X
বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২
২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

র‍্যাংকিংয়ের আশা করা ভুল

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
১৫ জুন ২০২২, ১৬:৪০আপডেট : ১৫ জুন ২০২২, ১৬:৪০
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোয়াককোয়ারেল সাইমন্ডস (কিউএস) বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং ২০২৩ প্রকাশিত তালিকায় দেখা যায়, বিশ্বসেরা এক হাজার ৪০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থান হয়নি। এতে কিছু যায় আসে বলে মনে করেন না আমাদের শিক্ষামন্ত্রী বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যরা।

সামাজিক মাধ্যম, মূল ধারার গণমাধ্যমে এ নিয়ে কত যে সমালোচনা। কিন্তু কিউএস র‍্যাংকিংয়ের সূচকগুলো চিন্তা করলে ভাবনাটা ভিন্ন হবে বলে আশা করি। এগুলো হলো অ্যাকাডেমিক খ্যাতি (অ্যাকাডেমিক রেপুটেশন), চাকরির বাজারে সুনাম (অ্যামপ্লয়ার রেপুটেশন), শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত (ফ্যাকাল্টি-স্টুডেন্ট রেশিও), শিক্ষকপ্রতি গবেষণা-উদ্ধৃতি (সাইটেশনস পার ফ্যাকাল্টি), আন্তর্জাতিক শিক্ষক অনুপাত (ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাকাল্টি রেশিও), আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অনুপাত (ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট রেশিও), আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক (ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ নেটওয়ার্ক) ও কর্মসংস্থান (অ্যাম্প্লয়মেন্ট আউটকামস)। এগুলোর কোনোটাই নেই ঢাকা কিংবা আমাদের অন্য কোনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের।

সেই বিবেচনায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ও বিধেয় চিন্তা করা দরকার। গত শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলা হতো।  যারা এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই ব্রিটিশ শাসকরাই একে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলতেন।  কেননা, কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একদম স্বতন্ত্রভাবে গড়ে তোলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে।  লন্ডনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে আবাসিক ও টিউটোরিয়াল পদ্ধতিসহ পূর্ববঙ্গের ঢাকায় এ বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হতে হতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন আদৌ কোনও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিনা সে নিয়ে বড় সংশয় তৈরি হচ্ছে। যেকোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকদের যোগ্যতা ও তাদের শিক্ষকসুলভ জীবনাচরণের ওপর। তারা শিক্ষার্থীদের কাছে রোল মডেলের মতো। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের এখন আর সেরকম শিক্ষক নেই। যদিও বা থাকেন, তারা সাইডলাইনে পড়ে আছেন ‘রাজনীতিবিদ শিক্ষক’দের দৌরাত্ম্যে।

বিদ্যাচর্চা সেখানেই বিকশিত হয় যেখানে শিক্ষক-গবেষকরা স্বাধীনভাবে পাঠ্য, পাঠক্রম, মূল্যায়ন ঠিক করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সহায়কের ভূমিকায় থাকে। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কর্মকাণ্ড তথা নীতি-নৈতিকতা এখন ব্যাপক আলোচিত। উপাচার্যদের দুর্নীতি কতটা প্রমাণ করা যাবে বা যাবে না, সে বিষয়ে তর্ক বৃথা। বৃহত্তর নৈতিকতার দাবি বলবে, শিক্ষকের সঙ্গে ছাত্রদের সম্পর্ক শুধু আইনি সূত্রে বাঁধা নয়, এটি আত্মার সম্পর্ক।

সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম সবার আগে আসে। যদি জানতে চাওয়া হয় গত একশ’ বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন কী? উত্তর আসবে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন , ১৯৬৬-এর ছয় দফা ও ছাত্রদের ১১ দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর স্বাধীনতার যুদ্ধ এবং  ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গ। এসব রাজনৈতিক অর্জনের চিৎকারে হারিয়ে যায় অ্যাকাডেমিক অর্জন প্রসঙ্গ এবং সেই অর্থে অর্জন নেইও আমাদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি টাকায় চলে, তৈরি হয় সরকারি ছাত্র সংগঠনের ক্যাডার আর বিসিএস ক্যাডার।  এখন মনে হচ্ছে এটাই এদের কাজ। র‌্যাংকিং বিতর্ক এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অপ্রযোজ্য। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সনদ বিতরণ করছে কেবল।

