নিজেদের নিরাপত্তায় আমাদের ৫ করণীয়

Send
আরিফ জেবতিক
প্রকাশিত : ১৪:০১, মার্চ ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৪, মার্চ ২৯, ২০১৯

আরিফ জেবতিক
বনানী এফআর  টাওয়ারে যখন আগুন লাগে, তখন আমি ঠিক তার পাশের ভবনটাতেই ছিলাম। ছুটে বেরিয়ে এসে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম অসহায় মানুষের আর্তনাদ! বাইরের কিছু একটা ধরে নামতে গিয়ে অনেক উঁচু থেকে মানুষ অসহায়ের মতো মাটিতে পড়ে যাচ্ছেন, এই বীভৎস অসহায় দৃশ্য চোখের সামনে দেখার মতো অভিজ্ঞতা যেন আমার শত্রুরও না হয়। এই দুঃস্বপ্ন আমাকে অনেকদিন তাড়া করে ফিরবে।
দুর্ঘটনার পরপর সবকিছু নিয়ে হইচই করার, নড়েচড়ে বসার একটা অভ‌্যাস আমাদের আছে। এই লেখাটিও সেই অভ্যাসের বাইরের কিছু নয়। তবুও, দীর্ঘদিন ধরে এসব দীর্ঘকায় ভবনে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমার নিজের কিছু পর্যবেক্ষণ শেয়ার করতে চাই।
নতুন ঢাকার আধুনিক নগরায়নের এই আকাশ ছোঁয়া ভবনগুলোতে আগুন লেগে যখন প্রাণহানি হয়, তখন আপনি কাকে দায়ী করবেন? পুরোনো ঢাকার ছোট ছোট গলিতে নিয়ম-কানুন ছাড়া গড়ে ওঠা ভবন এবং সেই ভবনগুলোতে প্লাস্টিক কারখানা, ক্যামিক্যাল গুদাম, দাহ্য পদার্থের অসাবধান উপস্থিতি, দুর্বল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা- এসবকে গালি দেওয়া গেলেও নতুন ঢাকার ঝকঝকে তকতকে ভবনগুলোর ব্যাপারে আমরা কোন ভাগ্যকে দোষারোপ করে পার পাবো?

গত কয়েক দশকে আমাদের এই ভবনগুলোও ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই তৈরি হয়েছে। এসব ভবনের ডিজাইনের সবচাইতে বড় ত্রুটি হচ্ছে- অধিকাংশ ভবনের সিঁড়িঘর ভবনের ঠিক মাঝখানে রেখে চারপাশে দেয়াল বন্ধ করে দিয়ে অফিস স্পেস করা হয়েছে। এতে বড় সমস্যাটি হচ্ছে- ধরা যাক, তৃতীয় তলায়ও যদি আগুন লাগে তাহলে বদ্ধ সিঁড়িঘর দিয়ে সেই কালো ধোঁয়া মুহূর্তেই একেবারে কুঁড়িতলা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ধোঁয়া যেহেতু সরে যাওয়ার কোনও পথ থাকে না, তাই সিঁড়িটি আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবহার অনুপযুক্ত হয়ে যায়। অথচ তৃতীয় তলা থেকে আগুন কুঁড়িতলায় পৌঁছাতে অনেক সময় লাগলেও, এই সময়ের মধ্যে বাকি ফ্লোরগুলোর মানুষদের বেরিয়ে আসার কোনও পথ থাকে না। এই গুরুতর ত্রুটিসম্পন্ন ভবনগুলো নিয়েই আমাদের এই নাগরিক জীবন, যেখানে অতি তুচ্ছ অসাবধানতার কারণেই প্রাণহানি ঘটাতে পারে। আমার-আপনার কারও জীবনই এই নগরে তাই নিরাপদ নয়।

সরকারের তরফ থেকে এই ভবনগুলোর বাইরের দিকে ইমার্জেন্সি সিঁড়ি করার মতো যথেষ্ট চাপ দেওয়া হবে- এতটা আশা করি না। দুর্নীতিবাজরা যেখানে প্রতিটি স্তরে বসে আছে, তখন ওপর মহলের কোনও সদিচ্ছাও একেবারে তলানি পর্যন্ত কার্যকর হবে- এমনটা আশা করা দুরাশা।

সেক্ষেত্রে কিছু কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা আমাদের নিজেদের স্বার্থেই নেওয়া উচিত। আমি আশা করি, আমার যে পাঠকরা এসব উঁচু ভবনগুলোতে কাজ করেন অথবা বাস করেন, তারা নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর স্বার্থেই এই কাজগুলো করবেন। এগুলো থিওরিটিক্যাল আলাপ নয়, রানাপ্লাজার দুর্ঘটনার পর গার্মেন্ট কারখানাগুলোতে এসব নিয়মকানুন চালু হওয়ার কারণে এই সেক্টরে দুর্ঘটনার হার অনেক কমে এসেছে।

