X
শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২
১৭ আষাঢ় ১৪২৯

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিভ্রান্তি

আপডেট : ০৮ মে ২০১৭, ১৭:৫৬

নাদীম কাদির সাংবাদিকতা পেশায় আছি ৩৬ বছর ধরে। জাতীয় দৈনিকগুলোকে দীর্ঘদিন কাজ করার পর ১৯৮৮ সালে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কাজ শুরু করি। ২০১৫ সালে লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার হিসেবে যোগদানের আগ পর্যন্ত আমি আন্তর্জাতিক মাধ্যমে কর্মরত ছিলাম।
আজ লিখতে প্ররোচিত হয়েছি বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নে বহির্বিশ্বের বিভ্রান্তি নিয়ে। ওই বিভ্রান্তির নেপথ্যে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশের সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল, তাদের অনুসারী, কূটনীতিক এবং এনজিওগুলো।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংগঠনগুলো শোনা কথার ওপর নির্ভরশীল। কাজের ক্ষেত্রে তারা প্রাথমিক তথ্য কিংবা প্রকৃত ঘটনাকে উপজীব্য করে না। কোনও পূর্ববর্তী ধারণা কিংবা চেনা পরিচয় ছাড়াই টেলিফোনে তারা এনজিও কর্মী, কূটনীতিক আর ব্যক্তি-সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বললাম এইসব।
আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতির নামে নিজেদের দেশ নিয়ে কুৎসা রটাতেও দ্বিধা করে না। সত্যিই খুব দুঃখজনক যে, বাংলাদেশ যে তাদের নিজেদের দেশ সে কথা তারা ভুলে যায়। নিজেদের শাসনামলে গণমাধ্যমের জন্য তারা কতটুকু করতে পেরেছে, সে ব্যাপারে কথা না বলে প্রতিপক্ষ কী করলো না করলো তা নিয়ে নানা শোরগোল করে।
কেবল লন্ডনে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্র হিসেবে নিয়োজিত আছি বলেই বলছি না। স্বাধীন ও প্রতিনিধিত্বশীল গণমাধ্যমের বিকাশে দেশে সত্যিকার অর্থেই খুবই অনুকূল পরিবেশ-পরিস্থিতি রয়েছে। রয়েছে রাষ্ট্রীয় সমর্থন। সত্যিই নৈতিকভাবেই অ্যামনেস্টির মতো সংগঠনগুলোর মিথ্যাচার গ্রহণ করাটা কঠিন।
দেশের ইতিহাসে হাসিনা সরকারের সময়ে ব্যবসায়িক-লাইসেন্স পাওয়া টিভি, রেডিও ও সংবাদপত্র সংখ্যার বিচারে নজিরবিহীন। এটা বাস্তব। ইন্টারনেট, নাগরিক সাংবাদিকতা এবং অনলাইন নিউজ সার্ভিসের এ যুগে সত্য কথা বলার জন্য কিভাবে প্রেসকে কণ্ঠরোধ করা যেতে পারে? কিভাবে তাকে আলাদা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা যায়?
বিভিন্ন সরকারের সময়ে কিংবা নিজ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন সহকর্মীর মাধ্যমে আমি বিভিন্ন সময়ে সেন্সরশিপের শিকার হয়েছি। ঊর্ধ্বতনদের আরোপিত সেন্সরশিপ কিবা স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ যাই হোক না কেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার জন্য আমি প্রথমে নিজেদেরকেই দায়ী করবো।
১৯৯১ সালে জেনারেল হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের ক্ষমতাচ্যুতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আবারও গণতন্ত্র ফিরে আসে। আর এর পরপরই এরশাদবিরোধী ইউনাইটেড ফ্রন্ট ভেঙে সাংবাদিক সম্প্রদায় বিভক্ত হতে শুরু করে। দেখলাম, ধীরে ধীরে স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ বাড়ছে, বাড়ছে পক্ষপাত। ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে পাল্টে দেওয়ার প্রচেষ্টাও চোখে পড়তে শুরু করে।

