আইইডিসিআর’র তথ্যে অসঙ্গতি কেন?

Send
মিজানুর রহমান
প্রকাশিত : ২২:২৯, মে ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৯, মে ০৪, ২০২০

আইইডিসিআর

দেশে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে দেশের মানুষকে অবহিত করতে প্রতিদিনই সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতর। আর এ তথ্যের জোগান দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন আরেকটি গবেষণা সংস্থা রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এখান থেকে সরবরাহকৃত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিদিন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডাটা (উপাত্ত) প্রদান করা হয়–যা সংবাদ প্রচার, গবেষণা ও তথ্য সংরক্ষণের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে, এসব ডাটায় নিয়মিতভাবে অসঙ্গতি পাওয়া যাচ্ছে, এমন অভিযোগ উঠেছে। এসব অসঙ্গতির কারণে ডাটা রিপোর্টিং ও পর্যালোচনায় নানাভাবে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে সাংবাদিক ও গবেষকদের।

বাংলা ট্রিবিউন গবেষণা বিভাগ বিস্তর অনুসন্ধান করে আইইডিসিআরের প্রেস রিলিজের ডাটায় কয়েক ধরনের অসামঞ্জস্যতা খুঁজে পেয়েছে।

ডাটায় অসামঞ্জস্যতার স্থানগুলো:

প্রেস রিলিজের দুটি সুনির্দিষ্ট স্থানে নিয়মিতভাবেই অধারাবাহিকতার প্রমাণ পাওয়া যায়।

১. টেস্টের মোট হিসাবে: শুরু থেকে কতগুলো টেস্ট করা হয়েছে এই সংখ্যাটিতে।

২. আক্রান্ত সংখ্যার জেলাভিত্তিক বণ্টনে। এই তথ্য প্রতিদিন আইইডিসিআরের ওয়েবসাইট থেকে প্রদান করা হয়ে থাকে। 

টেস্টের মোট সংখ্যায় অসামঞ্জস্য বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে 

এই অসামঞ্জস্যটি দেখা যায় শুরু থেকে নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত কতটি টেস্ট করা হয়েছে এই সংখ্যার পর্যালোচনায়। হিসাব করলে দেখা যায়, কোনও কোনও দিনে উল্লেখিত মোট টেস্টের সংখ্যা, ২৪ ঘণ্টায় করা মোট টেস্টের সংখ্যা এর পূর্ববর্তী দিনে ঘোষিত মোট টেস্টের যোগফলের সঙ্গে মেলে না। এ ধরনের অসামঞ্জস্য এই পর্যন্ত মোট ১৩ দিন পাওয়া গেছে।

প্রথম এই অসামঞ্জস্য দেখা যায় ১০ মার্চ। এদিন মোট টেস্টের সংখ্যা ৫টি বেশি লেখা হয়। তবে ১১ মার্চ মোট টেস্টের সংখ্যা পাঁচটি কম লিখে বিষয়টি ঠিক করা হয়। হ্রাস-বৃদ্ধি পরদিন ঠিক করার নজির পাওয়া যায় ৮ ও ৯ এপ্রিলও। ৮ এপ্রিল মোট টেস্টের সংখ্যায় পূর্ববর্তী দিনের হিসাবে ১০৬টি কম লেখা হয়। পরদিন অর্থাৎ ৯ এপ্রিল ১০৬টি বাড়িয়ে ব্যালেন্স করা হয়।

চার্ট-১: ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে প্রেস কনফারেন্সে ঘোষিত তথ্যের তফাৎ

সবসময় যে পরবর্তী দিনে সংযোজন বিয়োজন করে ঠিক করা হয়েছে তাও নয়। ১৭ মার্চ থেকে শুরু করে ৮ দিন এমন পাওয়া গেছে, যেসব দিনে টেস্টের সংখ্যা পূর্ববর্তী দিনের তুলনায় বাড়তি লেখা হলেও পরবর্তী সময়ে সেটি কমানো হয়নি। ১৭ ও ১৮ মার্চ যথাক্রমে ৯ ও ১৫টি টেস্ট বেশি লেখা হয়। ২২ মার্চ বেশি লেখা হয় ৬৬টি। ২৮ মার্চ ৩টি, ৩১ মার্চ বেশি লেখা হয় ১২৪টি। ২ ও ৩ এপ্রিল বেশি লেখা হয় যথাক্রমে ছয়টি ও চারটি এবং ৬ এপ্রিল বেশি লেখা হয় ২২৮টি।

অন্য ধরনের অসামঞ্জস্যতাও পাওয়া গেছে। যেমন, ২০ ও ২১ তারিখের প্রেস রিলিজে উল্লেখিত ২৪ ঘণ্টায় টেস্টের সংখ্যা এবং মোট টেস্টের সংখ্যা সম্পূর্ণ একই। উভয় ক্ষেত্রে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৩৬ ও ৪৩৩।

