X
বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২
২২ আষাঢ় ১৪২৯

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতা পাল্টে দেবে স্বাস্থ্য খাতের চেহারা

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২২, ২০:২২

স ম মাহবুবুল আলম স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সীমাহীন সংকটে নিমজ্জিত। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ও মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে।  দরিদ্র মানুষের জন্য শুধু  অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করেই স্বাস্থ্য খাতের বহুমুখী সংকটের সহজ ও সাশ্রয়ী সমাধান আনা যায়। স্বাস্থ্যসেবার দুর্বিষহ অবস্থা দ্রুততম সময়ে সহনীয় হয়ে উঠতে পারে। বাজেট বরাদ্দকে সাধ্যের মধ্যে রেখেই আবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব। জনগণ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবে। আবশ্যকীয় সব ওষুধপত্র ও টিকা সাশ্রয়ী মূল্যে সবার জন্য সহজলভ্য করা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ৩.৮-এ সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত।
 
বাংলাদেশের চিত্র: সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত, বাংলাদেশের সরকারের নিজস্ব গবেষণা বলছে, সরকারি হাসপাতাল থেকে মাত্র ৩ শতাংশ রোগী ওষুধ পেয়ে থাকেন। চিকিৎসার জন্য রোগীর নিজ পকেট থেকে ব্যয় হয় ৬৮.৫ ভাগ। সেই ব্যয়ের প্রধান অংশ যায় ওষুধ কিনতে, যা প্রায় ৬৪ ভাগ। ওষুধ ক্রয়ে সরকারের বছরে মাথাপিছু বরাদ্দ মাত্র .৩৬ ডলার। সরকারি হাসপাতাল থেকে প্রেসক্রিপশনের সম্পূর্ণ ওষুধ পাওয়া যায় না। হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র ও হাসপাতালে প্রাপ্য ওষুধের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকে না প্রায়ই। রোগীদের ঠেলে দেওয়া হয় বহুগুণ অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খেতে। ফার্মেসিতে ওষুধের দাম দরিদ্র জনগণের নাগালের বাইরে। সরকারি হাসপাতালে অকস্মাৎ ওষুধের মজুত শেষ হয়ে যাওয়া সাধারণ ব্যাপার। মাসের পর মাস অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বিহীনভাবে চলছে। ওষুধের প্রকৃত খরচ, মজুত, মেয়াদোত্তীর্ণের সময়, চাহিদার সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে না। হাসপাতালে এক অংশে মজুত শেষ হলেও অন্য অংশে অব্যবহৃত পড়ে থাকে ওষুধ। ওষুধের উচ্চমূল্য নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণকে উৎসাহিত করছে।

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও বাংলাদেশ: প্রথম দেশ, কিউবা ১৯৬৩ সালে আবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরি করে। ১৯৭৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রথম ২১২টি ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় আদর্শ তালিকায় লিপিবদ্ধ করে। তার ধারাবাহিকতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রতি দু’বছর অন্তর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা উন্নত ও হালনাগাদ করে চলছে। ২০১৭ সালে সর্বশেষ ২০তম সংস্করণে ৪৩৩টি ওষুধ রেখে তৈরি করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকাটি প্রতিটি দেশের নিজস্ব অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরিতে সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখছে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির ধারণাটি সারা বিশ্বে স্বাস্থ্যসেবায় সমতা প্রতিষ্ঠা, ওষুধের সহজ প্রাপ্যতা ও সাশ্রয়ী উপাদান  হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বা এসেনসিয়াল ড্রাগ লিস্ট হলো একটি জনপদ বা দেশের জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৈরি তালিকা যেখানে নিত্য প্রয়োজনীয় সকল নিরাপদ, কার্যকর ও সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ লিপিবদ্ধ থাকে। সরকার অনুমোদিত এই তালিকা প্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদন, ওষুধের মূল্য নির্ধারণ, যৌক্তিক ক্রয় ও সরবরাহ, অর্থ বরাদ্দ ইত্যাদি বিষয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকরভাবে পদক্ষেপ নিতে দিকনির্দেশনা দেয়।

