সেকশনস

সর্ব অঙ্গে ব্যথা মলম দিবো কোথা?

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২০, ১৬:৫৩

রেজানুর রহমান সর্ব অঙ্গে ব্যথা, মলম দিবো কোথা? সময় বিবেচনায় অবস্থাটা বোধকরি এমনই দাঁড়িয়েছে। করোনার এই দুঃসহকালে যেখানে ধারণা করা হয়েছিল দেশের দুর্নীতিবাজ, নীতি নৈতিকতাহীন মানুষেরা এবার নিশ্চয়ই ভালো হয়ে যাবে। সৎ পথে পা বাড়াবে। কিন্তু কারোই ভালো হবার কোনও লক্ষণ নেই। বরং কে কত মন্দ হতে পারে তার একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। মন্দ মানুষ হওয়ার মধ্যেই যেন বাহাদুরি। মন্দ কাজকে অনেকে শিল্পের পর্যায়ে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্ব প্রতারক সাহেদ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কথায় বলে, চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনি। দুর্নীতিবাজ, লুটেরা, অসৎ চরিত্রের মানুষেরা যেন এই সত্যটাকে প্রমাণের ব্যাপারেই মরিয়া। দেশের স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর জনসমক্ষে যতই প্রকাশ হচ্ছে, দুর্নীতিবাজেরা ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অথচ এক চোর ধরা পড়লে অন্য চোরের সতর্ক হয়ে যাওয়ার কথা। আমাদের দেশে মোটেই তা হচ্ছে না। বরং একজন ধরা পড়লে অন্যেরা যেন আরও বেপরোয়া। আরও বলগাহীন। কেন এই অবস্থা? এই প্রশ্নের জবাবে অনেকে মন্তব্য করেছেন, রাজনীতির তথাকথিত বড় ভাইয়েরা এজন্য দায়ী! যারা সীমাহীন অন্যায় করেন তাদের প্রায় সকলেরই সাহসের খুঁটি রাজনৈতিক প্রশ্রয়। রাজনীতির বড় ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই অপরাধীরা এত বেপরোয়া। প্রতারক সাহেদ করিম তার জ্বলন্ত প্রমাণ।


অপরাধের বিচার না হলেই মূলত অপরাধীরা বেপরোয়া হয়। বাংলাদেশে ক্যাসিনো সংস্কৃতি চালু হয়েছে। অবৈধ ক্যাসিনোর আড়ালে চলছিলসীমাহীন অপরাধ কর্মকাণ্ড। অপরাধীদের ধরা হলো। শুধু দেশে নয় গোটা পৃথিবীতে এ নিয়ে তোলপাড় হলো। দেশের সাধারণ মানুষ আশায় বুক বাঁধলো এবার বোধকরি প্রিয় দেশটা অপরাধ মুক্ত হবে। কারণ শীর্ষ পর্যায়ের অপরাধীরা তো শেষ পর্যন্ত জেলে গেছে। ব্যস, এবার জেলে পচে মরুক...
কিন্তু এটা হলো মুদ্রার এক পিঠ। যা দেখেছে দেশের সাধারণ মানুষ। এক পিঠ দেখেই তারা আনন্দে আটখানা। কিন্তু মুদ্রার ওপিঠে কী যে কারবার চলছে তা জানার সুযোগ নেই। এই দেশে অপরাধী ধরা পড়লে একটু শোরগোল হয়। পরে সেটা আস্তে আস্তে থেমেও যায়। এই সুযোগে প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীরা জেল থেকে বেরিয়ে গেলেও তা নিয়ে আর শোরগোল হয় না। সে কারণে অপরাধ করে ধরা পড়ার পরও পুলিশের ভ্যানে ওঠার সময় দুর্ধর্ষ অপরাধীও বীরদর্পে হাতের দুই আঙুল উঁচিয়ে ‘ভি’ চিহ্ন দেখায়। অপরাধীদের অনেকে গ্রেফতার হওয়ার পর অসুস্থতার ভান করে। তখন ‘রাজনীতির তথাকথিত বড় ভাইদের কূটকৌশলে দেশের নামিদামি হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে আশ্রয়ের সুযোগ পায়। তারপর আর হাসপাতাল থেকে যায় না।

