X
রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
৯ আশ্বিন ১৪২৯

ওয়াইসি: ‘নতুন জিন্নাহ’ নাকি ‘বিজেপির এজেন্ট’?

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
১২ নভেম্বর ২০২০, ১৪:১১আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২০, ১৪:৪৫

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী গত মঙ্গলবার ১০ নভেম্বর ২০২০ ভারতের বিহার রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে ফলাফল ঘোষিত হলো। ২৪৩ আসনের বিহার বিধানসভার ১২৫টি আসন পেয়ে আবারও বিজেপির জোট ন্যাশনাল ডেমোক্র‌্যাটিক অ‌্যালায়েন্স (এনডিএ) সেখানে সরকার গড়তে যাচ্ছে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড এই জোটের নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু ফলাফলে দেখা যাচ্ছে এনডিএ-র সহযোগী দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭৪টি আসন পেয়ে বিজেপি এখন জোটে ‘বড় ভাইয়ে’র আসন নিয়েছে। নীতিশের দল পেয়েছে ৪৩টি আসন। সে কারণে নীতিশ কুমার আবারও মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আসবেন কিনা সন্দেহ দেখা দিলেও বিজেপির শীর্ষ নেতারা নিশ্চিত করেছেন নীতিশই টানা চারবারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন। এই নিয়ে সপ্তমবারের মতো নীতিশ কুমার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হবেন।
গতবারের মতো এবারও লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দলকে বিহারের একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েও বিরোধী দলের আসনে বসতে হচ্ছে। কংগ্রেসকে নিয়ে যে মহাজোট তারা করেছে সেখানে আরজেডি ৭৫, কংগ্রেস ১৯, বামেরা ১৬ আসন পেয়েছে। সরকার গঠন করতে না পারলেও লালুর ছেলে আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন অনেকে, ভোটে নীতিশ কুমারকে জোরালো একটি ধাক্কা দেওয়ার জন্য। এই ভোটে ৫ আসন পেয়ে অভাবনীয় ফলাফল করেছে সর্বভারতীয় মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এমআইএম)। চমক দিয়েছে বাম দলগুলোও।

এমআইএম নেতা আসাদউদ্দীন ওয়াইসি ভারতের মুসলমান সম্প্রদায়ের একজন জনপ্রিয় নেতা। তিনি সর্বভারতীয় মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন দলের প্রেসিডেন্ট। হায়দ্রাবাদ থেকে তিনবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়াতেও বেশ আলোচিত কোটি কোটি টাকার মালিক এই ওয়াইসি। 

বিহার নির্বাচনের আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ তাকে নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে ‘ওয়াইসির জিন্নাহ হতে চাওয়া আত্মঘাতী হবে’ শিরোনামে একটি কলামে লিখেছিলাম। সেখানে বলেছিলাম যে, তার কার্যক্রম ভারতীয় মুসলমানদের জন্য কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণ ডেকে আনতে পারে। কারণ তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রত্যেক নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তর প্রদেশ, হায়দারাবাদ অর্থাৎ যেখানে যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলমানরা বসবাস করে সেখানে তার সংগঠনের পক্ষ থেকে নির্বাচনে প্রার্থী দেবেন এবং মুসলমানদের সমর্থন নিয়ে তার প্রার্থীকে জেতানোর চেষ্টা করবেন। এর ফলে ভোট ভাগাভাগিতে মুসলমানরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আমার আশঙ্কা সত্য হয়েছে। মহাজোট বিহারে সরকার গঠনের পর্যাপ্ত আসন সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ওয়াইসির এমআইএম ২০ আসনে প্রার্থী দিয়ে ৫ আসন পেয়েছে। তার দল সীমাচল এলাকার যেসব আসনে প্রার্থী দিয়েছে তার মধ্যে ১৪টি মুসলিম অধ্যুষিত আসন। অল্প কয়েক আসনের জন্য লালুর দল ক্ষমতায় বসতে পারছে না এখন। ফলে নির্বাচনের পর আবারও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—ওয়াইসি ভারতীয় মুসলিমদের ‘নতুন জিন্নাহ’ নাকি ‘বিজেপির এজেন্ট’? কারণ অনেকে মনে করছেন ওয়াইসির দল মুসলিম ভোট কেটেছে বলেই বিজেপি জোট বিহারে আবার ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে। লালুর রাষ্ট্রীয় জনতা দল এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ওয়াইসিকে ভোটের আগেও বলেছে ‘বিজেপির দালাল’। সংখ্যালঘুদের ভোট ভাগ করার জন্য তিনি প্রার্থী দেন। উল্লেখ্য, মুসলমানরা বিহারের জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ। বিধানসভা কয়েকটি আসনে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে এবং কমপক্ষে ৫০টি বিধানসভা আসনের ভাগ্য নির্ধারণ করে মুসলমানেরা।
আসাদউদ্দীন ওয়াইসি বিবিসির কাছে এই অভিযোগ অবশ্য জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন ভারতীয় মুসলিমরা তাকে বিজেপির ‘উপযুক্ত জবাব’ হিসেবে দেখছেন বলেই বিভিন্ন রাজ্যে বেছে নিচ্ছেন। ফলে কে কী বললো তার কিচ্ছু যায় আসে না, আর ভোট-কাটুয়া বা বি-টিম গালি পুরনো হয়ে গেছে। ভোটের রেজাল্ট যখন ঘোষিত হচ্ছিল তখন এনডিটিভির সঙ্গে একটি লাইভ ইন্টারভিউতে তিনি অবশ্য অভিযোগ আনেন, মহাজোটে যেতে চাইলেও কংগ্রেস জোট তাকে অংশীদার করেনি। তাদের কাছে তিনি হচ্ছেন সবচেয়ে অচ্ছুত।
মহারাষ্ট্র ও বিহারের পর আসাদউদ্দীনের পরবর্তী টার্গেট যে পশ্চিমবঙ্গ, সেটা তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন অনেক আগে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে বিজেপির দালাল বলছেন। কারণ ওয়াইসি পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ভোটে ভাগ বসিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় ফেরার রাস্তা কঠিন করে তুলতে পারেন। এমআইএম  অনেক পুরনো দল হলেও বছর কয়েক আগেও হায়দ্রাবাদ শহরের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তার প্রভাব। তিন তালাক রদ করার বিরোধিতা থেকে শুরু করে বাবরি মসজিদ ভাঙার ইস্যু বা নাগরিকত্ব আইন নিয়ে ওয়াইসি যেভাবে সরব হয়েছেন, তাতে ভারতীয় মুসলিম সমাজের একটা বড় অংশ তাকে ভারতের ‘নতুন জিন্নাহ’ ভাবতে শুরু করেছে।

