X
সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১, ৯ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

যে বেদনা চিরদিন বইতে হবে

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:৩৭

তোফায়েল আহমেদ ১৯৭৫-এর ১২ সেপ্টেম্বর আমাকে যখন ময়মনসিংহ কারাগারের কনডেম সেলে (যেখানে ফাঁসির আসামিদের রাখা হয়) নিয়ে গেলো তখন আমার কাছে মনে হয়েছে যে আমি স্বর্গে এসেছি। এটা আমার জন্য বেহেশত। যেখানে ফাঁসির আসামিকে রাখা হয় সেখানে সূর্যের আলো-বাতাস অনুভব করা যায় না। কারণ, ১৫ আগস্টের বিভীষিকাময় দিনটির শুরু থেকেই আমার ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছিল, তাতে আমি না পারি হাঁটতে, না পারি দাঁড়াতে। আমার অবস্থা ছিল এতটাই করুণ।
১৫ আগস্ট থেকেই খুনিচক্র আমাকে গৃহবন্দি করে রেখেছিল। গৃহবন্দি অবস্থায় ঘাতকের দল আমার ওপর তিনবার ভয়াবহ নির্যাতন চালায়। ১৭ আগস্ট মেজর শাহরিয়ার (যার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে) ও ক্যাপ্টেন মাজেদ (সম্প্রতি যার ফাঁসি হয়েছে) এই দু’জন বাসা থেকে টেনেহিঁচড়ে আমাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যায়। আমার মা তখন বেহুঁশ। সেখানে আমার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। ১৮ আগস্ট আমার বাসায় তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার শাফায়েত জামিল এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন (তখন মেজর ছিলেন), আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন এবং গোপন কিছু কথা বলেন। তারা চলে যাওয়ার পর আমার ওপর খুনিচক্রের নির্যাতন বেড়ে যায়। যে কথা শাফায়েত জামিল তার বইতে লিখেছেন এবং ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াতও তার বইতে উল্লেখ করেছেন যে আমার ওপর কী ধরনের অত্যাচার হয়েছে। ২৩ আগস্ট আমাকে এবং জিল্লুর রহমানকে (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) বঙ্গভবনে খুনি মোশতাকের কাছে ই এ চৌধুরী নিয়ে যান। ই এ চৌধুরী তখন ডিআইজি এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান। সেখানে আমাদের ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং খুনি খোন্দকার মোশতাক সরকারকে সমর্থনের জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়। আমরা যখন কিছুতেই রাজি হইনি, তখন খুনি মোশতাক ভীতি প্রদর্শন করে ইংরেজিতে You are waking on grave. If somebody enter your house and killed you, nobody will take responsibility. খুনি সরকারের সপক্ষে সম্মতি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে আমাদের বাসভবনে ফিরিয়ে দেয়। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে আমাকে ৬ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয়। আমি, জিল্লুর ভাই, রাজ্জাক ভাই (প্রয়াত শ্রদ্ধেয় নেতা) ও আবিদুর রহমান (তৎকালীন ‘দ্য পিপল’ পত্রিকার সম্পাদক)-এই চার জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে রাখে। সেখানে প্রায় ৩০ জন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা পুলিশ কন্ট্রোল রুম ঘিরে রাখে। প্রত্যেক দিন আমার ওপর সেনা সদস্যরা দুর্ব্যবহার করে। পুলিশ কন্ট্রোল রুমের বন্দিদশা থেকেই একদিন খুনিচক্র আমাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যায়। সেদিন রাতে আমি এবং রাজ্জাক ভাই একটি কক্ষে একসাথে ঘুমাচ্ছিলাম। জিল্লুর রহমান ও আবিদুর রহমান আরেকটি কক্ষে ছিলেন। হঠাৎ একদিন রাত তিনটার দিকে মেজর মহিউদ্দিন, মেজর হুদা, মেজর শাহরিয়ার আমাদের কক্ষে ঢুকেই চিৎকার করে বলে, ‘হু ইজ তোফায়েল’, ‘হু ইজ তোফায়েল’। রাজ্জাক ভাই আমার আগে জেগে ওঠেন এবং আমাকে দেখিয়ে দেন। আমাকে দেখেই তারা আমার বুকে স্টেনগান চেপে ধরে। চোখের সামনে মৃত্যু উপস্থিত বিধায় সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণ করে বলি, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ...।’ মৃত্যু তখন সন্নিকটে। আমি ওজু করার জন্য তাদের নিকট অনুরোধ করি। পাশেই বাথরুম ছিল। সেখানে আমাকে ওজু করতে দেয়। ওজু করে আসার পর খুনিরা আমার চোখ বাঁধে। আমি সহবন্দিদের কাছ থেকে বিদায় নিই এবং ভাবি আজই আমার শেষদিন। তারপর বারান্দায় নিয়ে আমার দু’হাত পিছমোড়া করে বাঁধে। এরপর মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কোথাও নিয়ে যায়। অনুমান করি এটি রেডিও স্টেশন। পরে জেনেছি স্থানটি রেডিও স্টেশনই ছিল। সেখানে নিয়ে আমার হাতের বাঁধন খুলে চেয়ারের সাথে বেঁধে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়। চোখবাঁধা থাকায় ইন্টারোগেশনকালে কারা প্রশ্ন করেছিল বুঝতে না পারলেও খুনি ডালিমের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট চিনতে পেরেছি। ডালিম বলছিল, ‘শেখ মুজিব মেজর ডালিমকে ভালোবাসতো। কিন্তু শেখ মুজিব আমাকে আর্মি থেকে ডিসমিস করেছে।’ ‘Sheikh Mujib he is to loved Dalim very much, but he has been dismissed me from the army and Mr. Tofail you…’ বলেই সে বাঁ হাত দিয়ে আমাকে ঘুষি মারতে থাকে। তার ডান হাত নষ্ট ছিল। বঙ্গবন্ধু লন্ডনে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করিয়েছিলেন। সে যে বাম হাত দিয়ে ঘুষি মেরেছে আমি তা অনুমান করি। এরপর শুরু হয় প্রশ্নের পর প্রশ্ন। বঙ্গবন্ধুর ফান্ড ছিল আমার কাছে, রক্ষীবাহিনী, রক্ষীবাহিনীর অস্ত্র এসব বিষয়াদি নিয়ে লাগাতার প্রশ্ন করা হয়। একপর্যায়ে তারা আমাকে রেখে নিজদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে যে, আমাকে কী করবে? পরে অনেক প্রশ্ন করে খুনিরা আমাকে বলে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে। কোথায় শেখ মুজিবের ফান্ড, কোথায় আমার অস্ত্র গেছে ইত্যাদি। খুনিরা আমায় বলে, ‘তোমার প্রাইভেট সেক্রেটারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সে ৬০ পৃষ্ঠার স্টেটমেন্ট দিয়েছে। সেখানে লেখা আছে তুমি কাকে কাকে অস্ত্র দিয়েছো। রক্ষীবাহিনীর ওখানে (রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টারে) গিয়ে তুমি পাল্টা কিছু করতে চেয়েছিলে।’  সেদিন ১৫ আগস্টের সকালে যখন রেডিওতে ডালিমের কণ্ঠস্বর শুনলাম তখন আমি সেনাবাহিনী প্রধান শফিউল্লাহ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী সাহেব, ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব সকলের সাথেই টেলিফোনে কথা বলেছি। খুনিচক্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মনোবল নিয়ে শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত রক্ষীবাহিনীর সদর দফতরে গিয়েছি। কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই প্রতিকূলে ছিল যে কিছুই করা সম্ভবপর হয়নি। কারণ, খুনিচক্রের ষড়যন্ত্রের জাল ছিল কঠিন এবং তা ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এক বহুল বিস্তৃত নীলনকশা! মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে রক্ষীবাহিনীর হেডকোয়ার্টারে যখন গিয়েছি তখন চারপাশে ১৪টি ট্যাংক। রক্ষীবাহিনীর গোলাবারুদ ওখানে থাকতো না। সেসব গোলাবারুদের কোত ছিল বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) ক্যাম্পে অর্থাৎ পিলখানায়। মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান তখন বিডিআর-এর ডিজি। তিনি কোনও সহযোগিতা করেননি। অস্ত্র না পেলে তো কিছু করা যাবে না। অপরদিকে সাভারে সেখানে ২০০০ আন্ডার ট্রেনিং রক্ষী ছিল। কিন্তু সাভারে ব্রিজের ওপর ট্যাংক বহর অবস্থান নেওয়ায় কেউ যেতেও পারেনি আসতেও পারেনি। অর্থাৎ সবদিক থেকেই আমরা অবরুদ্ধ। রক্ষীবাহিনীর দুই উপ-প্রধান আনোয়ার উল আলম শহীদ ও সারোয়ার হোসেন মোল্লা প্রতিরোধের আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তারা কারও কাছ থেকে কোনও সাহায্য পায়নি। ষড়যন্ত্রকারী খুনিচক্র এতটাই নিখুঁতভাবে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে যে আমরা ছিলাম নিরুপায়। রক্ষীবাহিনীর সদর দফতরে আমার উপস্থিতি জানাজানি হলে জিয়াউর রহমানের নির্দেশে ওখান থেকেই সিটি এসপি সালাম সাহেব প্রায় ৫০ জন পুলিশ নিয়ে আমাকে গ্রেফতার করে গৃহবন্দি করে রাখে। রক্ষীবাহিনীর উপ-প্রধান আনোয়ার উল আলম শহীদ ‘রক্ষীবাহিনীর সত্য-মিথ্যা’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘কিন্তু বাঙালি জাতির দুর্ভাগ্য যে শোকে মুহ্যমান জাতীয় নেতারা (রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত) জাতির এই কঠিন সময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি।’ (পৃষ্ঠা-১৪৯)।

বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার্থে আমি চেষ্টা করেছি সে কথা আমি কখনও বলি না। কারণ, আমরা কিছু করতে পারিনি; জাতির পিতাকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি। বিষয়টি নিছক ব্যক্তিগত নয়, এটি আমাদের জাতীয় ব্যর্থতাই বটে!