কয়েকদিন আগে দেশের একটি শীর্ষ দৈনিকে চাঞ্চল্যকর এক খবর বেরিয়েছে। খবরের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘নানা ছুতোয় আসামিরা হাসপাতালে’। খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, অবৈধ ক্যাসিনো কাণ্ডের অন্যতম নায়ক জি কে শামীম হাতের ক্ষত সারাতে অর্থাৎ হাতের অপারেশন করতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু হাসপাতালে এসে হাতের অপারেশন করেননি। হাসপাতালে ভর্তি হবার পর তার হাতের সমস্যা গিয়ে দাঁড়ায় বুকে এবং বুকে ব্যথার অজুহাতে দীর্ঘ ৪ মাস হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে দিন যাপন করছেন। বুকে ব্যথার কথা বলে দীর্ঘ প্রায় ৮ মাস ধরে একই হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে দিন যাপন করছেন যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। দুই দিনের কথা বলে জি কে শামীমকে কারাগার থেকে হাসপাতালে আনা হয়। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ৪ মাসে ছয় দফা চিঠি দিয়েও জি কে শামীমকে কারাগারে ফেরত পায়নি কারা কর্তৃপক্ষ। আর সম্রাটের ব্যাপারে ৮ মাসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ১১ দফা চিঠি দিয়েছে কারাগার কর্তৃপক্ষ। কোনও জবাব মিলেনি। শুধু জি কে শামী ও সম্রাটই নন নানা অপরাধে অভিযুক্ত একাধিক মামলার আসামি নানান অসুস্থতার অজুহাতে মাসের পর মাস হাসপাতালে আয়েশি জীবন যাপন করছেন। অপরাধী ধরা পড়ার পরও অন্যের মাঝে অপরাধ প্রবণতা না কমার এটি একটি বড় কারণ বলে অনেকে মনে করেন। ভাবটা এমন, পুলিশ গ্রেফতার করলে বড় জোর কারাগারে পাঠাবে। তারপর তো একটু অসুস্থতার ভান আর ‘বড় ভাইয়ের’ আশীর্বাদপুষ্ট ফর্মুলায় এক চিমটি অসুস্থতা এবং এক চিমটি আশীর্বাদ, মিশিয়ে রাজনৈতিক পাওয়ারের স্যালাইন বানিয়ে খেলেই পাওয়া যাবে অমরত্ব। আর তাই অপরাধীরা এতো বেপরোয়া, দুর্বিনীত। দেশের সব চেয়ে আলোচিত প্রতারক সাহেদ প্রতারণাকে একটা শিল্পের পর্যায়ে দাঁড় করিয়েছেন। এখানেও ত্রাতার ভূমিকা পালন করেছে রাজনীতির তথাকথিত বড় ভাইয়েরা। দেশের প্রায় সব স্তরের বিশিষ্ট মানুষজনদের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ ছবি আছে। যুক্তির খাতিরে কথা উঠতেই পারে–আরে ভাই এ ধরনের ছবি তোলা কি খুব কঠিন কাজ? মানছি কঠিন কাজ নয়। কিন্তু সাহেদ যে সব জায়গায় বিশিষ্টজনদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন সেই সব জায়গায় উপস্থিত হতে পারাও একটি যোগ্যতা। সাহেদ এই যোগ্যতা পেলেন কীভাবে? কে দিলো তাকে এই যোগ্যতা? পত্রিকায় পড়লাম সাহেদকে যখন ঢাকার বাইরে থেকে গ্রেফতার করে আনা হয় তখন নাকি তিনি র‌্যাবের সদস্যদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিল আপনারা আমাকে বেশিদিন আটকে রাখতে পারবেন না। যদি ঘটনা সত্যি হয় তাহলে আরও কঠিন প্রশ্ন থেকেই যায় প্রতারক সাহেদের এই হম্বিতম্বির সাহস কে জোগায়? প্রসঙ্গক্রমে সাহেদকে ঘিরে একটি কার্টুন চিত্রের উল্লেখ করছি।কার্টুনে দেখা যাচ্ছে নদীতে মাছরূপী সাহেদ ও সাবরিনা জেলের জালে আটকা পড়েছেন। কিন্তু প্রতারণার কাজে তাকে সহায়তাকারী বড় বড় মাছ লাফিয়ে লাফিয়ে জাল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। খুবই মিনিংফুল কার্টুন। একথা সত্য, সাহেদ একা এতবড় প্রতারণার জাল ফেলেননি। সঙ্গে আরও অনেকে ছিল। সাহেদের পাশাপাশি তাদের সাজা না হলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে অনেকের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, শেষ পর্যন্ত সাহেদেরও কি সর্বোচ্চ সাজা হবে? নাকি তিনিও আইনের ফাঁক গলিয়ে পার পেয়ে যাবেন অথবা শারীরিক অসুস্থতার ভান করে সরকারি হাসপাতালের আরামদায়ক বিছানায় শুয়ে শুয়ে আপন মনে খিচতি আওড়াবেন–এখন দেখি তোরা আমার কী করতে পারিস?
অপরাধী যখন এ ধরনের আস্ফালন করে তখন বুঝতে হবে তার খুঁটির জোর আছে। তার সঙ্গে কোনও না কোনও পর্যায়ের ক্ষমতাবান ‘বড় ভাই’আছে। সময় এসেছে তথাকথিত এই বড় ভাইদের ব্যাপারেও ব্যবস্থা গ্রহণের। তা নাহলে প্রকৃত অর্থে অপরাধীরা শাস্তি পাবে না। সাধারণজনগণ আশ্বস্ত হবে না। স্বস্তিও পাবে না।
করোনার মহা আতংক সত্ত্বেও দুর্নীতিবাজরা কোনোভাবেই থামছে না। একটি পত্রিকায় কোরবানির হাট নিয়ে খবর বেরিয়েছে। খবরের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, কোরবানির হাটকে কেন্দ্র করে তৎপর হয়ে উঠেছে মৌসুমি চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীরা। অর্থাৎ এই দেশে মৌসুমভিত্তিক চাঁদাবাজেরও আবির্ভাব হয়। অবাক কাণ্ড। সরকারের দুর্নীতিবিরোধী ব্যাপক তৎপরতা সত্ত্বেও দুর্নীতি কমছে না। বরং দুর্নীতির নতুন নতুন চেহারা উন্মোচিত হচ্ছে। একটি পত্রিকায় দেখলাম বিদ্যুৎ নিয়ে হয়রানির ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্মচারী গ্রাহকের বাড়ি বাড়ি না গিয়ে অফিসে বসেই গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল তৈরি করেছেন। ফলে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়েছে। এই অনিয়মের সঙ্গে গ্রাহক মোটেই জড়িত নয়। অথচ গ্রাহককেই বিদ্যুৎ বিল সংশোধনের জন্য দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণেরও অভিযোগ উঠেছে কোথাও কোথাও।
করোনার এই সংকটকালে পেশা হারিয়েছে অনেক মানুষ। বেকার হয়ে গেছে অনেকে। সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ের চাকরিজীবীদের মধ্যে বেতনের ক্ষেত্রে বিরাট বৈষম্য দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দুর্নীতির লাগাম যদি টেনে না ধরা যায় তাহলে দিনে দিনে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়তে থাকবে। কাজেই সময় থাকতেই সংশ্লিষ্ট সকল মহল এক্ষেত্রে আন্তরিক হবেন আশা করি।
প্রিয় পাঠক, পবিত্র ঈদের শুভেচ্ছা নিন। দেশকে ভালোবেসে ভালো থাকুন সকলে। ঈদ মোবারক।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

