X
শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১, ৩১ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

এই শ্রাবণে অশ্রুর আগস্টে বিষণ্ন ভাবনাগুলো

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২১, ২২:৩২

নাসির আহমেদ মানুষের জীবনে সুসময়-দুঃসময় দুই-ই থাকে। সময়ের আবর্তে আলো-অন্ধকার আর সুখ-দুঃখের এই উত্থান-পতন। যে কারণে পর্বতপ্রমাণ বিষাদ বেদনার ভারেও স্তব্ধ হয়ে যায় না জীবন। নিরন্তর বহমান বলেই এই বিশ্বসংসার আজও টিকে আছে। আমাদের জাতীয় জীবনের এক চরম বেদনাবিধুর বিপর্যয়ের মাস আগস্ট। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার কালো স্মৃতিবিজড়িত এই মাস। সদ্য স্বাধীন এই বাংলাদেশকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা উল্টো পথে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, যে পথ স্বাধীনতা বিরোধীদের পছন্দ, যে পথ আন্তর্জাতিক পরাশক্তির পছন্দ, যে পথ সাম্প্রদায়িকতার পুঁজিবাদীদের শোষণ প্রক্রিয়ায় চলার পথ। বঙ্গবন্ধুর মতো মহান নেতাকে হত্যা করেও বাংলাদেশকে তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রচিন্তার পথ থেকে চিরতরে সরানো যায়নি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে হলেও বাংলাদেশ তার মুক্তিযুদ্ধের সড়ক ধরেই চলার সুযোগ ফিরে পেয়েছে।

কিন্তু তারপরও ১৫ আগস্ট এমন এক অমোচনীয় ক্ষত, যা কোনও কিছুতেই মুছে ফেলা যাবে না। শ্রাবণের অঝর ধারার বৃষ্টিভেজা ১৯৭৫ সালের সেই ১৫ আগস্ট যেন চিরদিনের কান্নার স্মৃতি হয়ে আছে বাংলার মানুষের জীবনে। এই মাস যেন কেবলই বিপর্যয়ের মাস। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার পথে যত বাধা তার সবকিছুই যেন এই আগস্ট থেকে সৃষ্ট। সে প্রসঙ্গে আলোচনা করার আগে এ তথ্যও ভুলে যাবার নয় যে আগস্ট বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মহাপ্রয়াণেরও স্মৃতিবিজড়িত মাস।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের যে চরিত্র হনন ঘটেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ১৭ ও ২১ আগস্ট ঘটে যাওয়া জঙ্গিবাদ আর রাজনৈতিক নৃশংসতার কালো স্মৃতিবিজড়িত দুটি দিনও বিস্মরণ সম্ভব নয়। বাংলাদেশের নিকট ইতিহাসের ভয়াবহ বিপর্যয় ও কলঙ্কের স্মৃতি জড়িয়ে আছে আগস্টের ওই তারিখ দুটির সঙ্গে।

সে বিষয়টি বিস্তারের আগে স্মরণীয় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ও তাদের জ্যেষ্ঠপুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালের জন্মদিন। শোকের মাস আগস্টেই গভীর ভালোবাসা আর পরম শ্রদ্ধায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারীরা পালন করেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব (৮ আগস্ট) ও শেখ কামালের (৫ আগস্ট) জন্মদিন। আবার সেই আগস্টেই ঘাতকচক্রের হাতে অকালে জীবন প্রদীপ নিভে গেলো আগস্টের জাতক মা এবং পুত্রের!

বঙ্গবন্ধুর জীবনের সব সংগ্রামে-সংকটে বঙ্গমাতার ধৈর্য, নিষ্ঠা আর সহনশীলতা যে কী বিশাল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে, তার কোনও তুলনা নেই। খোকা থেকে শেখ মুজিব, শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধু থেকে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে বঙ্গমাতার অপরিসীম ত্যাগ আর সহযোগিতার কথা আজ সর্বজনবিদিত। বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন থেকেই বঙ্গমাতা সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করেছেন। সে কথা গভীর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বারবার উল্লেখ করেছেন।

ষাটের দশকে যখন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের শীর্ষতম অবস্থানে, স্বাধিকারের সংগ্রাম যখন স্বাধীনতার পথে যাত্রা করেছে, জেনারেল আইয়ুব সরকারের কোপানলে পড়েছেন ছয় দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে, তখন জেল-জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। মায়ের পাশাপাশি সেই চরম সংকটময় দিনগুলোতে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও রাজপথের আন্দোলন সংগঠনে শেখ কামালও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এক কথায় বলতে গেলে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামে সংকটে তাঁরা ছিলেন বিরাট অনুপ্রেরণার উৎস। জন্ম মাস আগস্টেই মা এবং পুত্রকে সেই কাল রাতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেই শাহাদাতবরণ করতে হলো। তাই আগস্ট এলে বাঙালির মন বিপন্নতার বোধে আক্রান্ত না হয়ে পারে না।

কোন পর্যায়ের নৃশংসতার বোধ থাকলে স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পাশাপাশি তাঁর স্বজন-পরিজন, নারী-শিশুসহ ১৬ জন মানুষকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করা যায়, তা অবশ্যই ভাবনার বিষয়।

কেন এমন নৃশংসতা? কেনই বা তাকে হত্যার জন্য ওই সময়টাই বেছে নেওয়া হয়েছিল, যখন তিনি বাংলাদেশকে একটি নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার পথে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি এ দেশে কৃষক-শ্রমিক মেহনতী মানুষ, তথা দরিদ্র মানুষের সরকার কায়েম করতে চলেছিলেন, ডাক দিয়েছিলেন দ্বিতীয় বিপ্লবের।

এই নৃশংসতা আর হত্যার সময়-পরিকল্পনার আলোকে অনুসন্ধান করলে বেরিয়ে আসে বঙ্গবন্ধু এবং তার স্বজন-পরিজনদের প্রতি ভয়ংকর ক্রোধের কারণও। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড নিয়ে গত চার দশকে অনেক অনুসন্ধানী গবেষণা হয়েছে, তাতে দেশের অভ্যন্তরের স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের ভূমিকা যেমন স্পষ্ট, তেমনি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মুখোশও অনেকখানিই উন্মোচিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তৎকালীন বহু গোপন নথিপত্র এবং বিধিমাফিক ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের অনেক গোপন প্রতিবেদন ইতোমধ্যে উন্মুক্ত হয়েছে। তাতে ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে কীভাবে কারা যুক্ত ছিল এবং হত্যার মূল উদ্দেশ্য অনেকটাই উন্মোচিত।

কেন বঙ্গবন্ধুর সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠন শান্তিপূর্ণভাবে করতে পারছিলেন না, স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দেশের অভ্যন্তরে নানামুখী সন্ত্রাস এবং নৈরাজ্যের কেন এত ডামাডোল বেজে উঠেছিল, তার কারণও অনেকটাই এখন স্পষ্ট। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে জাসদের জন্ম হলো, কেন সিরাজ সিকদার, তোহা প্রমুখ অতি বাম রাজনীতিকেরা নানারকম বাহিনী সৃষ্টি করে সারাদেশে ‘শ্রেণিশত্রু’ খতমের নামে গলাকাটার রাজনীতি শুরু করেছিল? এসব ঘটনার পেছনে সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র যে ছিল, তাও বেরিয়ে আসছে ক্রমান্বয়ে!

অকাল প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের গবেষণামূলক একটি গ্রন্থে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নীলনকশা ঢাকায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সিআইএ’র প্রত্যক্ষ মদতে প্রণীত হয়েছিল, তার বহু তথ্য পাওয়া যায়, যা পড়লে চমকে উঠতে হয়। বইটিতে দালিলিক তথ্য-প্রমাণসহ এসব ষড়যন্ত্র তুলে ধরা হয়েছে। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজের গ্রন্থেও এ সংক্রান্ত বহু তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

আজ সময় এসেছে বঙ্গবন্ধু হত্যার পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে একটি ট্রুথ কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে এই হত্যার নেপথ্য কুশীলবদের মুখোশ জাতির সামনে উন্মোচন করার।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও জানা দরকার হাজার বছরের পরাধীন জাতিকে যিনি প্রথম একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকারী করলেন, কী ছিল তার স্বপ্ন এবং জীবন সাধনা? জানতে হবে এ দেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতির ৫৫ বছরের স্বল্প পরিসর জীবনের চরম ত্যাগ স্বীকার আর অসামান্য অবদানের ইতিহাস। আর কেনই বা এমন মহান ত্যাগী নেতাকে সপরিবার হত্যা করতে হলো এমন নির্মমভাবে!

সুখের কথা, ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে কুশীলবদের খুঁজে বের করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন, আইনমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেও স্পষ্ট হয়েছে যে এ সংক্রান্ত দলনিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

বিভাজনের যে কালো রেখা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঐক্যবদ্ধ অস্তিত্বের মর্মমূলে পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এঁকে দেওয়া হয়েছে, সেই কলঙ্ক থেকে যতদিন বাঙালির মুক্তি না ঘটবে, ততদিন ১৫ আগস্ট অবিস্মরণীয় বেদনাবহ স্মৃতির পাশাপাশি প্রতিরোধের দুর্জয় শক্তি নিয়েও জাগ্রত থাকবে বাঙালির জাতিসত্তায়। অনেকে বলবেন ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচারের মধ্য দিয়ে কলঙ্ক মুছে গেছে। এটা আংশিক সত্য, পূর্ণ সত্য নয়। কারণ, পনেরো আগস্টের পরে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির যে পুনরুত্থান ঘটেছে, তা থেকে দেশ আজও  মুক্ত নয়। আর সে কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যার অভিঘাত ভয়াবহ ক্ষতের সৃষ্টি করেছে আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের মর্মমূলে।

১৫ আগস্টের ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শুধু একজন রাষ্ট্রপতিকে হত্যা কিংবা আওয়ামী লীগের মতো একটি রাজনৈতিক দলকেই ক্ষমতাচ্যুত করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক দর্শনের প্রগতিশীল রাষ্ট্রের স্বাপ্নিক অস্তিত্বকে। বরং হত্যাকারীরা ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল মৃত পাকিস্তানের সেই সামরিক ধর্মান্ধতা কবলিত অপরাজনীতি, যা গণতন্ত্র এবং সাধারণ মানুষের চিরশত্রু। সে কারণে ১৫ আগস্ট ভোরেই ঘাতকরা বাংলাদেশ বেতার দখল করে মুহূর্তের মধ্যে নাম পাল্টে দিয়ে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ এবং ‘জয় বাংলা’র স্থলে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দিয়ে পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশকে নাম বদল করে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ ঘোষণা করেছিল। যদিও তারা শেষ পর্যন্ত টিকেনি।

পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার এ দেশীয় এজেন্ট এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদতে সেদিন যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল এবং যারা এই হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত, তারা একটি ক্যামোফ্লাজ তৈরি করেছিল। তা হলো, তাদের মধ্যে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কিছু লোকও ছিল। ফলে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র যে তাকে হত্যা করেছে, এ নিয়েও বিভ্রান্তির কুয়াশা সৃষ্টির একটা অপচেষ্টা ১৯৭৫ থেকে আজও পর্যন্ত চলছে। এর কারণ এই হত্যা-পরিকল্পনায় জড়িত এবং হত্যার সরাসরি বেনিফিসিয়ারি খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধু সরকারের একজন প্রবীণ মন্ত্রী। হত্যা চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমানও। তাই ঘাতকরা বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ পেয়েছিল। খন্দকার মোশতাক যে পাকিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ দালাল ছিল, সেটি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই কলকাতায় ধরা পড়েছিল। তারপরও বঙ্গবন্ধুর সরল বিশ্বাসে মন্ত্রিপরিষদেও সে ঠাঁই পেয়েছিল। মোশতাক যেমন মুজিবনগর সরকারের অংশী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, তেমনি এক সময়ের পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সদস্য জিয়াউর রহমানও মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার। তারা দুজনই বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের পৃষ্ঠপোষক এবং সমর্থক।

