেন্টে মিলছে ৩০ শতাংশ ক্যাশব্যাক
ঈদ কেনাকাটায় ‘নগদ’ পেমেন্টে মিলছে ৩০ শতাংশ ক্যাশব্যাক
চামড়ায় সুদিন ফিরছে?
চামড়ায় সুদিন ফিরছে?
মোটরসাইকেল: সম্ভাবনা না সংকট
মোটরসাইকেল: সম্ভাবনা না সংকট
লোকসানে গরু বিক্রি করবো নাকি?
লোকসানে গরু বিক্রি করবো নাকি?
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