X
বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪
৬ আষাঢ় ১৪৩১

কর-বৈষম্য জিডিপি বৃদ্ধির অন্তরায়

মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন
২৪ মে ২০২৪, ২১:৪৭আপডেট : ২৪ মে ২০২৪, ২১:৪৭
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতি। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সবখানেই তহবিলের নিশ্চয়তা নিয়ে ব্যস্ততা। কর্মের সংস্থান, ব্যবসা বাণিজ্য ইত্যাদির গতি মুহূর্তে পরিবর্তন হচ্ছে। এতে বড় ধরনের আঘাত আসছে দৈনন্দিন জীবনযাপনে। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণহীন পর্যায়ে চলে গেছে। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যে আইএমএফ-এর পরামর্শ মোতাবেক কর-জিডিপি বৃদ্ধির জন্য মরিয়া সরকার। সরকার পড়েছে উভয় সংকটে। একদিকে নাগরিকদের পরিষেবা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে ঋণের কিস্তি নিতে হলে দাতার শর্ত মানা। এই এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি আমরা। এর ইঙ্গিত ইতোমধ্যে বিভিন্ন মিডিয়ার বদৌলতে সচেতন নাগরিকরা জেনে গেছে। গেলো বছরগুলোতে যা ছিল আলোচনা, আসছে বছরে তা হবে বাস্তবতা।

এই বাস্তবতার মাঝেও কর-বৈষম্য নাগরিকদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। ২০২৩ সালে জাতীয় সংসদ কর্তৃক পাসকৃত আয়কর আইনে কর-বৈষম্য অনেকটা স্পষ্টভাবে সামনে চলে আসে। সচেতন নাগরিক সংগঠকগুলো বা বিজ্ঞজন আইনের এই বৈষম্য হ্রাসের বিষয়ে একাধিকবার সুপারিশ করে কোনও সাড়া সরকারের কাছ থেকে পায়নি। অনেকের মতে, আমলানির্ভর এই আইনে বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে অনেকটা জেনে, শুনে, বুঝে। আইনে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাপক হারে কর ছাড়ের সুযোগ থাকায় এই বৈষম্য দৃশ্যমান পর্যায়ে চলে আসে।

একসময় সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় কর-ছাড়ের ব্যাপারে সরকার কিছুটা নমনীয় ছিল। এই নমনীয়তার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বর্তমানে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুবিধাভোগী ও নিশ্চিত জীবনের অধিকারী কর্মকর্তাদের ব্যাপক হারে কর ছাড় দিয়ে যে বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে তা কাম্য নয়। প্রাক-বাজেট আলোচনায় আসছে ২০২৪-২৫ করবর্ষে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের কর-বৈষম্য দূর করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এফবিসিসিআই।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, এই প্রস্তাব তেমন আমলে নেওয়া হচ্ছে না। তার মানে হলো কর-বৈষম্য থেকেই যাচ্ছে।

আয়কর আইন ২০২৩-এর ষষ্ঠ তফসিলের ১ম অংশের দফা ৪ থেকে ৯ পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাদের পেনশন, আনুতোষিক, স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিল, বার্ধক্য তহবিল, স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণকালীন সময়ে প্রাপ্ত যেকোনও অর্থ, পেনশনারস সেভিংস সার্টিফিকেট থেকে গৃহীত সুদ/মুনাফা ইত্যাদি আয় পরিগণনা থেকে বাদ দেওয়ার বিধান করা হয়েছে।

অন্যদিকে আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৩২-এ উপ-ধারা-১ ও ২-এ বেতন খাতের আয় হিসেবে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, তা শুধু বেসরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রযোজ্য। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য শুধু মূল বেতন ও উৎসব বোনাস ছাড়া অন্য সব প্রাপ্তি করমুক্ত রাখা হয়েছে। একই আইনে বেসরকারি কর্মকর্তাদের পেনশন, আনুতোষিক, স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিল, বার্ধক্য তহবিল ২৭.৫% ও ৩০ এর পরিবর্তে ১৫% আয়কর প্রদানের বিধান চলমান রয়েছে (এসআরও ৩৩৩-আইন/আয়কর-২০/২০২৩, তারিখ ৬ ডিসেম্বর ২০২৩।

এনবিআর কর্তৃক প্রণীত আয়কর আইন ২০২৩ এ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের এই বৈষম্য নিয়ে কথা বলেছেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। তাদের মতে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় জড়িত থাকার কারণে বৈষম্য থাকার পরও তা কার্যকর রেখেছেন এনবিআর কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।”  

বেসরকারি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাপক পরিসরে কর-ছাড় বা কর অব্যাহতি প্রদান করা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ তারাও এ দেশের নাগরিক। নাগরিক হিসেবে একদিকে সব সুবিধা গ্রহণ করেন এবং নিশ্চিত চাকরির সুবিধা নিচ্ছেন, অন্যদিকে আয়করের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব থেকে সরকারকে বঞ্চিত করছেন। এই বৈষম্যের ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রাজস্ব আদায়ে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন এবং কর এড়িয়ে চলার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করছেন। এর ফলে রাষ্ট্র দুইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ব্যাপক পরিসরে কর-ছাড় পাচ্ছেন, অন্যদিকে তাদের এই অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের প্রবণতা সমাজের স্বাভাবিক করদাতাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাবের কারণে অনেকে কর ফাঁকি দেওয়ার পথ খোঁজেন।

আসছে বাজেটে আগামী বছরের জন্য যেসব ক্ষেত্রে কর-বৈষম্য রয়েছে, তা কমিয়ে আনার জন্য সরকারকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। মূলত এই সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে রাজনৈতিক কমিটমেন্টের জায়গা থেকে। আমলানির্ভর আইন প্রয়োগ করে নাগরিকদের পরিষেবা যেমন অর্জন সম্ভব হয় না তেমনি কঠিন হবে জিডিপি বৃদ্ধি করা।


লেখক: আইনজীবী

[email protected]
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
এবার ছেলেদের কোচ হয়ে নতুন ভূমিকায় ডালিয়া
এবার ছেলেদের কোচ হয়ে নতুন ভূমিকায় ডালিয়া
আফ্রিকান শান্তিরক্ষীদের প্রত্যাহার বিলম্বিত করতে চায় সোমালিয়া
আফ্রিকান শান্তিরক্ষীদের প্রত্যাহার বিলম্বিত করতে চায় সোমালিয়া
‘রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউরই ছাগলকাণ্ডে আলোচিত সেই ইফাতের বাবা’
‘রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউরই ছাগলকাণ্ডে আলোচিত সেই ইফাতের বাবা’
সিলেট বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা ৮ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত
সিলেট বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা ৮ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত
সর্বশেষসর্বাধিক