জিয়া-মোশতাকের কার্যকলাপ থেকেই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা দৃশ্যমান। ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের তারা সমর্থন করেছেন, ৩ নভেম্বর জেলহত্যার পর প্রাইজ পোস্টিং দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ মিশনে এসব ঘাতককে পুনর্বাসিত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে অল্প সময় খন্দকার মোশতাক প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। জিয়া সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে পদোন্নতি নিয়ে হয়েছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান।

১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের বিচার বন্ধ করতে জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি সংবিধানে লিপিবদ্ধও করেছিলেন জিয়াউর রহমান।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জিয়ার মতো অনেকেরই স্খলন পরবর্তীকালে আমরা লক্ষ করেছি। যে কারণে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক মুক্তিযোদ্ধাদের (!) সমাবেশ-সম্মেলনও দেশবাসীকে দেখতে হয়েছে! অথচ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত শুধু বিরোধিতাই করেনি, পাক বাহিনীর সশস্ত্র সহায়ক শক্তি হয়ে আলবদর বাহিনী গঠন করে তারা অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে বাংলার মাটি সিক্ত করেছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পূর্বাপর ঘটনার দিকে তাকালে দেখা যাবে, ঘাতকচক্র তাকে তখনই হত্যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলেছে, যখন তিনি সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সমাজকাঠামোয় বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে শুরু করেন, অর্থাৎ কৃষক এবং শ্রমিকের রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য তিনি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠনের মধ্য দিয়ে প্রশাসন এবং অর্থনীতি নতুন বিন্যাসে পুনর্গঠন  করছিলেন।

পুঁজিপতি, ভূস্বামী, সামরিক-বেসামরিক আমলা থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের দর্শনে বিশ্বাসীরা বঙ্গবন্ধুর এই কৃষক-শ্রমিকের ক্ষমতায়ন বা রাষ্ট্র প্রশাসন ব্যবস্থা মেনে নিতে পারেননি। আর মার্কিন পরাশক্তি তো আগে থেকেই বিরূপ ছিল বঙ্গবন্ধুর ওপর। কারণ, সোভিয়েত এবং ভারতের সমর্থনপুষ্ট হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত বাংলার সংগ্রামী জনতা। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনেও সোভিয়েত ইউনিয়নের নানামুখী সহযোগিতা গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সরকার। এমনকি বঙ্গবন্ধু সরকার সংবিধানে  চার নীতির স্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ করেছিলেন সমাজতন্ত্র।

যে কারণে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যেমন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের চোখের বালি ছিল, নেতা হিসেবে বিশ্বের দুজন মানুষকে তিনি চরম শত্রু বিবেচনা করতেন, একজন চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দে এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই দুই নেতা খুব কাছাকাছি সময়ে আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়, কিশোর বয়স থেকেই শ্রেণিচেতনা বঙ্গবন্ধুর মধ্যে জাগ্রত ছিল। কৈশোরে তিনি রুশ বিপ্লবের অভিঘাতে সৃষ্ট বিশ্ববাস্তবতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লব সফল হলে সমগ্র পৃথিবীতে এমনকি এই উপমহাদেশেও তার প্রবল প্রভাব সৃষ্টি হয়। কাজী নজরুল ইসলামের মতো কবি কমিউনিস্ট দর্শনে উজ্জীবিত হয়ে শ্রেণি-সংগ্রামের কবিতা লিখেছেন, শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষের মুক্তির বাণী তার কাব্যে গানে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু তার কৈশোরেই দেখেছেন শোষণ-বঞ্চনায় দরিদ্র কৃষক শ্রমিকের দুঃখ দুর্ভোগ। তাদের ক্ষমতায়িত করবার স্বপ্ন তার মনে দোলা দিয়েছিল রাজনীতিতে আসার আগেই। যে কারণে শীতার্ত মানুষকে নিজের গায়ের চাদর খুলে দান করে দেওয়া, পিতার গোলার ধান দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করা- এসবের পেছনে তার মূল প্রেরণা ছিল শোষণমুক্ত সমতার সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা। যে কারণে পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তার মূল অভিযোগ ছিল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য। শোষণহীন সমাজ গঠন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানসহ তাদের মৌলিক অধিকারগুলো আদায় করে বাংলার মানুষকে মর্যাদাবান জাতি হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল তার আজীবন সাধনা।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল। মাত্র তিনটি বছর। এরইমধ্যে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন দেশে নতুন অর্থ ব্যবস্থা তথা নতুন প্রশাসনিক কাঠামো বিনির্মাণ করবেন। বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামোতে দরিদ্র মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই তিনি নয়া ব্যবস্থা তথা দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু গরিব দুঃখী মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সমতার সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা বঙ্গবন্ধু বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। তার আগেই তাঁকেও ঠিক আলেন্দের মতোই প্রাণ দিতে হলো।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করে আবার সেই পাকিস্তানি রাজনৈতিক দর্শন কবলিত অন্ধকার পথে। বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ করেছিলেন ধর্মের রাজনীতি, কিন্তু আবারও চালু হলো সেটি। তার বিষফল আজ ভোগ করছে এই দেশ। জঙ্গিবাদ মৌলবাদ আজ বাংলাদেশকে ভয়ংকর ঝুঁকির মুখে ঠেলছে। দেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় উঠেছে এই ধর্মান্ধতার সংঘর্ষ এবং ষড়যন্ত্রের রাজনীতি।

জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যেভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তার সেই অগ্রযাত্রার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চাৎপদতার অন্ধ রাজনীতি, যার কবর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রচনা করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এই লেখার শুরুতেই ১৭ আগস্টের কথা, ২১ আগস্টের কথা উল্লেখ করেছিলাম। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড না ঘটলে এ দেশে মৌলবাদ জঙ্গিবাদ আর তালেবানি রাজনীতির সমর্থক গোষ্ঠী সৃষ্টি হতে পারতো না। বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে সারাদেশে একযোগে ৬৩ জেলায় বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জঙ্গিরা জানান দিয়েছিল তাদের শক্তিমত্তা। জঙ্গি বাংলাভাইদের ব্যাপক উত্থান ঘটেছিল ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে! ২০০১ সালে নির্বাচনের আগে চারদলীয় জোটের জনসভা থেকেই ছাত্রশিবির-ছাত্রদল যৌথভাবে স্লোগান তুলেছিল: ‘আমরা হবো তালেবান/বাংলা হবে আফগান’। সেই স্লোগানের ফল আমরা দেখেছি চারদলীয় জোটের শাসনামলে! ওই আমলে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতাদের একযোগে হত্যার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দেখেছিলেন দেশবাসী বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ দলীয় কার্যালয়ের সামনের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াবহ সেই গ্রেনেড হামলার নৃশংসতার শোকাবহ কলঙ্কিত স্মৃতি কোনও দিন মুছে যাবে না দেশবাসীর মন থেকে। এর সবকিছুর মূলে ওই ১৫ আগস্ট।

নববর্ষে বোমা হামলা বলুন, হলি আর্টিজান হামলা বলুন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদেশি নাগরিক, ধর্মযাজক, পুরোহিত হত্যার মাধ্যমে দেশকে বিপদে ফেলার ষড়যন্ত্র আর গোপন তালিবানি সন্ত্রাসের রাজনীতিই বলুন, সবকিছুর মূলেই বাংলাদেশের পথ হারানো ১৯৭৫ সালের আগস্ট ট্র্যাজেডি। ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড না হলে বাংলাদেশে কখনও জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ বাসা বাঁধতে পারতো না।

১৫ আগস্ট অতিক্রান্ত। একাধিক শোক আর লজ্জার ঘটনা বেদনার কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকবে আমাদের মর্মলোকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রত্যক্ষ ঘাতকদের বিচার হয়েছে, একদিন নেপথ্য ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হবে। কিন্তু যে ভয়ংকর ক্ষতি হয়ে গেছে দেশের, সেই ক্ষত মোছা যাবে না কোনোদিন। জানি না বিভাজিত জাতি কবে আবার ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে। দেশে বহু পথ বহু দলমতের রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকবে, কিন্তু লাখো শহীদের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু- এই অবিতর্কিত বিষয়টিকে একই অবস্থান থেকে দেখার মতো রাজনীতি কবে দেশে সূচিত হবে জানি না। সেই পরিবর্তিত রাজনীতি ছাড়া দেশের ঐক্যবদ্ধ উন্নয়নের পথে যাত্রা সুদূরপরাহত।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তার জন্মদিন উপলক্ষে লিখেছিলেন বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘সভ্যতার সংকট’। যে ইংরেজদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, সাহিত্য আর ভদ্রতা-নম্রতা, সৌজন্যবোধ যৌবনে তাকে মুগ্ধ করেছিল, জীবন সায়াহ্নে সেই ইংরেজ তথা ব্রিটিশ শাসকদের ঔদ্ধত্য, ভারতবর্ষকে শাসনে-শোষণে জর্জরিত করা আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের উন্মাদনায় হতাশ রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করে লিখেছিলেন:

‘ভাগ্যচক্রের পরিবর্তনের দ্বারা একদিন না একদিন ইংরেজকে এই ভারত সাম্রাজ্য ত্যাগ করে যেতে হবে। কিন্তু কোন ভারতবর্ষকে সে পিছনে ত্যাগ করে যাবে? কী লক্ষ্মীছাড়া দীনতার আবর্জনাকে?’