 
 
/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

করোনার যুগেও জনসমুদ্র!

করোনার যুগেও জনসমুদ্র!

আজ ভালোবাসার জন্মদিন

আজ ভালোবাসার জন্মদিন

মেয়েদের ছেলে বন্ধু!

মেয়েদের ছেলে বন্ধু!

ভুল মানুষের ডাকে ভুল পথে...

ভুল মানুষের ডাকে ভুল পথে...

নির্ভরতার ছাদগুলো সরে যাচ্ছে!

নির্ভরতার ছাদগুলো সরে যাচ্ছে!

ভালো আর আলো নিয়ে কথা!

ভালো আর আলো নিয়ে কথা!

এসব কীসের আলামত?

এসব কীসের আলামত?

কে শোনে কার কথা?

কে শোনে কার কথা?

সাকিব কেন ‘ক্ষমা’ চাইলেন?

সাকিব কেন ‘ক্ষমা’ চাইলেন?

যুক্তরাষ্ট্রেও ভোট চুরি হয়?

যুক্তরাষ্ট্রেও ভোট চুরি হয়?

ভয় কি পেলো অন্য যুবরাজেরা!

ভয় কি পেলো অন্য যুবরাজেরা!

এইখানে এক নদী ছিল

এইখানে এক নদী ছিল

সর্বশেষ

শিশু গৃহকর্মীর গায়ে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা!

শিশু গৃহকর্মীর গায়ে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা!

হারানো টাকা উদ্ধারে ‘চালপড়া’ খাইয়ে সন্দেহ, নারী শিক্ষকের জিডি

হারানো টাকা উদ্ধারে ‘চালপড়া’ খাইয়ে সন্দেহ, নারী শিক্ষকের জিডি

হ্যান্ডকাপ খুলে পালিয়েছে মাদক ব্যবসায়ী, চলছে চিরুনি অভিযান

হ্যান্ডকাপ খুলে পালিয়েছে মাদক ব্যবসায়ী, চলছে চিরুনি অভিযান

কারাগারে লেখক মুশতাকের মৃত্যু, মধ্যরাতে বিক্ষোভ

কারাগারে লেখক মুশতাকের মৃত্যু, মধ্যরাতে বিক্ষোভ

আপত্তির মুখে দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলার অনুমোদন

আপত্তির মুখে দেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা খোলার অনুমোদন

সংকট সামলাতে এলএনজি সরবরাহ বাড়ছে

সংকট সামলাতে এলএনজি সরবরাহ বাড়ছে

নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়েও এবার তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী তারা

ডিরেক্টরস গিল্ড নির্বাচন ২০২১নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়েও এবার তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী তারা

৬ বছর পর রাণীনগর আ. লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন

সভাপতি হেলাল সা. সম্পাদক দুলু৬ বছর পর রাণীনগর আ. লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন

ভেঙে পড়া গাছচাপায় নিহত ২

ভেঙে পড়া গাছচাপায় নিহত ২

প্রক্টর কার্যালয়ে শিক্ষার্থীকে পেটালো ছাত্রলীগকর্মী

প্রক্টর কার্যালয়ে শিক্ষার্থীকে পেটালো ছাত্রলীগকর্মী

ভবনের প্ল্যান পাস করিয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা

ভবনের প্ল্যান পাস করিয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১১ কোটি ৩২ লাখ ছাড়িয়েছে

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১১ কোটি ৩২ লাখ ছাড়িয়েছে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.