X
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪
২১ ফাল্গুন ১৪৩০

আজ একজন শেখ হাসিনার নয়, বাংলাদেশেরও স্বদেশ প্রত্যাবর্তন  

আবদুল মান্নান
১৭ মে ২০২৩, ০০:১১আপডেট : ১৭ মে ২০২৩, ০০:১১

কোনও একটি রাষ্ট্র, সমাজ বা গোষ্ঠীর সামনে কোনও ক্রান্তিকাল উপস্থিত হলে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে একজন দূরদর্শী, সাহসী ও আস্থাভাজন নেতার প্রয়োজন হয়। আর সে রকম নেতৃত্ব যদি না থাকে, তাহলে পরিস্থিতি খারাপ থেকে আরও খারাপ হয়। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে তেমন একজন নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, যাঁর নেতৃত্বে বাঙালি দেশ স্বাধীন করার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে গিয়েছিল এবং দেশ স্বাধীন করেছিল। যুদ্ধোত্তর একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বাংলাদেশ তাঁর নেতৃত্বে আবার উঠে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁকে সপরিবারে হত্যা করার পর দেশ আবার নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে, দেশ যায় অন্ধকারে তলিয়ে। ভাগ্যক্রমে তাঁর দুই কন্যা বেঁচে যান, যার মধ্যে বড়জন এখন বাংলাদেশের টানা তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুকন্যার এটি একটি নজিরবিহীন অর্জন। মোট চারবার দেশের মানুষ তাঁকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে। এটি তাঁর একটি নজিরবিহীন অর্জন, যা ইতিহাসে লেখা থাকবে বহুদিন। পরিবারের সবার মৃত্যুর পর তাঁরা দুই বোন প্রায় ছয় বছর বিদেশে কাটিয়েছেন। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সহায়তায় দিল্লিতে পরিচয় গোপন করে শিশু জয় আর কন্যা পুতুলকে নিয়ে সাদামাটা মধ্যবিত্তের জীবনযাপন করেছেন। স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়াকে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী পারমাণবিক বিজ্ঞানী হিসেবে একটি চাকরি দিয়েছিলেন। ব্যবস্থা করেছিলেন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার। শেখ হাসিনা ছয় বছরের প্রবাস জীবন শেষ করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে এসেছিলেন। এর আগে আওয়ামী লীগের একটি বিশেষ অধিবেশনে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। বেগম জহুরা তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তখন নানা সমস্যায় জর্জরিত। নানা রকম দলীয় কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

দেশে ফেরার আগে ছোট বোন রেহানার কাছে রেখে এসেছিলেন তাঁর দুই শিশু সন্তানকে। এমন একটি সিদ্ধান্ত একজন মায়ের জন্য খুবই কঠিন। দেশের জন্য তা তিনি নিয়েছিলেন। যেদিন তিনি দেশ ফিরেন সেদিন সার্বিক অর্থেই তিনি তখন সর্বহারা। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের যে বাড়িতে নিজ পরিবারের সব সদস্য খুন হয়েছেন, সেই বাড়িও সেনাশাসক জিয়ার হাতে। সেখানে গিয়েছিলেন স্বজনদের জন্য দোয়া পড়তে। ঢুকতে পারেননি। রাস্তায় কয়েকজন নেতাকর্মীকে নিয়ে দোয়া পড়ে মুনাজাত করেছিলেন। বাড়ির দখল বুঝে পেতে তাঁকে আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর জিয়া ৩০ লক্ষ  প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে আবার মিনি পাকিস্তানে পরিণত করেছিলেন। তখন শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে গঠিত হয়েছিল ‘শেখ হাসিনা আগমন প্রতিরোধ  কমিটি’। আহ্বায়ক ছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা গোলাম হাফিজ (জাতীয় সংসদের স্পিকার, ১৯৭৯-১৯৮২)।

শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন থেকে ২০২৩ সালের ১৭ মে’র মাঝখানে ৪২ বছর পার হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ব্যক্তিগত ঝড়ঝাপটা সামলেছেন অনেক। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন একাধিকবার। ২০০৪ সালে জিয়াপুত্র তারেক রহমান তাঁকে দলীয় কার্যালয়ের সামনে ভয়াবহ গ্রেনেড মেরে হত্যা করতে চেষ্টা করেছিলেন। অনেক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বাবার মৃত্যুর ২১ বছর পর প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করেছেন ১৯৯৬ সালে। তখনও তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় একেবারে আনকোরা। এক বছরের মাথায় দেশের উত্তরাঞ্চলে দেখা দিল এক ভয়াবহ বন্যা। বিদেশি মিডিয়া আগাম জানালো, এই বন্যায় কমপক্ষে ২০ লাখ মানুষ মারা যাবে। একজনও মারা যায়নি সরকারের দুর্যোগ মোকাবিলায় পারদর্শিতার কারণে। মাঠে নেমে পড়েছিলেন শেখ হাসিনা স্বয়ং। সঙ্গে একটি টিম পেয়েছিলেন। ঠিক বাবার মতো। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেলো সম্প্রতি যখন দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে সুপার সাইক্লোন ‘মোখা’  আঘাত হানলো। সেন্টমার্টিন আর টেকনাফে সম্পদের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। প্রাণহানির কোনও ঘটনা ঘটেনি আগাম প্রস্তুতির কারণে। তারপরও কিছু অর্বাচীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছে সেন্টমার্টিন থেকে কেন সব মানুষকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করেনি। এসব নাদানরা জানে না সেন্টমার্টিনের ভৌগোলিক অবস্থান ও যারা উপকূলে বসবাস করে তাদের চরিত্র। তারা শুনেনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান ‘আঁরা চাঁটগাইয়া নওজোয়ান দইর্জার কূলত বসত গরি সিনাত ঠেকাই ঝড়তুফান’ (আমরা চট্টগ্রামের নওজোয়ান, সমুদ্রের কূলে বসবাস করি বুকে ঠেকাই ঝড় তুফান’)। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কেউ দেশটির ভবিষ্যৎ দেখতে পায়নি। বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দেশটির ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ তৈরি করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু এ দেশের মাটি ও মানুষের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। পরবর্তীকালে সামরিক জান্তারা বঙ্গবন্ধুর সব স্বপ্নকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। মুছে দিয়েছিল পিতার নাম।

বাংলাদেশে বা এই অঞ্চলের দেশগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নতুন কিছু নয়। দুর্যোগ হলে আর তাতে হাজার-লাখ মানুষের মৃত্যু হলে তখন তা খবর হয়। সেটি ষাটের দশক থেকে মানুষ দেখেছে। কিন্তু এবারের কোভিড-১৯ নামের যে একটি দুর্যোগ সারা বিশ্বে ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল, জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে হানা দিয়েছে আর মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুর মুখোমুখি করে দিচ্ছে, তা আগে দেখা যায়নি। এটি আর মহামারি নয়, বলা হচ্ছে অতিমারি। এর প্রাদুর্ভাব ছিল  বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশে হানা দিয়েছে ২০২০ সালের মার্চের প্রথম দিকে।