বিশ্বকবির এই আক্ষেপকে একটু ঘুরিয়ে আমরাও প্রশ্ন করতে পারি, ১৯৭৫ সালে সপরিবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ৪৬ বছর চলে গেছে। ঘাতকদের বিচার হয়েছে। কিন্তু ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের মর্মমূলে যে কলঙ্কের ক্ষত সৃষ্টি করে গেছে, সেই কলঙ্কিত আবর্জনা কি আমরা এখনও সাফ করতে পেরেছি! নাকি কোনও দিন পারবো? আমাদের জীবনে কি তা দেখে যেতে পারবো? এটাই হচ্ছে ১৫ আগস্টের ট্র্যাজিক ঘটনার সবচেয়ে ভয়ংকর ক্ষত।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক পরিচালক (বার্তা), বাংলাদেশ টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনা মহামারিতে ঈদ ছুটির বিড়ম্বনা

করোনা মহামারিতে ঈদ ছুটির বিড়ম্বনা

করোনাকালের ঈদ: আনন্দে যখন শঙ্কা

করোনাকালের ঈদ: আনন্দে যখন শঙ্কা

জাতীয় লজ্জার সেই কালো স্মৃতিবহ দিন

জাতীয় লজ্জার সেই কালো স্মৃতিবহ দিন

ঐতিহাসিক ২৩ জুন: গৌরবের ৭২ বছরে আওয়ামী লীগ

ঐতিহাসিক ২৩ জুন: গৌরবের ৭২ বছরে আওয়ামী লীগ

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২১, ১৬:০৪

তুষার আবদুল্লাহ গতকাল রাতে ভেবেছিলাম আজ লিখবো না কিছু। লেখা কিংবা কথা বলা, সবই তো অপচয়। পত্রিকা বা পোর্টালের জায়গা ভরাট করে দেওয়ার জোগালি করা মাত্র। যা নিজে বিশ্বাস করি না তাই হয়তো লিখছি। যা বিশ্বাস করি তা হয়তো লিখতে পারছি না। বলার বেলায়ও একই চিত্র। এই যে মন ও কর্ম বা আচরণের দূরত্ব, এটা এক ধরনের অসুস্থতা। যারা রাজনীতি করছেন আর আমরা যারা বিভিন্ন পেশার সঙ্গে জড়িত, সবাই পোশাকি বচন নিয়ে আছি। একে অপরকে পোশাকি বচনে তুষ্ট বা দমন করে রাখতে চাই। কিন্তু যার সঙ্গে বিশ্বাস বা মনের যোগাযোগ নেই, সেই বচন টেকসই হয় না। দুর্যোগ প্রতিরোধ করতে পারে না। সাম্প্রদায়িকতা ‘ফনা’ তুলে দাঁড়ালেও বীণার কৃত্রিম সুর তাকে বশ মানাতে ব্যর্থ হয়।

সমাজ ও রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িকতা ‘ফোঁস’ করে উঠলে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দিকে আঙুল তুলি আমরা। নির্দিষ্ট করে ধর্মভিত্তিক দল বলে কিছু নেই এখন। সব রাজনৈতিক দলই ভোটবাজারে ধর্মকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করছে। রাজনীতি কি শুধু সরকারি-বেসরকারি দফতরে কাজ আদায় কিংবা কাজ ফাঁকিতে? শিক্ষা, ব্যবসা, পণ্য বিক্রিতে উদারভাবে ধর্মের ব্যবহার হচ্ছে।

ধর্ম নিয়ে কট্টর অবস্থান সব অনুসারীর মধ্যেই আছে। হিন্দু-মুসলমানদের এ বিষয়ে একতরফা দোষারোপ করা যাবে না। রোগটি শুধু বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা মিয়ানমারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। সবাই রোগাক্রান্ত গোলকের। ভেতরে একটু উঁকি দিলেই, জীবন আচরণ ও অন্য ধর্মের প্রতি রাগ-অনুরাগ প্রত্যক্ষ করলেই রোগের লক্ষণ বোঝা যাবে। বাংলাদেশ ও এর চারপাশের ব্রিটিশশাসিত দেশগুলোতে ব্রিটিশরা যে বিষফোঁড়া ফাটিয়ে দিয়ে গেছে, সেই পুঁজ এখনও প্রবাহিত। উত্তাপটা বাড়ছেই।

মানুষ সাম্প্রদায়িক হলো কবে? ইতিহাস এর নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা দেবে কিনা জানি না। কোনও ইতিহাসই সংশয় ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। সবাই নিজ নিজ মতলব মতো ইতিহাস তৈরি করে নিয়েছে। রাজনীতি, ধর্ম সবাই। তবে নিশ্চিত করে আমরা বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী ও বিশ্বাসীরা বলতে পারি- আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে অস্ত্র হিসেবে যখন ধর্মের ব্যবহার শুরু হলো তখন থেকেই ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাষ্ট্র সাম্প্রদায়িক হতে শুরু করে। এখন ক্ষমতায় আরোহন এবং টিকে থাকাও ধর্মের ওপর নির্ভরশীল। অসাম্প্রদায়িকতার পতাকা উড়ে বিস্ফোরিত হয় অসাম্প্রদায়িকতার ফাঁকা বুলি। আমরা ভোটের মতলবে, সামাজিক স্বার্থে অসাম্প্রদায়িকতার বসন নেই। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে, আচরণে, চর্চায় আমাদের বহিঃপ্রকাশ সাম্প্রদায়িক। এজন্যই দেশি-বিদেশি গোষ্ঠী যখন তাদের স্বার্থ হাসিলের রণক্ষেত্রের নকশা তৈরি করে, তখন মুফতে পেয়ে যায় আমাদের মতো সৈনিক।

সাম্প্রদায়িক শক্তি যেকোনও জনপদেই লঘুদের ওপর চড়াও হয়। এটাই আধিপত্যবাদের ধর্ম। লঘুরা নির্যাতনের শিকার হলে, বিপন্ন বোধ করলে, নিরাপত্তাহীনতায় কুঁকড়ে থাকলে, অসাম্প্রদায়িকতার চাদর নিয়ে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এগিয়ে যায়। নিপীড়িতরা প্রথম প্রথম কারও কারও প্রতি বিশ্বাস রাখতো। কিন্তু দেখা গেলো- তাতে আগুন নেভে না। জমি, কন্যা, স্ত্রী, মায়ের ওপর থেকে লোভের চোখ সরে না। অঙ্ক কষে দেখা যায়, ভোটবাজারে বিক্রি হতে হতে আর কোনও ভাগশেষ নেই।

অভিবাসনের অন্যতম একটি কারণ সাম্প্রদায়িক আক্রমণ। দেশভাগের পর থেকে কম মানুষ তো ভিটে ছেড়ে এপার-ওপার হলো না। সব ভূখণ্ডেই এমন ভিটে ছাড়া মানুষের দল আছে। কিন্তু নতুন বসতিতেও কি তারা নিশ্চিত যাপনে আছে? সিদুঁর রাঙা মেঘ সর্বত্র তাদের তাড়া করেই বেড়াচ্ছে। কারণ ‘সাম্প্রদায়িকতা’র মতো আর কোনও পণ্যের চৌকাঠ অবধি বাজারজাত হয়নি। দুয়ার বন্ধ রেখেও কি এই পণ্যের প্রবেশ রোধ করা যাচ্ছে? যাচ্ছে না বলেই লেখন, বচন সবই অপচয়।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

/এসএএস/জেএইচ/

সম্পর্কিত

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

শিক্ষক ও মর্যাদার সংকট

শিক্ষক ও মর্যাদার সংকট

শেখ হাসিনায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি: স্বাভাবিক হলেও ব্যতিক্রম

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২১, ১৩:০৮

ড. প্রণব কুমার পান্ডে বঙ্গবন্ধু চারিত্রিকভাবে ছিলেন বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী। খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সত্যের অনুসারী এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে বদ্ধপরিকর। সেই ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় একবার জেলা শিক্ষা অফিসারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে তর্ক করেছিলেন। পরবর্তীতে তিলে তিলে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বিভিন্ন সময় আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তাঁর প্রতিবাদী চরিত্রের। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করেছিল দেশবাসী। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগের ব্যাপক বিজয় হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তা যখন ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়, ঠিক সেই সময় বাংলার মানুষ কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু আগে থেকেই জানতেন এই হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাংলার মাটি ও মানুষকে রক্ষা করতে হলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেই হবে।

আর এই কারণেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি এক মহাকাব্যিক বক্তব্য প্রদান করেছিলেন।  একটি অলিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি যেভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের দৃশ্যপট রচনা করেছিলেন তা ইতিহাসে সত্যিই বিরল। সেই দিন বঙ্গবন্ধু যদি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন তাহলে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে তাঁকে গ্রেফতার করে বাংলার মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রগতি রহিত করতো পাকিস্তানি জান্তা। কিন্তু, পাকিস্তানি শাসকরা বঙ্গবন্ধুকে চিনলেও তার ভেতরের যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সেটা চিনতে কিছুটা হলেও ভুল করেছিলেন। আর এই কারণেই বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করে কূটনৈতিক ভাষায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে। তাঁর সেই বক্তব্য শুধু বাংলাদেশের জনগণকেই নয়, বিশ্ববাসীকে আকৃষ্ট করেছিল। এটি এমন এক ধরনের আবেগময় ভাষণ ছিল সে আবেগে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলার লাখো লাখো আবাল বৃদ্ধ বনিতা স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল। এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে আবির্ভূত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। কারণ, মাত্র নয় মাসে একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে এরকম উদাহরণ পৃথিবীতে খুব কমই রয়েছে।

অনেকের মনে এতক্ষণ একটি প্রশ্ন জেগেছে যে আজকের লেখার শিরোনামের সঙ্গে এই বিষয়ের অবতারণা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? আমি মনে করি এটি সত্যিই যুক্তিযুক্ত। ৭ মার্চের ভাষণ প্রদান করা সব নেতার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই ধরনের ভাষণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন অন্যরকম নেতৃত্ব, যা হবে নির্ভীক, বলিষ্ঠ এবং দূরদর্শী। বঙ্গবন্ধু তাঁর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। প্রথমদিকে সব ভালোই চলছিল। কিন্তু যখনই তাঁর এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নেওয়া বিভিন্ন কার্যক্রম পাকিস্তানপন্থীদের স্বার্থে আঘাত হানে, তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এর ভয়াল রাতে তাঁকে পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পুরোটাই বাধাগ্রস্ত হয়।

এরপরে অনেক চড়াই-উৎরাই পার করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দায়িত্বভার গ্রহণ করে দলকে সংগঠিত করে ক্ষমতায় নিয়ে যান। গত ১২ বছর শেখ হাসিনা যেভাবে দেশ শাসন করছেন তাতে স্পষ্টতই তার বাবার রাজনৈতিক গুণাবলি তাঁর নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। এ বিষয়টি নিয়ে কোনও তর্কের অবকাশ নেই। বঙ্গবন্ধুর যেমন বাঙালির ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ছিল অপরিসীম ভালোবাসা, ঠিক তেমনি শেখ হাসিনার রয়েছে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধু যেমন নীতির সঙ্গে কখনোই আপস করেননি, ঠিক তেমনি শেখ হাসিনাও নীতির কাছে আপস না করে কঠোরভাবে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমরা ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হবো এবং আশা করছি ২০৪১ সালে উন্নত বিশ্বে উন্নীত হবো। গত এক দশকে উন্নয়ন এমনি এমনি হয়নি। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অক্লান্ত পরিশ্রম এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের কারণে হয়েছে। তিনি চেষ্টা করেছেন উন্নয়নের সব মাত্রায় এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে, যাতে সার্বিকভাবে উন্নয়ন সূচকে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমরা যেমন এশিয়ান টাইগার হয়েছি, ঠিক তেমনি সামাজিক সূচকে গত এক দশকের আমাদের উন্নয়ন পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃত হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করেছি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাফল্যের কারণে জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) কর্তৃক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘এসডিজি প্রগ্রেস ওয়ার্ড’-এ ভূষিত করা হয়েছে জাতিসংঘের ৭৬তম সাধারণ অধিবেশনে।

বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ১২ বছর ধরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন। এটি সত্যিই একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। পিতামাতার আদর্শ সাধারণত সন্তানদের মধ্যে প্রতিফলিত হয়- এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য শেখ হাসিনার মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবারগুলোতে এই বিষয়টি সব সময় স্বাভাবিক হতে দেখা যায়নি। আমরা দেখেছি কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে সন্তানরা বিভিন্নভাবে দুর্নীতি ও অনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। অবশ্যই কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, সেসব সন্তানকে প্রতিপালনের ক্ষেত্রে হয়তো পিতামাতা ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু পাশাপাশি এটাও  ঠিক, যখন কেউ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন তখন তাঁর উচিত নিজের সম্মান রক্ষার্থে এবং দেশের মানুষের কথা ভেবে নিজের সন্তানদের নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখেছি, অনেকেই তাঁদের সন্তানদের একদিকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি, আবার পাশাপাশি নিজেদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকের সন্তানদের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।