১. প্রতিটি ভবনে নিয়মিত মাসিক ফায়ার ড্রিল করা। এক্ষেত্রে ভবন দেখভালের জন্য বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়াদের যে সমিতি থাকে, সেই সমিতির উদ্যোগ নেওয়া উচিত। নিয়মিত ফায়ার ড্রিল করলে যেকোনও দুর্ঘটনার সময় মানুষ সহজাত অভ্যাসের রিফ্লেক্সে তখন দ্রুত কাজ করতে পারে। গার্মেন্ট কারখানাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করার সময় আমি নিজে বিষয়টি দেখেছি। বারবার ফায়ার ড্রিল করা থাকলে মানুষ দ্রুত বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

২. প্রতিটি ভবনের সব বাসিন্দাদের নিয়ে মাসে বা দুই মাসে সিকিউরিটি ব্রিফিং করা। অনেক ভবনে দায়সারা গোছের কিছু নিরাপত্তা পোস্টার ঝুলিয়ে রাখা হয়। এই পোস্টার বিপদের সময় কোনও কাজে আসবে না। সভা করে সবাইকে বুঝিয়ে দিলে সেটা বরং মানুষের পক্ষে স্মরণ রাখা সম্ভব হয়।

৩. অগ্নি নিরাপত্তা এবং ফার্স্টএইড বিষয়ে প্রতিটি ফ্লোরের কিছু লোককে প্রশিক্ষণ দেওয়া। বিভিন্ন নিরাপত্তা কোম্পানি, ফায়ার ব্রিগেডের লোকজন এসব প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। আমি অনেক ভবন দেখেছি যেখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক ফায়ার এক্সিটিংগুইশার আছে, কিন্তু এগুলো কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, এ ব্যাপারে কারও কোনও ধারণাই নেই! কেউ কখনও এগুলো ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নেননি। তাই ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকলেও, দুর্ঘটনার মুহূর্তে শিখে এগুলো ব্যবহার করতে কতজন এগিয়ে আসবেন সেই প্রশ্নটি রয়েই যায়।

৪. বাসিন্দাদের উচিত, ভবনে যতদূর সম্ভব নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপন করা। এটা ঠিক যে, আমাদের দেশে ভাড়াটিয়াদের কথায় কোনও ভবন মালিক নিরাপত্তা সিঁড়ির ব্যবস্থা হয়তো করবেন না। কিন্তু হোস পাইপ, রিজার্ভ ট্যাংক এবং রিজার্ভ ট্যাংক থেকে প্রতি ফ্লোরে হোসপাইপ দেওয়ার জন্য বাড়িওয়ালাদের সম্মিলিতভাবে চাপ দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে সিঁড়িগুলোতে আইপিএস এর সঙ্গে সংযুক্ত করে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা বাতির ব্যবস্থা করা, প্রতিটি তলায় ফায়ার এক্সিটিংগুইশার স্থাপন করা, ধোঁয়া প্রতিরোধী মাস্ক রাখার ব্যবস্থা করা উচিত।

৫. একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গার্মেন্ট কারখানাগুলোতে করা হয়েছে। এটি সব আধুনিক ভবনে করা উচিত। সেটি হচ্ছে দড়ির সিঁড়ি রাখা, যা প্রয়োজনে ঝুলিয়ে দিয়ে মানুষ বের হয়ে আসতে পারবে। এজন্য কয়েকটি জানালা চিহ্নিত করে সেগুলো গ্রিল ছাড়া রাখতে হবে। দড়ির সিঁড়িটি যাতে দ্রুত ঝুলানো যায়, সেজন্য জানালার পাশে আংটা রাখা, দড়ির সিঁড়ির অগ্রভাগে হুক রাখা এবং সিঁড়িটি যাতে যথেষ্ট শক্তপোক্ত এবং সহজে ব্যবহার উপযোগী হয়, সেটা খেয়াল রাখতে হবে। বিপর্যয়ের সময় তাহলে বাইরে দিয়ে দড়ির সিঁড়ি ঝুলিয়ে বের হয়ে আসা যাবে।

আমার এই লেখাটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। আমি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞও নই। পেশাগত অভিজ্ঞতায় যেসব নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা চোখের সামনে দেখেছি, সেগুলোই শেয়ার করলাম মাত্র।

আমি নিশ্চিত, প্রফেশনাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা আরও অনেক কার্যকর পরামর্শ নিয়ে আসবেন। তবে সব চাইতে বড় কথা, আমরা যেন কথাগুলোকে কথার কথা হিসেবে না নেই, একটু উদ্যোগ নিয়ে নিজেদের মতো করে কার্যকর করতে চেষ্টা করি।

বিপদ শুধু অন্যের জন্য আসে না, বিপদ যে কোনও সময় আমাদের নিজেদের ওপরও আসতে পারে। আমাদের আজকের সামান্য অবহেলা যেন সেদিনের আফসোসের কারণ হয়ে না দাঁড়ায়...

লেখক: ব্লগার অ্যান্ড অ্যাকটিভিস্ট

 

/এএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