বাংলাদেশও অন্য দেশের মতো এই রোগের জন্য প্রস্তুত ছিল না। অনেক দিন পর্যন্ত এই রোগের কোনও ওষুধও আবিষ্কৃত হয়নি। একমাত্র ওষুধ ছিল মানুষের সচেতনতা। রোগটি যেহেতু ছোঁয়াচে, তাই মানুষকে অন্যজনের কাছ থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছিল। আবারও বাংলাদেশে দ্রুত সংক্রামক এই রোগ মোকাবিলা করার জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা অনেকটা একাই এগিয়ে এসেছিলেন। প্রথম দিকে ১৯৯৭ সালের টিমও তাঁর সঙ্গে দেখা যায়নি। সে বছর পালিত হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ। বছরব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছিল। ঢাকা আসার কথা ছিল বিশ্বের অনেক নেতার। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। শেখ হাসিনার নিত্যদিনের সমালোচকরা বললেন, যেহেতু তাঁর বাবার জন্মশতবর্ষ, সেহেতু তিনি এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে কোনও ব্যবস্থা নেবেন না। কিছু সবজান্তা তো বলেই ফেলেছিল অতিমারিতে মারা পড়ে পথে ঘাটে হাজার হাজার লাশ পড়ে থাকবে। তারা শেখ হাসিনাকে চিনতে ভুল করেছিলেন। তাঁর কাছে সবসময় দেশের মানুষের স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। কোনও দ্বিধা না করে স্থগিত করে দিলেন সব অনুষ্ঠান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে করলেন।

দুর্যোগ মোকাবিলায় গ্রহণ করলেন নানা কর্মসূচি। বললেন, খাদ্যের অভাবে যেন কোনও মানুষ কষ্ট না পায়। যেহেতু সব দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা লকডাউনের কারণে বন্ধ, হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে গেলো, অনেক মধ্যবিত্তের বাড়িতেও খাবার নেই, কারও কাছে চাইতেও পারে না। প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিলেন, ‘সরকারি সাহায্য নিতে লজ্জা পাবেন না। এটা ভিক্ষা নয়, জনগণের টাকায় রাষ্ট্রের শস্যভাণ্ডারে আপনার অধিকার।’ শিল্প প্রতিষ্ঠানকে যত রকমের সহায়তা প্রয়োজন তা তিনি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। রোগাক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য সব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের দরজা খুলে দিলেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি আর পুলিশ সদস্যরা মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি ত্রাণ পৌঁছে দিলেন। বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, খেটে খাওয়া মানুষ, বাদ গেলো না কেউ। বিশ্বনেতারা শেখ হাসিনার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখলেন। তাদের  অনেকে শিখলেন বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ সাফল্যের সঙ্গে কীভাবে এমন ভয়াবহ দুর্যোগ মোকাবিলা করে। উত্তরটি সহজ। প্রয়োজন শেখ হাসিনার মতো একজন দূরদর্শী নেতা, যিনি সবকিছুর আগে দেশের সব স্তরের মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য ভালো, একজন সর্বহারা শেখ হাসিনা আজ থেকে ৪২ বছর আগে দেশে ফিরেছিলেন। ১৯৯২ সালেও দেশে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিয়েছিল। তখন বেগম জিয়া ক্ষমতায়। সে সময় রাষ্ট্রীয় ত্রাণের বেশিরভাগ চোর-বাটপারদের ঘরে উঠেছিল। কোন কোন স্থানে দলের নেতাকর্মীরা ট্রাকসহ ত্রাণের পণ্য গায়েব করে দিয়েছিল । চট্টগ্রামে বিমান বাহিনীর ঘাঁটিতে বেশক’টি যুদ্ধবিমান নষ্ট হয়েছিল । ২০২০-২১ সালেও চোর-বাটপার ছিল, তবে তাদের সঙ্গে সঙ্গে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে। পদচ্যুত হতে হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, শাস্তি হয়েছে, যা আগে দেখা যায়নি। সবার স্বাভাবিক চিন্তা, শেখ হাসিনা না থাকলে কী হবে বাংলাদেশের? তাঁর চারপাশে যারা তাঁকে ঘিরে থাকেন, তাদের সবাইকে তো বিশ্বাস করা যায় না।