সেই জায়গা থেকে বিচার করলে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো শেখ হাসিনার চরিত্রের মাধ্যমে প্রতিফলিত হওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও ব্যতিক্রম বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। শেখ হাসিনা তাঁর বাবার আদর্শকে শুধু লালনই করেননি, তাঁর  অপূর্ণ স্বপ্ন সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন। তাঁর প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশ অবশ্যই সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হবে। তবে পাশাপাশি এটিও ঠিক, বঙ্গবন্ধু যেমন বিভিন্ন সময়ে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন, শেখ হাসিনা সেভাবে বিভিন্ন সময় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। কখনও বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, আবার কখনও বা মৌলবাদের হামলার শিকার হয়েছেন। ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় তিনি প্রতিবারই অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন।

তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এখন সবাই বাংলাদেশকে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বিবেচনা করে। ১২ বছরের কঠোর পরিশ্রমের ফলে শেখ হাসিনা আঞ্চলিক নেত্রী থেকে বিশ্বনেতৃত্বে রূপান্তরিত হয়েছেন। বড় বড় দেশের রাজনৈতিক নেতারা শেখ হাসিনার কাছে প্রায়ই জানতে চান বাংলাদেশের অবিস্মরণীয় উন্নয়নের মূলমন্ত্র। শেখ হাসিনা বারবার একই কথা বলেছেন যে জনগণকে ভালোবেসে, তাদের কথা চিন্তা করে, এবং সততার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করলে দেশের উন্নয়ন হবে এটিই স্বাভাবিক। এবং এই কারণেই তিনি উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াসে লিপ্ত রয়েছেন। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলাদেশকে এবং বাংলাদেশের জনগণকে সোনার বাংলার জনগণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার তাঁর লড়াই চলমান রয়েছে। আবার এটিও ঠিক, তাঁর আশপাশে, এমনকি তাঁর দলেও এখনও কিছু অপশক্তির অন্তর্ভুক্তি হয়েছে, যারা সব সময় চেষ্টা করছে উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে।  

অতএব, এই মানুষগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, আমাদের মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত স্নেহের কিছু মানুষ, যাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু নিজের খাবার শেয়ার করতেন। সেই খন্দকার মোশতাক গংয়ের প্রেতাত্মারা আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বুঝতে হবে কারা তাঁর ভালো চায় এবং কারা তার খারাপ চায়? এই মানুষগুলোকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। পরিশেষে বলতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের দৃশ্যমানতা পিতা-কন্যার সম্পর্কের খাতিরে স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, এতে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/এমওএফ/এমএম/

সম্পর্কিত

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

নির্বাচন কমিশন: বড় হোক সাংবিধানিক ক্যানভাস

নির্বাচন কমিশন: বড় হোক সাংবিধানিক ক্যানভাস

আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারের ঘাটতি!

আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারের ঘাটতি!

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫৯

স্বদেশ রায় রাশিয়ার দিমিত্রি মুরাতভ যেদিন ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসার সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পান ওই দিনটি ছিল  দিমিত্রি মুরাতভ সম্পাদিত নোভায়া গেজেটের অন্যতম পরিচিত সাংবাদিক আন্না পলিতিভস্কয়ার নিহত হবার ১৫তম বার্ষিকী। ২০০৬ সালে তিনি পেশাগত কাজ করতে গিয়ে গুলিতে নিহত হন। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত নোভায়া গেজেটের ছয় জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন। আর এই সাংবাদিক টিমেরই নেতৃত্ব দেন দিমিত্রি মুরাতভ। অন্যদিকে মারিয়া রেসার বিরুদ্ধে এখনও দুটি মামলা চলছে।

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মৃত্যু, হামলা ও মামলা এটা সাংবাদিকের সঙ্গে শুরু থেকে চলে আসছে। আর এ কারণে সাংবাদিকতা ঝুঁকিপূর্ণ পেশা বলেই চিরকাল চিহ্নিত। প্রত্যেকটা পেশায় ঝুঁকি নেওয়ার একটা কারণ থাকে, একটা স্বার্থকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এ ঝুঁকি নিতে হয়। সাংবাদিকতার মূল স্বার্থ রাষ্ট্র ও সমাজকে মানুষের কাছে স্বচ্ছ রাখা। অধিকাংশ মানুষই মূলত সাংবাদিকের চোখ দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে দেখতে পায়। তাই অধিকাংশ মানুষকে সঠিক বিষয়টি দেখানোর সততা নিয়ে নির্ভয়ে এ কাজটি করার দায়িত্ব সাংবাদিকের ঘাড়ে বর্তায়। আর পৃথিবীতে যেখানেই যেকোনও ধরনের ভয় বা ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ালেই সেখানে মৃত্যুসহ নানান ঝুঁকি আসবেই।

তবে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সাংবাদিকতাকে এই ঝুঁকির ঊর্ধ্বে যতটা নেওয়া যায় সেই চেষ্টাই করা হয়েছে। আর এটা যতটা না সাংবাদিকের ও সাংবাদিকতার স্বার্থে, তার থেকে অনেক বেশি মানুষ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে। এই স্বাধীন সাংবাদিকতা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিটি দেশ অনেক বড় বড় বিপর্যয় থেকে নিজেকে রক্ষা করেছে।

যেমন, একটা বিষয় লক্ষ করলে দেখা যায়, ব্রিটিশ চলে যাবার পরে ভারতে আজ অবধি বড় কোনও দুর্ভিক্ষ হয়নি। অথচ ব্রিটিশ আমলের শুরুতে দ্বৈত শাসনামলে ১৭৬৯-৭০ বা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে খ্যাত দুর্ভিক্ষে সে সময়েই তৎকালীন বেঙ্গলে প্রায় ৩০ লাখ লোক মারা যায়। আবার ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষে মারা যায় প্রায় এক কোটি। সেদিনের এই বড় দুটি দুর্ভিক্ষের অর্থাৎ  ছিয়াত্তরের মনন্বতর ও ৪৩-এর দুর্ভিক্ষকে ঠেকাতে না পারার কারণ হিসেবে অনেক বিষয় গবেষকরা সামনে এনেছেন। তার ভেতর ছিয়াত্তরের মন্বন্তর না ঠেকাতে পারার অন্যতম কারণ সে সময়ের মিডিয়াবিহীন রাষ্ট্র আর ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে না পারার কারণ সরকার নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া। ১৯৪৩-এ ব্রিটিশ সরকার দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে কোনও সঠিক সংবাদ প্রকাশ করতে দেয়নি। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার পরে সেদেশে মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করায় দরিদ্র দেশ হলেও সেখানে প্রতিটি দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস পাওয়া গেছে মিডিয়ার মাধ্যমে। আর সরকার সেই পূর্বাভাস পাবার পরপরই দুর্ভিক্ষ ঠেকানোর ব্যবস্থাগুলো নিতে পেরেছে। যার ফলে সব দুর্ভিক্ষই তারা ঠেকাতে সমর্থ হয়েছে।

আজকের পৃথিবীতে আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ছাড়া আর সব দেশই প্রায় মূল খাদ্য অভাবটি দূর করতে সমর্থ হয়েছে।  বর্তমান বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর এ মুহূর্তে মোটা দাগে মূল কাজ-  মানুষে মানুষে ধনবৈষম্য কমানো, টেকসই উন্নয়ন করা, রাষ্ট্রের ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায় থেকে দুর্নীতি বন্ধ করা, যুদ্ধ উন্মাদনা কমানো, সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতা থেকে পৃথিবীকে বের করে আনা, ধর্মীয় মৌলবাদ ও বর্ণবাদ মুক্ত করা। আর সর্বোপরি মানুষের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সব ধরনের সুযোগ দিয়ে চিন্তা ও সংস্কৃতির সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটানো। যাতে মনোজাগতিকভাবে মানুষ নিজেকে উন্নত করতে পারে।

এ মুহূর্তের পৃথিবীতে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীতে প্রতিদিন প্রযুক্তির উন্নতি ঘটছে কিন্তু ওই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে না। আঠারো শতক, উনিশ শতক এবং বিশ শতকে প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের মনোজগতে যে বিকাশ ঘটেছিল, এ মুহূর্তের পৃথিবীতে মনোজগতের বিকাশের গতি সেখানে নেই। বরং সবখানেই কমে গেছে। মনোজগতের এই বিকাশ কমে গেলে মানুষের সাহস কমে যায়, চিন্তার উদারতা কমে যায়, মানুষ অনেকটা যান্ত্রিক হয়ে পড়ে। যার ফল দাঁড়ায় রাষ্ট্র ও সমাজে দুর্নীতি, বিভিন্ন ধরনের মৌলবাদ ও কুসংস্কার বাসা বাঁধতে থাকে। এবং ধীরে ধীরে এগুলোই রাষ্ট্র ও সমাজে চালকের ভূমিকায় বসে যায়। রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে দুর্নীতি, মৌলবাদ, কুসংস্কার এগুলো দূরে রাখতে হলে এর বিরুদ্ধে সমাজে সব সময়ই একটা প্রতিবাদ থাকতে হয়। কারণ, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো লোভের কাছে আত্মসমর্পণ করা, কুসংস্কার বা মৌলবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করা। এর বিপরীতে মানুষের চিন্তার জগৎকে জাগ্রত করতে পারলে, বোধকে জাগ্রত করতে পারলে তখন মানুষ এগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। তখন রাষ্ট্র ও সমাজ সুস্থ ও আধুনিকতার পথে যাবার সুযোগ পায় বা মানুষকে সে পথে নিয়ে যেতে পারে।

আধুনিক এই রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মানুষের বোধ ও চিন্তার জগৎ জাগ্রত রাখার জন্যে অনেক ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে আসছে সেই পনের শতক থেকে। পৃথিবীর এই পথ চলাতে এখন অবধি দেখা যাচ্ছে, অনেক ত্রুটি সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিই মন্দের ভালো। কারণ, গণতন্ত্র কোনও রাষ্ট্রের একক কোনও শক্তির বিষয় নয়। এটা রাষ্ট্রের অনেক শক্তির ওপর নির্ভর করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেমন রাষ্ট্রীয় সব কাঠামোকে শক্তিশালী ও স্বাধীন রাখতে হয়, তেমনি সামাজিক শক্তিগুলোকেও শক্তিশালী ও স্বাধীন রাখতে হয়। রাজনৈতিক দল জনগণের রায়ে রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী হয় ঠিকই, কিন্তু তারা যদি মনে করে রাষ্ট্রের সবকিছুর নিয়ন্ত্রক তারাই, তাহলে গণতন্ত্র থাকে না। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রের ও সমাজের সব ধরনের শক্তির সঙ্গে নিজেকে ভারসাম্যমূলক অবস্থানে নিয়ে যখন চলতে পারে তখনই কেবল ওই রাষ্ট্র ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হয়।

রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রের সব শক্তিকে নিয়ে ভারসাম্যমূলকভাবে চলছে কিনা, রাষ্ট্রে মৌলবাদ, কুসংস্কার, বর্ণবাদ জাগছে কিনা, আবার রাষ্ট্র তার সব নাগরিকের জন্যে সমানভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করছে কিনা, রাষ্ট্র কাউকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে কিনা- এ বিষয়গুলো সব সময়ই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছ রাখার চেষ্টা করতে হয়। আর এই চেষ্টার প্রথম সারিতে কাজ করে মিডিয়া। মিডিয়া এগুলোকে যতটা স্বচ্ছভাবে মানুষের সামনে নিয়ে আসবে ততই মানুষ এর ত্রুটিগুলো দূর করার জন্যে রাষ্ট্রের প্রতি চাপ দিতে পারে। এখানে মিডিয়ার ওপর কোনও ভয়ের সংস্কৃতি থাকলে চলে না।

এবারের দুই জন সাংবাদিককে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া তাই বাস্তবে দুই জন সাংবাদিককে নোবেল দেওয়া নয়, এটা মূলত পৃথিবীজুড়ে মিডিয়ায় যে ভয়ের সংস্কৃতি ঢুকে গেছে, তার বিরুদ্ধে একটি বার্তা। তাই এবারের শান্তিতে এ নোবেলটি শুধু সময়োপযোগী নয়, এটা সারা পৃথিবীর মিডিয়াকে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি আহ্বান। কারণ, এ কাজটি এমন একসময়ে হয়েছে যে সময়ে সারা পৃথিবীতে রাষ্ট্র, পুঁজি, মৌলবাদ, উগ্রবাদ, ধর্মীয়বাদ ও বর্ণবাদ দ্বারা মিডিয়া অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আর এই কাজ পৃথিবীর দেশে দেশে রাষ্ট্রের এক ধরনের ভুল চিন্তা বা পুঁজি নিয়ন্ত্রিত চিন্তার কারণেই ঘটছে সব থেকে বেশি। এই চিন্তার এক বড় স্লোগান হলো, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ও মিডিয়ার স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর এই স্লোগানের সপক্ষে কর্তৃত্ববাদী সরকার পরিচালিত দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচককে সামনে আনা হচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর এই অর্থনৈতিক সূচক বাস্তবে কতটা সত্য তা কেউই জানে না। কারণ, ওই দেশগুলোর বাস্তব অবস্থা কি তা সেখানে স্বাধীন মিডিয়া না থাকায় জানার কোনও সুযোগ নেই । যেমন, গত শতকের নব্বইয়ের দশকের আগে অবধি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক, মানবিক উন্নয়নের সূচক নিয়ে পৃথিবীর নানান প্রান্তে অনেক মানুষ উচ্ছ্বসিত ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন কাচের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো তখন দেখা গেলো, ওই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক, মানবিক উন্নয়নের সূচক আসলে ছিল কর্তৃত্ববাদী সরকারের প্রোপাগান্ডার ফানুস। তাই আজ পৃথিবীর দেশে দেশে যেসব কর্তৃত্ববাদী সরকার তাদের অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়নের সূচক তুলে ধরছে নিয়ন্ত্রিত ও সরকারি প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে, তাও যে অমনি ফানুস নয় তা কে জানে?

তবে এর কিছু কিছু লক্ষণ কিন্তু দেখা যাচ্ছে। যেমন, বেশ কয়েক দশক ধরে বলা হচ্ছে আগামী অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক হবে এশিয়া। আর সেখানে সামনের সারিতে রাখা হয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোকে । কিন্তু এখন অবধি এসব দেশ প্রোডাকশন হাউজই থেকে গেলো। তারা এখনও নিজের দেশের বাজারকে বড় করতে পারেনি বা মূল বাজারে পরিণত করতে পারেনি। তাদের দেশে শ্রমের প্রকৃত মূল্য নিশ্চিত করতে পারেনি। বাস্তবে শুধু শ্রম বিক্রি করেই যাচ্ছে। এর মূল অর্থ দাঁড়ায়, সেখানে প্রবৃদ্ধি কেবল কিছু সংখ্যক লোকের জন্যে ঘটেছে। কিছু লোকই ধনী হয়েছে। সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য মোটেই কমেনি। আর কোনও সমাজে যখন রাতারাতি কিছু লোক ধনী হতে থাকে, তখন নিশ্চিত ধরে নিতে হয় ওই রাষ্ট্রের সরকার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এবং সরকারি আনুকূল্যে কিছু লোক ধনী হচ্ছে। সরকারি আনুকূল্যে যখন কিছু লোক ধনী হয় তখন তারা যতটা না সঠিক বাণিজ্যের মাধ্যমে ধনী হয়, তার থেকে বেশি হয় জনগণের অর্থ নয়-ছয় করে। যারা জনগণের এই অর্থ নয় ছয় করে তারা তখন ওই অর্থ দিয়েই রাজনীতি ও প্রশাসনকে কিনে ফেলে। আর তখন যে রাজনীতি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে ওই রাজনীতি ও প্রশাসন জনগণের ওপর ভয়ের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়। এই ভয়ের খড়গটি সব থেকে বড় হয়ে আঘাত করে মিডিয়ার ওপর। এমনকি অনেক সময় অনেক সৎ রাজনীতিকও সরকারি আনুকূল্যের বাণিজ্যের মাধ্যমে তথাকথিত উন্নয়নের প্রতারণায় পড়ে যান। তারা মনে করেন, সত্যি সত্যি দেশের উন্নয়ন ঘটছে। এবং তারাও মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজকে ভালো মনে করেন।

যেমন, একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সাবেক দুই মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সৎ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এমনকি সৎ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও। তবে তারপরেও আজ বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের অন্যতম দরিদ্র রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। যেখানে সত্যি অর্থে কোনও শিল্প নেই; বরং রয়েছে চরম বেকারত্ব ও দারিদ্র্য। অথচ ১৯৪৭-এ যখন ভারত স্বাধীন হয় সে সময়ে শিল্প ও অর্থনীতি মিলিয়ে ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে চার নম্বরে ছিল বেঙ্গল। আর আজ তাদের এ অবস্থা। এখানে তারা বলতে পারে বেঙ্গল ভাগ হবার একটা ধাক্কা তাদের ওপর পড়েছে।

তবে তারপরেও সেখানে এখন সচেতন সবাই বলেন, পশ্চিমবঙ্গের যা প্রকৃত উন্নয়ন তা শুধু বিধান রায়ের আমলেই হয়েছিল। তারপরে আর হয়নি। এই বিধান রায়ের আমলে সেখানে মিডিয়ার স্বাধীনতা এমন ছিল যে বিধান রায় বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে একটি প্রদেশ বা রাজ্য করতে চেয়েছিলেন। মিডিয়ার সমালোচনাই কিন্তু বিধান রায়কে এ কাজ থেকে বিরত হতে বাধ্য করে। অন্যদিকে জ্যোতিবসু’র কমিউনিস্ট শাসনে পশ্চিমবঙ্গে মিডিয়া ও মানুষের মনোজগৎ, দুটোই সরকার শাসিত ছিল। আর মমতা ব্যানার্জির  আমলে ‘আনন্দবাজার’ ও ‘বাংলা স্টেটসম্যানে’-এর  সম্পাদককে সরে যেতে হয়েছে শুধু সরকারের সমালোচনা করার অপরাধে। এভাবে প্রাইভেট মিডিয়াও সেখানে নিয়ন্ত্রিত। আর তার ফল ভোগ করছে পশ্চিমবঙ্গ দারিদ্র্য দিয়ে। সেখানে উন্নয়ন বলতে কয়েকটি ফ্লাইওভার। যে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে হেঁটে চলে হাজার হাজার বেকার তরুণ-তরুণী। শুধু দারিদ্র্য নয়, তাদের মনোজগতেরও পরিবর্তন ঘটে গেছে। সেখানে কোনও আদর্শবাদী রাজনীতি এখন আর নেই।  সুবিধাবাদী ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতিও স্থান করে নিয়েছে উপমহাদেশের আধুনিকতার রেনেসাঁ ঘটেছিল যে এলাকাটিতে, সেই মাটিতেই।

তাই এই স্বাধীন মিডিয়ার বাধা এখন শুধু আর কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোতে নয়। সবখানেই কম বেশি বাধার মুখে মিডিয়া।  মাত্র কিছু দিন আগেও যে দেশের সংবিধানে মিডিয়ার স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ নিশ্চিত করা হয়েছে সেই আমেরিকার হোয়াইট হাউজ থেকে ট্রাম্পও মিডিয়াকে ‘শত্রু’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর মতের লোকেরা এখনও আমেরিকাতেও কম নয়। তাই এবারের শান্তির নোবেল সারা পৃথিবীর সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার জন্যে একটি ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা। এ মুহূর্তে তাই যেকোনও দেশের  সাংবাদিকতা ও মিডিয়া এই সত্য উপলব্ধির বাইরে থাকলে ভুল করবে।

কারণ, স্বাধীন মিডিয়া ছাড়া, সাহসী সাংবাদিকতা ছাড়া একটি মনোজাগতিক ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত সমাজ গড়া মূলত গ্রিক দেবতা ‘কাইমেরা’। অর্থাৎ আশা করা যেতে পারে কিন্তু বাস্তবে অসম্ভব।

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

নির্বাচন কমিশন: বড় হোক সাংবিধানিক ক্যানভাস

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ২০:০৩

এস এম মাসুম বিল্লাহ  প্রতিবার নির্বাচন আসে আর আমাদের নির্বাচন কীভাবে হবে এই আলাপ বাড়ে। পঞ্চাশ বছর কেটে গেলো। একটা ঘাতসহ নির্বাচন ব্যবস্থা দাঁড়ালো না! এমনকি একটা নির্বাচন কমিশন কীভাবে গঠিত হবে তা নিয়ে আমাদের বাহাসের শেষ নেই। অনুমান করি এ আলাপ অব্যাহত থাকবে।

নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। একজন থাকেন প্রধান, বাকিরা সদস্য। সাবেক নির্বাচন কমিশনার প্রয়াত বিচারপতি নাঈমুদ্দীন আহমেদকে একবার একটা অনুষ্ঠানে বলতে শুনেছিলাম, বাংলাদেশে ভালো নির্বাচন করার জন্য চার জন সৎ ও দৃঢ়চেতা মানুষই যথেষ্ট।

অতিরঞ্জিত শোনালেও কথাটার স্পন্দন ধরা যায়। আমাদের সংবিধান নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারকে (এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গকে) নির্বাচন কমিশনের খেদমতে পেশ করেছে। যেমন, ১২৬নং অনুচ্ছেদে বলা আছে: ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’ সংবিধান থেকে শক্তি নিয়ে প্রশাসনকে হুকুম তামিল করানোর মতো মানুষ দরকার।

সে রকম মানুষ নেই আমাদের? থাকতেও পারে। দরকার খুঁজে বের করা। সার্চ!

৫৩ জন বিশিষ্ট নাগরিক বিবৃতি দিয়ে নির্বাচন কমিশন বানানোর একটা লিখিত আইন তৈরি করতে সরকারকে আহ্বান করেছেন। বিবরণে প্রকাশ, তারা আসলে ৫৪ জন। আমি ধরে নিলাম তিপ্পান্ন– ‘যাহা বাহান্ন, তাহা তিপ্পান্ন!’ তবে ‘বিশিষ্ট নাগরিক’ তকমা খটকার জন্ম দেয়। আমরা সব নাগরিকই তো সমান।

ধরুন, ভিন্ন কোনও গোষ্ঠী বা সংগঠন বিবৃতি দিয়ে নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়ন করতে বললেন। তাহলে কি তাদের কথা গুরুত্ব পাবে না?