এসব অসামঞ্জস্যতা পরবর্তী সময়ে ঠিক করে না নেওয়ার কারণে বর্তমানে দৈনিক হিসাবে প্রকৃত মোট টেস্টের চেয়ে প্রেস রিলিজে উল্লেখিত মোট টেস্টের সংখ্যা নিয়মিত ৪১৯টি বেশি লেখা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, প্রকৃত মোট টেস্টের সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে প্রতিদিন উল্লেখিত ২৪ ঘণ্টায় করা টেস্টের সংখ্যাগুলোকে যোগ করে।

এ ধরনের অসামঞ্জস্যতা খুব বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। কারণ, আগের দিনের সঙ্গে অধারাবাহিক ডাটা পাওয়া গেলে সেটি সংশোধনের ক্ষেত্রে দুটি প্রশ্ন দাঁড়ায়। এক. মোট সংখ্যাকে সঠিক ধরে ২৪ ঘণ্টার টেস্টের সংখ্যাকে ঠিক করা হবে, নাকি দুই. ২৪ ঘণ্টায় টেস্টের সংখ্যাকে ঠিক ধরে মোট সংখ্যাকে ঠিক করা হবে?

কোভিড-১৯ সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় অনলাইন ব্রিফিংয়ে চলে যায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। আজ রবিবার এই ব্রিফিংয়ে বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা।

মোট শনাক্তের সংখ্যা ও জেলাভিত্তিক মোট সংখ্যার ব্যবধান বেড়েই চলছে

আইইডিসিআর সংক্রমণের জেলাভিত্তিক বণ্টনের ডাটা দেওয়া শুরু করে ৯ এপ্রিল থেকে। কেবল প্রথম দিনই সারা দেশে মোট সংক্রমণের সংখ্যার সঙ্গে জেলাভিত্তিক সংক্রমণের তথ্য যোগ করে পাওয়া মোট সংখ্যাটি মিলেছিল। এ দিন দুটি সংখ্যাই ছিল ৩৩০। এরপর আর কোনোদিন এই দুটি সংখ্যা মেলেনি। বরং এই দুই সংখ্যার ব্যবধান প্রতিদিনই ক্রমশ বেড়েছে। সর্বশেষ ১ মে তারিখের ডাটা মোতাবেক এই ব্যবধান ৯৭৮। অর্থাৎ মে মাসের ১ তারিখ মোতাবেক যতজন আক্রান্ত ও শনাক্ত হয়েছেন তাদের ৯৭৮ জনের জেলার তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রতিদিনের এই ব্যবধান টেবিল ২-এ তুলে ধরা হলো।

টেবিল-১: জেলা থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মূল তথ্যের তফাৎ

এই সংখ্যাটি অনেক বড় হওয়ার কারণে ধারণা করা হচ্ছে, এটি জেলাভিত্তিক সংক্রমণের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষকে ভুল তথ্য দিচ্ছে। একইসঙ্গে এত বেশি ডাটাকে বিবেচনার বাইরে রেখে গবেষকদের জন্য জেলাভিত্তিক সংক্রমণের সঠিক গতিপথ অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ছে। 

কিছু জেলায় আগের দিনের চেয়ে মোট সংক্রমিতের সংখ্যা কমেছে!

জেলাভিত্তিক আরেকটি ভিন্ন পর্যালোচনায় দেখা যায়, কোনও কোনও দিন কিছু কিছু জেলায় মোট সংক্রমিতের সংখ্যা আগের দিনের তুলনায় কম দেখানো হচ্ছে। এমন অসামঞ্জস্য এ পর্যন্ত ১০ এপ্রিল, ১৫ এপ্রিল, ১৭ এপ্রিল, ২০ এপ্রিল, ২১ এপ্রিল, ২২ এপ্রিল, ২৫ এপ্রিল, ২৬ এপ্রিল ও ৩০ এপ্রিল দেখা গেছে। দেশের ১৬টি জেলা, যথা বাগেরহাট, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, গাইবান্ধা, গাজীপুর, গোপালগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, মাদারীপুর, মুন্সিগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, রাজবাড়ী, রাজশাহী ও ঠাকুরগাঁও জেলায় অন্তত একদিন হলেও এ ধরনের অনিয়ম দেখা গেছে। ২৫ এপ্রিল এক দিনে এমন অনিয়ম সর্বোচ্চ পাঁচটি জেলায় দেখা যায়। যাতে আগের দিনের চেয়ে ৩৮টি সংক্রমণ কমার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এদিন কেবল গাজীপুর জেলার মোট সংক্রমণের সংখ্যা আগের দিনের চেয়ে ৩৩টি কমিয়ে দেওয়া হয়। ২৪ এপ্রিল গাজীপুরে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ২৯৪ জন, একদিন পর, অর্থাৎ ২৫ তারিখ এই সংখ্যা লেখা হয় ২৬১ জন।

