X
মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২
২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

কোন ‘কিলার’ কমাবে আমাদের ‘পেইন’?

প্রভাষ আমিন
০৪ নভেম্বর ২০২১, ১৬:৪৯আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২১, ১৭:৩৩

প্রভাষ আমিন

বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতি আমাদের প্রবল অনুরাগ, তীব্র ভালোবাসা, আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা। ভালোবাসা যতই থাকুক; টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে টাইগাররা যা খেলেছে, আমরা যদি ধরি এটাই আমাদের সামর্থ্য, তাহলে বেদনাটা কম হতো। এটা যদি সত্যি হতো তাহলে মেনে নিতে আমাদের আপত্তি থাকতো না। কিন্তু এটা বাস্তবতা নয়। আর যদি এটাই বাস্তবতা হয়, সবকিছু ঢেলে সাজানোর সময় এসে গেছে।

জয়-পরাজয়ই খেলার শেষ কথা নয়। আমরা জিতলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে আছিই, হারলেও আছি। কিন্তু আমাদের এই প্রশ্নহীন সমর্থনকে পুঁজি করে যখন ক্রিকেট বোর্ডের ব্যাংক ব্যালেন্স মোটা হয় আর দলের পারফরম্যান্স নামে তলানিতে, তখন আমাদের বুক ভেঙে যায়। তালেবান শাসিত আফগানিস্তান বা নামিবিয়াও এবারের বিশ্বকাপে কিছু না কিছু চিহ্ন রেখেছে, সবার নজর কাড়তে পেরেছে। সেখানে বাংলাদেশের অর্জন শূন্য। জয়-পরাজয় বড় কথা নয়; কিন্তু পরাজয়ের ধরন, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, খেলোয়াড়দের কমিটমেন্ট, বোর্ড কর্তাদের খামখেয়ালিপনা– সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট আজ এক টার্নিং পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছে।

২০০৭ সালে প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েই জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। আশরাফুলরা তখন যে ভয়ডরহীন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট দেখিয়েছেন; ১৪ বছরে তো সেটি এগোনোর কথা। কিন্তু হয়েছে উল্টো। আমরা যেন পেছাতে পেছাতে শুরুতে চলে গেছি। জয় নয়, সম্মানজনক হার খুঁজতে গিয়ে লজ্জাজনক পরাজয়ই শুধু জুটছে। জয়ের ক্ষুধাটাই যেন মরে গেছে। এমনিতে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টিতে ভালো নয়। তবে এখন একেবারে খারাপের চূড়ান্ত পর্যায়ের দল। যেটুকু শিখেছিল, সেটাও যেন ভুলে গেছে।

বাংলাদেশ ফাঁপা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছিল। দেশের মাটিতে স্পিনিং ট্র্যাক বানিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জয়ে বিসিবির নির্বাচনে সুবিধা হয়েছে, র‌্যাংকিয়ে উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপের কোনও প্রস্তুতিই হয়নি। উল্টো মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে, যা চাপে ফেলেছে দলকে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হারার পর সংবাদ সম্মেলনে তাসকিন আহমেদ শুভঙ্করের ফাঁকিটা ধরিয়ে দিয়েছেন, ‘এখানকার উইকেট অনেক স্পোর্টিং। মিরপুরের চেয়ে অনেক ভিন্ন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও ভালো উইকেটে খেলা হলে আমাদের বোলিং-ব্যাটিং দুটিই আরও উন্নত হবে। যত ভালো উইকেটে খেলা হবে, বোলারদের চ্যালেঞ্জ তত বাড়বে। এতে আমাদের সবারই আরও উন্নতি হবে। ভবিষ্যতে ভালো উইকেটে খেললে ফল যা-ই হোক, বড় টুর্নামেন্টে সুবিধা হবে আশা করছি।’ 

তাসকিনের এই উপলব্ধি কি বোর্ডের কর্তাদের নেই?