রাষ্ট্রপতি (জিল্লুর রহমান ও আব্দুল হামিদ) সার্চ কমিটি করে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে গত দুইবার নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। আওয়ামী লীগ এবারও এই ফর্মুলায় আস্থা রাখতে চায়। প্রধানমন্ত্রী সেটা সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে পরিষ্কার জানান দিয়েছেন। বিএনপির তরফে কোনও ফর্মুলা জানা যায় না। তত্ত্বাবধায়ক বা সেই গোছের কোনও সরকার না এলে নির্বাচন কমিশন কেমন করে হচ্ছে– এ আলাপ তাদের কাছে এই মুহূর্তে অতটা আগ্রহোদ্দীপক হওয়ার কথা নয়। তবু মনে হচ্ছে তারা ৫৩ নাগরিকের বক্তব্যে সওয়ার হতে চান।
 
বিধিবদ্ধ একটি আইন কেন দরকার? এর প্রথম যুক্তি হলো, এটা একটা সাংবিধানিক আজ্ঞা ও  অভিজ্ঞান। কমিশন গঠন করার ব্যাপারে এবং এর কাজের পরিধি বর্ণনার সময় সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ বেশ কয়েকবার ‘আইনের সাপেক্ষে’ কথাটির দোহাই দিয়েছে। তাই এমন একটি আইন না করার কোনও কারণ নেই। দ্বিতীয় যুক্তি হলো, আইন দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য সদস্যদের যোগ্যতা, অযোগ্যতা ও কর্মপরিধি ঠিক করা থাকলে একদিকে যেমন ক্ষমতাসীন দল তাদের নিজস্ব পছন্দের মানুষ নিয়োগ দিতে পারবে না, অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনাররাও  তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ থাকবেন।

তৃতীয়ত, একটা বিধিবদ্ধ আইন উপস্থিত প্রয়োজন চালানোর দায় থেকে সরকারকে নিষ্কৃতি দেবে। কমিশন গঠন প্রক্রিয়া একটা স্থায়ী রূপ পেলে, কোনও রাজনৈতিক দলের প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকবে না। কিন্তু একটি আইন থাকলেই কি নির্বাচন সমস্যার সমাধান হবে? অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের খুব আশাবাদী করে না।
মার্কিন বিচারপতি হোমসের কথা ধার করে বলা যায়, ‘আইনের জীবন যুক্তির নয়, অভিজ্ঞতার।’

সংবিধান কর্তৃক তাগাদাপ্রাপ্ত অনেক আইন-ই তো আমাদের করার কথা ছিল, আছেও বোধহয় কয়েকটি। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি, কেউ রাখে না। আমাদের রাজনীতির পরিশুদ্ধি ঘটলো কোথায় আর নির্বাচন সমস্যার সমাধান হলো কোথায়? উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে আইন থাকার কথা ছিল, নেই। ‘ন্যায়পাল আইন’ হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ার আইন আছে, কিন্তু এখানে কসমেটিক ভাষায় ‘ফুলের মতো পবিত্ররাই’ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্বাচনে দাঁড়ায় ও জেতে। তাই আইন হলেই যে সমস্যার সমাধান হবে না তার সপক্ষে শক্ত কিছু যুক্তি উত্থাপন করা যায়।

‘যার হয় না ছয়ে, তার হয় না ষাটে’। পঞ্চাশ বছর চলে গেছে, কারও মনে হয়নি নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্যে আলাদা একটা পূর্ণাঙ্গ আইন দরকার। যে কাজ পঞ্চাশ বছরে করতে পারা যায়নি, সে কাজ চার মাসে কেমন করে করা যাবে সেটা একটা প্রশ্ন।

একটু পেছনে যাই। বিএনপি ভাষ্যে দাবি করা হয়, জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের’ প্রবর্তক। তো নির্বাচন কমিশন আইনের অনুপস্থিতে বহুদলীয় গণতন্ত্র কীভাবে হয়েছিল তা প্রশ্ন তোলা সমীচীন হবে। সেই প্রশ্ন তো শুধু  বিএনপির কাছে নয়, এ প্রশ্ন সবার কাছেই, বিশেষত নতুন প্রজন্মের মানুষরা করতে চাইবেন।  
এরপর হলো, আইনটি বানাবে কে? বর্তমান বাস্তবতায় কাঙ্ক্ষিত আইনটিকে যদি আলোর মুখ দেখতে হয়, তাহলে তা বানাতে হবে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদকে। সেটা কি বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো মেনে নেবে? একটা জোরালো মত রয়েছে যে বর্তমান সংসদ প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত। সেই সংসদ মনোলোভা একটা আইন প্রণয়ন করবে, এই ভরসাটা আসলে কোথা থেকে আসে?

সেটা কি এই যে শেখ হাসিনা আর যা কিছুই করুন, এযাবৎ জাতীয় জীবনের নির্বাচন প্রসূত যেসব ভালো কিছু ঘটেছে তার সিংহভাগের প্রবক্তা তিনি? নাকি জনমতের চাপের মুখে ‘দুর্বিনীত’ মানুষ শেখ হাসিনাকে দিয়ে এরকম একটা আইন করিয়ে নেওয়া সম্ভব? তো সেই জনমত সৃষ্টির বাস্তবিক মেধাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রচেষ্টাটি কোথায়?  

যুক্তির খাতিরে যদি ধরেও নিই আওয়ামী লীগের ‘শুভবুদ্ধির’ উদয় হলো, এবং ৫৩  নাগরিক প্রদত্ত খসড়ার ওপর পরিমার্জন করে তারা একটা আইন প্রণয়ন করলো। ধরা যাক, অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই এই আইনে একটা ধারায় লিখলো, ‘নির্বাচন কমিশন গঠন করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কোনও যুদ্ধাপরাধী সংগঠন বা ফৌজদারি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত কোনও ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন কোনও দলের মতামত গ্রহণ করবেন না।’

তাহলে বিএনপি বা বিবৃতিদাতা বিশিষ্টজনদের অবস্থান কী হবে?

অথবা ধরা যাক, এসবের কিছুই থাকলো না, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কয়েকজন মানুষকে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দিলো। কিন্তু সেই কমিশনাররা শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক মানেন এবং সম্বোধনে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ব্যবহার করেন, তাহলে বিএনপির মননে ও সংজ্ঞায় তাঁরা কি যোগ্য কমিশনার হবেন? এর সঙ্গে আমাদের ‘ড্রাফটিং পলিটিক্স’ তো আছেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা বর্ণনায় সামান্য ‘দৈনন্দিন কাজের’ সংজ্ঞা কি আমরা নির্ধারণ করতে পেরেছিলাম?  
একটা আদর্শ আইন দিয়ে ফেব্রুয়ারি ২০২২ নাগাদ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠিত হলেও তা বিএনপির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, ইতোমধ্যে বিএনপির একটা শক্ত অবস্থান প্রতিভাত হয়েছে যে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল ছাড়া ২০২৩ সালের নির্বাচনে যাবেন না। যদি তা-ই হয়, আলোচনায় আসা নির্বাচন কমিশন আইন তড়িঘড়ি করে করার কোনও মানে হয় না। সেটা নতুন সংকটের জন্ম দেবে।

আইন প্রণয়নে ‘প্রণয়’ ব্যাপারটা লাগে। এতে বোঝা যায়, আইন বানানোর প্রক্রিয়া সময় ভালোবাসা ও মনোনিবেশ দাবি করে। প্রাসঙ্গিকভাবে স্মর্তব্য যে সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছেন (আব্দুল মান্নান খান, ২০১১)।
পরবর্তীতে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সেই বাতিলকে আরও সুসংহত করা হয়েছে।

তাই বিকল্প কোনও নির্বাচনকালীন সরকারের চিন্তা করে থাকলে বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলোকে নতুন কোনও সংবিধানসম্মত ফর্মুলা দিয়ে তা জনপ্রিয় করে তুলতে হবে এবং (সম্ভবত) নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে বা আলোচনা করে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গত দশ বছরে এরকম কোনও ফর্মুলা বিএনপি দিতে পারেনি এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে কিছু মন্ত্রণালয় ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত নির্বাচনকালীন সরকারে অংশগ্রহণের একটা সুযোগ বিএনপি গ্রহণ করেনি।

এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন হতে পারে, সার্চ কমিটি ফর্মুলার অবস্থান ও প্রকৃতি কী? উত্তর হচ্ছে, সার্চ কমিটির বর্তমান চর্চার মান একটা বিধিবদ্ধ আইন দিয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশনের মান থেকে বেশ কিছু দিক দিয়ে বেশি সৌকর্য ও সৌন্দর্যমণ্ডিত।

এই চর্চা প্রথম শুরু করেন রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, ২০১২ সালে। তিনি প্রথমে ২৪টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনা করেন। বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের পরামর্শ মতে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির (বর্তমান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন) নেতৃত্বে তিনি ছয় সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করেন। সার্চ কমিটির গঠনকে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে আইনি রক্ষাকবচ দেওয়া হয়। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ‘নোটিফিকেশন’ও আইনের মর্যাদা পায়। সার্চ কমিটি প্রতি পদের বিপরীতে দুই জন করে কমিশনারের নাম প্রস্তাব করে, এবং রাষ্ট্রপতি এদের মধ্য থেকে চার জনকে সদস্য এবং একজনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে নির্বাচন কমিশন গঠন করেন।

২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ রাষ্ট্রপতি  জিল্লুরের ফর্মুলা অনুসরণ করে এটাকে একটা সাংবিধানিক রেওয়াজে পরিণত করেন। গতবার থেকে একজন নারী সদস্য যুক্ত হওয়ার বিধান পাকা করা হয়েছে।

টিপ্পনিতে বলে রাখি, সাংবিধানিক আইনবিজ্ঞানের এই জেন্ডার উপলব্ধি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমবার বিএনপি সক্রিয়ভাবে এবং দ্বিতীয়বার নিষ্ক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। এক্ষেত্রেও বলা যায়, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই চর্চা একটা আইনের মর্যাদা পেয়েছে (অর্থাৎ ‘আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যেকোনও প্রথা বা রীতি’-দেখুন, অনুচ্ছেদ ১৫২, আইনের সংজ্ঞা)। এই চর্চার সুন্দর দিকগুলো হলো:
 
(১) সংলাপের মাধ্যমে এভাবে কমিশন গঠিত হলে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য তৈরি হয়। জনগণ খেয়াল করে বিধায়, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ফর্মুলা প্রদান ও কথাবার্তায় সতর্ক হয়। এ প্রক্রিয়ায় সার্চ কমিটিতে ও কমিশনের মনোনয়নে রাজনৈতিক দলগুলো এমন নাম প্রস্তাব করে যে, যাতে তাদের প্রস্তাবিত নামটি শ্রেয়তরভাবে অন্য দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। নাগরিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন বিধায়, এখানে অংশীমূলক গণতন্ত্রের চর্চা হয়। যেমন, এটা ভাবতেই কারও ভালো লাগতে পারে যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বা ড. মোহাম্মদ সাদিকের মতো ব্যক্তিত্বরা নাগরিক প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন গঠন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখছেন!