এরপর আসে বিভীষিকাময় ১০ সেপ্টেম্বরের রাত। তখন রোজা। শাহবাগস্থ পুলিশ কন্ট্রোল রুমে বন্দি। আমি তারাবির নামাজ পড়ে রাজ্জাক ভাইয়ের পাশে ঘুমিয়ে ছিলাম। গভীর ঘুম। সেখান থেকে খুনিচক্র আমাকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর সেই একই প্রশ্ন। কোথায় কাদের কাছে অস্ত্র ডিসট্রিবিউট করেছি, আমার প্রাইভেট সেক্রেটারি ৬০ পৃষ্ঠার স্টেটমেন্ট ও নানারকম তথ্য দিয়েছে। আমি কাকে কাকে অস্ত্র দিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর টাকা-পয়সা কোথা থেকে আসতো, কীভাবে দিতো। আর্মির লোকজনের সাথে বিশেষ করে কর্নেল র‌্যাংকের নিচে কারও সাথে আমি দেখা করতাম না। বড় বড় অফিসার কোথায় তারা এখন। তারা কি তোমাকে হেল্প করতে পারে? এরপর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজসহ শারীরিক নির্যাতন। খুনিরা আমাকে টার্গেট করেছিল। আমার তখন হুঁশ নেই। আমি তাদের সোজাসাপ্টা একটি কথাই বলেছিলাম, ‘বঙ্গবন্ধুর ভালো কাজের সাথে আমি যেমন জড়িত, যদি কোনও ভুল হয়ে থাকে তবে তার সাথেও জড়িত। এর বেশি আর আমি কিছু বলতে পারবো না।’ খুনিরা যখন নির্যাতনে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি দেয় তখন অজ্ঞাত একজন মানুষ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে খুব করুণ কণ্ঠে চাপাস্বরে বলতে থাকেন, ‘আল্লাহ আল্লাহ করেন, আল্লাহ আল্লাহ করেন।’ তার মনে হয়েছিল মৃত্যু আমার অবধারিত। সন্ধ্যার সময় খুনি মেজর শাহরিয়ার আসে। একগাদা লিখিত প্রশ্ন আমাকে দিয়ে বলে, ‘এর উত্তর দিতে হবে।’ আমার তখন হুঁশ নেই, আমি আধমরা। এই বেহুঁশ অবস্থায় আমাকে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে দিয়ে যায়। অসহ্য যন্ত্রণায় আমি চিৎকার করতে থাকি। তখন রাজ্জাক ভাই, জিল্লুর ভাই আমার শুশ্রূষা করেন। কিছুক্ষণ পর যিনি আমাকে গ্রেফতার করেছিলেন, সেই সিটি এসপি সালাম সাহেব ডাক্তার নিয়ে আসেন। সন্ধ্যার দিকে আমাকে, আবিদুর রহমান, রাজ্জাক ভাই এবং জিল্লুর ভাই- এই চারজনকে সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নাম-ধাম লিপিবদ্ধ করে সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ আমাদের চার জনকে জেলগেটে নিয়ে আবিদুর রহমান এবং আমাকে ময়মনসিংহ এবং রাজ্জাক ভাই ও জিল্লুর ভাইকে কুমিল্লা কারাগারে প্রেরণ করে।

ময়মনসিংহ কারাগারে ১২ তারিখ সকালের দিকে পৌঁছাই। তখন আমার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। আমাকে আর আবিদুর রহমানকে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখে। এক রুমে দু’জন থাকার নিয়ম নেই। হয় থাকতে হবে তিন জন, নয় একজন। গভীর রাতে জেল সুপার, জেলার এবং সুবেদার আলী আহমদ এসে কনডেম সেলে যারা অন্য আসামি ছিল তাদের অন্যত্র সরিয়ে নেন। এখানে আমি প্রায় ৫ মাস সূর্যের আলো দেখিনি। এই কনডেম সেলেই ফাঁসির আসামির মতো আমার জীবন কেটেছে। জেলখানার নিয়ম-কানুন মেনে চলতাম। এখন তো কারাগার অনেক উন্নত হয়েছে। তখন এত উন্নত ছিল না। উন্নত বাথরুম ছিল না। আবিদুর রহমান সাহেব আমার জেলসঙ্গী ছিলেন। তিনি কবিতা লিখতেন। আমিও ডায়েরি লেখার চেষ্টা করতাম। ঈদের দিন জেলখানায় সকলকে সেল থেকে বেরুতে দেয়। সকলেই নামাজ পড়ে এবং খোলা অবস্থায় থাকে। যখন ঈদের দিন সুবিধা দিলো তখন আগের ওই কনডেম সেলের ফাঁসির আসামির মধ্য থেকে পাঁচ জন জেল থেকে পালিয়ে যায়। আমি আর আবিদুর রহমান ছাড়া আর সবাই স্বাধীনতাবিরোধী এবং অন্যান্য আসামি। তখনই যারা আগে কনডেম সেলে ছিল তাদের আবার কনডেম সেলে নিয়ে এসে আমাকে ওয়ার্ডে দেয়। সেই ওয়ার্ডে আমরা অনেকেই ছিলাম। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অর্থাৎ ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুরের স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতা আসতে থাকে। বঙ্গবন্ধু কারাগারের রোজনামচায় লিখেছেন,  ‘জেলখানার সম্বল, থালা-বাটি-কম্বল।’ আমাকে দিয়েছে দুটো কম্বল। একটি বিছানার, আরেকটি গায়ে দেওয়ার; সেইসাথে একটি থালা ও বাটি। এই ছিল আমার জেলখানার সম্বল। তখনও আমি এমপি। এমপি পদ যায়নি, কিন্তু ডিভিশন দেয়নি। ডিভিশন আসে অনেকদিন পর। ডিভিশন পাওয়ার পর আমি ওয়ার্ডে গেলাম। সেখানে পেলাম জনাব আবদুল হামিদ সাহেবকে (বর্তমান রাষ্ট্রপতি)। তিনি গ্রেফতার হন ২০ মার্চ ১৯৭৬-এ। তাঁকে গ্রেফতারের পর প্রথমে আর্মি ক্যাম্প, পরে পুলিশ ক্যাম্পে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। ডিভিশন পাওয়ার পর আমরা অনেকেই একসাথে থাকি। সেখানে ছিলাম আমি, আবিদুর রহমান, আব্দুল হামিদ, জাতীয় নেতা রফিক উদ্দিন ভূইয়া, সাবেক ধর্মমন্ত্রী ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, সাবেক এমপি মোস্তাফিজুর রহমান, শেরপুরের নিজামউদ্দীন এমপি, আব্দুস সামাদসহ শেরপুরের অনেকে। এছাড়াও মেম্বার ওয়াদুদ, আব্দুল হামিদ, মোস্তাফিজুর রহমান চুন্নু মিয়া এমপিসহ কিশোরগঞ্জের বহু নেতা এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের ছোট ভাই সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলাম পট্টু ভাই, সিপিবি নেতা অধ্যাপক যতীন সরকার এবং ন্যাপ নেতা আব্দুল বারী, যিনি ছিলেন খোন্দকার মোশতাক আহমেদের আপন ভাগ্নে। তিনিও আমাদের সাথে ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দি ছিলেন। নেত্রকোনার খসরু, ফজলুর রহমান, সাফায়েত, ন্যাপ নেতা অলোক ময়নাহা, এরকম ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গার অসংখ্য নেতাকর্মী আমাদের সাথে  বন্দি ছিলেন। কারাগার ভর্তি শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। ’৭৬-এর ৩১ আগস্ট জিয়াউর রহমানের এক আদেশে স্বাধীনতাবিরোধী যারা হত্যা, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং লুটতরাজ করেছে, বঙ্গবন্ধু ক্ষমা প্রদর্শনের পরে এরা সবাই কারাগারে ছিল, তাদের সকলকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু দালাল আইনে তাদের আটকাদেশ দিয়ে বিচারের মুখোমুখি করেছিল। যারা কোলাবরেটের তারা কারাগারে ছিল ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আমাদের নেতাকর্মীদের নির্বিচারে গ্রেফতার করা শুরু করলে পর্যায়ক্রমে রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের বেরুনোর পালা শুরু হয়। স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়া দালাল আইন বাতিল করে ৩১ ডিসেম্বর জেলখানা খালি করে দেয় এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কারাবন্দি করে।

এই ময়মনসিংহ কারাগারেই ৩ নভেম্বর জেলহত্যার সংবাদ পাই। কারাগারের জেল সুপার তখন নির্মলেন্দু রায়। বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারে বন্দি তখন তিনি ডেপুটি জেলার ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে অনেকবার তিনি গণভবনে দেখা করতে এসেছেন। আমি তখন তাকে দেখেছি। নির্মলেন্দু রায় আমার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এই জেলখানায় এক মেজর সশস্ত্র অবস্থায় প্রবেশ করতে চেয়েছিল। কিন্তু নির্মলেন্দু রায় তাকে ঢুকতে দেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি অস্ত্র নিয়ে কাউকে ঢুকতে দিবো না।’ যেটা ঢাকা জেলখানায় করেনি। আমার ক্লাসমেট ছিল ওদুদ। ওদুদ তখন এসডিপিও তথা সাবডিভিশনাল পুলিশ অফিসার। যার ’৭৩ ব্যাচে চাকরি হয়। সে প্রায় ৩০/৪০ জন পুলিশ নিয়ে জেলখানা ঘিরে রেখেছিল। যার জন্য সেই মেজর সেদিন ময়মনসিংহ কারাগারে ঢুকতে পারেনি। ইতোমধ্যে ঢাকায় জেল হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কারাভ্যন্তরে নৃশংসভাবে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। ময়মনসিংহের তৎকালীন এসপি রাত্রিবেলায় জেলখানায় আসেন আমাকে জেল থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কারণ, জেলখানায় আক্রমণ হতে পারে। কিন্তু আমি যাইনি। আমাকে প্রোটেকশন দেওয়ার কারণে পরবর্তীকালে নির্মলেন্দু রায়কে বদলি করে ফরিদপুরে পাঠানো হয়। আর এসপিকে ময়মনসিংহ থেকে বদলি করে ওএসডি করে রাখে। এই দু’জন মানুষের নিকট আমি কৃতজ্ঞ।

