মালেকরা যে কারখানায় উৎপাদিত হয়

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৫:০৩, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৪, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাগতকাল (২২.৯.২০) তারিখে বাংলাদেশ প্রতিদিনের একটি শিরোনাম ছিল–‘বিস্ময়ের শেষ নেই স্বাস্থ্য খাতে’। ড্রাইভার মালেক কাণ্ড নিয়ে পত্রিকাটি এদিন বেশ ক’টি প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরবার চেষ্টা করেছে।
দুর্নীতি কেন হয়? এমন প্রশ্নের কোনও সহজ উত্তর নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভাতা সব আকাশচুম্বী করে দিয়েছেন। এমনকি এই করোনাকালে সবাই সংকটে দিনানিপাত করলেও তাদের বেতন, সুবিধা, পদন্নোতি কোনও কিছু আটকে থাকেনি। প্রত্যাশা ছিল বেতন ও সুযোগ সুবিধা বাড়ালে সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি কমবে। কিন্তু তা হয়নি।
বেশ কিছু মানুষ ধরা পড়ছে, মানুষ নানা কথা বলছে, টেলিভিশন টকশো গরম হচ্ছে। তিতাসের মিটার রিডার, রাজউকের নকশাকার, স্বাস্থ্যের স্টেনোগ্রাফার ও ডাইভাররা আলোচনায়। প্রশ্ন হলো এই তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরাই যদি এত টাকার মালিক হয়, এত এত সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে, তাহলে যারা উচ্চ পদে বসে সব কেনাকাটা, বদলি ও তদবিরে সই করেন, অনুমোদন দেন, তারা কত টাকা কামাই করছেন? এমন কথাও উঠছে, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদেরটা তবুও দৃশ্যমান হয়, কারণ তারা টাকাটা দেশেই বিনিয়োগ করে। কিন্তু শিক্ষিতরা ধরাছোঁয়া বা ট্রলের বাইরে, কারণ এদের টাকা উড়ে চলে যায় বেগম বাজার বা বিদেশের মাটিতে গড়া সেকেন্ড হোমে।   

দৈনন্দিন দুর্নীতির প্রকোপ কমানোর চেষ্টা করা হবে কিনা, সেটা রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন। সেই সদিচ্ছা আছে বলেই প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রায়ই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। আমরা বুঝতে পারছি দুর্নীতি কমানোর পথ আমাদের অজানাই থাকছে। দুয়েকজন ধরা পড়ে, কিছু শাস্তি হয়। অধিকাংশের পরিণতি আজানা থাকে। তাই দুর্নীতির সম্ভাব্য শাস্তি ও শাস্তির খরচ যদি প্রত্যাশিত আয়ের চেয়ে কম হয়, তাহলে দুর্নীতি নিবারণের কোনও সম্ভাবনাই থাকবে না। 

দুর্নীতি মানেই বেআইনি কাজ নয়। অনেক দুর্নীতির ঘটনায় নিশ্চয়ই আইন লঙ্ঘন করা হয়, কিন্তু আইন না ভেঙেও দুর্নীতি সম্ভব। সেগুলো আমরা দেখি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অযাচিত খরচে। আইন ও বিধি এমনভাবে করা যে কর্মকর্তারা টাকা মারেন বিধির ভেতরে থেকেই। 

দুর্নীতি হয় যোগসাজশে। দুর্নীতিবাজ যে স্তরেরই হোক না কেন, কেউ এককভাবে দুর্নীতি করে না বা করতে পারে না। স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাড়িচালকও তাই। এটা সরকারি পরিদফতর বা অধিদফতরগুলোর একটি স্বাভাবিক বিষয়। এমন একটা প্রশাসনিক ব্যবস্থা কায়েম করা সম্ভব হয়নি, যেখানে কর্মীরা ভাববে, ‘কেউ ঘুষ খায় না, আমি খাই কী করে?’ বরং এখানে ঘুষ খাওয়ার ঝুঁকিটা কম, লোকের কাছে নাম খারাপ হওয়ার ক্ষতিটাও কম। 

দুর্নীতি কমাতে হলে প্রথম অবস্থায় আমাদের যেতে হবে। তা কী করে সম্ভব? যারা বলছেন কড়া নজরদারি এবং কঠিন শাস্তি দেওয়াই দুর্নীতিমুক্তির পথ, তারা এই জিনিসটাকে অতি সরলীকৃত করে ফেলছেন। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, চীনে শিরশ্ছেদ আর মৃত্যুদণ্ডও দুর্নীতি কমাতে পারেনি। বিষয়টি শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে ঘুষ খাওয়ার সুযোগ কমে যায়। 