জনগণের ক্ষমতা অনুশীলনের একটি ছোট্ট কিন্তু তাৎপর্যময় উদাহরণ এটা। এভাবে গঠিত কমিশনের সদস্যরা মনে করতে থাকেন যে তারা সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে কমিশনার হয়েছেন। সুতরাং, তাদের কাউকে ভয় পাবার কিছু নেই। মূলত রাজনৈতিক সমাজের ঐক্যবদ্ধ অনুমোদন কোনও পাবলিক-ক্ষমতা অনুশীলনের মূল শক্তি।

(২) সংবিধান অনুসারে [অনুচ্ছেদ ৪৮ (৩)] রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে বাধ্য। কিন্তু রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান এই সাংবিধানিক লাউঞ্জটি বড় ক্যানভাসে মেলে ধরেছেন। সংলাপের আবহ থাকায় সার্চ কমিটি প্রক্রিয়া প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নেওয়ার বিধানকে বেশ খানিকটা নিষ্প্রভ করে দেয়। বিধিবদ্ধ আইন প্রক্রিয়ায় সেটা সম্ভব নয়। বিধিবদ্ধ আইন দিয়ে সংবিধানে লেখা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শের বিধান উপেক্ষা করা যায় না।
 
সংলাপপ্রসূত বিষয়ে লিখিত সংবিধানিকতার ওপর অলিখিত সাংবিধানিক প্রজ্ঞার জয় হয়। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অনুশীলন ব্যাপারটা ওই ৪৮(৩)-এর দ্বিতীয় অংশের ওপর জোর আরোপ করে: ‘প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোনও পরামর্শদান করিয়াছেন কিনা এবং করিয়া থাকিলে কী পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোন আদালত সেই সম্পর্কে কোন প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না।’ দলীয় পরিচিতি থাকলেও রাষ্ট্রপতি জিল্লুর এই চর্চাকে ৪৮(৩) প্রভাব-বলয়ের বাইরে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন তাঁর ব্যক্তিত্ব ও মুনশিয়ানা দিয়ে।
 
(৩) ব্রিটিশ সাংবিধানিক আইনে সাংবিধানিক কনভেনশন বা রেওয়াজ সাংবিধানিক আইনের উৎস। বিচারপতি আব্দুল মতিন তাঁর ‘আনরিটেন কনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ’ (মল্লিক ব্রাদার্স, ২০১৯) বইয়ে দেখিয়েছেন যে বাংলাদেশ সংবিধানেও কিছু অলিখিত রীতিনীতি আছে, যা সাংবিধানিক আইনের মর্যাদা পেতে পারে। যেমন, বিচারক নিয়োগে সুপ্রিম কোর্টের সাথে রাষ্ট্রপতির পরামর্শের রীতি। তেমনি, ইদ্রিসুর রহমান মামলায় (২০১০) সুপ্রিম কোর্ট সাব্যস্ত করেছেন যে সাংবিধানিক রীতিনীতি সাংবিধানিক আইনের সমকক্ষ।

তাই বলা যায়, সংলাপের মাধ্যমে সার্চ কমিটি গঠন করে নির্বাচন কমিশন গঠন করা একটা সাংবিধানিক রীতিনীতিতে পরিণত হয়েছে বা হওয়ার মতো পরিপক্ব অবস্থায় রয়েছে। আমরা এ চর্চাকে বাংলাদেশে কতটুকু এগিয়ে নিয়ে যাবো সেটাই দেখার বিষয়।
 
মার্কিন বিচারপতি ফ্রাঙ্কফার্টার-এর একটা কথা স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি মনে করতেন যে সবকিছুকে আক্ষরিক চোখ দিয়ে দেখা মানে হলো সংবিধানিকতাকে সাংবিধানিক প্রজ্ঞার সমান করে ফেলা। এটা উদারনৈতিকতার পরিপন্থী। দার্শনিক এমানুয়েল  কান্টের কথাও এখানে প্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে: “Woe to the political legislator who aims in his Constitution to realize ethical purposes by force, to produce virtuous institution by legal compulsion. For in this way, he will not only effect the very opposite result, but will undermine and endanger his political Constitution as well.”
 
একটা প্রশ্ন জাগতে পারে যে সার্চ কমিটি চর্চা যদি এমন ভালোই হবে তাহলে কাজী রাকিবুদ্দিন আহমেদ বা নুরুল হুদা কমিশন জনমনে এমন খারাপ ভাবমূর্তি তৈরি করলো কেন? এর কারণ খুঁজতে গেলে একটা আলাদা প্রবন্ধ লিখতে হবে।

এখানে শুধু এটুকু বলা যাবে, ২০১৪ বা ২০১৯ সালের নির্বাচনের মান শুধু নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এর সঙ্গে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আলাদা সুনির্দিষ্ট দায় রয়েছে। আগেই বলেছি, নির্বাচন কমিশনের শক্তি নির্ভর করে সেটা রাজনৈতিক দলগুলো (বিশেষ করে প্রধান প্রধান) কতটুকু একে নিজস্ব ভেবেছে তার ওপর। নুরুল হুদা কমিশন (২০১৭) গঠন আলোচনায় বিএনপি অংশ নেয়নি (এটা তাদের একান্তই নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত)।
 
আপন না ভেবেও তারা এর অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এর বড় একটা কারণ হলো, তারা অন্তত একজন মাহবুব তালুকদারকে তাদের ভাষায় কমিশনের ‘বিবেক’ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। তাছাড়া অতীতে বিএনপি যে মডেলের নির্বাচন কমিশন উপহার দিয়েছে (কে এম সাদেক, আব্দুর রউফ, এমএ আজিজ প্রমুখ), তা থেকে রাকিবুদ্দিন কমিশন বা নুরুল হুদা কমিশন ভালো না হলেও বেশি মন্দ কিনা তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।

এমএ আজিজ কমিশনের ‘পাগলামি’ এখনও মানুষের মনে ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। নিকট অতীতে দেখা যায় যে টালমাটাল রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কেএম শামসুল হুদা কমিশন শ্রেয়তর ভালো নির্বাচন করেছেন, এর কারণ হলো সব বড় রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সমর্থন পেয়েছিল হুদা কমিশন (২০০৯)।

হুদা কমিশনের সময় রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় ছিল না সত্যি, কিন্তু সেটা ১৩তম সংশোধনী প্রবর্তিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল না মোটেও।

তাহলে লিখিত বিধিবদ্ধ আইনে নির্বাচন কমিশন গঠন বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোনও ফল বয়ে আনবে না। সার্চ কমিটির মাধ্যমে সেটি হলে তা কিছুটা হলেও ভালো হবে। দীর্ঘ অনুশীলনের পর, একপর্যায়ে এটা লিখিত আইনি রূপ পেতে পারে। তাহলেই সেটা যদি মজবুত হয়!

আনুষঙ্গিক হিসেবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে দুই একটা কথা বলা দরকার। কারণ, বিনম্র রাজনৈতিক সংস্কৃতি (cultural humility) একটা দেশের আইন ব্যবস্থার চেহারা মূর্ত করে তোলে। শুধু সুপ্রিম কোর্ট দিয়ে ‘সাংবিধানিকতাবাদ’ হয় না। মার্কিন অধ্যাপক মার্ক টাশনেট একবার বলেন যে সুপ্রিম কোর্টের (মার্কিন) উঠান থেকে সংবিধানকে লোকচর্চায় আনতে হবে (টাশনেট, ‘টেকিং দ্য কনস্টিটিউশন এওয়ে ফ্রম দ্য কোর্টস, প্রিন্সটন, ১৯৯৯)। প্যাটি স্মিথের একটা পপ গান ব্যাপারটা চমৎকার করে ধরেছে (১৯৮৮):

The People Have the Power
To Redeem the Work of the Fools
Upon the Meek the Graces Shower
It's Decreed--
The People Rule.

একটা রাজনৈতিক সমাজকে সংবিধান পরিচর্যার দায়িত্ব নিতে হয়। একটা সংলাপময় আবহ জারি রাখলে আইনের শাসনের লাভ হয়। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে দেশ পরিচালনাকারীদের মতবিনিময় চর্চা অব্যাহত রাখা উচিত।

অধ্যাপক বিউ ব্রেসলিন তাঁর বইয়ে লেখেন (২০০৯): ‘রাজনৈতিক পরিশুদ্ধতার খোঁজে সংবিধান বানানোর কাজ শুরু হয় সংবিধানের ভাষা ও নাগরিকের মধ্যে রূপক সংলাপের মধ্য দিয়ে।’ সম্ভবত এটাকেই বিখ্যাত আর্জেন্টাইন সংবিধান বিশেষজ্ঞ রবার্তো গার্গারেলা নাম দিয়েছেন ‘ডায়ালজিক কনস্টিটিউশনালিজম’।
যে সংকট আমাদের জাতীয় জীবনকে নিয়মিত বিরতিতে তাড়িত করে, সে সংকট আমাদের জবান (word) ও জগতের (world) মধ্যে গরমিলের। আমাদের রাজনীতিকদের উচিত প্রতিশ্রুতি (word), বাস্তবতা (world) ও জবাবদিহিতার (accountability) মধ্যে সমন্বয় ঘটানো। বৃহৎ আমাদের সাংবিধানিক ক্যানভাস। সেখানে যে  বাধা তা মূলত ক্ষমতা অনুশীলন ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যকার, সরকার ও জনগণের মধ্যে সম্পর্কের এবং আক্ষরিক ও চেতনাগত  দৃষ্টিভঙ্গির । এই বাধাগুলো আমাদের অতিক্রম করতে হবে।

নেলসন ম্যান্ডেলার একটা কথা দিয়ে শেষ করি। ম্যান্ডেলা বলেন যে, ‘আইনের শক্তি আইন থেকে আসে না, আসে আইন মানার সক্ষমতা থেকে। একটা সংবিধানের মহত্তম প্রভাব লুকিয়ে থাকে এর একটা স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সমাজ প্রতিমূর্ত করে তোলার ক্ষমতা থেকে।’
 
লেখক: শিক্ষক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/এমওএফ/

আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারের ঘাটতি!