১৯৮২ সালের যুগান্তকারী ওষুধ নীতিতে সব ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে রেখে ১৫০টি ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় রাখা হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে  বাংলাদেশ সরকার  একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকারের সব ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা খর্ব করে ১১৭টি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যে সীমিত করে আনে (এই প্রজ্ঞাপনটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের ওয়েবসাইটে নেই)। ২০০৫ সালে জাতীয় ওষুধ নীতিতে ১৯৮২  সালের ওষুধ নীতি সংশোধন করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের কোনও তালিকা না রেখে দাম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অস্পষ্ট কথা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ২০০৮ সালে ২০৯টি ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশিত হয়। ২০১৬ সালে প্রণীত জাতীয় ওষুধ নীতি পরিশিষ্টে ২৮৫টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সংযুক্ত করেছে, দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের ক্ষমতা উহ্য থেকেছে। নানা লুকোচুরি ও নানামুখী চাপে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ২০০৮ সালের ২০৯টি বা ২০১৬ সালের ২৮৫টি নয়; ১৯৯৪ সালে নির্ধারণ করা ১১৭টি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করে। ২৭ বছরের আগের এই পুরনো তালিকার বেশিরভাগ ওষুধই অকার্যকর। এটি একটি গুরুতর প্রতারণার ঘটনা ও নিয়মের ব্যত্যয়।

সরকার EDCL এবং CMSD মাধ্যমে ওষুধ সংগ্রহ করে। সেখানে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা গুরুত্বহীন। জনগণের চাহিদার তুলনায় সরকারি ওষুধ সংগ্রহ অত্যন্ত অপ্রতুল। EDCL ও CMSD-এর  সেই অপ্রতুল সংগ্রহে যথাক্রমে মাত্র ২৪ ও ৬৮ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ থাকে। চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ব্যবহারের কোনও নির্দেশিকা বা সচেতনতা তৈরি করা হয়নি। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ও হাসপাতালে প্রাপ্যতার কোনও মিল নেই।

২০০৮ এবং ২০১৬ সালে কারা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করেছে তা গোপন রাখা হয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা কতটা কার্যকর হবে তা  নির্ভর করছে কোন পদ্ধতিতে তা প্রণয়ন করা হচ্ছে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কমিটি তৈরিতে যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন ও যৌক্তিকভাবে ওষুধ নির্বাচনে অনুসরণ করা পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। জনপদে রোগের প্রাদুর্ভাবের পরিবর্তন, জাতীয় প্রমিত চিকিৎসা নির্দেশিকার আলোকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা কমপক্ষে প্রতি দু’বছরে পুনঃমূল্যায়ন প্রয়োজন। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ব্যবহার ও তার প্রভাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বাজেটে একটি অতিরিক্ত পয়সা খরচ না করেই, শুধু একটি কার্যকর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ নীতিমালা তৈরি করে এ দেশের অসংখ্য দরিদ্র মানুষের জীবন রক্ষা করা যেত।

ওষুধের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে: বাংলাদেশে ওষুধের  যথেচ্ছ ব্যবহার, অপব্যবহার, সঠিক ওষুধ ব্যবহারে ব্যর্থতা বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে দামি ওষুধ ব্যবহার গুরুতর সমস্যা। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া সাধারণ মানুষ ওষুধ কিনছে হরদম। চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রের নিরীক্ষার প্রচলন নেই। যৌক্তিক ওষুধ ব্যবহার উৎসাহিত করার পদ্ধতি নেই। চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রের বিচ্যুতি রোধে জাতীয় প্রমিত চিকিৎসা নির্দেশিকা নেই। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে ওষুধ ও চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ কমিটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, স্টেরয়েড ইত্যাদির অপ্রয়োজনীয় ও অপব্যবহার রোধে  জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। অযৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিট্যান্সের মতো ভয়াবহ সমস্যা তৈরি হচ্ছে। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ ক্রয়ের তালিকা ছোট করে আনতে হবে। হাসপাতালের বহির্বিভাগ, ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী বা ফার্মেসি থেকে প্রতিনিয়ত ওষুধ ব্যবহারের তথ্য পাওয়ার কোনও পদ্ধতি নেই। ওয়ার্ডে ওষুধ বিতরণ ও তার তথ্য-প্রমাণ রাখার পদ্ধতি বিপজ্জনক। সরকারি হাসপাতালে রোগীর প্রেসক্রিপশনের জন্য ভিড় কমাতে ওষুধ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নত করাসহ একাধিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে। চিকিৎসকরা তখন প্রেসক্রিপশন লিখতে বেশি সময় পাবেন ও যত্নশীল হতে পারবেন।

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যবস্থা: অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতা তৈরি করতে এবং নাগালের মধ্যে রাখতে সরকারি ওষুধ সংগ্রহের পদ্ধতিকে বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে কার্যকর ও দক্ষ করে তুলতে হবে।  ওষুধের মূল্যের পক্ষপাতহীন তথ্য, প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের সুযোগ, বিপুল পরিমাণে একসঙ্গে ক্রয়, সরাসরি উৎপাদকদের সঙ্গে ন্যায্যমূল্যের আলোচনা, স্থানীয় মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে সহায়তা প্রদান ইত্যাদি ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো ইলেকট্রনিক ইনভেনটরি ব্যবস্থাপনা না থাকায় ওষুধের প্রকৃত চাহিদা, মজুত ঘাটতির সম্ভাবনা বা পূর্বাভাস দিতে পারে না। ওষুধ বিতরণেও অব্যবস্থা, দীর্ঘ লাইন ও চুরির সুযোগ থেকে যায়। ওষুধের মজুত, প্রতিদিনের খরচ, ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের ধরন, মজুত ঘাটতির পূর্বাভাস, মেয়াদোত্তীর্ণের সময় ইত্যাদি তথ্য প্রকৃত সময়ে জানা প্রয়োজন। খণ্ডিত, অসম্পূর্ণ ডাটাবেজ সেই তথ্য উপস্থিত করতে পারে না। ওষুধের বিতরণ ব্যবস্থাকে দক্ষ করতে, চুরি বন্ধ করতে ও বিশ্বাস যোগ্যতা আনতে প্রয়োজন তথ্য প্রযুক্তির সফল ব্যবহার। ওষুধ ব্যবস্থাপনায় ফার্মাসিস্ট নিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ আছে, তাদের ভূমিকা রাখার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষকে দেওয়া আর্থিক ও ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতা ওষুধের প্রাপ্যতা ও ওষুধের মজুত শেষ হওয়ার মতো সমস্যা অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে সক্ষম।

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ও ওষুধ কোম্পানি:  ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা একই সঙ্গে এক বিপজ্জনক অংশীদার।  ওষুধ কোম্পানি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের নীতিমালাকে সমর্থন করবে ও তালিকার সম্প্রসারণ গ্রহণ করবে তা আশা করা কঠিন। ইতোমধ্যে ১৯৮২ সালের নীতিমালায় সরকার তার সব ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে জনস্বার্থবিরোধী আপস করেছে। যে ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতিমালা দেশীয় কোম্পানিগুলোকে বড় কোম্পানিতে পরিণত করলো, তারাই সেই নীতিমালায় তাদের পক্ষে পরিবর্তন আনলো আরও মুনাফা তুলতে। সরকার ১০০% মুনাফার সুযোগ দিয়েও তার হাতে মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা রাখতে পারতো জনস্বার্থে। সার্কভুক্ত ৫টি দেশে ২৪টি ওষুধের ওপর একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাত্র ৪টি ওষুধের দাম বাংলাদেশে সর্বনিম্ন। ওষুধ কোম্পানির সাফল্য নিয়ে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে গল্প বলার চেষ্টা আছে। বর্তমান সময়ে ফার্মার রফতানি মোট জাতীয় রফতানির ১ শতাংশের নিচে। ওষুধ কোম্পানিগুলো এখনও শুধুই প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান, কোনও গবেষণায় ভূমিকা নেই। ওষুধের মানগত দিক উপেক্ষিত। ক্রমাগত ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি হচ্ছে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ও সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ উৎপাদনে, গবেষণায় ওষুধ কোম্পানি অনাগ্রহী। অনেক অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ পাওয়া যায় না।

তাই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের উৎপাদন, রোগীবান্ধব যথাযথ ডোজেজ ফর্ম, গবেষণা ও যৌক্তিক মূল্যে প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারকে নীতি কাঠামোর মধ্যে আসতে হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে ও ওষুধ বিপণনে জেনিরিক নামের ব্যবহার কম মূল্যে ওষুধ পেতে, সহজ বিপণনে ও বিভ্রান্তি দূর করতে সহায়ক হবে। ওষুধের মোড়কের গায়ে ওষুধের জেনেরিক ও ট্রেড নাম সমান হরফে লেখা থাকতে হবে। ওষুধের মোড়কের গায়ে কিউআর কোড সংযোগকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজারের নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধকে বহুলাংশে প্রতিরোধ করবে। ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা কম জনবলে, কম সময়ে দক্ষতার সঙ্গে বাজারে নকল, ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে। ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে চিকিৎসকদের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অনৈতিক আঁতাত ওষুধের উচ্চমূল্য ধরে রাখতে সাহায্য করছে। অতিরিক্ত, অপ্রয়োজনীয় ও উচ্চমূল্যের লাভজনক ওষুধ ব্যবস্থাপত্রে থাকছে। চিকিৎসক ও ফার্মাসিউটিক্যালসের অস্বাস্থ্যকর জোট ভাঙতে হবে। চিকিৎসকদের কাছে নতুন ওষুধ (প্রোডাক্ট)-এর তথ্য ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির মাধ্যমে নয়, নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আসতে হবে। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোকে নিজেদের প্রয়োজনে ও জনগণের প্রয়োজনে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ওষুধের কাঁচামাল তৈরি, উন্নত ড্রাগ টেস্টিং ল্যাব, বায়োইকুইভালেন্স পরীক্ষা অবকাঠামো তৈরি ও গবেষণার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তুলতে হবে।