আর হলো প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। ব্রিটিশরা চলে গেছে, তারা নিজেদের বদলে ফেলেছে, কিন্তু আমরা এখনও সেসব আঁকড়ে আছি। কোনও কোনও ক্ষেত্রে ঘুষখোর আর ঘুষদাতা দু’জনেই একই ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে যান সিস্টেমের কারণে। যত টাকায় জমি বেচেন, তত টাকা কাগজে দেখান না এবং এটা সিস্টেমেরই অংশ। সরকার সরকারি কর্মীদের বেতন বাড়ালো, কিন্তু কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করলো না। ফলে দুর্নীতি কমানোর এই সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। 

প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েও দুর্নীতি কমানো যায়। আমরা ডিজাটাল ডিজিটাল বলছি। কিন্তু কর দিতে, সনদ তুলতে, জমির কাজগপত্র ঠিক করতে, বিল দিতে এখনও সরকারি অফিসের লোকজনের সশরীরে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। এবং তাদের হওয়া মানেই তাদের খুশি করা। সত্যিকারের ডিজিটাল হলে সরকারি কর্মীদের ঘুষ খাওয়ার সুযোগ কমে যেতো। 

একজন সরকারি চাকরি পাওয়ার পর তার সম্পদের হিসাব নেওয়া এবং প্রতি বছর সেখানে কী পরিবর্তন ঘটছে তার দিকে নজরদারি রাখা প্রয়োজন। সরকারি কর্মীদের বদলি এবং পদোন্নতির নীতিতেও বড় পরিবর্তন আনা দরকার। সরকারি আমলাদের কাজের মূল্যায়নের সময়ে তাদের এলাকার কী কী উন্নতি হয়েছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। তার ভিত্তিতে বদলি, পদোন্নতি হতে হবে। ব্যবস্থা ঠিক থাকলে এলাকার উন্নতি আটকে পুকুর চুরি করে, সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়াবেন না, অবাধে ঘুষ খেতে পারবেন না। বরং আমরা দেখলাম নির্দেশ জারি হয়েছে যে, ওপরের কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলাও করা যাবে না।  

বাংলাদেশের প্রশাসনের পদ্ধতি এমনই যে, সরকারি যেকোনও কর্মীর যেকোনও একটি কাজ আটকে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তারা টাকা নেয় কাজ করে দেওয়ার জন্য, আবার টাকা দিয়েও কাজ হয় না। বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্যের এমন ব্যবস্থার পরিবর্তন না এনে যদি কোমর বেঁধে ঘুষখোর খুঁজতে নামি আর মালেকদের ধরে ট্রল করি তাহলে কিছুই হবে না। বদলি, পদন্নোতি নিয়ন্ত্রণ করে অর্থ আদায় করা, নিজে পাজেরো জিপ চালানো, পরিবারের ২৭ জনকে একই অধিদফতরে চাকরি দেওয়া, অধিদফতরের ক্যান্টিন নিজে চালানো এবং সেখানে আবার অফিসের লোকদেরই কর্মী বানানো সবকিছুই ছিল গাড়িচালক মালেকের জন্য নিরাপদ। অফিসের পরিবেশটাই এমন যে তার কাছে এটা অন্যায় মনে হয়নি, ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়নি। এভাবেই উৎপাদিত হয় একেকজন মালেক।  

সরকারি কর্মী মানেই অপরিমিত ক্ষমতাশালী। এই ভাবনা যাতে দৃঢ় না হয় সেজন্যই সংস্কার প্রয়োজন। সরকারি কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের একক ক্ষমতার পরিসর কমানো দরকার। সরকারি অফিসে যা হয় সেগুলো হলো সংঘটিত ও সংঘবদ্ধ দুর্নীতি। তাদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব এবং যথেচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার খর্ব করে, জনসেবা ব্যবস্থায় বিকেন্দ্রীকরণ এনে, নানা ধরনের রক্ষাকবচ তুলে দিয়ে একটা বিশ্বাসযোগ্য দুর্নীতি-প্রতিরোধী ব্যবস্থা করতেই হবে। দুর্নীতির প্রকোপ কমানো সম্ভব এবং তা করা হবে কিনা, সেটা অবশ্যই রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তার প্রশ্ন। 

লেখক: সাংবাদিক 

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