ময়মনসিংহ কারাগারে থাকাকালে আমার জীবনে অনেক দুঃখের ঘটনা ঘটে। হঠাৎ একদিন শুনতে পাই, মাইকে ঘোষণা করছে যে, শফিকুল ইসলাম মিন্টু নামে কোনও বন্দি আছে কিনা? অর্থাৎ আমার এপিএস শফিকুল ইসলাম মিন্টু; আমাকে বন্দি করার পর তাকে গ্রেফতার করে আমার বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করে খুনিচক্র। কিন্তু সে সম্মত না হওয়ায় হত্যা করে তার লাশ বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। তার মৃতদেহ আর পাওয়া যায়নি। তখন তাঁকে খোঁজার জন্য কারাগারে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। এই কারাগারেই ‘৭৫-এর ৫ অক্টোবর আমার মেজো ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ পাই। তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। ফজরের নামাজ পড়ে দিনের বেলা যখন ঘুমাই তখন আলী আহমদ সুবেদার আমাকে জাগিয়ে বলেন, ‘উঠেন উঠেন, আপনার সাক্ষাৎ আসছে।’ অর্থাৎ আমার স্ত্রী, একমাত্র মেয়ে ডা. তসলিমা আহমেদ মুন্নি এবং চাচাতো ভাই ওদুদ আমাকে দেখতে ময়মনসিংহ কারাগারে এসেছে। ওদের সঙ্গে সাক্ষাতের শুরুতেই জিজ্ঞাসা করি মেজো ভাইয়ের খবর কী? তখন আমার স্ত্রী বলেন, ‘এসব কথা বাদ দিয়ে অন্য কথা আলাপ করো।’ হঠাৎ ক্লাস টু-তে পড়ুয়া আমার ছোট্ট মেয়েটি বলে, ‘আব্বা, কাকুকে তো মেরে ফেলেছে!’ আমার মেজো ভাই আলী আহমেদ, ঈদের আগের দিন বাড়ির কাছে গ্রামের হাটে বাজার করতে গিয়েছিল। তখন খুনি ক্যাপ্টেন মাজেদ লোক নিয়োগ করে মেজো ভাইকে বাজারের মধ্যে গুলি করে হত্যা করে। আমার মায়ের জীবনটা ছিল খুবই কঠিন। কারণ, মেজো ভাইয়ের মৃত্যুর ৩ মাস আগে ‘৭৫-এর ১১ জুলাই আমার বড় ভাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন ঢাকার (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) পিজি হাসপাতালে। বঙ্গবন্ধু তখন ধানমন্ডির বাসভবনে এসে আমার ভাইয়ের জানাজা করলেন, এয়ারপোর্টে নিজে গেলেন ও হেলিকপ্টারে আমার ভাইয়ের মৃতদেহ ভোলায় পাঠালেন। আমি যখন ১৫ দিন ভোলাতে ছিলাম, প্রতিদিনই তিনি আমাকে ফোন করতেন। আজকের মতো তখন ফোন এত সুলভ ছিল না। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ আমি যেন প্রতিদিন ১১টার সময় ভোলার থানায় গিয়ে বসে থাকি। ঠিক ১১টার সময়ই প্রত্যেক দিন আমাকে তিনি ফোন করতেন। শেখ জামাল ও শেখ কামালের বিয়ের দিনও ফোন করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সবাই আছে শুধু তুই নাই। তোর কথা শুধু মনে পড়ে।’ এতবড় মহান নেতা ছিলেন তিনি। আমার মায়ের তখন করুণ অবস্থা। আমরা তিন ভাই। বড় ভাই মারা গেলেন ১১ জুলাই, মেজো ভাই মারা গেলেন ৫ অক্টোবর আর আমি কারাগারে। মায়ের সেই বেদনাবিধুর কষ্ট আমি আজ  লিখে বোঝাতে পারবো না। যে সরকারি বাড়িতে ছিলাম ১৫ দিনের মধ্যেই সেই বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। সে সময় আমার স্ত্রীকে মানুষ বাড়ি ভাড়া দিতে চায়নি। কারণ, আমার স্ত্রীকে বাড়ি ভাড়া দিলে তাদের ক্ষতি হবে। আমার ভাগ্নি জামাই নজরুলের নামে বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেই বাড়িতে আমার স্ত্রী থাকতেন। পরিবারের সকলেই তখন সীমাহীন কষ্ট করেছে।

ময়মনসিংহে দীর্ঘদিন কারা নির্যাতন ভোগের ২০ মাস পর ‘৭৭-এর ২৭ এপ্রিল যেদিন শেরেবাংলার মৃত্যুবার্ষিকী ওইদিন আমাকে ট্রেনে করে কুষ্টিয়া কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রথমে আমাকে আইসোলেশনে রাখা হয়। কুষ্টিয়া কারাগারে সহ-কারাবন্দি ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা সরদার আমজাদ হোসেন, সেদিনের জাসদ নেতা শাজাহান খান এবং বরিশালের ছাত্রলীগ নেতা ফারুক। দুই ছেলে হারানো আমার মা তাঁর বেঁচে থাকা একমাত্র ছেলেটিকে দেখতে বৃদ্ধাবস্থায় অসুস্থ শরীরে কুষ্টিয়া কারাগারে যেতেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে কপালে চুমু খেয়ে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বিদায় নিতেন। আমার স্ত্রী আমাকে দেখতে আসার পথে একবার সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন। তার মাথায় ১৪টি সেলাই লাগে। অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে কারা কর্তৃপক্ষ আমাকে ২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেন। আমার স্ত্রী আনোয়ারা আহমেদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আটকাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আইনজীবী (যিনি আমার স্ত্রীর নিকট থেকে মাত্র ১ টাকা ফি নিয়েছিলেন) অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক (বর্তমান আইনমন্ত্রীর পিতা) আদালতে বলেন, ‘তাঁর আটক সম্পূর্ণ অন্যায় এবং ১৯৭৫ সালের জরুরি ক্ষমতা আইনের আওতায় তাঁর আটকাদেশের যৌক্তিকতা প্রতিপন্ন করার মতো কোন তথ্য-প্রমাণ সরকারের হাতে নেই। ফলে উক্ত আটকাদেশ অবৈধ ও আইনের এখতিয়ারবহির্ভূত।’ রাজ্জাক ভাই এবং আমার একসাথে রিট হয়। রাজ্জাক ভাই হাইকোর্ট থেকে মুক্তি পেলেও আমি মুক্তি পাইনি। অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায়ে মুক্তি পেলাম ৪ মাস পর অর্থাৎ ‘৭৮-এর ১২ এপ্রিল। কুষ্টিয়া কারাগারে ১৩ মাসসহ সর্বমোট ৩৩ মাস বন্দি থাকার পর মুক্তিলাভ করি। কুষ্টিয়া কারাগারে যখন বন্দি তখন আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয় এবং কারাগারে আটকাবস্থায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই। আমাকে কুষ্টিয়া কারাগারে নেওয়ার আগে ময়মনসিংহ কারাগার থেকে ৮ মাস পর আব্দুল হামিদকে প্রথমে কুষ্টিয়া কারাগারে, পরে কুষ্টিয়া কারাগারে যখন আমাকে নিয়ে গেলো তখন তাকে রাজশাহী কারাগারে পাঠায়। রাজশাহী কারাগার থেকে তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে আনার পর তিনি মুক্তিলাভ করেন ‘৭৮-এর প্রথম দিকে। আর আমাকে কখনোই কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়নি।  কুষ্টিয়া কারাগারের ১৩ মাসে অনেক উত্থান-পতন দেখেছি। এই জেলে বসেই প্রত্যেক রাতেই আমি চিৎকার শুনতাম। ময়মনসিংহ ও কুষ্টিয়া কারাগারে থাকাকালে ফাঁসির আসামিদের কান্না শুনেছি।

আমি কখনও ভাবিনি যে বেঁচে থাকবো। বঙ্গবন্ধুর স্নেহ-আদর-ভালোবাসা পেয়েছি। তিনি বুকে টেনে নিয়েছেন। পৃথিবীর যেখানে গিয়েছেন, বাংলাদেশের যেখানে গিয়েছেন, আমাকে সঙ্গী করেছেন। প্রতিদিন সকাল ৯টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে অফিসে যেতাম। আবার রাতে বঙ্গবন্ধুকে তাঁর বাসভবনে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফিরতাম। যেদিন ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার শেষ দেখা, সেদিন বঙ্গবন্ধুকে বাসায় পৌঁছে দেই এবং বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেন, ‘কাল সকালে আসবি। তুই ডাকসুর ভিপি ছিলি। তুই আমার সাথেই ইউনিভার্সিটিতে যাবি।’ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এটাই আমার শেষ দেখা ও কথা! পরদিনের পরিস্থিতি এমন হতে পারে তা ছিল কল্পনাতীত!  তবু ভাবি, যাহোক আমি তো বেঁচে আছি। কিন্তু সারা জীবন মনের গভীরে এই দুঃখ থেকে যাবে, যে মহান নেতা জাতির পিতা পরম মমতা-স্নেহ-আদর-ভালোবাসায় সিক্ত করে সর্বদা ছায়া দিয়ে নিজের সঙ্গে রেখেছেন, যার স্নেহ-আদর-ভালোবাসা আমার জীবনে পাথেয়, তাঁর মৃত্যুতে কিছুই করতে পারিনি, বেদনার এই অবিরাম ভার আমাকে চিরদিন বয়ে বেড়াতে হবে!

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ।

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বঙ্গবন্ধুর চেতনা চলার পথের প্রেরণা

বঙ্গবন্ধুর চেতনা চলার পথের প্রেরণা

বঙ্গমাতার জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

বঙ্গমাতার জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

নির্লোভ নিরহংকারী প্রতিভাবান শেখ কামাল

নির্লোভ নিরহংকারী প্রতিভাবান শেখ কামাল

আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

এই আগুনের পেছনে কে?

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ১৭:১৪

আমীন আল রশীদ এই লেখাটি যারা পড়ছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন: ধরা যাক আপনি শুনতে পেলেন আপনার এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনও একজন লোক ফেসবুকে ইসলাম সম্পর্কে খারাপ কথা লিখেছেন। আপনি কি লাঠিসোঁটা আর আগুন নিয়ে ওই লোকের বসতবাড়িতে গিয়ে হামলা চালাবেন? ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেবেন? পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলবেন? সহজ উত্তর হচ্ছে– না। কারণ, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনি এতটা হিংস্র বা উগ্র নন। আপনি জন্মের পর থেকে যাদের সঙ্গে একই আলো-হাওয়া, একই পানি ও জলে বেড়ে উঠেছেন, কথিত ধর্ম অবমাননার গুজবে আপনি তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে পারেন না। এটা আপনি করেননি। যদি না করেন তাহলে কুমিল্লার মন্দিরে কে কোরআন  নিয়ে গেলো এবং সেই সংবাদ বা গুজবে কারা পরবর্তীতে ওই মন্দিরে হামলা চালালো? কুমিল্লার এই আগুন কী করে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে গেলো? রংপুরের পীরগঞ্জে কারা উসকানি দিলো এবং কারা গিয়ে পুরো পল্লিটি জ্বালিয়ে দিলো?