এই বছরের শেষে শেখ হাসিনার বর্তমান মেয়াদ শেষ হবে। যে শেখ হাসিনা ১৭ মে ১৯৮১ সালে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ ছয় বছর পর দেশে ফিরেছিলেন, প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠে যে শেখ হাসিনা বাবার গড়ে তোলা দলটিকে নিজের মেধা, মননে গড়ে তুলেছেন, আর একাধিকবার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে ফিরে এসেছেন, সেই শেখ হাসিনা এখন শুধু বাংলা নামের দেশটির একজন প্রধানমন্ত্রীই নন, তিনি বিশ্বনন্দিত একজন রাষ্ট্রনায়কও বটে। তার টানা তিন দফার মেয়াদে সফলতার সঙ্গে তিনি সামলেছেন একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিডিআর বিদ্রোহ, আর বেগম জিয়া পরিচালিত ২০১৩-১৪ সালের পেট্রোলবোমার সন্ত্রাস। বলতে দ্বিধা নেই, এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় অনেক সময় তিনি দলের অনেক নেতার সহায়তাও পাননি। শেখ হাসিনা তাঁর পিতার যোগ্য উত্তরাধিকার। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা যখন সরকার গঠন করেন তখন বাংলাদেশ ছিল একটি নিম্ন আয়ের দেশ। ২০০৯ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল চারশ ডলারের নিচে, আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই বাংলাদেশে বর্তমান মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২৪৫৮ ডলার আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৩১ বিলিয়ন ডলার। এর আগে তা ৪৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মান কমে যাওয়াতে শিল্পের কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে বৃদ্ধি পাওয়াতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। বিশ্বের দেশে দেশে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। এরমধ্যে ইউরোপের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করেছে। এই সমস্যা বাংলাদেশের একার নয়, সারা বিশ্বের। কৃষিতে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে তাদের ষড়যন্ত্র তত্ত্বে লিপ্ত তখন এই শেখ হাসিনাই সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, পদ্মা সেতু নিজেদের অর্থেই হবে। তখন অনেকের সে কী ঠাট্টা! আজ সেই পদ্মা সেতু বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

গত বছর তা চালু হওয়ার পর থেকে গত সাত মাসে টোল হিসেবে ৭০০ কোটি টাকা আয় হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের সদর দফতরে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ব্যাংকটির সদর দফতর ওয়াশিংটনে শেখ হাসিনা ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড মালপাসের হাতে পদ্মা সেতুর একটা পেইন্টিং তুলে দিয়ে তাঁকে এই মেসেজ দিয়ে এসেছেন, বাংলাদেশে অনেক অসাধ্য সাধন নিজেরাই করতে পারে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এই বাংলাদেশ।

শেখ হাসিনার পক্ষেই বলা সম্ভব এখন থেকে কোনও বৈদেশিক ঋণ বা সহায়তা ছাড়া বাংলাদেশ তার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুড়ঙ্গ পথ, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে। তা এখন প্রায় ৯০ শতাংশ সমাপ্ত। সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা নিয়ে ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু। সেই বাংলাদেশ এখন ২৫ হাজার সাত শত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম। রূপপুরে নির্মিত হচ্ছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিক চালু হয়েছে।

বাংলাদেশের উপগ্রহ মহাকাশে ঘুরছে। জাতিসংঘ স্বীকৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের সিঁড়ি অতিক্রম করছে। গত ১৪ বছরে বদলে গেছে বাংলাদেশ। বিশ্বের তাবৎ নেতৃবৃন্দ, জাতিসংঘের মহাসচিব বা আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী বা ব্যাংক বলতে দ্বিধা করে না- ‘উন্নয়ন দেখতে চাও তো বাংলাদেশে যাও’।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে একটি মিনি পাকিস্তান বানানোর কাজ হাতে নিয়েছিলেন। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের দ্বারা লিখিত ১৯৭২ সালের সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে তাকে একটি চরম সাম্প্রদায়িক দলিলে রূপান্তর করেছিলেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরসহ যেকোনও ধরনের রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে পদায়ন করেছিলেন। জিয়ার এসব অপকর্ম শেখ হাসিনা বাতিল করে দেশকে একটি সুষ্ঠু ধারায় ফিরিয়ে এনেছিলেন।

