X
সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪
১০ আষাঢ় ১৪৩১

গৌতম বুদ্ধের অহিংস সামাজিক সংঘ ও আজকের পৃথিবী

স্বদেশ রায়
০৪ মে ২০২৩, ১১:২৮আপডেট : ০৪ মে ২০২৩, ১৫:২৯

পৃথিবীর যে ক’জন গেমচেঞ্জার গৌতম বুদ্ধ তাঁদের একজন। পৃথিবীর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় তিনি সবার ওপরে স্থান দিয়েছিলেন মানুষকে। মানুষের মনোজাগতিক পরিবর্তন ছাড়া যে সত্যি অর্থে মানব সমাজের কোনও পরিবর্তন হয় না, আর মানব সমাজকে পরিবর্তন করা ছাড়া যে কোনও পরিবর্তন যে অর্থহীন– এই উপলব্ধি থেকেই তিনি তাঁর পরিবর্তনের জন্যে পথচলা শুরু করেন। আর এ উপলব্ধির কারণেই তিনি রাজ্য ত্যাগ করে প্রকৃতির পাঠশালায় নিজেকে নিয়ে এসেছিলেন। এবং ঋকবেদের ‘ব্রাহ্মণ গ্রন্থের’ লেখক ঋষি ঐতিরেয়’র মতো তিনিও প্রকৃতি থেকে নিজের জ্ঞানকে পুষ্ট করেছিলেন। আর প্রকৃতির দিকে তাকালে সবার আগে যে বিষয়টি দেখা যায়, প্রকৃতির প্রতিটি জীব নিজ নিজ এলাকায় বা সহজাত এলাকায় সে শক্তিশালী। কিন্তু মানুষ প্রকৃত শক্তিশালী হয় তার চিন্ময় অর্থাৎ চিন্তার জগৎকে যখন সে প্রসারিত করতে পারে তখনই। মানুষের প্রকৃত শক্তি তার চিন্তার জগতে। চিন্তার জগৎ উন্নত ছাড়া যে মানুষ -সে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সে শক্তির ভেতর একটা পাশবিকতা থাকে। বাস্তবে পশু শক্তি থেকে মানুষ বের হয়ে আসতে পারে না।

গৌতম বুদ্ধের জন্ম যে ভারতীয় সভ্যতায়, এই সভ্যতার ক্রমবিকাশে অন্তত আজ থেকে দশ পনের হাজার বছর আগের থেকেই একটা সত্য ও সুন্দর খোঁজার উন্মেষ ঘটেছিল। এবং গৌতম বুদ্ধের জন্মেরও প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে মানুষের মনোজাগতিক শক্তি বা চেতনা বিকাশের একটি ধারা সৃষ্টি হতে থাকে। অন্তত কিছু সংখ্যক মানুষ হলেও তারা ক্রমেই ত্যাগ করতে থাকেন মানুষের জৈবিক আচরণের ভেতর প্রতি মুহূর্তে যে পশুশক্তি কাজ করে তার বিপরীতে। সেখান থেকে তাঁরা মুক্ত করতে চান নিজেকে। নিজেকে এই পশুশক্তির বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে শুধু জ্ঞান চর্চা নয়, জীবনাচরণের মধ্যেই তাঁরা একটা অহিংসা নিয়ে আসেন। অর্থাৎ তাঁরা তাঁদের জীবনাচরণে জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির নানান শক্তিকে তখন জাগ যজ্ঞ দিয়ে যে তুষ্ট করার চেষ্টা করতেন, সে কাজে যে জীব হত্যা করতেন– সেখান থেকে অনেকেই নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আসেন। শুধু চিত্তকে দেহের নানান সংযম দিয়ে শান্ত রাখার ভেতরই তারা তাদের ওই চর্চাকে নিয়ে যান। আর এরই একপর্যায়ে গিয়ে তাদের ধারাতে অনেকেই সরে আসেন সব রকম জীব হত্যা থেকে। কারণ, নিজের জীবন ধারণের জন্যে প্রাণী হত্যা ও তাকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার ভেতরও তাঁরা এক ধরনের পাশবিকতা দেখতে পান। অর্থাৎ শুধু মানুষ নয়, সকল প্রাণীর ওপর থেকে তাঁরা হিংসাকে জীবনের উপলব্ধি দিয়ে প্রত্যাহার করেন। আর নিজেকে এভাবে হিংসামুক্ত করার ভেতর দিয়ে তাঁদের হৃদয়ে প্রতিমুহূর্তে জাগরিত হতে থাকে অহিংসা। এবং মানুষের পাশাপাশি এই অহিংস নীতি তাঁরা গ্রহণ করতে থাকেন প্রতিটি জীবের ওপর। আর এভাবে ক্রমেই ভারতীয় সভ্যতার মাটিতে প্রোথিত হতে থাকে অহিংসা।