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বরাবরই অসাম্প্রদায়িক। হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। কিন্তু তারপরও দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক উসকানি, মন্দিরে আগুন, প্রতিমা ভাঙচুর, হিন্দুদের কথিত ‘সংখ্যালঘু’ তকমা দিয়ে তাদের জায়গা-জমি দখল করে দেশছাড়া করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের পরে এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত যেসব ঘটনা ঘটেছে—সেখানে সাধারণ হিন্দু-মুসলমানের কোনও দায় ছিল না। এর নেপথ্যে বরাবরই কাজ করে ভোটের রাজনীতি। কখনও ব্যক্তিগত বিরোধও রাজনীতির মোড়কে রঙ পাল্টায়। কখনও এসব ঘটনার পেছনে থাকে ভূ-রাজনীতি। থাকে এই অঞ্চলের শক্তিমান রাষ্ট্রগুলোর নানা স্বার্থ। কিন্তু প্রশ্ন হলো,  অতীতে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনার মূল হোতাদের কি চিহ্নিত করে বিচার করা গেছে? নাকি প্রতিটি ঘটনাই রাজনীতির মারপ্যাঁচে হারিয়ে গেছে? মাঝখানে প্রাণ গেছে কিছু নিরীহ মানুষের। অনেক সময় কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মীও ভিকটিম হয়েছেন—যাদের সবাই হয়তো প্রকৃত অপরাধী নন।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, যখনই এ রকম ঘটনা ঘটে, বিশেষ করে মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর বা কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে, তখন দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক পক্ষ পৌনঃপুনিকভাবে একইরকম কথাবার্তা বলে। কম্পিউটারের প্রোগ্রামিংয়ের মতো তাদের বক্তব্যও নির্ধারিত। ঘটনা যাই ঘটুক, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের কোনও ব্যত্যয় হয় না। এবারও তা-ই।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অভিযোগ, এর পেছনে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তথা তাদের ভাষায় বিএনপি-জামায়াতের লোকজন জড়িত। তারাই দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায়। পক্ষান্তরে বিএনপির দাবি, সরকার তাদের লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতি-লুটপাট থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। মধ্যপন্থীদের অনেকে মনে করেন, এটা বিদেশি কোনও রাষ্ট্রের উসকানি। কেউ কেউ মনে করেন, বিশ্বব্যাপী যে ধর্মীয় উগ্রবাদ বিস্তৃত হচ্ছে, তারই প্রতিফলন।

অস্বীকার করার উপায় নেই, ভূ-প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জায়গায় অবস্থান করছে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি কেবলই পানের অযোগ্য লবণাক্ত জলের আধার নয়। বরং এর নিচে রয়েছে বিশাল সম্পদ। ব্লু ইকোনমির বিরাট সম্ভাবনা। বাংলাদেশের রয়েছে ১৭ কোটি লোকের বাজার। বাংলাদেশ এখন উপভোগ করছে পপুলেশন ডিভিডেন্টের সুবিধা—অর্থাৎ দেশের বিরাট জনগোষ্ঠী যখন তরুণ-উদ্যমী-শক্তিশালী-সাহসী—যে সুযোগ কোনও একটি জাতির জীবনে শত বছরেও আসে না এবং যে সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে; উদযাপন করছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী; করোনার অতিমারিতে বিশ্বের অনেক শক্তিশালী অর্থনীতির দেশও যখন বিপর্যস্ত, তখন বাংলাদেশ যে বিশাল জনগোষ্ঠীর চাপ নিয়েও দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে—এসব সফলতা অনেকেরই হয়তো মন খারাপের কারণ হতে পারে।

সুতরাং কে কোথা থেকে কোন উদ্দেশ্যে কলকাঠি নাড়ছে তা বোঝা মুশকিল। তবে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে কোনও রাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক বেশি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং তার সঙ্গে এই অঞ্চলের অন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর রসায়ন কেমন—এটিও ভাবনার বাইরে রাখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাকলে; অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে থাকলে; নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের স্পর্ধা দেখাতে পারলে যদি কারও মন খারাপ হয়—তখন তারা বাংলাদেশের সেই স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে। তাদের সেই অর্থ-লোকবল ও কৌশল আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ শান্ত থাকলে যদি কারও মন খারাপ হয়; কেউ যদি মনে করে যে বাংলাদেশ খারাপ থাকলেই তার ভালো—তাহলে গতকাল রামু, আজ কুমিল্লা, কাল পীরগঞ্জ—চলতেই থাকবে। সুতরাং বাংলাদেশ যদি সত্যিই কারও মন খারাপের বলি হয়ে থাকে, এবং ব্যক্তি-গোষ্ঠী-দল বা রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করা না যায়—তাহলে এই আগুন সহজে নিভবে না।
মনে রাখা দরকার, কারণ সাধারণ মানুষ বরাবরই অসাম্প্রদায়িক। তারা তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের অবমাননা করে না। কোনও সাধারণ মুসলমান মন্দিরে কোরআন শরিফ রেখে আসে না। কোনও সাধারণ হিন্দু মন্দিরে কোরআন শরিফ নিয়ে তাদের মূর্তির পায়ের নিচে রাখে না। বরং এই কাজগুলো করেন ‘অসাধারণরা’। সেই ‘অসাধারণ’দের চেনা দরকার এবং তাদের সম্পর্কে সজাগ থাকা দরকার।

কেউ যদি ধর্মের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে মানুষকে বিভক্ত করে ভোটের রাজনীতি করতে চায়—তাহলে তাদের প্রতিহত করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে সব ধর্মের সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐক্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় সৃষ্টিকর্তা, ধর্ম, ধর্মীয় গ্রন্থ বা ধর্মের অবতারের কথিত অবমাননার গুজব উঠলেই লাঠিসোঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে ভাবতে হবে, আপনি কার মন্দিরে আগুন দিচ্ছেন? আপনি কার বাড়িঘরে হামলা চালাচ্ছেন? আপনি কাকে পিটিয়ে মেরে ফেলছেন? সে তো আপনারই প্রতিবেশী। আপনি কেন অন্যের রাজনীতির ঘুঁটি হচ্ছেন?

এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান— সব ধর্মের মানুষের ঐক্য। কার কী ধর্মীয় পরিচয়, সেটি বিবেচনায় না নিয়ে প্রত্যেকের প্রধান পরিচয় যে ‘মানুষ’, সেই মানুষ পরিচয়টিকে সামনে নিয়ে আসা দরকার এবং মানুষ হিসেবে প্রত্যেককে সম্মান করতে পারলেই এবং হুজুগ ও গুজবে কান না দিয়ে বরং প্রত্যেকে তার নিজের ধর্ম নিজের মতো করে পালন করতে পারলেই দেশি-বিদেশি-রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কোনও উসকানিই সফল হবে না। আর এটা করতে না পারলে আরও অনেক বিপদ দেখার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

 লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

নির্বাচন কমিশন আইন হতে বাধা কোথায়?

নির্বাচন কমিশন আইন হতে বাধা কোথায়?

অপুর মৃত্যু, শওকতের প্রতিবাদ, আমাদের ‘সিস্টেম’

অপুর মৃত্যু, শওকতের প্রতিবাদ, আমাদের ‘সিস্টেম’

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ভাইরাল লেগ স্পিনার এবং দু’চার কথা

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ২১:৩৩

জনি হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টুইটার ও ইনস্টাগ্রামে ভারতের ক্রিকেট গ্রেট শচীন টেন্ডুলকারের একটি পোস্ট বেশ কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলছে বলেই যে আগ্রহটা তৈরি হয়েছে তা নয়। গত ১৪ অক্টোবর তার শেয়ার করা একটি ভিডিও ক্লিপে রয়েছে বাংলাদেশি খুদে বালকের ক্রিকেট প্রতিভা। সেজন্যই এ নিয়ে এত আলোচনা। এটি এক বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। সেই ভিডিওতে সবাই দেখেছে বরিশালের খুদে লেগ স্পিনারের বোলিংয়ে সতীর্থদের অসহায়ত্ব। কখনও গুগলিতে, কখনও ফ্লিপারে বা লেগ স্পিনের মায়াজালে কুপোকাত করেছে সে। ক্রিকেটের প্রতি ছোট্ট ছেলেটির আবেগ ও ভালোবাসায় মুগ্ধ ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার।

অনেকে ভেবেছিলেন, শচীনের শেয়ার করা ভিডিওতে বল হাতে কারিকুরি দেখানো খুদে ক্রিকেটার ভারতেরই কেউ হবে! ভারতীয় নেটিজেনদের অনেকে তো এই দক্ষতা দেখে বিস্মিত। শচীনের পোস্টটির মন্তব্যের ঘরে আফগানিস্তানের তারকা লেগ স্পিনার রশিদ খান প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশি ছেলেটির। কিংবদন্তি লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন মুগ্ধ হয়ে নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে একই ভিডিও শেয়ার করেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, খুদে বালকটি কে?

ছেলেটির নাম আসাদুজ্জামান সাদিদ। খুদে এই লেগ স্পিনারের বয়স এখন ৬ বছর। এটুকু বয়সেই লেগ স্পিন ও গুগলিতে অসামান্য পারদর্শিতা তার। ভাগ্নের বোলিং নৈপুণ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করেন মামা। এরপর দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভিডিওটি শচীনের হাতে যাওয়ার পর ভাইরাল খুদে লেগি। এখন অস্ট্রেলিয়া অবধি তার দক্ষতার তারিফ চলছে।

শচীন টেন্ডুলকার কিংবা শেন ওয়ার্নের পোস্ট থেকে আমরা আসলে কী বার্তা পেলাম? ভারতে কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় এমন প্রতিভা তাদের চোখে পড়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তবু দুই কিংবদন্তির কাছে ভিডিওটি আলাদা মনে হলো কেন? কারণ, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এমন প্রতিভা ছড়িয়ে থাকার পরও জাতীয় দলে লেগ স্পিনার সংকট কাটেনি। দু’জনই যেন লেগ স্পিনার অন্বেষণে আমাদের ব্যর্থতা বা সদিচ্ছার অভাবকে চিমটি কেটে ধরিয়ে দিলেন! ভিডিওটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, লেগ স্পিনের প্রতিভা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার পরও আমরা নিজেরাই নিজেদের দরিদ্র করে রেখেছি।

অথচ টি-টোয়েন্টিতে এখন জিততে হলে লেগ স্পিনারের বিকল্প যেন নেই। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত ফরম্যাট শাসন করছেন এই কব্জির মোচড় ঘোরানো বোলাররা। যেকোনও দলের অধিনায়কের কাছে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার লেগিরা। তারা রান আটকান, উইকেটও এনে দেন। তাই ক্রিকেট বিশ্বে চলছে ব্যাটারদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো লেগ স্পিনারদের দাপট। এক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। এ কারণেই হয়তো মাঠে প্রতিপক্ষের লেগ স্পিন জাদুতে ভড়কে যায় টাইগাররা।

টি-টোয়েন্টিতে সত্যিই বাংলাদেশ দলের ব্যাটাররা থাকেন বাড়তি চিন্তায়। বাংলাদেশে ভালো মানের লেগ স্পিনার নেই বলেই হয়তো ক্রিকেটাররা এই শিল্পকে অতো ভালো সামলাতে পারেন না। ঘরোয়া লিগে লেগ স্পিনার বিরল। জাতীয় ক্রিকেটে নিয়মিত লেগিদের মুখোমুখি না হওয়ার কারণে অন্য দলের লেগ স্পিনারের সামনে নাকানি-চুবানি খেতে হয় টাইগারদের।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে কম-বেশি বিশ্বের সব লেগ স্পিনারই ভুগিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঘূর্ণিবলের গোলকধাঁধায় পড়ে ব্যাটারদের খাবি খেতে দেখা যায় হরহামেশা। কব্জির মোচড়ে বল ঘোরানো ক্রিকেটারদের কাছে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেন টাইগাররা। এই তো সেদিন বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে স্কটল্যান্ডের কাছে ৬ রানের হতাশাজনক হারের অন্যতম কারণ লেগ স্পিনে ধরাশায়ী হওয়া। স্কটিশ লেগ স্পিনার ক্রিস গ্রিভস তার ঘূর্ণিতে সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিমকে প্যাভিলিয়নে পাঠিয়ে জয়টা নিশ্চিত করে ফেলেন।