এক জীবনে একজন মানুষের পক্ষে যা করা সম্ভব তা শেখ হাসিনা করে ফেলেছেন। তাঁর সামনে এই মুহূর্তে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ আছে। প্রথম চ্যালেঞ্জ দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা। এই ভয়াবহ রোগটি দেশের প্রশাসনযন্ত্রকে খেয়ে ফেলেছে। এটি করতে হলে যথাযথ মানুষকে যথাযথ জায়গায় নিয়োগ দিতে হবে। দেশটিকে অর্ধশিক্ষিত মোল্লাদের হাত থেকে উদ্ধার করতে হবে। তার জন্য চাই ধর্মীয় শিক্ষাসহ সব শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। অনেক সময় একটি দল দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকলে দলে অনেক অগাছা পরগাছার জন্ম হয়। এই মুহূর্তে দলে এমন সব চরিত্র কিলবিল করছে। এরাই আওয়ামী লীগের প্রকৃত প্রতিপক্ষ। যত দ্রুত এসব বিষফোঁড়া কেটে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করা যায়, তত বেশি দল ও দেশের জন্য মঙ্গল। বুঝতে হবে মুজিব কোট পরলেই আওয়ামী লীগ হওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ একটি দর্শনের নাম। দল ঠিক থাকলে বাইরের শত্রু কিছু করতে পারে না, তা অনেকবার প্রমাণিত হয়েছে। আবার উল্টোটা হয়, তার প্রমাণ ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ড। বাংলার মানুষ আবার একটা পঁচাত্তর দেখতে চায় না। এ দেশের ১৭  কোটি মানুষের দোয়া শেখ হাসিনা জন্য আছে। মাথার ওপর আছে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ছায়া।

শেখ হাসিনা এই দেশকে বিশ্বদরবারে একটি পরিচিতি দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। শেখ হাসিনা আরও দীর্ঘায়ু হোন এই প্রার্থনা করি। দেশকে দিয়েছেন তিনি অনেক কিছু, দেওয়ার আছে আরও বেশ কিছু। ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা নয়, দেশে ফিরেছিল ত্রিশ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ। ৭ মে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দিন সরকারের বাধা উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা যখন বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছিলেন, সেদিন গণতন্ত্র দেশে ফিরেছিল। বারবার যখন তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন, তা ছিল সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা। আল্লাহ তাঁকে দিয়ে ভালো কাজ করাবেন, হয়তো তাই তিনি শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর শাসনামলের সব অর্জন ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন যোগ্য মানুষের যথার্থ মূল্যায়ন। পিতাকে ঘাতকরা জাতির এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হত্যা করেছিল। কন্যা পিতার অনেক আরাধ্য কাজ শেষ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে গেছেন পিতাকে। তাঁকে যেতে হবে আরও অনেক দূর। সঙ্গে সঠিক ও যোগ্য মানুষ থাকলে তা পরিক্রম করা কঠিন নয়।

জয়তু শেখ হাসিনা। জয়তু বাংলাদেশ।

 

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
চাকরি না করেই নিয়েছেন বেতন-ভাতা, শখ অধ্যক্ষ হওয়া
চাকরি না করেই নিয়েছেন বেতন-ভাতা, শখ অধ্যক্ষ হওয়া
প্রার্থিতা বাতিলের মামলায় জিতলেন ট্রাম্প
প্রার্থিতা বাতিলের মামলায় জিতলেন ট্রাম্প
ভেঙে পড়বো না, কীভাবে জেতা যায় সেই চেষ্টা করবো: জাকের
ভেঙে পড়বো না, কীভাবে জেতা যায় সেই চেষ্টা করবো: জাকের
টিভিতে আজকের খেলা (৫ মার্চ, ২০২৪)
টিভিতে আজকের খেলা (৫ মার্চ, ২০২৪)
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