X
রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ৫ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

সুস্বাস্থ্য ও জাতি গঠনে তামাক নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২১, ১৬:২০

ডা. হাবিবে মিল্লাত
করোনাভাইরাসকে বাংলাদেশ সফলভাবেই মোকাবিলা করেছে। উন্নত অনেক দেশ যেখানে করোনার টিকা পেতে তদবিরে ব্যস্ত, সেখানে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে গণটিকা প্রদান শুরু হয়েছে। এটি এক দারুণ সাফল্য। যদিও দেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের বেশিরভাগই আগে থেকে কোনও না কোনও জটিল রোগে ভুগছিলেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ (এমডিজি) অর্জন করেছে। লক্ষ্য এখন ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ (এসডিজি) অর্জনের। তারই ধারাবাহিকতায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন’ শীর্ষক দক্ষিণ এশীয় স্পিকারস সামিটে, আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

করোনাকালীন সময়ে তামাকের বিষয়টি আরও গুরুতরভাবে সামনে এসেছে। খোদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ধূমপায়ীরা করোনা পরবর্তী জটিলতায় ১৪ শতাংশ বেশি ভোগেন। সংসদ সদস্য হিসেবে, আমরা দীর্ঘদিন তামাকের ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছি। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের সকল নাগরিকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে তামাক নিয়ন্ত্রণের কোনও বিকল্প নেই। আর তা বাস্তবায়নে নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনই, অন্যতম কার্যকর পথ।

তামাক ও তামাকজাত পণ্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সংগ্রাম নতুন নয়। এই সরকার তামাকের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার। ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) স্বাক্ষরের পর, ২০১৩ সালে এই সরকার পুরনো তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে সময়োপযোগী এবং ২০১৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা পাস করে। শুধু তা-ই নয়, ইতোমধ্যে এসডিজি পূরণে এফসিটিসিকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে মূলধারার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গেছে। ফলাফল, ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে তামাকজাত পণ্য ব্যবহারকারীর সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ১৮.৫ শতাংশে। এতসব সাফল্যের মাঝেও, সময়ের সঙ্গে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ এসেছে। তাই আইন সংশোধন প্রয়োজন।

গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭ জানাচ্ছে, বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্যের ব্যবহারকারী সংখ্যা পৌনে ৪ কোটিরও বেশি। ঘরেই পরোক্ষ ধূমপানের শিকার ৪ কোটিরও বেশি মানুষ। ৮১ লাখ মানুষ কর্মক্ষেত্রে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয় এবং আড়াই কোটি মানুষ গণপরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। দেশের প্রায় সোয়া দুই কোটি মানুষ ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য (জর্দা, গুল) ব্যবহার করে, যার মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের চেয়ে ৮.৬% বেশি। তামাক দেশের ৬৭% অসংক্রামক ব্যাধির জন্য দায়ী। বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা, ‘তামাকজনিত ব্যাধি ও অকাল মৃত্যুর কারণে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মুহূর্তে দেশে ৩০ বা তদূর্ধ্ব বয়সী ৭০ লাখের অধিক লোক তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। টোব্যাকো এটলাস ২০২০ অনুযায়ী, দেশে তামাকের কারণে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এরমধ্যে সবার উপরে রয়েছে ক্যানসার ও হৃদরোগ।

আমরা সরকারিভাবে তামাককে ‘অর্থকরী’ ফসল হিসেবে উল্লেখ করছি। অথচ তামাক থেকে সরকার রাজস্ব পান ২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, আর তামাকের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা (জিডিপির ১.৪%)। প্রশ্ন হলো, তামাক নিয়ন্ত্রণে সংশোধিত আইনে আমরা কি চাই? আমরা চাই, নতুন আইনটি এফসিটিসি'র আলোকে সংশোধিত হোক। ছয়টি প্রস্তাবনা রয়েছে।

১. ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান বিলুপ্তসহ সকল পাবলিক প্লেস, কর্মক্ষেত্র ও গণপরিবহনে ধূমপান নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে শতভাগ ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে;

২. তামাকজাত পণ্য বিক্রয়স্থলে দ্রব্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করতে হবে;

৩. তামাক কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচি বা সিএসআর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে;

৪. খুচরা সিগারেট বা বিড়ি বিক্রি বন্ধ করতে হবে;

৫. সি-সিগারেট এবং হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টস (এইচটিপি)-এর মতো ক্রমশ বিস্তার লাভ করা পণ্যসমূহের আমদানি ও বিক্রি নিষিদ্ধ করতে হবে;

৬. সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার বৃদ্ধিসহ তামাকপণ্য মোড়কজাতকরণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।