ফল খারাপ হলে কোচ-অধিনায়ক বদলের দাবি ওঠে, এবারও উঠেছে। তবে আমি এই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নই। আসলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটা নতুন ‘শুরু’ দরকার, পাল্টে ফেলতে হবে খোলনলচে। সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেটে অনেক আগেই ঘুণে ধরেছে। সেটার ওপর দিয়ে রঙ দেওয়া হচ্ছে দিনের পর দিন। কিন্তু কাঠে একবার ঘুণে ধরলে যতই রঙ দেন না কেন লাভ হবে না। সমাধান তাই ঘুণে ধরা কাঠ বদলে ফেলা।’

নাজমুল হাসান পাপন বিসিবির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়েছেন ২০১২ সালে। তারপর থেকে তিনিই সর্বেসর্বা। দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার মতো ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনি ব্যবস্থাও ধ্বংস হয়ে গেছে। বোর্ডে নির্বাচনের নামে যেমন প্রহসন হয়, এখন খেলার নামেও প্রহসনই যেন হচ্ছে। ফেসবুকে দেখলাম, পাপন বিসিবি’র দায়িত্ব নেওয়ার সময় থেকে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান পরিবর্তন হয়েছে আটবার, পাকিস্তানের সাতবার, শ্রীলঙ্কার পাঁচবার। কিন্তু বাংলাদেশে এক ও অদ্বিতীয় পাপন। জীবনে কোনোদিন ক্রিকেট না খেললেও ক্রিকেট নিয়ে বুলি ছাড়েন বিশেষজ্ঞের ভঙ্গিতে। ‘এই ক্যাচ আমিও ধরতে পারতাম’ ধরনের ছেলেমানুষি কথাও বলেন অনায়াসে। কথাবার্তা শুনে মনে হয়, পাপন শুধু বিসিবি প্রধান নন; একইসঙ্গে প্রধান নির্বাচক, প্রধান কোচ এবং অধিনায়ক। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান সৌরভ গাঙ্গুলী ক্রিকেটের সর্বকালের সেরাদের একজন। অথচ তার মুখে ক্রিকেট নিয়ে কোনও কথা শুনেছেন? ক্রিকেট যেন শুধু পাপন একাই বোঝেন!

বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেট ভালোবাসে। আর এই ভালোবাসাকে পুঁজি করে বিসিবি ক্রিকেটকে বানিয়েছে টাকা বানানোর মেশিন। বিসিবির নাকি ৯০০ কোটি টাকার এফডিআর আছে। বিসিবি টাকা বানায়, ক্রিকেটার বানায় না, তাদের পাশে দাঁড়ায় না। ঘরোয়া ক্রিকেটে যেসব অনিয়মের কথা শোনা যায় তাতে বাংলাদেশের ক্রিকেট যে এখনও টিকে আছে, এটাই বিস্ময়কর। 

টি-টোয়েন্টি ব্যর্থতার পর সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেছেন, ‘এটাই হওয়ার কথা ছিল। মূল কারণ সততার অভাব। গত কয়েক বছরে ঘরোয়া ক্রিকেটকে যেভাবে ক্রিমিনালাইজড করা হয়েছে, তাতে শুধু অপেক্ষায় ছিলাম দেখার– ধসটা কখন নামবে। দলের ভেতরে দল। পঞ্চপাণ্ডব বনাম বাকি খেলোয়াড়রা। সবার কথাবার্তায় বাকি খেলোয়াড়দের সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন মনে হয়। দল ছেড়ে এখন ব্যক্তি ক্রিকেটারদের পেছনে সবাই। বাংলাদেশ দলটাকে খুঁজে পাই না।’ 

আসল সমস্যা এখানেই। বাংলাদেশ দল হারিয়ে গেছে। পাঁচ পাণ্ডবের মধ্যেও দেখি ছয়টা গ্রুপ। নিজেরা নিজেরা তো ল্যাং মারামারি করেনই, এখন দেখি সাকিব আল হাসানের স্ত্রীও তাতে হাওয়া দিচ্ছেন। তরুণরা কাদের দেখে শিখবে, কাদের দেখে অনুপ্রাণিত হবে?

তারুণ্যের কথাই যখন এলো, তখন বলি– টি-টোয়েন্টি তারুণ্যের খেলা। কিন্তু বাংলাদেশ তারুণ্যে নয়, অভিজ্ঞতায় ভরসা করে ডুবেছে। আপনারা কি জানেন, বছর দেড়েক আগে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জেতা আকবর আলি বাহিনীর সদস্যরা কই? এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তো তাদের আধিপত্য থাকার কথা। তারা কই?

