X
মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪
১১ আষাঢ় ১৪৩১

চাবির গোছা ও নষ্ট রাজনীতি

স্বদেশ রায়
৩০ জুন ২০২৩, ১২:৪৬আপডেট : ৩০ জুন ২০২৩, ১৪:৪১

“বেশ্যাদেরও দেখি, গঙ্গা থেকে নেয়ে ফেরবার সময় শিবের মাথায় একটু জল না দিয়ে পারে না। কেন তখনও কি তার শিবের মতো বর পাবার আশা নাকি?” নষ্ট রাজনীতি নিয়ে লেখা সমরেশ বসু’র ‘প্রজাপতি’ উপন্যাসে এই দুটি লাইনই নষ্ট রাজনীতিকদের জন্যে শুধু নয়, নষ্ট রাজনীতি যে নষ্ট সমাজ তৈরি করে সেই সমাজের উপমা হিসেবে সব থেকে কঠিন এবং এক অনবদ্য উপমা। গোটা উপন্যাসের সারাংশ তিনি যেন এই দুই লাইনে তুলে এনেছেন।

১৯৬৫ সালে প্রকাশিত সমরেশ বসুর এই প্রজাপতি উপন্যাস মূলত পশ্চিমবঙ্গের নষ্ট রাজনীতি ও তার প্রভাবে সমাজ যেভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল তারাই এক ছবি। একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যাওয়া এ উপন্যাসে নষ্ট রাজনীতিক থেকে নষ্ট প্রশাসন ও সমাজকে কিছুটা যৌনতার এক তির্যক দৃষ্টিতে তুলে এনেছিলেন সমরেশ বসু।

রাষ্ট্র এই বই নিষিদ্ধ করেছিল যৌনতার কথা বলে। রাষ্ট্র যারা চালান সেই আমলা ও রাজনীতিকরা অতটা বোকা নন। তারা যে উপন্যাসের মূল কথা বোঝেননি তা নয়। কিন্তু মূল কথা বলে তো আর বইটিকে নিষিদ্ধ করা যায় না। তাই যৌনতাকে তাদের কাজের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। আনন্দবাজারে অশোক সরকারের মতো সম্পাদক ছিলেন বলেই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে আবার বইটি প্রকাশের সুযোগ পায়– এ ইতিহাস সবার জানা।

সমরেশ বসুর এই উপন্যাস লেখার মাত্র পাঁচ বছর পরে মুক্তি পায় জহির রায়হানের কালজয়ী ছায়াছবি ‘ জীবন থেকে নেয়া’। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (অর্থাৎ পূর্ব বাংলায়)।

সমরেশ বসু যেমন তাঁর উপন্যাসের সারাংশ তুলে এনেছেন, দুটি লাইনে তেমনি জহির রায়হানও তাঁর ছায়াছবির সারাংশ তুলে এনেছেন ছায়াছবির একটি গানের একটি একটি লাইনে ‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে।’ আর সমরেশ বসু যেমন পশ্চিমবঙ্গের নষ্ট রাজনীতির রূপক উপমা ‘যৌনতা’ দিয়ে প্রকাশ করেছেন তেমনি জহির রায়হান তাঁর রাজনৈতিক এই ছায়াছবি যার মূল বিষয় স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্তি- তার উপমা হিসেবে ব্যবহার করেছেন একটি চাবির গোছা। যেটাই তার খাঁচা। জহির রায়হানের এ চলচ্চিত্রের কাহিনিও তাঁর লেখা।

জহির রায়হান যেমন শক্তিশালী ঔপন্যাসিক তেমনি শক্তিশালী পরিচালক। তাই তিনি সরাসরিই ‘জীবন থেকে নেয়া’কে চলচ্চিত্র হিসেবে ১৯৭০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (অর্থাৎ পূর্ব বাংলা) মানুষের সামনে আনেন।

