ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: দায়ী কে?

Send
সুলতান মির্জা
প্রকাশিত : ১৫:১৮, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৫, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

সুলতান মির্জা১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরে হত্যাকারীদের  সুরক্ষার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন স্বঘোষিত সরকার প্রধান খন্দকার মোস্তাক।  বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই এই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ সম্পর্কে জানেন না। তারা জানেন না—ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ কেন জারি হয়েছিল, কে বা কারা জারি করেছিলেন। নতুন প্রজন্মের একজন হিসেবে আজকের এই লেখায় ওই সময়ের খণ্ডিত কিছু চিত্র নিয়েই আলোচনা করবো।
একটি কথা বলে রাখা ভালো—বর্তমানে নিজেদের ‘প্রধান বিরোধী দল’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া বিএনপি ও তাদের কর্মী-সমর্থক-অনুসারীরা কোনও  সুযোগ পেলেই প্রায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে বলে সভা সেমিনার, টকশোসহ নানান জায়গায় বক্তব্য দেন। আমার মনে হয়,  এসব কথা বলার আগে ভেবে দেখতে হবে, এই কথাটি বলার নৈতিক অধিকার বিএনপি’র রয়েছে কিনা। বিএনপি কর্মী-সমর্থক-অনুসারীদের একটি মৌখিক সুযোগ অবশ্য আছে যে, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোস্তাক। এখানে তাদের দোষ কোথায়?

উত্তর হচ্ছে, খন্দকার মোস্তাক যখন যেই সময়ে অঘোষিত সরকার প্রধান হিসেবে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেন, ঠিক ওই সময়ে সেনাপ্রধান ছিলেন বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাত্র ৯ দিনের মাথায় ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন জিয়াউর রহমান। আর আর খন্দকার মোশতাক সরকার ছিল সম্পূর্ণভাবে সেনাসমর্থিত একটি ‘পুতুল সরকার’।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে হত্যাকারীদের বিচার ও জবাবদিহিতা থেকে রক্ষা করার জন্য সেনাসমর্থিত সরকারের প্রধান হিসেবে খন্দকার মোস্তাক ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান থাকার সময় ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘অঘোষিত’ বা ‘স্বঘোষিত’ রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক  ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জারি করেন। সুতরাং এর দায় এড়াতে পারেন না বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান।

সেদিন ‘দ্য বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথিউরিটি’তে লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাকের স্বাক্ষর করেছিলেন। মোশতাকের স্বাক্ষরের পর অধ্যাদেশে তৎকালীন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এইচ রহমানের স্বাক্ষরও সংযুক্ত ছিল।

পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রকারী হিসেবে আবির্ভূত হন। ওই সময় বিচারপতি আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং জিয়া রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল নবগঠিত বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়। সংশোধনী পাস হয় ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল। সংসদে উত্থাপিত আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’। এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেওয়ায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা দায়মুক্তি পেয়ে যায়।

অর্থাৎ খন্দকার মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেওয়া না হলে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেত। জিয়াউর রহমানই ব্যবস্থা নিতে পারতো। কিন্তু জিয়াউর রহমান ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, ভবিষ্যতে কেউ যেন ব্যবস্থা না নিতে পারে পাকাপাকিভাবে সে ব্যবস্থাও করে দেন। ওই সময়ে একটি প্রচার ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, যেহেতু এই ইনডেমনিটি আইন সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে তাই এই আইন আর পরিবর্তন হবে না। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল বা রহিত করেননি কিংবা উদ্যোগও নেননি। 

জেনে রাখার জন্য বলা, মোস্তাক আর জিয়াউর রহমান সেই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বা বহাল রেখেই বসে থাকেনি। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী খুনিদের নানাভাবে পুরস্কৃতও করেছিল। এমনকি খুনিদের যোগ্যতা না থাকার পরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে ভিন্ন ভিন্ন কূটনৈতিক পদে।

১. লে. কর্নেল শরিফুল হককে (ডালিম) চীনে প্রথম সচিব।

২. লে. কর্নেল আজিজ পাশাকে আর্জেন্টিনায় প্রথম সচিব।

৩. মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকে আলজেরিয়ায় প্রথম সচিব।

৪. মেজর বজলুল হুদাকে পাকিস্তানে দ্বিতীয় সচিব।

৫. মেজর শাহরিয়ার রশিদকে ইন্দোনেশিয়ায় দ্বিতীয় সচিব।

৬. মেজর রাশেদ চৌধুরীকে সৌদি আরবে দ্বিতীয় সচিব।

৭. মেজর নূর চৌধুরীকে ইরানে দ্বিতীয় সচিব।

৮. মেজর শরিফুল হোসেনকে কুয়েতে দ্বিতীয় সচিব।

৯. কর্নেল কিসমত হাশেমকে আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব।

১০. লে. খায়রুজ্জামানকে মিসরে তৃতীয় সচিব।

১১. লে. নাজমুল হোসেনকে কানাডায় তৃতীয় সচিব।

১২. লে. আবদুল মাজেদকে সেনেগালে তৃতীয় সচিব।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন নানান চড়াই উৎরাই পার করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার আইনি বাধা অপসারণের প্রক্রিয়া হিসেবে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিল’ ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদে উত্থাপন করা হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর আইনটি সংসদে পাস হয়। ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর এটি পরিপূর্ণভাবে আইনে পরিণত হয়। ফলে মোশতাকের জারি করা এবং মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সময় বৈধতা পাওয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বিলুপ্ত বলে গণ্য হয়। এভাবেই ওই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিলুপ্ত করার পরই শুরু হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কাজ।

এই ইতিহাসটি নতুন করে বলা প্রয়োজন। কারণ, ইনডেমনিটি আইন বিলুপ্তকরণে শেখ হাসিনার সরকার ছাড়া কেউই পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে এর দায় ১৯৭৫-১৯৯৬ পর্যন্ত যারা যারা ক্ষমতায় ছিলেন তাদের সকলের। আজকের এই দিন বাংলাদেশের জন্য আরেকটি কালো দিন। কারণ এই দিনেই একটি দেশের জাতির পিতার  খুনিদের রক্ষা করার জন্য আইন জারি করা হয়। 

লেখক: অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

 

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