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট এখন ভয়ংকর সংকটকাল অতিক্রম করছে। আমি খেলোয়াড়দের দোষ দেবো না। এত দলাদলি, ল্যাং মারামারি, কথার লড়াইয়ে খেলা হয় না। ক্রিকেট গায়ের জোরের খেলা নয়, এখানে মাইন্ডগেম বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আগে বাংলাদেশকে একটা দল হতে হবে। আর ক্রিকেট বোর্ডে ক্রিকেটারদের গুরুত্ব থাকতে হবে সবার আগে। বিদেশে গেলে ক্রিকেটাররা টিএ/ডিএ পায় ১০০ ডলার, বোর্ড কর্তারা নাকি পান ৫০০ ডলার। এবারও দুবাইয়ে ১৫ জন ক্রিকেটারের সঙ্গে নাকি ৬৯ জন কর্মকর্তা গেছেন! ক্রিকেটারদের জন্য বোর্ড, নাকি বোর্ডের জন্য ক্রিকেটার?

এই যে ক্রিকেট আমাদের জীবন, জয়-পরাজয়ে আমরা হাসি-কাঁদি। ক্রিকেটার বা বোর্ড কর্মকর্তাদের কাছে কিন্তু তা নয়। বাংলাদেশের পরাজয়ে আপনার হয়তো তিন দিন মন খারাপ। ক্রিকেটাররা কিন্তু ১০-১৫ মিনিট পরেই হাসিঠাট্টায় মেতে ওঠেন। তাদের কাছে ক্রিকেট খেলাটা একটা চাকরি। বোর্ডের কাছে তো ক্রিকেট স্রেফ টাকা বানানোর মেশিন।

বাংলাদেশের ক্রিকেট যে গভীর সংকটে পড়েছে, সেখান থেকে দলকে টেনে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। আগামী বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ভালো করবে, এ ধরনের ছেলেভোলানো গল্প শুনিয়ে লাভ নেই। বরং আমাদের সবাইকে মেনে নিতে হবে– কিছু দিন আমাদের খারাপ সময় যাবে। এ সময় ক্রিকেটের পাশে থাকতে হবে। তবে সবার আগে নাজমুল হাসান পাপনকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় জানাতে হবে। ঘরোয়া ক্রিকেটের সব অনিয়ম দূর করতে হবে। ক্রিকেটারদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন করা প্রয়োজন। প্রতিভা খুঁজে আনার জন্য জহুরিদের মাঠে নামাতে হবে। প্রতিভা বিকাশের ব্যবস্থা নিতে হবে। সাকিব-তামিম আসমান থেকে নামবে না, তাদের তৈরি করতে হবে। বরিশালের ছয় বছর বয়সী লেগ স্পিনার আসাদুজ্জামান সাদিদের প্রতিভা মুগ্ধ করেছে শচীন টেন্ডুলকার, শেন ওয়ার্নদের। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কেউ কি সাদিদকে চেনেন?

সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশ দলকে একটা দল বানাতে হবে আগে। বলতে হবে– ক্রিকেট খেলা নিছক চাকরি নয়, ক্রিকেট গোটা জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার বাতিঘর এবং ঐক্যের সূত্র। তাই ক্রিকেট খেলতে হবে ভালোবাসা, মমতা ও কমিটমেন্ট দিয়ে। হারজিত থাকবেই, তবে আমরা যেন হারার আগেই হেরে না থাকি। মুশফিক আমাদের আয়নায় মুখ দেখতে বলেছেন, মাহমুদুল্লাহ শুনিয়েছেন পেইন কিলার খেয়ে খেলতে নামার গল্প। একটা বিষয় বলতে পারি, দলের ব্যর্থতা আমাদের যতটা বেদনার্ত করে, কোনও আয়নাই তা সইতে পারবে না। আর মাহমুদুল্লাহ পেইন কিলার খেয়ে শরীরের ব্যথা কমান, কিন্তু বাংলাদেশ হারলে আমরা যে কষ্ট পাই, কোন পেইন কিলার খেলে সেই বেদনা কমবে?

/এসএএস/জেএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সড়কে প্রাণ হারালেন অটোরিকশাচালক
সড়কে প্রাণ হারালেন অটোরিকশাচালক
জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিষিদ্ধ করলো ইন্দোনেশিয়া, আইন পাস
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিষিদ্ধ করলো ইন্দোনেশিয়া, আইন পাস
গাজীপুরে ঝুটের গুদামে অগ্নিকাণ্ড
গাজীপুরে ঝুটের গুদামে অগ্নিকাণ্ড
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