বড় দলের কথা পরে বলি, স্কটল্যান্ডের মতো ছোট দলগুলোতেও কমপক্ষে একজন করে লেগ স্পিনার আছে, যাদের বোলিংয়ের টার্ন দেখে মাথা ঘোরায়! বলা চলে লেগিরাই তাদের তুরুপের তাস। আরেক ছোট দল নেপালের লেগ স্পিনার সন্দীপ লামিচান চলতি মাসে আইসিসির ‘প্লেয়ার অব দ্য মান্থ’ নির্বাচিত হয়েছেন। আইপিএলে তিন বছর ধরে দল পান তিনি। আইপিএলে সব দলই কব্জির মোচড় ঘোরানো লেগিদের দলে ভিড়াতে চায়। সেখানে তাদের চাহিদা বেশ রমরমা। টি-টোয়েন্টি অলরাউন্ডার র‌্যাংকিংয়ে ছোট দলের তিন জন লেগ স্পিনার আছেন। ওমানের খাওয়ার আলি ৪ নম্বরে, আয়ারল্যান্ডের গারেথ ডেলানি ১২ নম্বরে এবং পাপুয়া নিউগিনির চার্লস আমিনির অবস্থান এখন ১৯ নম্বরে।

আগেই বলেছি, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে এখন লেগি বোলাররা সাফল্য পাচ্ছেন বেশি। লেগ স্পিনে বাইশ গজ কাঁপাচ্ছেন তারাই। টি-টোয়েন্টি বোলার র‌্যাংকিংয়ের দিকে চোখ রাখলেই তা বোঝা যায়। ২ থেকে ৪ নম্বরে থাকা সবাই লেগ স্পিনার। দুই নম্বরে শ্রীলঙ্কার ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা ডি সিলভা, তিনে আফগানিস্তানের রশিদ খান এবং চার নম্বরে আছে ইংল্যান্ডের আদিল রশিদের নাম। সাত নম্বরে আছেন আরেক লেগ স্পিনার অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডাম জাম্পা। শীর্ষে থাকা তাব্রেইজ শামসি বাঁ-হাতি রিস্ট স্পিনার, সেক্ষেত্রে তিনিও এক অর্থে লেগ স্পিনারই! আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তারা সবাই নিজ নিজ দলের মূল স্কোয়াডের সদস্য। অন্য দলগুলোর মূল স্কোয়াডে কমপক্ষে একজন দক্ষ লেগি আছে।

টি-টোয়েন্টি র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ দল ইংল্যান্ড দিয়ে শুরু করি। গত এক বছরে দলটির হয়ে সবচেয়ে বেশি (১৬) উইকেট নিয়েছেন আদিল রশিদ। তাদের মারকুটে দুই ব্যাটার ডেভিড মালান ও লিয়াম লিভিংস্টোন লেগ স্পিনার হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারেন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টি-টোয়েন্টিতে গত একবছরে সবচেয়ে বেশি (১৭) উইকেট নিয়েছেন অ্যাডাম জাম্পা। অজিদের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে আছেন আরেক স্বীকৃত লেগ স্পিনার মিচেল সোয়েপসন। এছাড়া দলটির অন্যতম দুই ব্যাটার ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথ গুগলি দিতে পারেন ভালো। দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটার রাসি ভ্যান ডার ডুসেন লেগব্রেক করতে পারেন।

অন্য দলগুলোর মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হেডেন ওয়ালশ (গত একবছরে দেশের হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি), পাকিস্তানের সহ-অধিনায়ক শাদাব খান, নিউজিল্যান্ডের ইশ সোধি (গত একবছরে দেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ উইকেট) ও টড অ্যাসেল আছেন লেগি হিসেবে। পাকিস্তানের হয়ে গত একবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ উইকেট শিকারি উসমান কাদির আছেন রিজার্ভ। ভারতের মূল স্কোয়াডের দুই সদস্য রাহুল চাহার ও বরুণ চক্রবর্তী কার্যকর দুই লেগ স্পিনার। দলটির স্ট্যান্ডবাই তালিকায় অন্যতম আরেক লেগি যুজবেন্দ্র চাহাল।

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে রিজার্ভ হিসেবে একজন স্বীকৃত লেগ স্পিনার (আমিনুল ইসলাম বিপ্লব) ছিলেন। কিন্তু তাকে ওমান নিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পর ফেরত নিয়ে এসেছে বিসিবি। এ কারণে কর্তাব্যক্তিরা সমালোচিত হয়েছেন। অথচ তিনি দলের সঙ্গে থাকলে ব্যাটাররা অনুশীলনে সুবিধাই পেতেন। লেগ স্পিনারদের আলোয় নিয়ে আসতে জাতীয় ক্রিকেট লিগের ম্যাচে ও বিপিএলে প্রতি দলের একাদশে একজন করে লেগ স্পিনার রাখার নিয়ম বাধ্যতামূলক রেখেছে বিসিবি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাই বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে লেগ স্পিনার রাখেনি! তাহলে কি সব নিয়ম-কানুন লোক দেখানো? লেগ স্পিনারদের জন্য আত্মবিশ্বাস খুব দরকারি। টানা ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেলে তাদের আত্মবিশ্বাস আসবে কোত্থেকে? বিসিবি সেটা কতটা নিশ্চিত করতে পারে?

প্রায় সব দেশে যখন ভালো মানের লেগিদের জয়জয়কার, সেখানে বাংলাদেশের শূন্য। জাতীয় ক্রিকেট দলে লেগ স্পিন বহু বছর ধরেই সবচেয়ে আক্ষেপের নাম। আমাদের দেশে ঠিক কতজন লেগ স্পিনার ছিলেন তা বের করতে গলদঘর্ম হয়ে যেতে হয়। বাইনোকুলার দিয়ে খোঁজার পর টেনেটুনে কয়েকটা নাম হয়তো বলা যাবে। হাতে গোনা সেই কয়েকজন হারিকেনের মতো মৃদু আলো ছড়ালেও সেই অর্থে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের জাত চেনাতে পারেননি। তাদের মধ্যে অন্যতম অলক কাপালি। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম হ্যাটট্রিক এই লেগ স্পিনারের। তার পাশাপাশি মোহাম্মদ আশরাফুল মাঝে মধ্যে ভেলকি দেখাতেন। কেউ কেউ কালেভদ্রে দলে জায়গা পেলেও আসন পাকা হয়নি। যেমন লেগ স্পিনার জুবায়ের হোসেন লিখন। অল্প বয়সে ২০১৪-২০১৫ সালে ছয়টি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পান তিনি। এরপর আর জায়গাটা ধরে রাখতে পারেননি। সম্প্রতি রিশাদ হোসেন ও মিনহাজুল আবেদিন আফ্রিদি লেগ স্পিন করেন বলেই কিছুটা আলোচনায় এসেছেন। কিন্তু লেগ স্পিনারের সংকট আদৌ দূর হবে কিনা সংশয় থেকেই যায়।

দেশে লেগ স্পিনারের অভাব যায়নি বলেই লেগি পাওয়া যায় না! ভালো আইডল না থাকায় উঠতি খেলোয়াড়রা অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবে কীভাবে। কাকে সামনে রেখে এগোবে তারা? কব্জির মোচড়ে ভেলকি দেখানো লেগ স্পিনারের তালিকায় কেউই যে নেই! লেগ স্পিনারদের বরাবরই বেশ পরিকল্পনা মাফিক বল করতে হয়। সেই অনুশীলন হয় জাতীয় ক্রিকেট ম্যাচে। লেগ স্পিনের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করা ঘরোয়া লিগের ক্লাবগুলো কব্জি ঘোরানো বোলারদের গুরুত্ব দেয় না। খেলার সুযোগ না পেলে তারা হাত পাকাবেন কোথায়? একজন লেগ স্পিনার বছরের পর বছর অনুশীলনের মাধ্যমে পরিপক্বতা পায়। অনেক ছোট বয়স থেকেই এই শিল্পের চর্চা করলে সুফল আসে বেশি। আসাদুজ্জামান সাদিদের মতো খুদে ক্রিকেটারদের আরও ভালো বোলার হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা প্রদানে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বিসিবির। শচীন ও ওয়ার্নের শেয়ার করা ভিডিওটি বুঝিয়ে দিয়েছে, মানসম্পন্ন লেগ স্পিনার পেতে হলে তৃণমূল পর্যায় থেকে খুঁজতে হবে। আসাদুজ্জামান সাদিদের মতো আরও অনেকে নিশ্চয়ই আছে যাদের কথা আমরা এখনও হয়তো জানি না।

বিসিবিকে এ নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে হবে। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে শুধুই লেগ স্পিন নিয়ে কাজ করবেন এমন কিছু কোচ নিয়োগ দেওয়া যায়। জাতীয় অ্যাকাডেমির ছায়াতলে স্বনামধন্য কোচের মাধ্যমে অনুশীলন করানো যেতে পারে এই বোলারদের। চোখে পড়ার মতো লেগ স্পিনার পেলে তাকে ঘরোয়া লিগে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে নিতে হবে বোর্ডকেই। লেগ স্পিনারের জন্য বাংলাদেশের হাহাকার ঘুচিয়ে ফেলতে বিসিবিকে আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আমাদের সাবেক ক্রিকেটাররাও পরামর্শ দিতে পারেন। অন্য দেশের ক্রিকেটারদের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সঠিক মানুষের সহায়তা পেলে এই খুদে বালকরা আগামীতে উদ্ভাসিত হয়ে রাঙিয়ে দেবে দেশের ক্রিকেট। 

শুধু টি-টোয়েন্টিই নয়; ক্রিকেটের অন্য ফরম্যাটেও লেগ স্পিনের কার্যকারিতা শেন ওয়ার্ন, অনিল কুম্বলে, মুশতাক আহমেদ, শহিদ আফ্রিদিরা দেখিয়ে গেছেন। তাদের মুগ্ধকর বোলিংয়ে লেগ স্পিন পেয়ে এসেছে শিল্পের মর্যাদা। লেগ স্পিন সত্যিই একটি শিল্প। কিন্তু বাংলাদেশে এই শিল্প কবে প্রাণ পাবে কে জানে! ক্রিকেটের এই সৌন্দর্য বাংলাদেশিদের হাতে দেখতে তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকতে হবে আর কতদিন? এ নিয়ে কেবলই যে দীর্ঘশ্বাস বাড়ে।

 

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

এই আগুনের পেছনে কে?

এই আগুনের পেছনে কে?

বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার

বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার

সাম্প্রদায়িকতা ও মনোজগৎ

সাম্প্রদায়িকতা ও মনোজগৎ

ধর্মীয় উগ্রবাদ ঠেকাতে ফিরতে হবে ৭২-এর সংবিধানে

ধর্মীয় উগ্রবাদ ঠেকাতে ফিরতে হবে ৭২-এর সংবিধানে

বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১৫:৫৮

তুষার আবদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) দুলে উঠেছে। সেই দুলুনি দূরে থেকেও অনুভূত হয়েছে। যে গানের দল সুর তৈরি করেছে, কণ্ঠ ছেড়েছে জোরে, তারা আমার চেনা। টেলিভিশনে তাদের সঙ্গে ঢাকার কাছে এক কাশবনে আড্ডা হয়েছিল। তখন আকাশে ছিল শরতের মেঘ। আড্ডা দিয়েছি মেঘদলের সঙ্গে। গতকাল শুক্রবার সেই মেঘদলই টিএসসি এলাকায় সুরের মূর্ছনা ছড়িয়েছিল। আওয়াজ ছিল প্রতিবাদের। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের। প্রতিবাদের এই ভাষা আমার পছন্দের। আমি বিশ্বাস করি- মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাজিত ও নির্মূল করতে সাংস্কৃতিক অস্ত্রই উপযুক্ত। এই অস্ত্র প্রতিরোধ ও মোকাবিলার শক্তি তাদের নেই।

যে টিএসসিতে গানে গানে শুক্রবার প্রতিবাদ জানানো হলো, সেই টিএসসি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম তীর্থভূমি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ রাষ্ট্রের যেকোনও বিপন্নতা ও দুর্যোগে এখান থেকে নবীন-প্রবীণের সম্মিলনে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। সেই প্রতিরোধ কোনও অপশক্তি কখনও ডিঙাতে পারেনি।

আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চা ও আন্দোলনে জোয়ার প্রবাহমান থাকেনি। রাজধানীতে চিন্তক শ্রেণি, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও কর্মীরা রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত হয়ে আছে। তাদের কাছে একাত্তর ও বাংলাদেশের চেয়ে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান মিটিয়ে নেওয়াটাই যেন জরুরি বিষয় এখন। পদ-পদবি আর তারকা ইমেজের একটা ঘোরের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে সবাই।

সাংস্কৃতিক চর্চার ভাটাকালকে অপচয় করতে চায়নি মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। তারা সমাজ, পরিবার ও রাজনীতিতে চিন্তার মেরুকরণ ঘটিয়ে ফেলে। আমাদের জীবনযাপন, শিক্ষায় ধর্মীয় অন্ধত্ব, কট্টর লু’হাওয়া বইয়ে দিতে শুরু করে, যা সমাজ ও রাজনীতিকে অসহিষ্ণু করে তোলে। আমরা ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের দুই নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের সঙ্গে ২০০১ পরবর্তী বাংলাদেশের মিল খুঁজে পাবো না। এ সময়টায় ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহারে মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির বদলে একটি পরগাছা সংস্কৃতিতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলতে শুরু করি। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো- রাজনীতিবিদরা না হয় ভোট ও ক্ষমতার লোভে পরগাছা তুলে নিলো, কিন্তু দেশের চিন্তক শ্রেণিরাও কেন সেই সুবাসে মোহিত হতে চাইলেন? তাহলে কি আমাদের চিন্তক শ্রেণির কোনও টেকসই বা শক্তিশালী মনন তৈরি হয়নি? পুরোটাই ছিল ভেসে বেড়ানো জলজ উদ্ভিদ?

স্রোতের প্ররোচনায় এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ানো অভ্যাস আমাদের চিন্তক শ্রেণির আগেও ছিল, এখনও আছে। সংশয়ে ডুব দিয়ে তাদের নীরব থাকাটা একাত্তর ও নব্বইতে যেমন দেখেছি, এখনও একই চিত্র। যখন গণজোয়ার ওঠে, সেই গণজোয়ার কোনও স্বর্ণদ্বীপ আবিষ্কার করলে তারা সেই দ্বীপের নকশাকার কিংবা পূর্বাভাস দাতা হয়ে যান চট করেই। আমরাও যেন কোন মন্ত্রে সেই বচন বিশ্বাস করতে শুরু করি। এমন মন্ত্র বসে কতো চিন্তককে যে রাষ্ট্রের বিধাতা করে তুলেছি‍! অবশ্য নিজ গুণে তাদের পতনও হয়েছে।

তাই কোনও চিন্তক বা রাজনীতির বাঁশিতে মোহিত হতে চাই না। বরাবরই কান পেতে রাখি কখন কোন তরুণদল হাঁক দিয়ে বলবে– ‘জাগো বাহে কোনঠে সবাই’। তখন বজ্রমুঠি নিয়ে মিছিলে নেমে পড়তে রাজি যেকোনও বয়সেই। কারণ প্রতিরোধ আর প্রতিবাদের কোনও বয়স নেই। মাতৃভূমির বিরুদ্ধে যেকোনও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধের সব কণ্ঠস্বরের বয়স এক। সমবয়সী। এমন সমবয়সীদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে আবারও জড়ো করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে এই সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ুক আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, রংপুর হয়ে এই জনপদের দোঁয়াশ, এঁটেল, প্রতিটি ধূলিকোনায়। জয়তু বাংলাদেশ। তুমি জাগ্রত জনতার।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

/এসএএস/জেএইচ/

সম্পর্কিত

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

সাম্প্রদায়িকতা ও মনোজগৎ

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ২২:৫২
স্বদেশ রায় আলেকজান্ডারকে তার বাবা ছোটবেলায় যেমন যুদ্ধবিদ্যা শেখার ব্যবস্থা করেছিলেন তেমনই তার মনোজগৎ গড়ে তোলার জন্যে এরিস্টটলের মতো শিক্ষকের কাছেও তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের একটি সভ্যতায় মনোজগৎ গড়ে তোলার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। আর এরিস্টটল কখনোই আলেকজান্ডারের মনোজগৎ কোনও অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে গড়ে তোলেননি। তিনি বাস্তবতা ও প্রকৃতির আচরণ থেকে আলেকজান্ডার যাতে শিক্ষা নিতে পারে সে চেষ্টাই করেছিলেন। উদার এবং অসম্ভবকে জয় করার একটি মনোজগৎ তাঁর ভেতর তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন।

এখন যেমন ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের ভেদবুদ্ধি ও নানান সংকীর্ণতা মানুষের মনোজগৎকে সংকীর্ণ করে; অতীতের ওই সভ্যতাগুলোতেও দেখা যায়, নানান কুসংস্কার সমাজ ও মানুষের মনকে সংকীর্ণ করতো। আর এর বিপরীতেই ছিল উদার চিন্তার একটি যাত্রা। আবার ইতিহাসে এর পরের সময়ে দেখা যায়, ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও ধর্মের একাধিপত্য বা ধর্মের নামে রাষ্ট্র ও সমাজকে বেঁধে ফেলার এক ভয়াবহ যুগ। এর আগে নানান কুসংস্কারে রাষ্ট্র ও সমাজকে যতটা না আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে পেরেছিল, তার থেকে অনেক বেশি আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে ধর্মের একাধিপত্য। বাস্তবে রাজতন্ত্রের বদলে পুরোহিততন্ত্র ও চার্চতন্ত্রই তখন চালু হয়। ধর্মীয় নেতা পেছনে থাকলেও তারাই রাজাকে বা রাষ্ট্র ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। সেই নিয়ন্ত্রণের বাঁধন এতই শক্ত হয় যে ধর্মের তথাকথিত বিধানের বলে রাষ্ট্র নরহত্যার যেমন একক অধিকার পায়, তেমনি নারীকে বেঁধে ফেলা হয় নানান শেকলে। যে নারীর হাত ধরে গৃহসভ্যতা ও কৃষিসভ্যতার জন্ম সেই নারীকে পরাধীনও অসহায় করে সমাজকে একটি অন্ধকার যুগে নিয়ে যাওয়া হয়। যা থেকে আজও  সমাজ বের হয়ে আসতে পারেনি। ধর্ম সাম্প্রদায়িকতার নামে আমরা মাঝে মাঝে পৃথিবীর নানান দেশে ধর্মীয় হামলা, মানুষের ওপর হামলা ও সম্পদ দখলের নগ্নতা দেখি। কিন্তু প্রতিদিন ধর্মের নামে নারী’র ওপরে যে আঘাত এখনও পৃথিবীর নানান রাষ্ট্রে ও সমাজে করা হচ্ছে, তা আমরা সঠিক দেখতে পাই না। কারণ, এটা আমাদের সহজাত হয়ে গেছে। আমরা এই অন্ধকারকে স্বাভাবিক অন্ধকার মনে করি বা বুঝতেই পারি না এটা অন্ধকার। যেমন, যে রাতকানা রোগে ভোগে তার চোখে রাতের আকাশ তারাহীন। কিন্তু সে সেটা বোঝে না।

রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর ধর্মের নামে এই ছোবলকে বাঁচানোর জন্যে পনের শতকে ইউরোপের অনেক বুদ্ধিনায়করা আন্দোলন শুরু করেন। তাদের এই আন্দোলনের ফলে তখন পাশ্চাত্যের দেশগুলো ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে অনেকটা আলাদা করা শুরু করে। কিন্তু শতভাগ তারা এখনও করতে পারেনি। গণতন্ত্রের অন্যতম জন্মভূমি ব্রিটেনে ব্লাসফেমি আইন তুলে দেওয়া হয়েছে ২০০৮ সালে। আর প্রকৃতপক্ষে এটা নর্দান আয়ারল্যান্ড ছাড়া সর্বত্র তাদের কমন ল’ থেকে বাদ যায় ২০২১-এর মার্চে।  তবে শুধু পার্থক্য ছিল আধুনিক যুগে এসে তারা পাকিস্তানের মতো হয়তো কথায় কথায় এই ব্লাসফেমি আইন ব্যবহার করতো না। রাষ্ট্র পরিচালকদের শিক্ষাদীক্ষা কিছুটা হলেও তাদের সংযত করে রেখেছে এ ক্ষেত্রে। তারপরেও ক্যামেরুনের মতো তরুণ নেতাও চার্চ শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনিও বোঝেননি, শিক্ষাকে হতে হয় ইহজাগতিক ও আধুনিক। এই ইহজাগতিক ও আধুনিক শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের দায় ব্যক্তির নিজের। এ দায়ভার যখনই আধুনিক রাষ্ট্র নিজ হাতে তুলে নেয় তখনই বৈপরীত্য দেখা যায়। এবং ক্যামেরুনকে কিন্তু তার ফল ভোগ করতে হয়েছে। তার সমাজ পরোক্ষভাবে উগ্র হয়েছে। যে উগ্রতার কারণে তাকে ব্রেক্সিটে হারতে হয়েছে। ক্যামেরুন ব্রেক্সিটের পক্ষের জয়ে নিশ্চিত ছিলেন বলেই তিনি ব্রেক্সিটের পক্ষে-বিপক্ষে গণভোট দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন না তার সমাজে এখন উগ্রবাদীরা সংখ্যায় বেশি। যেকোনও উগ্রবাদ, তাই সে উগ্র জাতীয়তাবাদ হোক না, সেটাও কিন্তু ভয়াবহ এক সাম্প্রদায়িকতা। পৃথিবীতে এই উগ্র জাতীয়তাবাদের নামেও কম ধ্বংসযজ্ঞ, কম নরহত্যা হয়নি। পার্থক্য শুধু এখানে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা থেকে মানবতাবাদে পৌঁছাতে একটি রাষ্ট্র বা সমাজকে যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে মানবতাবাদে পৌঁছাতে তার থেকে সামান্য কিছু কম পথ পাড়ি দিলে হয়তো চলে।