বাধা কোথায়: অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ নীতিমালা বাস্তবায়নে নানামুখী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে- অস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান, সুনির্দিষ্ট পরিমাণগত লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যর্থতা, সঠিক তথ্য-উপাত্তের অভাব-চাহিদা ও প্রাপ্যতা, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকা, ওষুধ ক্রয় প্রক্রিয়ায় গলদ, ওষুধ সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় অদক্ষতা, খণ্ডিত ওষুধ ব্যবস্থাপনা-জাতীয় স্বাস্থ্য ডাটাবেস ও ইলেকট্রনিক ইনভেনটরি না থাকা,  নিম্নমান ও নকল ওষুধ, ওষুধের অতিরিক্ত মূল্য, প্রমিত চিকিৎসা নির্দেশিকার অভাব ইত্যাদি। সর্বপ্রথম বাধা একটি হালনাগাদ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নেই। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ২৭ বছর আগের সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা মাত্র ১১৭টি ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে।  স্বাস্থ্যসেবায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকার কার্যত কোনও ভূমিকা নেই। ওষুধ কোম্পানি , চিকিৎসক, অসাধু কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা পুনঃমূল্যায়ন, সম্প্রসারণ ও নীতি কাঠামো তৈরি করার বড় বাধা।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত অনেকটা ফুটো কলসির মতো বেরিয়ে যাচ্ছে জনগণের অর্থ। ন্যূনতম ওষুধের সরবরাহ না থাকায় স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বিশাল অবকাঠামো, জনবলের ব্যাপক অপচয় ঘটছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদান অথবা দায়িত্ব পালন না করার ভেতর কোনও পার্থক্য নেই। সরকারি হাসপাতালে নিম্নমানের সেবা রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে বাধ্য করছে। সরকার, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্টদের তাই একটি গ্রহণযোগ্য উদ্ভাবনী পথ বের করতে হবে, যেখানে কর্মদক্ষতা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়।

বাংলাদেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ নীতিমালা বাস্তবায়ন ও তার সুফল পেতে যে পদক্ষেপগুলো আশু নেওয়া প্রয়োজন:
 
১. অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের একটি সময়োপযোগী গ্রহণযোগ্য তালিকা স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হালনাগাদ করতে হবে। ওষুধের তালিকা তৈরি থেকে সুফল পেতে আবশ্যকীয় ওষুধের ক্রয়, মজুত, মূল্য নির্ধারণ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে অন্তর্ভুক্ত থাকা ইত্যাদি বাস্তবায়নযোগ্য নীতিমালার ভেতরে আনতে হবে।

২. ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতে জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে হবে। এবং তা নিয়মিত পুনঃমূল্যায়ন প্রয়োজন। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, ফার্মাসিস্টদের উন্নত বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ করতে হবে।

৩. ওষুধের নিয়মিত খরচ, মজুত, মেয়াদোত্তীর্ণের সময়, দক্ষতার সঙ্গে ওষুধ বিতরণ, চাহিদার পূর্বাভাস পেতে ও সামগ্রিক তদারকি প্রতিষ্ঠা করতে প্রথমেই প্রয়োজন একটি জাতীয় স্বাস্থ্য ডাটাবেসের অন্তর্ভুক্ত পূর্ণাঙ্গ ওষুধ ইনভেনটারির প্রতিষ্ঠা।

৪. অবশ্যই সরকারকে ওষুধ ক্রয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। ক্রয় প্রক্রিয়াকে দক্ষ করতে হবে।

৫. হঠাৎ মজুত ঘাটতি রোধে, ওষুধ ব্যবস্থাপনার মান বৃদ্ধিতে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে (জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে) প্রয়োজনীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জনবল পরিচালনা ও সেবা প্রদানে স্বাধীনতা দিতে হবে।

আবশ্যকীয় ওষুধের নীতি বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের অভিযাত্রা সফল হবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। সিনিয়র কনসালটেন্ট ও ল্যাব কো-অর্ডিনেটর, প্যাথলজি বিভাগ, এভার কেয়ার হাসপাতাল।

[email protected]

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
চিংড়ির ঘের থেকে উঠছে গ্যাস, পরীক্ষা করবে বাপেক্স
চিংড়ির ঘের থেকে উঠছে গ্যাস, পরীক্ষা করবে বাপেক্স
টিভিতে আজ
টিভিতে আজ
সমর্থন আদায়ে মঙ্গোলিয়া সফরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী
সমর্থন আদায়ে মঙ্গোলিয়া সফরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী
রশিদ ছাড়া হাসিল আদায়
রশিদ ছাড়া হাসিল আদায়
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