পশ্চিম বাংলায় ত্রিশ শতাংশ মুসলমান। ২০২১ সালের এপ্রিল-মে মাসে পশ্চিম বাংলার বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপি সর্বশক্তি নিয়োগ করে তৃণমূল কংগ্রেসের মমতাকে হটিয়ে সরকার গঠনে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশকে কোনও বিষয়ে চোখ রাঙাতে হলেও পশ্চিম বাংলায় বিজেপির ক্ষমতায় থাকা প্রয়োজন। সুতরাং এবার তারা কঠোরভাবে মাঠে থাকবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা কব্জা করার ফন্দি ফিকিরে। জেতার জন্য হেন কোনও অশুভ তৎপরতা বাকি রাখবে না হিন্দু মৌলবাদীরা। এই তৎপরতায় বাংলাদেশে তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করে দাঙ্গা বাধানোর পরিকল্পনাও তাদের মাথায় আছে। এর মধ্যে তার লক্ষণ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ এবং সরকারের এ বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার।
ভারতের মুসলমানদের এখন কঠিন সময়। সারা বিশ্বে মুসলিম নির্যাতনের কাতারে ইসরায়েলের নেতানিয়াহুর সরকারের সঙ্গে ভারতের নরেন্দ্র মোদির সরকারের নামও শীর্ষে উঠে এসেছে। তার সরকার মুসলমানদের নাগরিকত্বহীন করার চেষ্টা করছে, কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন হরণ করেছে, মানবাধিকার বলতে কিছু নেই ভারতীয় মুসলিমদের। সবকিছুর কারণ ভারতের কেন্দ্রে হিন্দু মৌলবাদী দল বিজেপি ক্ষমতায়। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের মতো কট্টোর সাম্প্রদায়িক, মুসলিম বিদ্বেষী ব্যক্তিরা সেখানে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী আর অমিত শাহ তখন সেখানে ডেপুটি-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তখনই গুজরাটের নির্মম দাঙ্গা হয় আর কয়েক হাজার মুসলমানকে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। এ বছর প্রাণ হারাতে হয়েছে দিল্লির দাঙ্গায়।
যেভাবে হিন্দু মৌলবাদীদের নিয়ে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ মাঠে নেমেছেন, বিহারের মতো পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের কয়েকটি নিশ্চিত আসনে এমআইএম  থেকে মুসলমান প্রার্থী দিয়ে ভোট বিভক্ত করে ফেলেন তাহলে বিজেপির বিজয় অবধারিত। মুসলিম ভোটের যে কোনও বিভক্তি মুসলিম স্বার্থের পরিপন্থী হবে। এই দুর্দিনে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করে পদক্ষেপ দিতে হবে মুসলমানদের। এখন ভারতীয় মুসলমানদের উচিত হবে স্থানীয় রাজ্যভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক দলগুলোর সঙ্গে মিলে মিশে নির্বাচন করা। আর আসাদউদ্দীন ওয়াইসিকে ভারতীয় মুসলমানদের কল্যাণ চাইলে মুসলিম ভোট ভাগ করার চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে। মুসলিম নেতা হিসেবেও নানা বিষয়েই তিনি খুব রক্ষণশীল মনোভাব নিয়ে চলেন। তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী, তিনি ঠিক কী করতে চান তা নিয়েও বিতর্ক আছে। তিনি যদি নিজেকে দেশভাগের আগের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভাবেন তাহলে ভুল করবেন।
এদিকে, মুসলমানদের দাবির রাজনৈতিক মুখ হিসেবে ওয়াইসির উত্থান ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দলগুলোর জন্য একটি বড় সতর্ক বার্তা। দিনের পর দিন ‘মুলা’ দেখিয়ে যারা মুসলমানদের ভোট ব্যাংক হিসেবে গণ্য করেছে কিন্তু তাদের কল্যাণে কাজ করেনি, তাদের ভাবতে হবে ধর্মীয় মেরুকরণের আগ্রাসী রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদীদের প্রতিহত করতে মুসলমানরাও এখন ইসলামি রাজনীতির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য। এই পরিস্থিতিতে যারা ইসলামিকরণের রাজনীতি করে তাদেরকে উপেক্ষা করে দূরে ঠেলে দিলে তারা আরও দূরে চলে যাবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