‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ রেখে কীসের শুদ্ধি অভিযান?

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৫:৩৬, জুলাই ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৫, জুলাই ২৪, ২০২০

রুমিন ফারহানাদুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘আজান’ দিয়ে অভিযান শুরু হয়েছিল সম্রাট, জি কে শামিম, পাপিয়া, এনু, রুপম এদের দিয়ে, হালে যুক্ত হচ্ছে ডা. সাবরিনা, মো. সাহেদ, আরিফসহ আরও কিছু নাম। এরইমধ্যে পাপুল, দুর্জয়, এনামুল কিছুটা মাথা তুলেই আবার ডুবে গেছে। দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত সরকার ঘোষণা করেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স।  সরকার বারবার বলছে দুর্নীতি যেই করুক ছাড় দেওয়া হবে না কাউকে; দল, মতের ঊর্ধ্বে উঠে বিচার করা হবে সবার। আশার খবর, সন্দেহ নেই। কিন্তু বিষয়টি এমন তো নয় যে কেবল ক্যাসিনোকাণ্ড, টেন্ডারবাজি কিংবা করোনার মিথ্যা রিপোর্টেই সীমাবদ্ধ আছে এই দুর্নীতির খতিয়ান।  ব্যাংক কেলেঙ্কারি, শেয়ার বাজার লুট, কেন্দ্রীয় ব্যাংক লোপাট, অবকাঠামো খাত, টাকা পাচার,  সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর, সংস্থার নানা ধরনের কেনাকাটা, ঘুষ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি কোথায় নেই দুর্নীতির কালো থাবা? কালো বেড়াল তো ঘুরছে সর্বত্রই। একটি ঘটনা সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয় নতুন একটি ঘটনা। নাটকের পর নাটক, থরে থরে সাজানো। কেবল সামনে আসতে যেটুকু সময়। মানুষ কোনটা রেখে কোনটা নিয়ে ভাববে সেটি বুঝতে না বুঝতেই নতুন ঝাঁ চকচকে রঙিন আর একটি নাটক। হ্যাঁ, আমি নাটকই বলবো এটিকে।
এই নাটকগুলোর স্ক্রিপ্ট খুব যে পাকা হাতের তৈরি তাও না। কারণ, নাটকগুলোর প্লট ভিন্ন ভিন্ন হলেও এদের শুরু আর শেষ মোটামুটি একই কায়দায়। অনেকটা ‘বাংলা কমার্শিয়াল’ সিনেমার মতো। পরিণতি সবাই জানি, তাও কিছুক্ষণের ‘বিনোদন’ নিঃসন্দেহে। এই যেমন লেখাটা লিখতে গিয়েই চোখে পড়ল ক্যাসিনোকাণ্ডের অভিযোগপত্রে নাম নেই ওয়ান্ডারার্স ক্লাব সভাপতি ও যুবলীগ নেতার।  
‘বাংলা কমার্শিয়াল’ সিনেমায় যেমন শুরু থেকে শেষ একটি বিশেষ ধারা বজায় রাখা হয়, এখানেও তাই। সরকারি দলের তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির কোনও সুবিধাভোগীকে সামনে আনা হয়, গ্রেফতার গ্রেফতার খেলা চলে কিছুদিন, ধরা পড়ার পর উল্লাস, এর কিছুদিন পর হয় জামিন নয়তো মাসের পর মাস হাসপাতাল। এভাবে আর যাই হোক ‘শুদ্ধ’ করা যায় না কিছুকে। অল্প কিছু উদাহরণ দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। দুর্নীতির অনেক অতি আলোচিত মাইলফলকের একটি হলো হলমার্ক কেলেঙ্কারি। হলমার্ক গ্রুপের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতিসহ অন্য ছোট বড় জালিয়াতির কারণে ধুঁকছে সোনালী ব্যাংক। হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর, যিনি এখন জেলে আছেন, তার একার পক্ষে জালিয়াতি করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। তৎকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টার নাম সব মিডিয়ায় এসেছিল, কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সেই উপদেষ্টার সোনালী ব্যাংকের শেরাটন শাখায় ঘন ঘন যাতায়াত এবং এই কেলেঙ্কারির নায়ক তানভীরের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গতাকে অস্বাভাবিক ও অবাঞ্ছিত বলে মনে করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় উপকমিটি। এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পেলেও তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা কখনও শোনা যায়নি। মজার তথ্য হলো, মাসে ১০০ কোটি টাকা পরিশোধের শর্তে ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে জামিন পেয়ে হলমার্কের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম সাড়ে ৫ বছরের বেশি জেলের বাইরে ছিলেন, কিন্তু তিনি একটি টাকাও পরিশোধ করেননি। ঘটনা এখানেই শেষ না। গত বছর ডিসেম্বরে হলমার্কের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে অর্থমন্ত্রী তাদের আবার ঋণ দিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন। অথচ সোনালী ব্যাংকেরই এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছেন, হলমার্ক গ্রুপের কারখানা চালিয়ে বা হলমার্কের নামে ব্যবসা করে ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা, দাঁড়ানোই সম্ভব না। কারখানার সব মেশিন আগেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে, যেগুলো আছে সেগুলো সব অচল। এই ভয়ঙ্কর কেলেঙ্কারির ৮ বছর পার হলেও এই মামলার কাজ আজও শেষ হয়নি।