রবীন্দ্রনাথ এ কারণেই বলেছেন, ভারতীয় সভ্যতার চর্যায় ও মননে ‘অহিংসা’ বুদ্ধে জন্মের বহু আগে থেকেই জন্ম নিয়েছে। এবং তা ভারতীয় সভ্যতায় বসবাসরত একশ্রেণির মানুষের মধ্যে বহমান ছিল। তবে রবীন্দ্রনাথের কথা ধরেই বলা যায়, গৌতম বুদ্ধই প্রথম ভারতীয় সভ্যতার সকল অহিংস চিন্তাকে একটি সুতায় নিয়ে এসে ফুলের মালা তৈরি করে করেন। শুধু যে গৌতম বুদ্ধ এই অহিংসার ফুলের মালা তৈরি করেছিলেন তা নয়– তিনি এ ফুলের মালাটি সাধারণের জীবনে নিয়ে আসার পথ প্রসারিত করার চেষ্টা করেছিলেন সকল প্রকারে। এ কারণে যে অহিংসার ধারা, সকল জীবের প্রতি মানুষের প্রেমের ধারা, সকলকে প্রেমের পথে আনার ধারা ভারতবর্ষে সাধক বা জ্ঞাননির্ভর মানব জীবনের সঙ্গী  ছিল– তা প্রথম বুদ্ধের হাত ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে।

এছাড়াও বুদ্ধ নিজে একদা রাজা ও রাজপুত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনও মনে করেননি, মানুষের প্রতি, জীবের প্রতি এই প্রেম, এই অহিংসা তিনি অহিংস রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ছড়িয়ে দেবেন। কারণ, রাজা হিসেবে, রাজপুত্র হিসেবে তিনি জানতেন, সব রাষ্ট্রশক্তির মধ্যে একটা ক্ষাত্রশক্তি নিহিত থাকে। আর যেখানে ক্ষাত্রশক্তি থাকে সেখানে প্রেম বা অহিংসার মৃত্যু ঘটে অতি দ্রুতই। তাছাড়া প্রেম ও অহিংসায় কোনও শৃঙ্খল থাকে না, রাষ্ট্রশক্তিতে সবসময়ই শৃঙ্খল থাকে।

এ কারণে বুদ্ধ রাজপুত্র হয়েও রাষ্ট্রশক্তির মাধ্যমে, বৃহৎ কোনও রাজ্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অহিংসা বা শান্তি ও প্রেমের শক্তিতে মানুষকে একত্রিত করতে বা এগিয়ে নিতে চাননি। তিনি বরং হাত পেতে ছিলেন, সমাজের প্রতি। তিনি সমাজের মানুষকে নিয়ে অহিংসাকে রক্ষা করার জন্যে সংঘ গড়েছিলেন। চেয়েছিলেন, সমাজের অহিংস সংঘ শক্তিকে রাষ্ট্রশক্তি, ক্ষাত্রশক্তি সর্বোপরি মানুষের ভেতর থাকা পশুশক্তি’র থেকে বড় শক্তিতে পরিণত করতে। যে অহিংসা ও প্রেমের শক্তি সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা যেমন সন্তানকে সব অশুভ থেকে রক্ষা করে তেমনিই রক্ষা করবে মানুষকে।