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ১৬:২৬
প্রভাষ আমিন গল্পটা আগেও বলেছি। আসলে গল্প নয়, সত্যি ঘটনা। বেশ কয়েক বছর আগে আমার মামা বাড়ির এলাকার এক ভদ্রলোক এলেন আমার অফিসে। তিনিও সম্পর্কে আমার মামা। অনেক বছর পর মামাবাড়ির এলাকার কাউকে পেয়ে আমি নস্টালজিক হয়ে গেলাম। অনেক স্মৃতিচারণা হলো। পরে বললেন, তিনি দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন। এখন দেশে ফিরেছেন। দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে চান। পরে খোলাসা করলেন, তিনি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। আমি ভাবলাম, কাভারেজ-টাভারেজ চাইবেন। মনে মনে ভেবেও নিলাম, প্রয়োজনে একদিন তার মিছিলের ছবি দেখিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু তিনি আমাকে চমকে দিয়ে বললেন, নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও সহায়তা লাগবে না। তিনি মনোনয়ন সংক্রান্ত সহায়তা চান। আমার দৃষ্টিতে বিস্ময় দেখে তিনি ব্যাখ্যা করলেন, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেই জয় নিশ্চিত। তাই মূল লড়াইটা হয় মনোনয়নের টেবিলে, নির্বাচনের ময়দানে যা হয় সব সাজানো। এবার তিনি আরও খোলাসা করলেন, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে টাকা লাগে। টাকা দিতে তার আপত্তি নেই। প্রয়োজনে বেশিই দেবেন। কিন্তু সমস্যা হলো, এই কৌশলে অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরাও টাকা নিয়ে ঢাকা এসেছেন। আমার কাছে তার চাওয়া হলো, টাকা দিলে মনোনয়ন যাতে নিশ্চিত হয়, সেটা যেন আমি বলে দেই। কারণ, টাকা দিয়ে মনোনয়ন না পেলে পরে আর সেই টাকা ফেরত পাওয়া যায় না। আমি মনে মনে বিরক্ত হলেও সেটা গোপন করে বললাম, মামা টাকা দিয়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কেনা যায়, এমন খবর আমার জানা নেই। আর আমি বলে দিলে তিনি মনোনয়ন পাবেন, এমন কোনও যোগাযোগও আমার নেই। তিনি মনঃক্ষুণ্ন হয়ে ফিরে গেলেন।

পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, ঘটনা মিথ্যা নয়। বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে টাকা লাগে। শুধু মনোনয়ন নয়, আওয়ামী লীগ এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পদ-পদবি পেতেও টাকা লাগে। পুরো বিষয়টাই এখন ওপেন সিক্রেট। দেশজুড়ে এখন দফায় দফায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে। এসব নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়েও নানান কথা বাতাসে। স্থানীয় পর্যায় থেকে নামের তালিকা পাঠানো হয় কেন্দ্রে। কেন্দ্র সেই তালিকা থেকে মনোনয়ন চূড়ান্ত করে। তবে সেই তালিকার বাইরের কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ক’দিন আগে স্থানীয় নেতাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থীর নাম পাঠান। টাকা খেয়ে খারাপ লোকের নাম কেন্দ্রে পাঠাবেন না।’ তার মানে বিষয়টা পরিষ্কার, ‘টাকা খেয়ে’ নাম পাঠানোর ঘটনা ঘটে। আর ঘটনা যে ঘটে সেটা পত্রপত্রিকায় চোখ রাখলেই বোঝা যায়। চলুন কয়েকটি পত্রিকার শিরোনামে চোখ বুলিয়ে আসি, ‘সিলেটে এককালের শিবির নেতা এখন নৌকার প্রার্থী’, ‘ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পেলেন নৌকা প্রতীক’, ‘আওয়ামী লীগের তালিকায় বিএনপির সাবেক নেতা’, ‘তৃণমূল নাম না দিলেও মনোনয়ন পেলেন প্রবাসী’।

চাইলে এ তালিকা আরও অনেক লম্বা করা যাবে। আমি একটা জিনিস বুঝলাম না, টাকা খেয়ে বিএনপি বা শিবির নেতাকে মনোনয়ন দিতে হবে কেন? আওয়ামী লীগে কি টাকা দেওয়ার মতো নেতার অভাব রয়েছে। নাকি শিবির, ছাত্রদলের রেট বেশি? আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কি নিলামে বিক্রি হয়?

অবস্থাটা মনে হয় এমনই, যিনি বেশি টাকা দেবেন, যে দলই করুন তিনিই মনোনয়ন পাবেন। একযুগ ক্ষমতায় আছে বলেই নয়, বরাবরই আওয়ামী লীগের মূল শক্তি তার তৃণমূল। দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সাংগঠনিক ভিত্তিই বিভিন্ন বিপর্যয়ে দলকে টিকিয়ে রেখেছে। একযুগ ক্ষমতায় থাকার সুযোগে তৃণমূলকে আরও শক্তিশালী করতে পারতো আওয়ামী লীগ। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে উল্টো। আওয়ামী লীগের তৃণমূলে এখন হাইব্রিডের ভিড়। নানান সুযোগ-সুবিধা পেতে, মামলা থেকে বাঁচতে বিএনপি, জামায়াত, শিবিরের নেতারা এখন ভিড়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগে। দ্রুত তারা চলে আসছে সামনেও। আওয়ামী লীগের দরজা খোলা, কেউ ফেরে না খালি হাতে। সবাই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চাইবে, ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিতে চাইবে। কিন্তু সিদ্ধান্তটা আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে, তারা কাকে নেবে, কাকে নেবে না বা আদৌ বাইরের কাউকে নিতে হবে কিনা। আগেই যেমন বলেছি, দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের শক্ত ভিত্তি আছে। ৭৫’র পর ২১ বছর এরা লড়াই-সংগ্রাম করে আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রেখেছে। বিভিন্ন সময়ে এরা নির্যাতিত হয়েছে। দলের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করতেই তো আওয়ামী লীগের দম ফেলার সুযোগ পাওয়ার কথা নয়। অন্য দলের নেতাদের আওয়ামী লীগে নিতে হবে কেন? আওয়ামী লীগে কি আওয়ামী লীগ নেতার ঘাটতি পড়েছে? বছরের পর বছর যারা দলের জন্য ত্যাগ করেছেন, দল এখন তাদের ত্যাগ করছে। ক্রিম খেয়ে নিচ্ছে উড়ে এসে জুড়ে বসা সুখের পায়রারা। আওয়ামী লীগের মাঠে এখন ফসলের চেয়ে আগাছা বেশি।

জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার পর সিলেটে এখন উত্তেজনা। টাকার বিনিময়ে কমিটি ঘোষণার অভিযোগ এনে ছাত্রলীগেরই একাংশ বিক্ষোভ করছে। নতুন কমিটির নেতাদের বাসায় ভাঙচুর করেছে ছাত্রলীগের বঞ্চিতরা। যেকোনও সংগঠনের কমিটি ঘোষণার পরই কিছু নেতা নিজেদের বঞ্চিত মনে করেন। কিন্তু সিলেটের বিক্ষোভটি তেমন সরল নয়। এখানে টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এসেছে।

আওয়ামী লীগে বহিরাগতদের ‘হাইব্রিড’ বা ‘কাউয়া’ বলা হয়। এই টার্ম দুটিকে জনপ্রিয় করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ‘হাইব্রিড’ আর ‘কাউয়া’দের ব্যাপারে দলে সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠ ওবায়দুল কাদের। এই ক’দিন আগেও তিনি বলেছেন, ‘দুঃসময়ে বসন্তের কোকিলরা দলে থাকবে না, ত্যাগীরাই সুখে-দুঃখে দলের পাশে থাকবে।’ ওবায়দুল কাদের বছরের পর বছর ‘হাইব্রিড নেতা’দের বিরুদ্ধে বলছেন বটে। কিন্তু তাতে আওয়ামী লীগে তাদের অনুপ্রবেশের স্রোত ঠেকানো যাচ্ছে না। ঠেকায় পড়ে হেলেনা জাহাঙ্গীরদের মতো দুয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও সাধারণভাবে হাইব্রিডদের চিহ্নিত করে তাড়ানো বা দলে হাইব্রিডদের পৃষ্ঠপোষক নেতাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। হেলেনা জাহাঙ্গীর বা সাহেদের মতো লোকেরা কীভাবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটিতে ঠাঁই পেলো, এই প্রশ্নের জবাব নেই। অথচ ওবায়দুল কাদের চাইলে মুহূর্তে হাইব্রিড এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করতে পারেন। ওবায়দুল কাদের যে দুঃসময়ের কথা বলেছেন, তা আসার আগেই বসন্তের কোকিলদের তাড়াতে হবে, দল পরিষ্কার করতে হবে, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করতে হবে। নইলে দুঃসময় প্রলম্বিত হতে পারে।

একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা দিয়ে লেখাটি শেষ করি। রাজবাড়ি-১ আসনের এমপি কাজী কেরামত আলী রাজবাড়ি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি তার দলীয় পদটি ছোট ভাই কাজী ইরাদত আলীকে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে লিখে দিয়েছেন। ছোট ভাই ২০১৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন চাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। ইরাদত আলী ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ছোট ভাই যাতে মনোনয়নে বাগড়া দিতে না পারেন, সে জন্য কাজী কেরামত আলী সাধারণ সম্পাদক পদটি তাকে লিখে দেন। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টটি আমি একাধিকবার পড়েছি, বিশ্বাস হতে চায়নি। কিন্তু ঘটনা সত্য। আওয়ামী লীগ কি কারও পৈতৃক সম্পত্তি যে চাইলেই স্ট্যাম্পে সেটা লিখে দেওয়া যায়? শুধু আওয়ামী লীগ কেন, বিশ্বের কোনও সংগঠনেই স্ট্যাম্পে লিখে ছোট ভাইকে পদ দেওয়ার কোনও নজির নেই। সে ক্ষেত্রে এটি আওয়ামী লীগের ‘দেউলিয়া’পনার বিশ্বরেকর্ড হয়ে থাকবে। এভাবে চললে, ওবায়দুল কাদের যে দুঃসময়ের আশঙ্কা করছেন, তা এলে আরও প্রলম্বিত হবে।
 
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

মানুষ কেন বিএনপিকে ভোট দেবে?

মানুষ কেন বিএনপিকে ভোট দেবে?

ক্ষোভের আগুনে পুড়ুক সব অনিয়ম

ক্ষোভের আগুনে পুড়ুক সব অনিয়ম

২১ হাজার কোটি টাকা ‘জানের সদকা’!

২১ হাজার কোটি টাকা ‘জানের সদকা’!

চাপ নয়, শিক্ষা হোক আনন্দের

চাপ নয়, শিক্ষা হোক আনন্দের

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

তথ্য প্রতিমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবে: জিএম কাদের

তথ্য প্রতিমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবে: জিএম কাদের

আবাহনীকে হারিয়ে মেরিনার্সের প্রথম শিরোপা

আবাহনীকে হারিয়ে মেরিনার্সের প্রথম শিরোপা

জানুয়ারি থেকে দুই সেমিস্টারে ভর্তি নিতে ইউজিসির নতুন কৌশল

জানুয়ারি থেকে দুই সেমিস্টারে ভর্তি নিতে ইউজিসির নতুন কৌশল

সরকার মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে: আ স ম রব

সরকার মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে: আ স ম রব

খাদ্যে ভেজাল বন্ধে বৈষম্য ছাড়াই আইন প্রয়োগের সুপারিশ

খাদ্যে ভেজাল বন্ধে বৈষম্য ছাড়াই আইন প্রয়োগের সুপারিশ

পুনরায় হামলা-লুটপাটের আতঙ্কে গ্রাম ছাড়ছেন তারা

মাগুরায় চার খুনপুনরায় হামলা-লুটপাটের আতঙ্কে গ্রাম ছাড়ছেন তারা

‘কূটিল রাজনীতির কারণে সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে’

‘কূটিল রাজনীতির কারণে সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে’

অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে সরাসরি সুপার-১২ পর্বে খেলবে বাংলাদেশ যদি...

অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে সরাসরি সুপার-১২ পর্বে খেলবে বাংলাদেশ যদি...

খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটি এসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করার দাবি

খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটি এসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করার দাবি

২৪ ঘণ্টায় ৬ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ২৯৩

২৪ ঘণ্টায় ৬ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ২৯৩

আসিয়ান সম্মেলন থেকে বাদ মিয়ানমারের জান্তা প্রধান

আসিয়ান সম্মেলন থেকে বাদ মিয়ানমারের জান্তা প্রধান

‘ভবনে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং থাকলে ১০ শতাংশ হোল্ডিং কর রেয়াত’

‘ভবনে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং থাকলে ১০ শতাংশ হোল্ডিং কর রেয়াত’

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune