X
মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪
২১ ফাল্গুন ১৪৩০
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৫ (খ)

আব্বাসউদ্দীন: রবীন্দ্র-নজরুল গেয়েও লোকসংগীতে তুলনাহীন

শহীদ মাহমুদ জঙ্গী
২২ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:১৬আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২১:২৬

সত্যনারায়ণ শুকুল ছিলেন আব্বাসউদ্দীনের বন্ধু। তার বাসায় প্রতিদিন গানের আসর বসতো। কলেজ ছুটির পর বিকালে প্রায় সাত আট জন গাইয়ে শুকুলের বাসায় গান গাওয়ার জন্য হাজির হতেন। তাল-সহযোগে গান গাওয়া এখান থেকেই শুরু। 

গলা তৈরি ছিল। গানের প্রতি অদম্য ভালোবাসাও ছিল। গান ও গ্রামোফোনের প্রতি আকর্ষণ তো সেই ছোটবেলা থেকেই। সেই সঙ্গে নিজের গান রেকর্ড হবে, বাজবে এই স্বপ্ন তো আছেই। এই পর্যায় যা করা দরকার আব্বাসউদ্দীন তাই করলেন। গ্রামোফোন কোম্পানিতে যোগাযোগ করলেন। বন্ধুর বিয়ে উপলক্ষে কলকাতায় এসে তিনি দেখা করলেন সেই সময় তার স্কুল শিক্ষকের সন্তান অধ্যাপক বিমল দাসগুপ্তের সঙ্গে। অধ্যাপক বিমল তখন গ্রামোফোন কোম্পানিতে কাজ করতেন। তিনি আব্বাসউদ্দীনের গান শুনলেন। ঠিকানা নিয়ে রাখলেন। আব্বাসউদ্দীন অচিরেই অধ্যাপক বিমলের চিঠি পেলেন। চিঠিতে রেকর্ড করবার জন্য তাকে কলকাতায় ডাকা হয়েছে। 

তাঁর প্রথম গানের রেকর্ডে  দুটি গান ছিল- ‘স্মরণ পারের ওগো প্রিয়’ এবং ‘কোন বিরহীর নয়ন জলে বাদল ঝরে গো’। দুটি গানই লিখেছিলেন শৈলেন রায়। প্রথম গানের সুর করেছিলেন আব্বাসউদ্দীন ও শৈলেন রায়। দ্বিতীয় গানের সুর করেছিলেন ধীরেন দাস।

কলকাতা যাওয়া, গান গাওয়া ও অন্যান্য খরচ বাবদ গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে আব্বাসউদ্দীনকে দেওয়া হয়েছিল তিনশত টাকা। 

রেকর্ডের গান প্রকাশিত হতে কিছুটা সময় লেগেছিল। রেকর্ড প্রকাশের পর করণীয় সম্পর্কে আব্বাসউদ্দীন জানতেন। তাই গন্তব্যও ঠিক ফেলেছিলেন। সেই অনুযায়ী রেকর্ড প্রকাশের পর, একসময় আব্বাসউদ্দীন কলকাতা চলে এলেন। এসেছিলেন অভিভাবকের বিনা অনুমতিতে। আব্বাসউদ্দীন লিখেছেন, ‘সোজা কথায় পালিয়ে এলাম।’

কলকাতায় নিজের খরচ চালানোর জন্য ডি পি আই অফিসে মাসিক ৪৫ টাকা বেতনের চাকরী ও ছাত্র পড়াতেন। 
একটু গুছিয়ে নিয়ে তিনি গ্রামোফোন কোম্পানিতে গেলেন। কোম্পানির কর্মকর্তা ভগবতীবাবু গান চাইলেন। আব্বাসউদ্দীন দু’টি গান রেকর্ড করলেন। গাইলেন শৈলেন রায়ের লেখা, ‘আজি শরতের রূপ দীপালি’ আর জিতেন মৈত্রের লেখা ‘ওলো প্রিয়া নিতি আসি তব দ্বারে মন ফুল মালা নিয়া’। গান রেকর্ড করতে গিয়ে গ্রামোফোন কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আব্বাসউদ্দীনের সখ্য গড়ে ওঠে। 

গানের শুরুর দিকে কয়েকটি মঞ্চ অনুষ্ঠান ছিল আব্বাসউদ্দীনের গানের ক্যারিয়ারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেগুলো নিজের প্রতি নিজের আস্থা যেমন বাড়িয়েছিল একই সঙ্গে গায়ক হিসাবে তার পরিচিতির ক্ষেত্রও তৈরি করেছিল। 

মঞ্চ অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রথমটি ছিল স্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। আব্বাসউদ্দীন তখন পঞ্চম শ্রেণী পাশ করে ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠেছেন। স্কুলের সেই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ও সমাপনী সংগীত পরিবেশন করেছিলেন আব্বাসউদ্দীন। এর আগে আর কোনও অনুষ্ঠান মঞ্চে গান গাওয়ার কথা তিনি উল্লেখ করেননি। ধরে নেওয়া যায় যে, এটাই ছিল তার প্রথম মঞ্চ পরিবেশনা। 

আব্বাসউদ্দীন আহমদ তখন তিনি কলেজে পড়েন, নজরুলকে কুচবিহারে আনার ব্যবস্থা করেন। সে বারেই নজরুলের সাথে তার  প্রথম দেখা। নজরুলের সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা হয় দার্জিলিং-এ। নৃপেন্দ্রনারায়ণ মেমোরিয়াল হলে নজরুলের গান ও আবৃত্তির অনুষ্ঠান ছিল। হল ভর্তি মানুষ। অনুষ্ঠানস্থলে আব্বাসউদ্দীন পৌঁছে দেখেন, হলে তিল ধরণের জায়গা নাই। অনেক কষ্টে তিনি হলে প্রবেশ করেন। নজরুল তখন ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করছেন। সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছেন।
 
মঞ্চে আব্বাসউদ্দীনের এক পরিচিত ভদ্রলোক বসে ছিলেন। আব্বাসউদ্দীনের দিকে চোখ পড়তেই, ইশারায় মঞ্চের দিকে যেতে বললেন। অনেক কষ্টে ভিড় অতিক্রম করে তিনি গেলেন। ততক্ষণে নজরুল গান ধরেছেন। বিপুল করতালির মধ্যে একের পর এক গান গাইলেন। এরপর একটু চা বিরতি নিলেন। পরিচিত ভদ্রলোক এই সুযোগে আব্বাসউদ্দীনের কথা বললেন। আগের বছরই কুচবিহার সফর করেছিলেন। সফরের স্মৃতি তখনও জীবন্ত। এই স্মৃতি নিয়েই নজরুল জিজ্ঞেস করলেন, ‘কই, কোথায়?’ আব্বাসউদ্দীন কবির সামনে এগিয়ে এলেন। নজরুল দাঁড়িয়ে উঠে ঘোষণা করলেন, ‘এক নতুন শিল্পীর সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি—শ্রীমান আব্বাসউদ্দীন।’
 
আব্বাসউদ্দীন নজরুলের অনুমতি নিয়ে গাইলেন নজরুলের গান, ‘ঘোর ঘোররে আমার সাধের চরকা ঘোর।’  গানে শুনে সবাই মুগ্ধ। দার্জিলিং-এ নেপালি ভাষায় একটি গান শিখেছিলেন। এরপর ব্যাপক উল্লাস ধ্বনির মধ্যে সেই গানটি গাইলেন। এই অনুষ্ঠানে গান গাওয়া ছিল আব্বাসউদ্দীনের সংগীত জীবনের জন্য বিশাল প্রাপ্তি। এতবড় অনুষ্ঠানে নজরুলের সামনে গান গাওয়া এক বড় সৌভাগ্যও বটে। 

বন্ধু জিতেন আইন বিষয়ে পড়তেন। আইনের ছাত্রদের রিইউনিয়ন। এই উপলক্ষে ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউটে বিশাল গান-বাজনার আয়োজন করা হয়েছে। জিতেন অনুষ্ঠানের আগের দিন এই বিষয়ে আব্বাসউদ্দীনকে অবহিত করেন। অনুষ্ঠানের প্রচার পত্রে গায়ক তালিকায়  আব্বাসউদ্দীনের নামও দেওয়া হয়েছে। নিজের নাম ছাপা অক্ষরে দেখে খুশি হলেন। তবে শঙ্কিতও হলেন। কারণ অনুষ্ঠানে গাইতে আসবেন সেকালের অসাধারণ জনপ্রিয় গায়ক কৃষ্ণচন্দ্র দে, পংকজ মল্লিক প্রমুখ। জিতেনের সঙ্গে আব্বাসউদ্দীনের কথা হলো। বিখ্যাত গায়কদের গান শুনতে অনুষ্ঠানে যাবেন, কিন্তু নিজে গাইবেন না। 

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে আয়োজকদের অনুরোধে গান গাইতেই হয়। আব্বাসউদ্দীনকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় নবীন শিল্পী হিসাবে। আব্বাসউদ্দীনের গান শুনে সেদিন শ্রোতারা তৃপ্ত হয়েছিলেন। এই অনুষ্ঠান ছিল বড় ধরণের একটা সুযোগ। ভালো গান গেয়ে, শ্রোতাদের মুগ্ধ করে আব্বাসউদ্দীন হঠাৎ পাওয়া সুযোগের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে পেরেছিলেন। তিনি প্রথমে গাইলেন, ‘আজি শরতের রূপ দীপালি’। শ্রোতাদের অনুরোধে পরের গান ছিল—‘কোন বিরহীর নয়ন জলে বাদল ঝরে গো’। গান দু’টির গীতিকার ছিলেন শৈলেন রায়।

এই অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার পর কলকাতায় বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, হোস্টেলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে গান গাওয়ার জন্য প্রচুর আমন্ত্রণ আসতে লাগলো। আব্বাসউদ্দীন এক প্রকার বাধ্য হয়েই গান গাওয়ার জন্য পারিশ্রমিক নেওয়া শুরু করলেন। 

লক্ষণীয় হচ্ছে, প্রথম আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে তিনি গাইলেন রবীন্দ্রনাথের গান। যখন তিনি সবেমাত্র পঞ্চম শ্রেণী থেকে ষষ্ঠ শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এরপর দার্জিলিং-এ গাইলেন নজরুলের গান। এবং কলকাতায় তারকা শিল্পীদের সাথে গাইলেন নিজের মৌলিক আধুনিক গান। 

অথচ পরবর্তী পর্যায়ে আব্বাসউদ্দীনের মূল পরিচিতি গড়ে ওঠে লোক সংগীতের তুলনাহীন শিল্পী হিসাবে। 

চলবে...

লেখক: গবেষক, গীতিকবি ও প্রাবন্ধিক

তথ্যসূত্র: পর্ব ১৫ (গ) শেষে দেওয়া হবে

আরও:

পর্ব ১: অ্যাঞ্জেলিনা ইয়ার্ড থেকে সুপার স্টার গওহর জান হয়ে ওঠার ইতিহাস

পর্ব ২: শিল্পীদের আয়ের বিজ্ঞানসম্মত পথ খুলে দেয় গ্রামোফোন

পর্ব ৩: গান-বাণিজ্যে গওহর জান নায়িকা হলে, লালচাঁদ বড়াল নায়ক

পর্ব ৪: ‘সেকালের কলকাতার লোকেরা ছিলেন সংগীত-ছুট’

পর্ব ৫: রেকর্ডিং কোম্পানিগুলোর কাছে যোগ্য সম্মানি পাননি কে. মল্লিক

পর্ব ৬: অমলা দাশের কারণেই অনেক প্রতিভাবান শিল্পী এসেছিলেন

পর্ব ৭: প্রথম রেকর্ড হাতে পেয়ে ইন্দুবালা নিজেই ভেঙে ফেলেন!

পর্ব ৮: টাইটানিক থেকে ঢাকা, রেডিওর গপ্পো

পর্ব ৯: দৃষ্টি হারিয়েও সেই যুগের শ্রেষ্ঠ গায়ক কৃষ্ণচন্দ্র দে

পর্ব ১০: আঙ্গুরবালা দেবীর গান গাইতে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শিল্পী ভয় পেতেন

পর্ব ১১: ভারতে গীতিকার হিসেবে প্রথম সম্মানী পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ 

পর্ব ১২: সাহানাকে রবীন্দ্রনাথ: আমি যদি সম্রাট হতুম, তোমাকে বন্দিনী করতুম

পর্ব ১৩: রবীন্দ্রনাথের পরে দিলীপকুমারের ওপরেই দাবি ছিল সর্বাধিক

 
 
 
/এমএম/
সম্পর্কিত
‘পদ্মশ্রী’ প্রাপ্তিতে সংগীত ঐক্যর পক্ষ থেকে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে ফুলেল শুভেচ্ছা
‘পদ্মশ্রী’ প্রাপ্তিতে সংগীত ঐক্যর পক্ষ থেকে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে ফুলেল শুভেচ্ছা
৫০-এ সোলস: ব্যান্ডের লোগো নির্বাচন ও গান লিখতে পারবেন আপনিও
৫০-এ সোলস: ব্যান্ডের লোগো নির্বাচন ও গান লিখতে পারবেন আপনিও
রবীন্দ্রনাথের সকল গানের ভাণ্ডারি দিনেন্দ্রনাথ
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৬রবীন্দ্রনাথের সকল গানের ভাণ্ডারি দিনেন্দ্রনাথ
নজরুল-আব্বাসউদ্দীন: ইসলামি গান সৃষ্টি ও জনপ্রিয়তার নেপথ্য গল্প
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ১৫ (গ)নজরুল-আব্বাসউদ্দীন: ইসলামি গান সৃষ্টি ও জনপ্রিয়তার নেপথ্য গল্প
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
এক দিনের ব্যবধানে মাতৃহারা নায়ক ও গায়ক
এক দিনের ব্যবধানে মাতৃহারা নায়ক ও গায়ক
কিয়ারার পারিশ্রমিক ১৩ কোটি!
কিয়ারার পারিশ্রমিক ১৩ কোটি!
ফের ‘লাকি পার্টনার’র সঙ্গে ফারিণ!
ফের ‘লাকি পার্টনার’র সঙ্গে ফারিণ!
গানে ফারিণ, সঙ্গে তাহসান, পেছনে ইমরান
গানে ফারিণ, সঙ্গে তাহসান, পেছনে ইমরান
দেড় যুগের গান-গল্প শোনাবেন শাওন
দেড় যুগের গান-গল্প শোনাবেন শাওন