টেবিল-২: আগের দিনের সঙ্গে জেলাভিত্তিক তথ্যের তফাৎ

গত ৩০ এপ্রিলও এই অনিয়ম দেখা যায়। এদিন গোপালগঞ্জে সংক্রমণের মোট সংখ্যা এর আগের দিন (২৯ এপ্রিল) উল্লিখিত মোট সংখ্যার চেয়ে ৭টি কমে যায়। ২৯ এপ্রিল গোপালগঞ্জে সংক্রমিতের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৫২ জন, ৩০ এপ্রিল এই সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৪৫ জন। অন্যান্য জেলার ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিবর্তন এক থেকে তিন জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। জেলাভিত্তিক সংক্রমণ আগের দিনের তুলনায় কমে যাওয়ার চিত্র দেখুন, যা তুলে ধরা হয়েছে টেবিল ২-এ।

১৫ ও ১৬ এপ্রিলের তথ্যে ভুতুড়ে পরিবর্তন

গত ১৫ ও ১৬ এপ্রিল আইইডিসিআর-এর দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী,  ওই দু’দিনের আগের ২৪ ঘণ্টায় ( ১৪ ও ১৫ এপ্রিলের তথ্য) শনাক্তের সংখ্যা যথাক্রমে ২১৯ ও ৩৪১। কিন্তু আইইডিসিআরের ওয়েবসাইটে (iedcr.gov.bd) এই দুই দিনে শনাক্তের সংখ্যা দেখানো হয়েছে যথাক্রমে ২৬৮ এবং ২৯২। উল্লেখ্য, দুটি ক্ষেত্রেই যোগফল ৫৬০। অর্থাৎ এই দুই দিনে মোট শনাক্তের সংখ্যায় কোনও পরিবর্তন হয়নি। তবে একই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তা আলাদা করে লেখা হয়েছে। দুটি মাধ্যমে দেওয়া তথ্যের কোনটি সঠিক তা নিয়ে পরবর্তী সময়ে কোনও সংশোধনীও দেয়নি আইইডিসিআর। 

 

চার্ট-২: ১৫ ও ১৬ এপ্রিল ঘোষিত তথ্যে ভুতুড়ে পরিবর্তন

গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গবেষক ও চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী আতিক আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “গবেষণার জায়গা থেকে মোট সংখ্যা না মেলা ভয়ঙ্কর ইনএফিসিয়েন্সি। দেশের এই অবস্থায় এত বড় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের এই ‘মিসম্যাচ’ হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। তাদের এখন পরিষ্কার করে বলা দরকার কী কারণে সংখ্যায় পার্থক্য হচ্ছে।”

তিনি অভিযোগ করেন, “রোগীদের জেলাভিত্তিক ম্যাপ করতে গিয়ে যখন পর পর দুই দিন মোট নম্বর (সংখ্যা) মেলেনি তখন এটা আর এগুতে পারেনি।”

রোগীর তথ্য থাকা কতটা জরুরি জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেকোনও বিষয়েই ডেটা এক হওয়া উচিত, আর এ ধরনের মহামারির ক্ষেত্রে সেটি না হলে উপায় নেই। রোগীর মোট সংখ্যা কত সেটা যেমন দেশের জন্য জরুরি, তেমনি শনাক্ত হওয়া রোগী যদি আমাদের গণনার ভেতরে না আসে তাহলে তারা অন্যকে সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলবে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডেটার (উপাত্তের) সঙ্গে অমিল তিনিও পেয়েছেন উল্লেখ করে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, “যে ডেটা দেশের মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে সেটা সঠিকভাবে অ্যানালাইসিস করে দিতে হবে। এ নিয়ে হেলাফেলা করার সুযোগ তাদের নেই।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাংবাদিক এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, তথ্যগত এসব ভুল ও অনিয়ম দেখে দুটো সাধারণ ধারণা সামনে আসে। এক. তথ্য সংরক্ষণের পদ্ধতিগত বিষয়গুলো দায়সারাভাবে সম্পন্ন করছে আইইডিসিআর; অথবা দুই. সেখানে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে।  

আইইডিসিআর’র মন্তব্য

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিছু কিছু অভিযোগ আমরাও পেয়েছি। সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন স্যাম্পলের সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু জনবল বাড়েনি। ফলে কিছু কিছু সমস্যা হচ্ছে, সেগুলো অ্যাড্রেসও করা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে জানতে আইইডিসিআর’র পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরাজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার সঙ্গে চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি।

/জেএ/টিএন/এমওএফ/
টপ
X