সময়ের সঙ্গে বর্তমান আইনে কিছু ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। দেশের আইনে ফুটপাতকে পাবলিক প্লেস হিসেবে গণ্য করা হয় না। একই অবস্থা রেস্টুরেন্টের ক্ষেত্রেও। বর্তমান আইনে তামাকের বিজ্ঞাপন প্রচারণা নিষিদ্ধ, প্রদর্শনী নয়। যার সুযোগ নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। সংশোধিত আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিগারেট, বিড়ির খুচরা বিক্রি বন্ধ করা। স্কুলসহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল এলাকায় দৃশ্যমান তামাকজাত পণ্য বিক্রয়ের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে, সিগারেটের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচিত্র সতর্কবার্তা মুখ্য হয়, কোম্পানির নাম গৌণ। নতুন আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে বিষয়টি মনে রাখা জরুরি। তামাক কোম্পানিগুলো সংবেদনশীল উপায়ে ‘করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা’ বা সিএসআর-এর নামে নিজেদের প্রচারণা চালায়।

এ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের অনেক কিছু করার রয়েছে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে, সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে এফসিটিসি বাস্তবায়নের তাগিদ দিতে হবে। নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকাকে তামাকমুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় নাগরিক সমাজকে একত্রিত করতে হবে। সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সংসদ অধিবেশনের বক্তব্যে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের পক্ষে কথা বলতে হবে। ডব্লিউএইচও’র নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যদি বর্তমান আইনের বয়স পাঁচ বছর পার হয়ে যায়, তাহলে আইন সংশোধন করতে হবে। ইতোমধ্যে আমাদের আইন সেই শর্ত পার করেছে। কী ধরনের পলিসি, কৌশল ও নীতিমালা প্রয়োজন সে ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় করতে হবে। প্রত্যেকটি বাজেটে তামাকবিরোধী উদ্যোগ গ্রহণে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। একটি প্রস্তাবিত সংশোধিত খসড়া আইন করা যেতে পারে। তামাক ও তামাকজাত পণ্য ব্যবহারে যেসব গ্রুপগুলো ঝুঁকিপূর্ণ তাদের জন্য আলাদা কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। সর্বশেষ, তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব ও আর্থ-সামাজিক সম্পদ রক্ষায়, স্বাস্থ্য, শিল্প ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

আমরা পরামর্শ দিয়ে থেমে থাকতে চাই না। তামাক আইন সংশোধনের লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। ইতোমধ্যে সরকারি দল ও বিরোধী দলের এমপিদের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফোরাম ফর হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিং’ শীর্ষক সংসদীয় কমিটি গঠিত হয়েছে। ফোরামটি দেশের স্বাস্থ্য বিষয়ক নানান ইস্যুতে সরকারকে নীতিনির্ধারণী ও কৌশলগত সহায়তা দেবে। তামাকের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই ফোরামটি একতাবদ্ধ হতে পেরেছে। খুব দ্রুতই আমরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে তামাক আইন নিয়ন্ত্রণের দাবিতে প্রায় ১৫৩ জন এমপির স্বাক্ষরিত চিঠি হস্তান্তর করবো। আমরা আশাবাদী, তামাকবিরোধী কার্যক্রমে জয়ী হবোই।

লেখক: অধ্যাপক; সংসদ সদস্য; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাশে বিশ্বব্যাংক

করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাশে বিশ্বব্যাংক

আনন্দে আত্মহারা মেসি

আনন্দে আত্মহারা মেসি

কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন জানেন না নিজেই!

কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন জানেন না নিজেই!

এমপি বাদশার শারীরিক অবস্থা নিয়ে গুজব ছড়ানোয় জিডি

এমপি বাদশার শারীরিক অবস্থা নিয়ে গুজব ছড়ানোয় জিডি

সোনারগাঁয়ে সহিংসতা: কাউন্সিলর ফারুক ২ দিনের রিমান্ডে

সোনারগাঁয়ে সহিংসতা: কাউন্সিলর ফারুক ২ দিনের রিমান্ডে

রাষ্ট্রীয় সম্মানে শায়িত হলেন নাট্যজন মহসিন

রাষ্ট্রীয় সম্মানে শায়িত হলেন নাট্যজন মহসিন

মোবাইল থেকে কেটে নেওয়া টাকা কবে ফেরত আসবে?

মোবাইল থেকে কেটে নেওয়া টাকা কবে ফেরত আসবে?

‘রমজানে লকডাউন দিয়ে আলেমদের দমন গ্রহণযোগ্য নয়’

‘রমজানে লকডাউন দিয়ে আলেমদের দমন গ্রহণযোগ্য নয়’

ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো দরকার: অর্থমন্ত্রী

ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানো দরকার: অর্থমন্ত্রী

‘মির্জা আব্বাসকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার’

‘মির্জা আব্বাসকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার’

আবারও দোকান খুলে দেওয়ার দাবি মালিক সমিতির 

আবারও দোকান খুলে দেওয়ার দাবি মালিক সমিতির 

করোনায় আক্রান্তরা দ্রুত মারা যাচ্ছেন: আইইডিসিআর

করোনায় আক্রান্তরা দ্রুত মারা যাচ্ছেন: আইইডিসিআর

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune