X
সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২
১৭ আশ্বিন ১৪২৯

পাকিস্তান: এর নাম আর যাই হোক গণতন্ত্র নয়

মাসুদা ভাট্টি
০২ এপ্রিল ২০২২, ১৩:৩৫আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২২, ১৩:৩৫

মাসুদা ভাট্টি এই লেখাটি যখন প্রকাশিত হবে তখন হয়তো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ক্রিকেটম্যান খ্যাত ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রীত্ব থাকবে কী থাকবে না সেটি নির্ধারণ হয়ে যাবে। ফলে সেই থাকা না থাকার ব্যাখ্যা কিংবা ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কিত এ লেখা নয়।

পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে কেমন? এই প্রশ্ন আমাদের সর্বক্ষণ স্মরণে থাকে, এ কারণে যে, একদা পাকিস্তানের নিগড়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি বাধা ছিল। ব্রিটিশ রাজ জেনেশুনেই পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব বাংলাকে জুড়ে দিয়েছিল, কারণ তারা মনে করেছিল যে, দুই ভূখণ্ডের গরিষ্ঠ জনগণের ধর্ম যেহেতু এক সেহেতু এদের আচার-আচরণ, সংস্কৃতি কিংবা মনোভাবও একই হবে। কিন্তু দেশ ভাগের মাত্র বছরখানেকের মাথায় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, পূর্ব বাংলা তথা আজকের বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের ভৌগলিক দূরত্বের মতোই আচার-সংস্কৃতি ও মনোভাবেই যোজন দূরত্ব বিদ্যমান। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যে শাসন করলেও যে আসলে শাসিতের চরিত্র সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল না তার প্রমাণ দুই ভূখণ্ডকে এভাবে জুড়ে দিয়ে এভাবে একটি  ‘পোকায় খাওয়া পাকিস্তানের’ জন্ম দেওয়া। সে ইতিহাস পুরনো এবং আমরা পেরিয়ে এসেছি। পঁচিশ বছর একত্রে কাটিয়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব সত্তায় ফিরে গেছে এবং পাকিস্তান তারপর থেকেই কেবল ধুকছে, কেবলই ধুকছে। কী অর্থনীতি, কী রাজনীতি, কী সংস্কৃতি, কী সামাজিক উন্নয়ন, কোনও কিছুতেই বাংলাদেশকে যেন আর পাকিস্তান ছুঁতে পারছে না।

শুরুতেই বলেছি যে, পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ভাগ্য এখন ১৬৪/১৭৬ ভোটের মধ্যে দুলছে, ৩৪২ আসনের সংসদে ইমরান খানের পক্ষে রয়েছে ১৬৪ ভোট আর বিরোধী পক্ষে রয়েছে ১৭৬ ভোট। যে মুহূর্তে ‘কিং মেকার’ হিসেবে খ্যাত মুক্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট বা এমকিউএম ইমরান খানের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নিয়েছে সে মুহূর্তেই দেশে-বিদেশে সর্বত্র বিশ্লেষকগণ বলছেন যে, ইমরান খানের বিদায় সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে কোনও প্রধানমন্ত্রীই যে আজ অবধি তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারলেন না এবং মেয়াদ পূর্তির আগেই যে, তাকে নানা প্রক্রিয়ায় চাপ প্রয়োগ করে এমনকি হত্যাকাণ্ডেও পিছপা না হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে বার বার ক্ষমতা দখলের বধ্যভূমিতে পরিণত করা হয় এর পেছনে মূলত কারা থাকে? সকলেই একবাক্যে এই প্রশ্নের উত্তরে বলবেন, থাকে সেনা বাহিনী। যখনই নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা বেশি চলে গেছে বলে মনে করা হয় তখনই অদৃশ্য শক্তিবর্গ নেমে পড়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের কাজে। ভুট্টো, তদ্বীয় কন্যা বেনজীর, নওয়াজ শরীফ এবং তারপর ইমরান খান– কেউই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। অদৃশ্য শক্তির চাপে-তাপে পাকিস্তানের গণতন্ত্র আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের চোখে এখনও ‘তথাকথিত’ এবং বার বার দগ্ধ হয়ে আসছে সেই শুরু থেকেই।

আমরা স্মরণ করতে পারি যে, ক্রিকেটের ময়দান থেকে অবসরে গিয়ে ব্যক্তি জীবনে বহুরকম ‘কেচ্ছাকাহিনির’ জন্ম দিয়ে ইমরান খান হঠাৎ রাজনীতিতে আসার ঘোষণা দেন। রাতারাতি একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং বলাই বাহুল্য যে, সেই রাজনৈতিক দলটি গঠন ও তার নেতা নির্বাচনে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল পাকিস্তানের সেনা বাহিনী ও সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই।

বাংলাদেশেও আমরা দেখেছিলাম যে, একজন সেনা শাসক ক্ষমতা দখল করেই রাতারাতি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং সেনা গোয়েন্দা তৎপরতায় এখানেও নানা দল থেকে রাজনীতিবিদ কিনে এনে রাজনৈতিক দল গঠন করে নির্বাচনের নামে প্রহসন শুরু করেন। তার মৃত্যুর পর নতুন জেনারেল ক্ষমতায় এসে একই প্রক্রিয়ায়  রাজনৈতিক দল গঠন করে রাজনীতি শুরু করেন, নির্বাচন নির্বাচন খেলা আরও হাস্যকর হয় বাংলাদেশে। পাকিস্তানে ইমরান খানের তবুও ‘সিভিলিয়ান’ অতীত ছিল, এদেশে দু’দুজন সেনানায়কের তাও ছিল না, ফলে ইমরান খানের রাজনৈতিক দলটি বরং বাংলাদেশের এ দুটি রাজনৈতিক দলের তুলনায় একটু বেশিই ‘গণতান্ত্রিক’ বলে ধরতে পারি আমরা। ক্ষমতায় আসার জন্য কিংবা থাকার জন্য পাকিস্তানের বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপসহ বড় বড় সব পরিবর্তন ঘটাতে ইমরান খানকে কোনও বেগ পেতে হয়নি কারণ তার পেছনে ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়েছিল পাকিস্তানের সেনা বাহিনী। আজকে তার বিদায়লগ্নেও তাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিচ্ছে সেনাবাহিনী। এর কারণ কী? কেন ইমরান ও সেনাবাহিনীর মধুর প্রেমের এই করুণ ও নির্মম পরিসমাপ্তি?

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে ইমরান খান ছিলেন একজন ‘সঠিক’ পুতুল, তাকে যেভাবে নাচতে বলা হবে ঠিক সেভাবেই নাচবে, এই ধারণা থেকেই একজন খেলোয়াড়কে ঘর থেকে তুলে এনে নেতা বানিয়ে, দল দিয়ে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় বসেই ইমরান খান হয়তো ভেবেছিলেন সময় বদলেছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বাদ দিয়ে তিনি নিজেই একজন খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারবেন। সকল সিদ্ধান্ত বিশেষ করে চীন থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সকলের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণে নিজেই দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে মিলে নিতে শুরু করেছিলেন। এমনকি সৌদি আরবের সঙ্গেও ইমরান খান নিজস্ব মৈত্রী গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। যে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নির্ধারণে সেনাবাহিনী সব সময় সিদ্ধান্ত দিয়ে আসছিল সেখানেও ইমরান খান নিজেকে সেনাবাহিনীর চেয়েও বড় ভারত-বিরোধী হিসেবে প্রমাণে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। ওদিকে দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে দেনার দায়ে ডুবতে থাকা পাকিস্তানকে পুনরায় দাঁড় করানোর কোনও চেষ্টাই ইমরান গ্রহণ করেননি। কিন্তু তিনি সবচেয়ে বড় ভুলটি করেছিলেন সেনাবাহিনীর জেনারেলদের একে অন্যের পেছনে লাগিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে গিয়ে এবং সেনাপ্রধানের পরামর্শ ছাড়াই সেনা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আরও মজার ব্যাপার হলো পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা যখন ভয়াবহ হয়ে উঠেছে তখন ইমরান খান বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ পাকিস্তানি বংশোদ্ভূতদের এনে সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছেন। অনেকেই ইমরান খানের সরকারকে বলছেন ‘কনসালটেন্সি গভর্নমেন্ট’, যারা মূলত, সরকার পরিচালনায় ইমরান খানের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। তারাই দেশ ও দলের খারাপ সময়ে ধর্মকে টেনে এনে নিজেদেরকে পাকিস্তানের অন্যান্য ইসলামিক দলগুলোর চেয়েও নিজেদেরকে বেশি ‘ইসলামিক’ হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছে এবং পশ্চিমকেও এই বার্তা দিতে শুরু করেছে যে, পাকিস্তানের একমাত্র উদ্ধারকর্তা হচ্ছে ধর্ম এবং এখানে পশ্চিম যেন বাগড়া দিতে না আসে। আফগানিস্তান থেকে আমেরিকা নিজেদেরকে সরিয়ে নেওয়ার পর পাকিস্তানের কাছে আফগানিস্তানকে দিয়ে গেছে বলেও মনে করা ইমরান খানের পরামর্শকদল পশ্চিম তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষির খেলা শুরু করে দিয়েছিলেন। তারা আগামী নির্বাচনে ইমরান খানের দলকে আরও বেশি ধর্মনির্ভর হিসেবে প্রমাণে উঠেপড়ে লেগেছিলেন সাম্প্রতিক কালে।