এ কারণে যেকোনও আধুনিক রাষ্ট্রকে প্রথমেই তার শিক্ষাকে আধুনিক করতে হয়। সেখানে কোনোভাবে ধর্মীয় শিক্ষার যোগ থাকলে চলে না। যে রাষ্ট্র তার শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষা রাখে ওই রাষ্ট্রকে পশ্চাৎপদ রাষ্ট্র হিসেবেই ধরতে হবে। ওই রাষ্ট্রকে আর যাই হোক আধুনিক রাষ্ট্র বলা যাবে না। কারণ, শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে ইহজাগতিক ও আধুনিক বিষয়। এর সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা থেকে শুরু করে অনেক দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু কিছু শিক্ষার ভেতর দিয়ে যে অবৈধ পুঁজি সৃষ্টি বা সম্পদ দখলের একটা তাড়না শুরু হয়েছে, এটাও কিন্তু শিক্ষার অঙ্গ নয়। কারণ, অবৈধ সম্পদ দখল ও দখলের তাড়নাও একটি রাষ্ট্র ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। ধর্মীয় উগ্রতা যেমন মানুষের মানবতা ধ্বংস করে তাকে রাষ্ট্রের ও সমাজের ক্ষতিকর কাজের দিকে ঠেলে দেয়, এই অবৈধ সম্পদ দখলের মানসিকতাও রাষ্ট্র ও সমাজকে সমান ক্ষতি করে। এবং একটা অদ্ভুত যোগাযোগ এখানে দেখা যায়, কোনও সমাজে উগ্র ধর্মীয়বাদ যেমন অবৈধ সম্পদ দখলের দিকে ছুটিয়ে নিয়ে যায় মানুষের মানসিকতাকে বা সেই সুযোগ করে দেয়, উগ্র-জাতীয়তাবাদও একই কাজ করে। ধর্মীয় মৌলবাদে যেমন রাষ্ট্রীয় ও সমাজের সম্পদ দখলের একটা তাড়না আছে, উগ্র জাতীয়তাবাদেও সেই একই বিষয় দেখা যায়। উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদে যেমন মানুষের সহজাত নৈতিকতা নষ্ট করে, অন্যের মানসিকতার ওপর, অন্যের সম্পদের ওপর অবৈধ দখলদারিত্ব সৃষ্টি করার একটা তাড়না দেখা যায়, উগ্র জাতীয়তাবাদেও তেমনই। পার্থক্য শুধু উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের বয়স দুই হাজার বছরের বেশি, তার শেকড় অনেক গভীরে আর উগ্র জাতীয়তাবাদের বয়স কয়েকশ’ বছর ছুঁতে চলেছে, তার শেকড় অতটা গভীরে নয়।

পনের শতকের পর থেকে ধীরে ধীরে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে ধর্মকে অনেকটা দূরে ঠেলে দিতে পেরেছিল পাশ্চাত্যের দেশগুলো। কিন্তু গত একশ’ বছরে সেখানেও উগ্র জাতীয়তাবাদের নামে প্রচ্ছন্নভাবে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে। যেমন, আমেরিকায় ট্রাম্পের বিজয়ের কারণ শুধু ডেমোক্র্যাটদের দুর্বল প্রার্থীই ছিল না, ধর্মীয় ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতাও কাজ করেছিল। যদিও ওবামা বলেছিলেন, তিনি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হলে ট্রাম্প জিততে পারতো না। তবে তারপরেও বাস্তবতা হলো, ট্রাম্প যে ভোট পান ওই ভোটের একটি অংশে কিন্তু এই ধর্ম ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ভোট ছিল। সেখানে সামনে আনা হয়েছিল উগ্র জাতীয়তাবাদকে। এবং সেটা এখনও আমেরিকায় আছে। এমনিভাবে পাশ্চাত্যের অধিকাংশ দেশগুলোর রাজনীতি লক্ষ করলে দেখা যাবে, সেখানে একটা ধর্ম ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ভোট জন্ম নিচ্ছে প্রতিদিন। আর এশিয়া ও আফ্রিকার পশ্চাৎপদ দেশগুলোতে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা অনেক বেশি উগ্রভাবে বাড়ছে।

এই ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতা জন্ম নেয় মানুষের ভেতর যে সহজাত ভালো গুণগুলো অর্থাৎ উদারতা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, পবিত্রতা ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা এগুলো নষ্ট হওয়ার ফলে। মানুষের সমাজের ও চরিত্রের বিবর্তনের ইতিহাস বলে, মানুষ সহজাতভাবে তার এই ভালো গুণগুলো নিয়ে সংঘবদ্ধ হতে শিখেছে। এবং সংঘবদ্ধ মানুষ তাদের এই ভালো গুণগুলো দিয়েই সমাজ থেকে, মানুষের মন থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা ও অন্ধত্বকে পরাজিত করেই এগিয়েছে। আবার পাশাপাশি মানুষের সমাজের চলার পথে দেখা যায়, স্বার্থপর হিপোক্রেটরা তাদের প্রতারণা দিয়ে মানুষের এই সহজাত ভালো গুণগুলো নষ্ট করে চলেছে। মানুষের ভেতর যে সহজাতভাবে ফুলের মধু আহরণের একটা গুণ থাকে, এটা ওই স্বার্থপর হিপোক্রেটরা নষ্ট করে দিচ্ছে। মানুষের ভেতর পশুত্ব জাগাচ্ছে।

মানুষের ভেতর যারা স্বার্থপর হিপোক্রেট তারা এই কাজটি করছে মোটা দাগে দুটো বিষয়কে আশ্রয় করে।

এক. ‘ধর্ম’, দুই, ‘রাজনীতি’। এবং এখানে এই ‘ধর্ম’ ও ‘রাজনীতির’ এক অদ্ভুত মিল দেখা যায়। এই ‘ধর্ম’ ও ‘রাজনীতি’ বর্তমানের এ সময়ে মানুষকে মানুষ না রেখে ভোটারে পরিণত করার বা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার ক্যাডারে পরিণত করার যন্ত্র বানানোর চেষ্টা করছে প্রতি মুহূর্তে। যে কারণে তারা রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের ভেতরকার ভালো গুণগুলো নষ্ট হওয়ার সবকিছুকে উৎসাহিত করছে পৃথিবীর নানান ভূখণ্ডে। তারা সমাজে আধুনিক শিক্ষার বদলে অজ্ঞতাকে, মূঢ়তাকে উৎসাহিত করছে। সমাজে যোগ্যতার অর্জনের বিপরীতে অবৈধ দখলকে উৎসাহিত করছে। রাষ্ট্র ও সমাজে নিয়মতান্ত্রিকতার বদলে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। রাষ্ট্র ও সমাজের জ্ঞান বিস্তারের প্রতিটি অঙ্গকে মূঢ়দের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। এবং সাধারণ মানুষ যাতে রাষ্ট্র ও মূঢ়চিন্তার দাস হয় সেদিকেই তারা রাষ্ট্র ও সমাজকে নিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নেতাদের একটি বড় অংশ আধুনিক মানুষগোষ্ঠী তৈরি হওয়ার বদলে এক ধরনের মানসিক প্রতিবন্দ্বী দাসগোষ্ঠী বা সমাজ সৃষ্টির কাজ করছে। তাদের চেষ্টার উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্র ও সমাজের আধুনিক ও উদার চিন্তার মানুষগোষ্ঠীর বিপরীতে এই দাসগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ানো। যে কারণে সমাজের একটি বড় অংশে উদার চিন্তা ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা প্রবেশের সব পথ তারা বন্ধ করতে সমর্থ হচ্ছে। ধর্ম ও রাজনীতির নানান কৌশলে তারা সমাজের বহুমুখী চিন্তাকে নষ্ট করছে।

কোনও রাষ্ট্রে ও সমাজে যখন এই চিন্তা চেতনায় দাসশ্রেণি গড়ে ওঠা শুরু হয় তখন ওই সমাজের মানুষ শুধু পেছন দিকে হাঁটতে শুরু করে না, সমাজের সব ধরনের সভ্যতা ও শৃঙ্খলাও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। এমন একটি সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা খুবই কঠিন। কারণ, তখন অবচেতনভাবেও অনেক দায়িত্বশীল মানুষের মনোজগতের শুভ গুণগুলো নষ্ট হওয়া শুরু হয়ে যায়। রাষ্ট্র ও সমাজের নানান অঙ্গে এই দাসরাই বসে যায়। তারা সব সময়ই নানানভাবে মূঢ়তাকে সাহায্য করে। রাষ্ট্র ও সমাজকে পেছন দিকে ঠেলতে শুরু করে। তখন অতি সহজে রাষ্ট্র ও সমাজে যেকোনও ধরনের উগ্রবাদীরা সামনে চলে আসতে থাকে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এটা ছোঁয়াচে। কখনোই কোনও নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এ মুহূর্তে গোটা পৃথিবীতে কম-বেশি নানান ধরনের উগ্রতা দেখা যাচ্ছে। আরও ছোট পরিসরে নিয়ে এলে দেখা যাবে, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অধিকাংশ দেশে ধর্মীয় উগ্রতা। দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের ভেতর আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে বেশি ও কম আকারে হলেও ধর্মীয় উগ্রতার ‘লাঠি’ দেখা যাচ্ছে। যা রাষ্ট্র ও সমাজের মানুষকে ধীরে ধীরে ধর্মীয় উগ্রতার দাস বানানোর চেষ্টা করছে। আবার রাজনীতিরও বড় অংশ ওই উগ্রতাকে ব্যবহার করে মানুষকে ‘দাস-ভোটার’ বানানোর চেষ্টা করছে। আর এর কুফলগুলো মাঝে মাঝেই এই দেশগুলোতে দেখা যাচ্ছে। এই দেশগুলোতে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করবে যে রাজনীতি ওই রাজনীতি থেকে উদারনীতি, পবিত্রতা, সহনশীলতা, বহুত্বকে গ্রহণ করার ক্ষমতা বিদায় নিয়ে সেখানে উগ্রতা, মূঢ়তার দাসতন্ত্র স্থান নিচ্ছে ধীরে ধীরে।