পূর্ববাংলা ও পশ্চিম বাংলা মূলত ১৯৪৭-এর আগে একই বাংলাদেশ। একই নৃগোষ্ঠীর মানুষের এখানে বাস। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ষাটের দশকের শেষভাগে এসে সমরেশ বসু যখন পশ্চিমবঙ্গের ছবি আঁকছেন তাঁর উপন্যাসে তখন সে এলাকা বা ভারতের ওই রাজ্যটি নষ্ট রাজনীতির এক লীলাভূমি। অন্যদিকে জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া ছায়াছবিতে দেখা যাচ্ছে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ পূর্ব বাংলায় ওই সময়ে ত্যাগের রাজনীতির এক স্রোতধারা প্রবহমান হবার জন্যে তার জলধারাকে বেগবান করছে।

একই নৃগোষ্ঠীর মানুষ দুই রাষ্ট্রে ভাগ হয়ে একই সময়ে কেন এমন দুই ধারায় প্রবাহিত হলো ষাটের দশকে এসে- তা নিয়ে ভবিষ্যতে গবেষকরা অনেক গবেষণা করতে পারবেন। তবে খুব সংক্ষেপে বা মোটা দাগে বলা যায়, বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তুর চাপ ও পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া এই উদ্বাস্তুদের মধ্যবিত্তের বড় অংশ ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া ও রাজনৈতিকভাবে দিশেহারা অবস্থাই ছিল পশ্চিমবঙ্গের নষ্ট রাজনীতির মূল কারণ। একটি সমাজে যখন মধ্যবিত্ত অর্থনৈতিক কারণে তার কালচার ধরে রাখতে পারে না, আর রাষ্ট্রের কোনও ক্ষমতা থাকে না তাকে সামর্থ্য জোগানোর তখন সে রাষ্ট্রের রাজনীতি ও সমাজ নষ্ট হতে বাধ্য। পশ্চিমবঙ্গে সেটাই ঘটেছিল। অন্যদিকে পূর্ব বাংলায় যেমন দেশত্যাগীদের বিপুল সম্পদ দ্রুত একটি বিশাল শ্রেণিকে আর্থিকভাবে সচ্ছলতা দেয় তেমনি এর পাশাপাশি পঞ্চাশের দশকের শেষের দিক থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক একটি আধুনিক রাষ্ট্রীয় চেতনা গড়ে ওঠে। কারণ, প্রগতিশীল তরুণ মুসলিম ছাত্র, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশার একটি শ্রেণির মধ্যে পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই একটি বোধ তীব্রভাবে ধাক্কা দেয় যে আর যাই হোক ধর্মের নামে কোনও আধুনিক রাষ্ট্র হতে পারে না। আর রাষ্ট্রকে মানুষের জন্যে হতে হলে অবশ্যই আধুনিক রাষ্ট্র হতে হবে। আধুনিক রাষ্ট্রের জন্যে অনেক দেশই প্রথামিকভাবে জাতীয়তাবাদকে বেছে নেয়– তবে বাস্তবে তার মূল উপাদান সংস্কৃতি। পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের এই আধুনিক তরুণ সমাজ সে সময়ে তাই বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল প্রমুখকে আঁকড়ে ধরে একটি বাঙালি সংস্কৃতিভিত্তিক উদার রাজনৈতিক পরিবেশের পথে ও আধুনিক রাষ্ট্রের পথে হাঁটতে থাকে।

জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছায়াছবিতে তাই রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের  ভেতর দিয়েই দেশের ছবি এসেছে। যে গানের ভেতর মিলন আছে বাউল এবং রবীন্দ্রনাথের। অর্থাৎ বাঙালির আপন ধর্ম। সে হিন্দু নয়, মুসলিম নয়, সে সহজিয়া। পাশাপাশি এই পথে হাঁটার জন্যে সব থেকে কঠিন যে কাজ তা হলো সহজিয়া মানসিকতা বা উদার গণতান্ত্রিক মানসিকতা। সেটাই যে ছিল পূর্ববাংলার ওই সময়ে ও প্রতি মুহূর্তে রাজনীতির এবং সমাজের মূল সমস্যা তা জহির রায়হান তাঁর ছায়াছবিতে বারবার ক্ষমতার চাবির গোছা বদলের ভেতর দিয়েই দেখিয়ে যান। চাবির গোছা যার আঁচলেই আসছে সেই স্বৈরাচারী হয়ে যাচ্ছে। নিবেদিত রাজপথের রাজনীতি আর ক্ষমতার রাজনীতির এই বাস্তবতা জহির রায়হান শুধু আঁচলের একটি চাবির গোছা দিয়েই চিরকালের ক্ষমতার এক চিরন্তন সত্য প্রকাশ করেন।

জহির রায়হানের এই চলচ্চিত্রটি এখন শুধু বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের একটি ছায়াছবি হিসেবেই দেখা হয় বেশি ক্ষেত্রে। সেভাবেই বিচার করা হয়। কিন্তু রাজনীতি ও রাষ্ট্রের মূল বিষয় যে সংস্কৃতি ও আঁচলে চাবির গোছা না থাকা সেদিকটা বড় করে দেখা হয় না। দেখা হয় না তিনি একটি উদার রাজনীতি ও ক্ষমতার পথকে সামনে এনেছিলেন।

এই উদার রাজনীতিকে সামনে আনার জন্যে সত্যজিৎ রায় রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড় গল্পকে চারুলতা নামে চলচ্চিত্র তৈরি করার সময় ঘটনার সময়টাকে পিছিয়ে নিয়ে গেছেন শুধু রামমোহনকে আনার জন্যে। যার ভেতর দিয়ে তিনি ভূপেনের মুখ দিয়ে লিবারালইজমের কথা ও লন্ডনের লেবার পার্টিকে সমর্থনের কথা বলিয়েছেন।

সমরেশ বসুর প্রজাপতি নিয়ে এ পর্যন্ত বাংলায় তিনটি চলচ্চিত্র হয়েছে। তার প্রথম দুটি সমরেশ বসু যে সময়ে বসে তাঁর উপন্যাসটি লিখেছিলেন সেই সময়টাকে ধরেই চলচ্চিত্র করা হয়েছে। সর্বশেষ চলচ্চিত্রটি করেছেন সুব্রত সেন। চিত্রনাট্য ও পরিচালনা সুব্রত সেনের। সুব্রত সেন এখানে সত্যজিৎ রায়ের চারুলতার মতো, সমরেশ বসুর প্রজাপ্রতি’র সময়কাল কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন করেছেন। সমরেশ বসু তাঁর উপন্যাসে রকের ছেলেদের বা মাতালদের ভাষা থেকে শুরু করে সব কিছুই সেই সময়ের বাস্তবতায় রেখেছিলেন। সুব্রত সেন সেক্ষেত্রে এখনকার পশ্চিমবঙ্গের পলিটিক্যাল কর্মী অর্থাৎ সেদেশের ভাষায় নানান জায়গায় মাস্তানি করে ‘কাট মানি’ নেওয়া যাদের মূল কাজ– তাদের মুখের ভাষাই নিয়ে এসেছেন। এবং সমরেশ বসুর ছবির নায়িকা শিখাকে তিনি বতর্মান সময়ে এনে বিভিন্ন জলসার নাচুনিতে পরিণত করেছেন। এমনকি শিখার বাড়ির পরিবেশও পরিবর্তন করে তিনি শিখাকে বর্তমানে নিয়ে এসেছেন। যার ভেতর দিয়ে হলেও অনেকখানি সে রাজ্যের বর্তমানের নষ্ট রাজনীতি তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। এদিক থেকে সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’ উপন্যাস নিয়ে করা অন্য দুটি বাংলা ছায়াছবির থেকে এটার কিছুটা আলাদা বিশেষত্ব রয়েছে।

কিন্তু তিনি সিনেমার শেষ পর্যায়ে এসে সৎ পুলিশের কার্যক্রম কেন দেখালেন তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ, তৃতীয় বিশ্বের এই নষ্ট রাজনীতি যেকোনও রাষ্ট্র বা রাজ্যে পুলিশ বাস্তবে ক্ষমতাসীনদের দলীয় ক্যাডারই হয়। সমরেশ বসুর উপন্যাসের বাইরে তিনি কেন এটা আনলেন, তা নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকে যায়। তবে সে প্রশ্নের উত্তর তিনি কি তাঁর ছবির শুরু ও শেষ দিয়ে দিয়েছেন! তার ছায়াছবি তিনি শুরু করেছেন, মুখোশ পরা কয়েক জনের নাচের ভেতর দিয়ে- আবার শেষও করেছেন মুখোশ পরা সেই নাচ দিয়ে।

বাস্তবে নষ্ট রাজনীতিতে নষ্ট হয়ে যাওয়া সমাজে সকলেই মুখোশ পরে থাকে। তাই কখনও কখনও কিছুক্ষণের জন্যে কাউকে কাউকে ভালো মুখোশ পরতে হয়। মুখোশের আড়ালের মুখটিই শেষ কথা।

নষ্ট রাজনীতি নিয়ে সমরেশ বসুর প্রজাপতি উপন্যাস অনেক শক্তিশালী। যেখানে নায়িকা শিখা নষ্ট হয়েও তার ভালোবাসার মানুষ, যাকে সমাজ ও রাজনীতি ও পরিবার নষ্ট করেছে সেই সুখেনকে বলছে, “তোমাকেও একটা দলে চলে যেতে হবে; নইলে টিকতে পারবে না”। এখানে সমরেশ বসু মাত্র একটি লাইনেই প্রকাশ করেছেন, নষ্ট রাজনীতি সমাজের সকল ব্যক্তি মতামত, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য এমনকি ব্যক্তিগত জীবনের অধিকারও কত ভয়াবহভাবে কেড়ে নেয়।

তাছাড়া যে পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই উপন্যাসের নায়ক সেই পরিবারের প্রধান নষ্ট আমলা বাবাটি শেষ জীবনে সারা রাত অন্ধকারে বসে থাকে। আলো দেখলেই চমকে ওঠে। নষ্ট রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সমাজের এই অন্ধকারের নীরবতা পরিপূর্ণভাবে ছায়াছবিতে আনা অনেক কঠিন কাজ। ছায়াছবি অনেক বড় মাধ্যম, তারপরেও মনে হয় শেষ অবধি শক্তিশালী উপন্যাসের কাছে হেরে যায়। যেমন, কখনও কখনও মনে হয় এতটা সফলতার পরেও সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র পথের পাঁচালি পেরেছে কি বিভূতি ভূষণের উপন্যাসের সেই দরিদ্র সন্তান অপু ও দুর্গার চারপাশের সবুজ ঘাসের গন্ধকে শতভাগ প্রকাশ করতে!

 

লেখক: সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সরাসরি অলিম্পিকে জায়গা পাওয়া সাগরকে বিমানবন্দরে সংবর্ধনা
সরাসরি অলিম্পিকে জায়গা পাওয়া সাগরকে বিমানবন্দরে সংবর্ধনা
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা
সুযোগ পেলে বিএনপি পাকিস্তানের কাছে দেশ বিক্রি করে দিতো: শেখ সেলিম
সুযোগ পেলে বিএনপি পাকিস্তানের কাছে দেশ বিক্রি করে দিতো: শেখ সেলিম
সভাপতিসহ যবিপ্রবির ৯ ছাত্রলীগ কর্মীকে বহিষ্কার
চাকরিপ্রার্থীদের অপহরণ ও শিক্ষার্থীকে নির্যাতনসভাপতিসহ যবিপ্রবির ৯ ছাত্রলীগ কর্মীকে বহিষ্কার
সর্বশেষসর্বাধিক