কিন্তু ইতিহাসের গতিতে, কালের উল্টোরথে বুদ্ধের অবর্তমানে ক্রমেই সেই সংঘ নানান পথে ধাবিত হয়। অন্যদিকে যে ভারতীয় সভ্যতায় অহিংস প্রোথিত হাজার হাজার বছর ধরে সেই ভারত থেকে বুদ্ধানুসারীরা বিতাড়িত হন রক্তাক্ত হয়ে। তবে তার অনুসারীরা বিতাড়িত হলেও একেবারে বিতাড়িত হয়নি সাধারণ মানুষের একটি শ্রেণির মধ্য থেকে, ওই সভ্যতার স্রোত থেকে অহিংসা ও প্রেমের ধারা- যা বুদ্ধ প্রোথিত করেছিলেন। অন্যদিকে অতীতের কনফুসিয়াস থেকে আধুনিক কালের টলস্টয়ের চিন্তার ভেতর অহিংসার ধারা থাকায় বুদ্ধের অহিংসা ও প্রেমের ধারা যেখানে ছড়িয়ে পড়েছে সেখানেই তা পুষ্ট হয়েছে। তবে বুদ্ধের এই চেতনা ও চিন্তা যেহেতু ভারতীয় সভ্যতা থেকে উত্থিত তাই সেখানে সব সভ্যতাকে গ্রহণ করার মতো অনেক স্থান ছিল। কিন্তু বুদ্ধের মৃত্যুর দেড় হাজার বছর পর থেকে যখন ধীরে ধীরে ইউরোপীয় সভ্যতা পৃথিবীতে শক্তির বাহু ও কৌশল নিয়ে এগোতে থাকলো– তখন তারা সব থেকে ভয়াবহ যে বিষয়টি করতে থাকে, পুরাতন সভ্যতার সবকিছু শেষ করে দিয়ে তাদের সভ্যতাকে চাপিয়ে দেওয়া। এর ফলে অন্য সব ধারা ক্ষীণ হয়ে একটি ধারাই প্রবল হতে থাকে। আর পাশাপাশি যোগ হতে থাকে চারপাশে বর্ম আটা ধর্ম ও রাষ্ট্র এক সঙ্গে।

যার ফলে শুধু কঠোর রাষ্ট্র সৃষ্টি হতে থাকে না, নিজেদের রাষ্ট্রের মাধ্যমে রক্ষা করতে গিয়ে বুদ্ধকে যারা একদা প্রাণে ধারণ করেছিলেন তাদেরও হাতে যুদ্ধের তীর তুলে নিতে হয়। হিংসায় উন্মত্ত হয়ে রক্তাক্ত করতে হয় একে অপরকে। যার ফলে আজ সব গেমচেঞ্জারের প্রকৃত অনুসারীরা পৃথিবীতে অনেকটা জাদুঘরে স্থান নিয়েছেন। এখন পৃথিবী নতুন নিয়মে, নতুন রাষ্ট্রের নামে নিজ রাষ্ট্রের ও অপর রাষ্ট্রের সকল মানুষকে ক্ষাত্রশক্তির দাপটের নিচে রাখছে। যা আরও কঠিনতম হিংসার এক মোড়কে ঢাকা রূপ।

তাই এ সময়ে পৃথিবীর অন্যতম গেমচেঞ্জার, অহিংস পথিক বুদ্ধকে চর্চা করা প্রয়োজন দুটো কারণে অনিবার্যভাবে। এক, রাষ্ট্রের ক্ষাত্রশক্তির বিপরীতে সমাজের অহিংস শক্তিকে জাগরিত করা। আর এই যুদ্ধ ও লালসা উন্মত্ত পৃথিবীতে লোভহীন প্রাণে শুধু নির্মল প্রেম যাতে জেগে ওঠে– সেই চিন্ময় মানব হওয়ার পথ ধরার পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্যে। যাতে হিংসাশূন্য, শত্রুতাশূন্য প্রাণে মঙ্গলের দায়ভার জন্ম নেয় আপন প্রেম ও জ্ঞানের শক্তিতে। আর যে শক্তি গড়ে তুলতে পারবে সেই সামাজিক সংঘ, যার ক্ষাত্রশক্তি থাকবে না– তবে প্রেম ও জ্ঞানের শক্তি দিয়ে সে হবে রাষ্ট্রীয় শক্তির থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী।

লেখক: সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত। 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
১০ মাসে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয়রা নিয়ে গেছে ৫১ মিলিয়ন ডলার
সংসদে অর্থমন্ত্রী১০ মাসে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয়রা নিয়ে গেছে ৫১ মিলিয়ন ডলার
ঘরোয়া উপায়ে খুশকি সামলাবেন যেভাবে
ঘরোয়া উপায়ে খুশকি সামলাবেন যেভাবে
‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ প্রিয়তার নতুন অর্জন
‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ প্রিয়তার নতুন অর্জন
বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ইউজিসির
বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ইউজিসির
সর্বশেষসর্বাধিক