আর এ অবস্থার কুফল হয়তো দুই একটা জায়গায় মোটা দাগে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে এর কুফল অনেক গভীরে। এর কুফলে প্রতি মুহূর্তে রাষ্ট্র ও সমাজ অযোগ্য ও মূঢ়দের হাতে চলে যায়। সমাজের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে আধুনিকতার বদলে পশ্চাৎপদ চিন্তাচেতনা। একটা বিরাট অংশ মানুষ ভুলে যায় তার একটি মনোজগৎ আছে। যা তাকে প্রতি মুহূর্তে বিকশিত করতে হয়। এবং এই বিকাশ হবার ভেতর দিয়েই মানব সমাজ ও প্রগতি এগিয়ে চলে। মানুষের মনোজগৎ বিকশিত না হলে কখনোই কোনও রাষ্ট্র ও সমাজের কোনও স্তরেই শৃঙ্খলা আনা যায় না। ধীরে ধীরে ওই রাষ্ট্র ও সমাজের সব অর্জন নষ্ট হতে থাকে। কারণ, মানুষের  আধুনিক শিক্ষা, মানুষের উন্নত মনোজগৎই রাষ্ট্র ও সমাজের সব উন্নয়নকে ধরে রাখে এবং সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। পৃথিবী থেকে ডাইনোসররা হারিয়ে গেছে খাদ্যাভাবে, বিপরীতে মানুষের বহু সভ্যতা, বহু অর্জন নষ্ট হয়েছে মনোজগৎ ধ্বংস হওয়ার ফলে।       

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

ধর্মীয় উগ্রবাদ ঠেকাতে ফিরতে হবে ৭২-এর সংবিধানে

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ১৬:১৮

লীনা পারভীন ‘আফগানিস্তানের শিয়া মসজিদে হামলায় ৪৭ জন মুসলিম নিহত হয়েছে। দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস’– এমন সংবাদ অহরহই আসছে। দু’দিন পর পর এমন হামলা হচ্ছে এবং মুসলমানরা মারা যাচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশে অনেক মানুষ আছেন, যারা সরাসরি কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে ধারণ করেন, ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে অন্য কোনও ধর্মের লোক থাকতে পারবে না। হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর ঘরবাড়ি, মন্দির ভেঙে দিচ্ছে, লুটপাট করছে। এবারের দুর্গাপূজায় যা ঘটে গেলো এরপর বাংলাদেশ আর অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের দাবিকে শক্তভাবে সামনে আনতে পারবে না।

কুমিল্লার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হলো পূজামণ্ডপ ভাঙা, লুটপাট। এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়লো সারাদেশে। চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, রংপুরসহ দেশের অন্যান্য জায়গায় শুরু হলো মন্দির, মণ্ডপ ভাঙা। হামলায় নিহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন।

কেন? এর পেছনের কারণ কি শুধুই ধর্মীয় বিদ্বেষ? তারা কোন ইসলাম ধর্মকে ধারণ করে এ হামলা করলো? ইসলামের কোথায় বলা আছে দুনিয়ার মাটিতে কেবল ইসলাম ধর্মের লোকেরাই থাকতে পারবে?

তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম যে মুসলমানেরা কেবল নিজেদের একটি পৃথিবী চায়। তাহলে আফগানিস্তানে তো হিন্দু নেই, পূজা নেই, মণ্ডপ নেই, সেখানে হামলা হয় কেন? মসজিদ তো মুসলমানদের পবিত্রতম স্থান, যেখানে গিয়ে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা হয়। সেই মসজিদে হামলা করলো কারা? হামলাকারীর পরিচয় তো মুসলিম। এর কী ব্যাখ্যা আছে?

এর ব্যাখ্যা আসলে একটাই। এরা কেউই কোনও ধর্মকে বিশ্বাস করে না। এদের মগজে আছে কেবল হিংসা আর বিদ্বেষ। এরা মানবতা কাকে বলে জানে না। এদের পরিচয় জঙ্গি। জঙ্গিদের কোনও ধর্ম হয় না। এর প্রমাণ আমরা আফগানিস্তানের ঘটনাতেই পাচ্ছি।

তার মানে বাংলাদেশেও যারা সাম্প্রদায়িক হামলা চালাচ্ছে তারা কেউই ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে কিছু করছে না। দেশে যদি একজন হিন্দু বা অন্য ধর্মের লোকও না থাকে তাহলে দেখা যাবে এরা মুসলমানদের ওপর হামলা করছে। তখন ইস্যু আসবে কেবল মুসলমান হলেই হবে না, কে কোন বিশ্বাসের অনুসারী সেই হিসাব। ঠিক আফগানিস্তানে যা ঘটছে।

অর্থাৎ, এখানে পেশিশক্তিই হচ্ছে প্রধান হাতিয়ার। নিজেদের সংখ্যাগুরু ঘোষণা দিয়ে চলবে এসব হামলা।

তাই বলছি, জঙ্গিদের যেমন কোনও ধর্ম নেই, ঠিক তেমন তাদের কোনও নির্দিষ্ট রাষ্ট্রও নেই। রাষ্ট্র নেই, তাই রাষ্ট্রীয় নীতিকেও তারা তোয়াক্কা করে না। এরা একটি রাষ্ট্রে বসবাস করবে কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়মনীতি বা বিশ্বাসকে পরোয়া করে না। এদের কাছে নিজেরটাই সেরা। গোটা পৃথিবীজুড়ে এখন এমন জঙ্গিবাদের জোয়ার চলছে। সেই ধাক্কায় দুলছে বাংলাদেশও।

আমি জানি না আমাদের সরকার, প্রশাসনের কর্তারা কী ভাবছেন? কেন এই জঙ্গিদের রুখে দেওয়া গেলো না। কুমিল্লার ঘটনার পর আরও হামলা হতে পারে এমন ইঙ্গিত কিন্তু ছিলই। আমরা সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছিলাম বিষয়টি। তাহলে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন কেন সচেতন হলো না?

জানা যায়, নোয়াখালীতে হামলার সময় পুলিশকে কাছে পাওয়া যায়নি, স্থানীয় প্রশাসন এগিয়ে আসেনি ঘটনা থামাতে। নির্বিচারে হামলা চালিয়ে চলে গেলো জঙ্গিগুলো। এর দায় কার? রাষ্ট্র কি নেবে এই দায়? নিতে তো হবেই। কারণ, এ ব্যর্থতা যে রাষ্ট্রেরই।

একটি রাষ্ট্র তৈরি হয় সব মানুষের অবদানে। এখানে কে কোন ধর্ম বা জাত, সে নারী না পুরুষ সে বিবেচনা আসে না। রাষ্ট্রের আইন তাই সবার জন্য সমান। সকল সুযোগ-সুবিধা সবার জন্য সমান থাকে। সংবিধান হচ্ছে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি। সেই সংবিধানেই বলা আছে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা। তাহলে সরকার কেন সেই বিধান মানতে পারবে না? সরকার কেন একজন হিন্দুকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না? শপথ নেওয়ার সময় তো সবার দায়িত্ব নেবে এমনটাই কথা ছিল।

প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। তখন এরা কারা যখন বলে বেড়ায়, ধর্ম যার যার, উৎসবও তার তার। কাদের এত বড় সাহস যারা প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানকে উপেক্ষা করে দেশে সন্ত্রাসী হামলা চালায়? প্রশাসনের ভেতরে কারা আছে যারা নিজেদের মুসলিম দাবি করলেও জঙ্গি মানসিকতাকে ধারণ করে? কারা তারা যারা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়?

জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত সফলতার পরিচয় দিয়ে এসেছে। কোথায় সেই সফলতার ফসল? তলে তলে এত জঙ্গি কেমন করে জন্ম নিচ্ছে। কেবল প্রকাশ্যে এলেই আমরা দেখতে পারি কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে জঙ্গি মানসিকতার চাষ হচ্ছে তাকে রুখবে কারা? কেমন করে?

এর সমাধান একটাই। রাষ্ট্রের গা থেকে মুসলমানের তকমা সরিয়ে দেওয়া।

রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনও ধর্ম থাকতেই পারে না। রাষ্ট্র হবে উদার, গণতান্ত্রিক, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার সংরক্ষণ করতে বাধ্য রাষ্ট্র। সংবিধানকে সংশোধন করে অবিলম্বে ৭২-এর সংবিধান প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

লাল তারকার বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউজিসির দায়

লাল তারকার বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউজিসির দায়

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ভালোবাসি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ভালোবাসি

ফেসবুকের পক্ষপাতমূলক আচরণ কেন?

ফেসবুকের পক্ষপাতমূলক আচরণ কেন?

ঝুমন দাসের মুক্তি চাই

ঝুমন দাসের মুক্তি চাই

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

নীলফামারীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতি ১৫ কোটি টাকা

নীলফামারীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতি ১৫ কোটি টাকা

সুদানের প্রধানমন্ত্রী গৃহবন্দি, আটক চার মন্ত্রী

সুদানের প্রধানমন্ত্রী গৃহবন্দি, আটক চার মন্ত্রী

রূপসার শিয়ালীর মন্দিরে হামলা মামলায় ২৩ আসামি জেলে

রূপসার শিয়ালীর মন্দিরে হামলা মামলায় ২৩ আসামি জেলে

সোহেলেই আটকে আছে ই-অরেঞ্জের তদন্ত

সোহেলেই আটকে আছে ই-অরেঞ্জের তদন্ত

নির্মাণে নতুন দিন আনছে কংক্রিট ব্লক

নির্মাণে নতুন দিন আনছে কংক্রিট ব্লক

স্বামীর মৃত্যুর ১৫ মিনিট পর মারা গেলেন স্ত্রী 

স্বামীর মৃত্যুর ১৫ মিনিট পর মারা গেলেন স্ত্রী 

অর্থের চেয়ে প্রীতি-সদিচ্ছার গুরুত্ব বেশি: বঙ্গবন্ধু

অর্থের চেয়ে প্রীতি-সদিচ্ছার গুরুত্ব বেশি: বঙ্গবন্ধু

অবৈধ শোধনাগারে বিস্ফোরণ, নাইজেরিয়ায় নিহত অন্তত ২৫

অবৈধ শোধনাগারে বিস্ফোরণ, নাইজেরিয়ায় নিহত অন্তত ২৫

শেষ হলো আফগান সীমান্তে রুশ নেতৃত্বাধীন মহড়া

শেষ হলো আফগান সীমান্তে রুশ নেতৃত্বাধীন মহড়া

পশ্চিম তীরে নতুন ১৩০০ বাড়ি বানাবে ইসরায়েল

পশ্চিম তীরে নতুন ১৩০০ বাড়ি বানাবে ইসরায়েল

কানাডা উপকূলে ছড়াচ্ছে বিষাক্ত গ্যাস

কানাডা উপকূলে ছড়াচ্ছে বিষাক্ত গ্যাস

১০ জন নিয়ে ড্র করলো পিএসজি

১০ জন নিয়ে ড্র করলো পিএসজি

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune