X
শনিবার, ২৫ জুন ২০২২
১১ আষাঢ় ১৪২৯

সে আগুন ছড়িয়ে গেলো সবখানে

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২২, ১৯:০৩

প্রভাষ আমিন পুলিশ ভাইদের অসংখ্য ধন্যবাদ। তারা সৈয়দা রত্নার একটি পাড়ার আন্দোলনকে জাতীয় আন্দোলন বানিয়ে দিলেন। সেদিন আমাদের এক রিপোর্টার বলছিলেন, বাংলাদেশে তো আগেও অনেক মাঠ দখল হয়েছে, মাঠ দখলের বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ নিয়ে যে আন্দোলন, আগে তো কখনও এমন হয়নি। এবার কেন এমন হলো? আমি তাকে বোঝালাম, মানুষ নানা কারণে ক্ষুব্ধ থাকে। সবসময় সব ক্ষোভ সে প্রকাশ করতে পারে না। ব্যক্তির অসহায়ত্ব তার ক্ষোভকে চাপা দিয়ে রাখে। কিন্তু সবসময় সব ক্ষোভ চাপা থাকে না। জমতে জমতে একসময় ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। তবে সে বিস্ফোরণের জন্য চাই একটা স্পার্ক। তেঁতুলতলা মাঠের আন্দোলনে সেই স্পার্কটা দেওয়ার জন্য পুলিশকে ধন্যবাদ।

সৈয়দা রত্না আমাদের সবার মতো ক্ষোভ পুষে রাখার মানুষ নন। কলাবাগান তেঁতুলতলা মাঠ বাঁচানোর জন্য তিনি একাই আন্দোলন করছিলেন। খুবই যৌক্তিক আন্দোলন। কলাবাগান এলাকার মানুষের শ্বাস ফেলার একমাত্র জায়গাটি যাতে পুলিশ দখল করতে না পারে, সে জন্য তার আন্দোলন। কিন্তু তার সে একার আন্দোলন গণমাধ্যমে জায়গা পায়নি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভাইরাল হয়নি। তবু ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলোরে’ নীতি মেনে একাই আন্দোলন করছিলেন। কিন্তু গত ২৪ এপ্রিল তেঁতুলতলা মাঠের সামনে থেকে লাইভ করার ‘অপরাধে’ সৈয়দা রত্নাকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে তার ১৭ বছর বয়সী ছেলেকেও তুলে নেয় পুলিশ। এখানেই পুলিশের চালে ভুল হয়েছে। সত্যের যে শক্তি, ন্যায্যতার যে শক্তি; তা টের পেতে তাদের বেশি সময় লাগেনি। মামলা ছাড়া মা ছেলেকে গভীর রাত পর্যন্ত থানায় আটকে রাখে পুলিশ। কিন্তু থানার গারদে এক কিশোরের দাঁড়িয়ে থাকার ছবি পাল্টে দেয় দৃশ্যপট। থানার সামনে প্রতিবাদের মুখে ১৩ ঘণ্টা পর মধ্যরাতে মা-ছেলেকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে। ছেলের কপালে মায়ের চুমুর ছবি ভাইরাল হয়েছে। অবশ্য মুক্তির আগে সৈয়দা রত্নাকে ‘আর আন্দোলন করবো না’ এই মুচলেকা দিতে হয়েছে। অবশ্য এখন আর রত্নাকে আন্দোলন না করলেও চলবে। যে আগুন তিনি জ্বালিয়ে দিয়েছেন, সে আগুন এখন ছড়িয়ে গেছে সবখানে। সৈয়দা রত্না আর একা নন। তার আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার এখন অনেক লোক। সারা দেশের বিবেকবান মানুষ তার পক্ষে।

সৈয়দা রত্নার কোনও রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচীর কর্মী। কিন্তু আমি নিশ্চিত তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে অন্তরে ধারণ করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন, ‘কেউ যদি ন্যায্য কথা বলে, আমরা তা মেনে নেবো; এমনকি তিনি যদি একজনও হন।’ সৈয়দা রত্না প্রমাণ করেছেন ন্যায্য কথা একজন বললেও তার ক্ষমতা অসীম। যে তেঁতুলতলা মাঠ এখন সারা দেশের মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে, সেটি দেখলে কিন্তু আপনাদের সবার মন খারাপ হয়ে যাবে। মাঠ বললে মাঠের অপমান হয়। এটি আসলে এক চিলতে খালি জায়গা। কোনও গাছপালা নেই, একেবারেই ফাঁকা। সেখানেই এলাকার শিশু-কিশোররা খেলে, বয়স্করা হাঁটেন, ঈদের নামাজ-জানাজা হয় এখানে, বিভিন্ন দিবসেও এলাকাভিত্তিক নানা আয়োজন হয় এই ফাঁকা জায়গাটিতেই। এটুকুই কলাবাগান এলাকার মানুষের শ্বাস ফেলার জায়গা। পুলিশ এখানে থানা বানালে মানুষের আর দম ফেলার ফুরসত থাকবে না। সৈয়দা রত্না কিন্তু ব্যক্তিগত কোনও স্বার্থে আন্দোলন করেননি। তার আন্দোলনটা সবার স্বার্থে।

তেঁতুলতলা মাঠে কলাবাগান থানা ভবন হবে। পুলিশকে এটি বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে। তাই পুলিশ বৈধভাবেই সেখানে দেয়াল তুলছিল। পুলিশ দেয়াল তুলছিল আর সৈয়দা রত্না প্রতিবাদ করছিলেন। এখানে পুলিশ কিন্তু একটা পক্ষ। অন্তত এই ক্ষেত্রে পুলিশের কোনও পক্ষ নেওয়া সমীচীন নয়। কিন্তু পুলিশ গায়ের জোরে একজন নিরীহ নারী এবং তার শিশু সন্তানকে তুলে নিয়ে যায়। এটা ঠিক একজন নারী বা শিশুর পক্ষে মহাপরাক্রমশালী পুলিশকে ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ প্রমাণ করে  দিয়েছে, পুলিশের অস্ত্রের চেয়েও ন্যায্যতায় ঐক্যবদ্ধ মানুষের শক্তি অনেক বেশি।

সৈয়দা রত্না বা তার ছেলের বিরুদ্ধে কোনও মামলা ছিল না। তারপরও পুলিশ তাদের কোন আইনে ১৩ ঘণ্টা আটকে রাখলো? আসলে বাংলাদেশের পুলিশের কাছে গায়ের জোরটাই মুখ্য, আইনের জোর নয়। সংবিধানেই মানুষের চলাফেরা, প্রতিবাদ করা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের পুলিশ আইন বা সংবিধানের তোয়াক্কা করে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশে অনেক বছর ধরেই প্রতিবাদ করার সুযোগ ছোট হয়ে আসছে। রাজনৈতিক প্রতিবাদের সুযোগ নেই বললেই চলে। কখনও কখনও ধর্ষণ, সড়ক দুর্ঘটনা বা কোটা সংস্কারের মতো সামাজিক ইস্যুতেও গড়ে ওঠে প্রবল আন্দোলন। কিন্তু অতীতেও আমরা দেখেছি, সামাজিক আন্দোলনকেও সরকার ভয় পায়, দমন করে নিষ্ঠুরভাবে; কখনও পুলিশ বাহিনী দিয়ে, কখনও হেলমেট বাহিনী দিয়ে। এখন আসলে সরকার তালিকা দিয়ে দিলেই পারে, কোন কোন ইস্যুতে আন্দোলন করা যাবে, কোন কোন ইস্যুতে যাবে না। অথবা বলে দিলেই পারে, কোনও আন্দোলনই করা যাবে না। সম্মিলিতভাবে আমরা সবাই মুচলেকা দিয়ে দেই, ‘আর কোনও প্রতিবাদ করবো না, আর কোনও আন্দোলন করবো না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এটি পুলিশের জায়গা। তারা ২৭ কোটি টাকা দিয়ে এটি বরাদ্দ নিয়েছেন। তিনি ভুল বলেননি। কিন্তু ২৭ কোটি টাকা তো সরকারি কোষাগারেই আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিকল্প খুঁজতে বলেছেন। কিন্তু কীসের বিকল্প মাঠের না থানার ভবনের? চাইলে কলাবাগান এলাকার অন্য কোনও ভবনেও থানা বানানো যাবে। কিন্তু চাইলেই তো কলাবাগান এলাকায় একটি মাঠ বানিয়ে ফেলা যাবে না।  যাইহোক, অবশেষে আজ দুপুরে জানা গেলো প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠে আর কোনও ভবন হবে না। মাঠ যেভাবে ছিল সেভাবেই থাকবে। এটা সত্যিই স্বস্তির খবর আমাদের সবার জন্য।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

               

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
‘পদ্মা সেতু বিশ্বকে দেখিয়ে দিলো আমরা বীরের জাতি’
‘পদ্মা সেতু বিশ্বকে দেখিয়ে দিলো আমরা বীরের জাতি’
সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
এখন ঢাকা থেকে ভোলায় গিয়ে নাশতা করাও সম্ভব: তৌসিফ মাহবুব
গৌরবের পদ্মা সেতুএখন ঢাকা থেকে ভোলায় গিয়ে নাশতা করাও সম্ভব: তৌসিফ মাহবুব
পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে ডিএমপির র‌্যালি
পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে ডিএমপির র‌্যালি
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