নিজে কখনও সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত ছিলাম না। তবে আমার মতাদর্শিক অবস্থান ছিল। ছিল পারিবারিক প্রভাব। ইতিহাস বিকৃতির প্রবণতা আমি প্রথম লক্ষ্য করি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক এক বার্তা সংস্থার জন্য প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে আমি লিখেছিলাম, ‘বাংলাদেশ আজ তাদের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করছে।’ আমার সহকর্মীর বক্তব্য ছিল, অনেকেই তো শেখ মুজিবকে জাতির জনক মানেন না। আমি যেন তার নামের সঙ্গে শুধু প্রথম প্রেসিডেন্ট লিখি। হায়, ইতিহাসের এ কোন নির্মম পরিহাস! সেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে তিনিই বাংলাদেশের জাতির জনক। এখন এটি নিয়ে সংশয়ের কারণ, সামরিক শাসকেরা ইতিহাসের পাতা থেকে তার নাম নিশ্চিহ্ন করতে চায়।

আমি আমার সহকর্মীদের বললাম, ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত কেউ এ ধরনের ইতিহাস-মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আওয়াজ তোলেনি। এরপর থেকে যা হয়েছে তা একেবারে রাজনৈতিক কারণেই হয়েছে। কিন্তু আমরা যেহেতু আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার জন্য কাজ করি, সেক্ষেত্রে আমাদের সত্যিকারের ইতিহাস অনুসরণ করা উচিত। এরপর যা ঘটলো তা এক বিশাল ইতিহাস।

মজার ব্যাপার হলো বিএনপি নেতা তারেক রহমান এখন দাবি করেন, তার বাবা জিয়াউর রহমান প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন?

গণমাধ্যমেও রয়েছে চরম রাজনৈতিক বিভাজন। আমরা সাংবাদিকেরা একে অপরের বিরুদ্ধে লিখতে দ্বিধা করি না। কেউ যদি দেশের বাইরে থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করতে চান, সরেজমিনে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করেই তা করতে হবে।

জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে নিরাপত্তা এবং অন্যান্য কিছু বিষয় জড়িয়ে থাকে যেখানে পেশাগত দক্ষতার সঙ্গে বিষয়গুলোকে বিচার করার দরকার হয়। বিশ্বের যে কোনও স্থানে এগুলো নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করা হয়। বিশ্বের সবখানে, এমনকি ব্রিটেনের মতো দেশেও সংবাদমাধ্যম পরিচালনা করতে গিয়ে আইনকানুন মানতে হয়। তবে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম সবার জন্য উন্মুক্ত।

কোনও কোনও ঘটনার ক্ষেত্রে প্রায়শই কারণে-অকারণে ভিন্ন রঙ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে বাইরের মানুষের জন্য প্রকৃত ঘটনা জানা কঠিন হয়ে পড়ে। একজন সাংবাদিককে চাঁদাবাজির জন্য আটক করা হলে সেটাকেও ভিন্ন রং দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। প্রকৃত অপরাধ ঢাকতে দল-প্রীতির অভিযোগ তোলা হয়। অথবা ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়। সাংবাদিক হয়রানির দুই একটা ঘটনায় সত্যাসত্য থাকতেও পারে, তবে এর নেপথ্য কারণ খুঁজে নেওয়া দরকার।

গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে মত প্রকাশের স্বাধীনতার মানে হলো দায়িত্বশীল হয়ে কোনও পক্ষপাত ছাড়া লেখা। স্বাধীনতাকে কোনও স্বার্থ অর্জনের কিংবা অন্যেকে খুশি করবার কাজে ব্যবহার এর অন্তর্গত নয়।

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে খুবই ইতিবাচক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। চলুন কেবল সমালোচনা না করে এর প্রতি আমরা সমর্থন বাড়াই। এই স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে গর্বিত হই। একটি দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে কুৎসা রটনার আগে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারীদেরও সতর্ক হওয়া উচিত। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য বেশিরভাগ সাংবাদিক যে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তার প্রতিও আমাদের শ্রদ্ধাবোধ দরকার।

লেখক: সাংবাদিকতায় জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারসোল্ড স্কলার এবং লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি
বিদ্যুৎ কোম্পানিতে চাকরি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি
টিভিতে আজ
টিভিতে আজ
‘এতদিন শুকনো খাবার খেয়ে থাকা যায়?’
‘এতদিন শুকনো খাবার খেয়ে থাকা যায়?’
নির্গমন কমাতে বাইডেনের ক্ষমতা কমিয়ে দিলো সুপ্রিম কোর্ট
নির্গমন কমাতে বাইডেনের ক্ষমতা কমিয়ে দিলো সুপ্রিম কোর্ট
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