এরপর অতি আলোচিত আর একটি ঘটনা হলো বেসিক ব্যাংক। এই ব্যাংকের বিষয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী একটি পত্রিকার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আব্দুল হাই বাচ্চুর মতো একটা লোকই বেসিক ব্যাংক ধ্বংস করে দিলো।’
‘আমরা মনে করি শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে মামলা করা হোক, তাকে গ্রেফতার করা হোক, জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক’– বলেছেন সাবেক সংসদ সদস্য, বর্তমান ঢাকা দক্ষিণের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। এরপরও ব্যাংকটির নিচু পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাকে জেলে নেওয়া হলেও বহাল তবিয়তে আছেন বাচ্চু। বাচ্চুকে না ধরার ব্যর্থতার জন্য দুদক চেয়ারম্যানের পদত্যাগ পর্যন্ত চেয়েছিলেন তাপস।
এমনকি বাচ্চুর একক সিদ্ধান্তে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে সেটিও কতটা বিশ্বাসযোগ্য তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। তাকে যারা আইনের হাত থেকে বাঁচাতে মরিয়া, তারা কারা? তারাও নিশ্চয় এই লুটপাটের সুবিধাভোগী। সাবেক অর্থমন্ত্রীকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল বাচ্চুর ব্যাপারে নীরব কেন, তখন তার জবাব ছিল, ‘আমি এ ব্যাপারে কথা বলতে চাই না’। (প্রথম আলো, ১৯ জানুয়ারি ২০২০)
এবার আসি ফারমার্স ব্যাংকের কথায়। এর বিষয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, এই ব্যাংকে শুরু থেকেই ডাকাতি হয়েছে। এটা কোনও ব্যাংক ছিল না।

এই ব্যাংকের প্রধান উদ্যোক্তা সরকারি দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি কোনও সমস্যায় পড়েছেন এটি নিয়ে তেমনটি তো শোনা যায়নি।  
গত ১০ বছরে বারবার ঘটেছে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি। গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। ২০১১ সালের শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি নিয়ে গঠিত তদন্ত রিপোর্টে খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বাজার কারসাজির জন্য প্রায় ৬০ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছিলেন, কিন্তু কারও ব্যাপারেই কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা শোনা যায়নি। এই ৬০ জনের মধ্যে বিশেষ করে ২ জনের কথা আলাদাভাবে বলা হলেও তাদের বিরুদ্ধে অন্তত কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিংবা আদৌ কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায় না। বিশ্বে নজিরবিহীনভাবে যে রিজার্ভ চুরি বাংলাদেশে হয়েছে তার বিষয়ে তদন্ত করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট দিয়েছিলেন ফরাসউদ্দিন, যা আজ পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। আমরা আজও জানি না এর সঙ্গে এই দেশের কে বা কারা জড়িত এবং কারও বিরুদ্ধেই কোনও ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
এবার আসা যাক অধুনাকালের শুদ্ধি অভিযানে। এই শুদ্ধি অভিযানের সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম সম্রাট আর জি কে শামিম। তাদের ধরার সময়কার নাটকের কথা যদি বাদও দেই, সম্রাট দুই মাস ধরে হাসপাতালে আছে তার অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনের জন্য। যে কেউ খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন এ ধরনের একটা মেডিক্যাল কন্ডিশন, ডাক্তারি ভাষায় যাকে ‘অ্যারিদমিয়া’ বলে সেটি নিয়ে মাসের পর মাস হাসপাতালে থাকতে হয় কিনা। জি কে শামিমের হাসপাতালে থাকার কারণ আরও চমকপ্রদ। তার হাতে মেটাল প্লেট বসানো ছিল, যেটায় ব্যথা হওয়ার কারণে তিনি হাসপাতালে গেছেন। এর একমাত্র চিকিৎসা হলো প্লেটটি অপসারণ করা। মাসের পর মাস হাসপাতালে থেকে সেটি অপসারণের অনুমতি তিনি কিছুতেই ডাক্তারদের দিচ্ছেন না। সম্রাট আর জি কে শামিম ছাড়াও আরও যারা হাসপাতালে আয়েশী সময় কাটাচ্ছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন টাকা আত্মসাৎ ও পাচার মামলার আসামি ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমিন, এনএসআই’র সাবেক মহাপরিচালক ওহিদুল হক, স্কুলশিক্ষিকা ও স্থপতি জয়ন্তী রেজা হত্যার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি আজম রেজা,লিবিয়ায় নিহত ২৬ বাংলাদেশিকে সেখানে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত সোহাগ হোসেন ও এস এম উদ্দিন। এমনকি এই তথাকথিত শুদ্ধি অভিযান চলমান থাকা অবস্থায়ও তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিনের ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার পর তার সেই জামিন বাতিল হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশ, তাদের কাজের সহযোগী থেকে বিপুল টাকা কমিশন পেয়েছে ক্ষমতাসীন দলের বড় বড় নেতা থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। পাওয়া কোন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের কোনও গডফাদারকে গ্রেফতার বা তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের কোনও তথ্য নেই।
হালে যে সাহেদকাণ্ড সেটিও কম চমকপ্রদ নয়। গত ১১ বছর হেন কোনও প্রতারণা, জালিয়াতি, দুর্নীতি নেই যা সাহেদ করেনি। ২০১১ সালে মাল্টিলেভেল মার্কেটিংয়ে সাধারণ মানুষের ৫০০ কোটি টাকা মেরে দিয়ে জেলে গিয়ে কয়েক মাস পর বেরিয়ে এসেছে, আর কিছু হয়নি। চেক জালিয়াতির মামলায় ১০ বছর আগে ২০১০ সালে তার ৬ মাসের কারাদণ্ড হয়েছিল। পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল, কিন্তু সে ১০ বছর কোনোরকম সমস্যা ছাড়া দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা করেছে। ২০১৬ সালে একবার চেক প্রত্যাখ্যান মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন সাহেদ। কিন্তু নানা পর্যায় থেকে তদবিরের কারণে এক সপ্তাহের মধ্যে বেরিয়ে আসেন তিনি। এমনকি সাহেদকে ভয়ঙ্কর প্রতারক উল্লেখ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে ২০১৬ সালে তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শককে চিঠি দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ক্ষমতা কত অসম্ভবকে সম্ভব করে তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হলো শিকদার গ্রুপের দুই ভাই, যারা হত্যা চেষ্টা মামলার আসামি হওয়ার পরও করোনাকালে চার্টার্ড প্লেন ভাড়া করে সরকারের সব সংস্থার নাকের ডগা দিয়ে কেবল বিদেশেই পাড়ি জমাননি, সেখান থেকে ভার্চুয়াল কোর্টে জামিনেরও আবেদন করেছে, স্বনামধন্য আইনজীবীরা তাদের পক্ষে যুক্ত হন।
সর্ষের মধ্যে ভূত দিয়ে শুরু করেছিলাম। তার একটা ছোট্ট উদাহরণ দিয়ে লেখার ইতি টানছি। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প ঠিকঠাক মতো বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা, সেগুলোর নানা কেনাকাটায় ব্যয় বরাদ্দ যৌক্তিক আছে কিনা সেটা তদারকির দায়িত্ব Implementation Monitoring and Evaluation Division (IMED) প্রতিষ্ঠান। করোনাকালে এই প্রতিষ্ঠান জুমে অনলাইন মিটিংয়ের কলম, ফোল্ডার, প্যাডের জন্য প্রতিজন ১ লাখ ১৫ হাজার ২০০ টাকা হিসাবে মোট ব্যয় ধরেছে ১ কোটি ৩৮ লাখ ২৪ হাজার টাকা। নিজ বাসায় বৈঠক করে খাবার বিল দিয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার টাকা। স্টেশনারি ও অন্যান্য ব্যয় হিসাবে ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ দেখিয়েছে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। শুদ্ধি অভিযান ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ করে হয় না, একটা পর্যায় পর্যন্ত লোক দেখানো গ্রেফতার আর দুই দিনের মাথায় জামিন কিংবা হাসপাতালে থেকে হয় না। রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের কবর রচনা করে, সরকারের ঘনিষ্ঠ কিছু মানুষকে সকল ক্ষেত্রে অন্যায্য সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ক্রোনি ক্যাপিটালিজম প্রতিষ্ঠা করেও শুদ্ধি অভিযান হয় না। শুদ্ধি অভিযান কী করে শুদ্ধ হয় তা সরকার ভালোই জানে। কিন্তু সেটি করার সাহস আর ক্ষমতা তাদের আছে কিনা সেটাই মূল প্রশ্ন।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