প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চৌর্যবৃত্তির কথা প্রকাশিত হয়।  আরও নানা রকম কীর্তির কথা আলোচিত হয়। নতুন কোনও গবেষণা হলো সেটা জানা যায় না।  ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আলোচনা আছে। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে ততটা হয় না। দলভিত্তিক রাজনীতির বাইরে এখন শাসক দল সমর্থিত শিক্ষক গ্রুপের ভেতরকার গ্রুপিং রাজনীতিও এখন ভয়ংকর।

‘প্রথম শ্রেণি পেলে শিক্ষক হওয়া যাবে’, এই এক দর্শন পুরো সিস্টেমকে নষ্ট করেছে। এখন শিক্ষক নিয়োগ যতটা হয়, তার চেয়ে বেশি হয় ভোটার নিয়োগ। একবার শিক্ষক হয়ে গেলে আর কোনও ভাবনা নেই। গবেষণা, প্রশিক্ষণ ছাড়াই শুধু দলবাজি করে পদোন্নতি, পদ-পদবি পাওয়া যায়। এই পদ্ধতিকে অযাচার বলা যায় কিনা সেটা শিক্ষকরা নিজেরাই ভেবে দেখতে পারেন। উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য একজন থাকেন ঠিকই। তার ভূমিকা অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা। কিন্তু আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে, উপাচার্য শুধু প্রশাসনিক প্রধান নন, তিনি ক্যাম্পাস রাজনীতিরও প্রধান। তিনি শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগেরও কর্ণধার।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকদের তৈরি পাঠ্যক্রমের ওপর। আমাদের এখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সেই ব্রত কম। অনেকেই আছেন ক্লাস আর পরীক্ষা কার্যক্রমে নিয়মিত অংশ নেন না। কিন্তু তাদের কিছু বলা যায় না। এমন শিক্ষকের কথা শুনেছি একটি কোর্সে মাত্র তিন দিন ক্লাসে গেছেন এবং তাও পুরো সময় শ্রেণিকক্ষে থাকেননি। কোনও ভালো পাবলিকেশন ছাড়া অধ্যাপক হয়েছেন, এমন সংখ্যা ভূরি ভূরি। শিক্ষকতার পাশাপাশি ব্যবসা বা অন্য জায়গায় ফুলটাইম চাকরি করছেন এমন নজিরও আছে। গবেষণার কথা বললেই শিক্ষকরা বলেন বরাদ্দ কম। কিন্তু কম বরাদ্দকেও কতটা কাজে লাগানো যায় সে চেষ্টাটুকুও চোখে পড়ে না।

শিক্ষকদের  ক্লাস লেকচার শিক্ষার্থীদের কাছে বেদবাক্যের মতো পৌঁছে গেলেই চলে না। শ্রেণিকক্ষে ভালো পড়ানোর পাশাপাশি আদর্শ শিক্ষকের সংখ্যা কমে গেলে যে মস্ত বড় ক্ষতি হয় সেটা নিয়ে ভাবনা দরকার। শিক্ষকের কাছে নৈতিকতার বৃহত্তর দাবি আছে সমাজের, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে অনেক। কিন্তু মনোজগতের উন্নয়ন বেশি প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রক্টরসহ অনেকের আচরণই শিক্ষকসুলভ নয়। নির্মম শাসক হয়ে কিংবা শিক্ষক রাজনীতির গ্রুপ লিডার হয়ে শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রাখা যায় না, র‍্যাংকিংও আসে না।

লেখক: সাংবাদিক
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
৮ ডিসেম্বর যেভাবে হানাদার মুক্ত হয় কুমিল্লা
৮ ডিসেম্বর যেভাবে হানাদার মুক্ত হয় কুমিল্লা
ইকুরিয়ার নিয়ে এলো ‘ইন্সটা পে’
ইকুরিয়ার নিয়ে এলো ‘ইন্সটা পে’
দুই নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আদেশ না মানায় ডিসি-ইউএনওকে তলব
দুই নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আদেশ না মানায় ডিসি-ইউএনওকে তলব
ব্যক্তিগত তথ্যকেন্দ্রিক বিজ্ঞাপন দেখানো নিষিদ্ধ হচ্ছে ফেসবুকে
ব্যক্তিগত তথ্যকেন্দ্রিক বিজ্ঞাপন দেখানো নিষিদ্ধ হচ্ছে ফেসবুকে
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