এই ভয়ংকর খেলায় ইমারান খান বেশিদিন টিকতে পারবেন না বলে মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল খোদ পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যমেই। দীর্ঘ ছ’মাস আগেই বোঝা গিয়েছিল যে, সেনাবাহিনী চুপ করে বসে থাকবে না, তারা সময় নিয়েছে এবং বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক মিত্রদের প্রধান বলে খ্যাত দেশটিকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, ইমরান খানকে আর সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে না, এবং তার ফলাফলই হচ্ছে ৩৪২ আসনের সংসদে ১৬৪ জনের সমর্থন নিয়ে ইমরান খানের সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়া। কেবলমাত্র কোনও ‘মিরাকল’-ই তার প্রধানমন্ত্রীত্বকে রক্ষা করতে পারে বলে মনে হচ্ছে। সেই ‘মিরাকল’ও আর কেউ নয়, জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে মুখ ফসকে হোক অথবা ইচ্ছে করেই হোক ইমরান খান নিজেই দেশটির নাম বলে দিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই কেবল এ যাত্রায় ইমরান খানকে রক্ষা করতে পারে। ইউক্রেন আক্রমণের আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ইমরান তার প্রধানমন্ত্রীত্বের কফিনে শেষ পেরেকটিও ঠুকে দিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এখন শুধুই অপেক্ষা।

প্রশ্ন হলো এই যে পাকিস্তানের ক্ষমতার পালা বদল বা পালা বদলের চেষ্টা, এটা কতটা গণতান্ত্রিক? যে কেউ বিতর্ক করতে পারেন যে, সংখ্যাগুরুর ভোটে ক্ষমতাসীন সরকারকে সংখ্যালঘু প্রমাণ করে ক্ষমতাচ্যুত করাতো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু পাকিস্তানে কি সে সৌন্দর্য বিকশিত হচ্ছে? নাকি ক্ষমতার ভাগাভাগিতে দেশটির চির ক্ষমতাবান ও সরকার বানানো ও নামানোর কারিগর হিসেবে খ্যাত সেনা বাহিনীর সঙ্গে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের ফলে পাকিস্তানের সংসদে অনাস্থা ভোটের ‘নাটক’ মঞ্চস্থ হচ্ছে, যার ফলাফল ইতোমধ্যেই বলতে গেলে নির্ধারিত। কেউ কেউ তো বলছেন এখানে না হলে সিনেট থেকে ইমরান খানকে বরখাস্ত করা হবে। যদিও সে পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ থাকবে কি না তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। ফলে পাকিস্তানের রাজনীতির এই টানাপড়েনকে গণতন্ত্রের ‘সৌন্দর্য’ বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বলে মনে করার কিংবা বাংলাদেশের সঙ্গে তাকে তুলনা করার চেষ্টায় যারা আছেন তারা আসলে পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো, ক্ষমতা কাঠামো, সেনা বাহিনীর ক্ষমতা এবং রাজনীতিতে সামন্তবাদের ভূমিকা সম্পর্কে আরেকবার পাঠ করে নিতে পারেন। এ সম্পর্কিত বহু তথ্য ‘গুগল মামা’র কাছেই গচ্ছিত রয়েছে। গণতন্ত্র ক্রিকেট মাঠ নয়, ছক্কা মেরে খেলা জিতে যাওয়ার কোনও সুযোগ এখানে নেই, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগ রয়েছে, কিন্তু পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোথাও সাধারণ মানুষের ভূমিকা আছে বলে মনে করার কোনও কারণ নেই। একটি সামন্ততান্ত্রিক (এলিট) সমাজব্যবস্থা, যেখানে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা ঈশ্বরতুল্য এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেখানে ক্রীড়নকের ভূমিকায় কেবল অভিনয় করে যান। একটু এদিক-ওদিক হয়েছে কি প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার জন্যও খেলোয়াড়/আম্পায়ার তৈয়ার থাকেন– এর নাম আর যাই-ই হোক গণতন্ত্র নয়।

লেখক: এডিটর ইনচার্জ, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

[email protected]

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা জুনায়েদের জামিন
হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা জুনায়েদের জামিন
রাতে ভক্তদের ভিড় পূজামণ্ডপে
রাতে ভক্তদের ভিড় পূজামণ্ডপে
৭ ম্যাচের সিরিজ ইংল্যান্ডের
৭ ম্যাচের সিরিজ ইংল্যান্ডের
ঘটনাবহুল ম্যাচ জিতে সিরিজ ভারতের
ঘটনাবহুল ম্যাচ জিতে সিরিজ ভারতের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