X
শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ও তৃতীয় ঢেউয়ের আশংকা

আপডেট : ১৮ জুন ২০২১, ১৬:২৩

মোহাম্মদ রুবায়েত হাসান মে মাসের শুরুর দিকে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ তিন অঙ্কে নেমে এলেও স্বস্তির তেমন কোনও  অবকাশ ছিল না। কারণ, প্রতিবেশী দেশ ভারতে ভয়াবহ সংক্রমণের প্রভাব যে বাংলাদেশেও পড়বে তা একরকম অবধারিতই ছিল। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ইন্ডিয়ান ভ্যারিয়েন্ট B.1.617.2 বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্তও হয় সে সময়, কিন্তু এর বিস্তৃতি কতটুকু এ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনও ধারণা ছিল না। সম্প্রতি আইইডিসিআর এবং আইদেশির যৌথ উদ্যোগে করা জেনোমিক সার্ভেইল্যান্স-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, করোনাভাইরাস আক্রান্ত শতকরা আশিভাগ লোকের মধ্যেই পাওয়া গেছে এই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। যদিও খুব অল্প সংখক নমুনার ওপর জরিপ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে , এ থেকে বাংলাদেশে এ সময়ে সার্কুলেটিং ভ্যারিয়েন্টগুলো সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। আবার যেসব মানুষের মধ্যে এই ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে তাদের অনেকেরই দেশের বাইরে ভ্রমণ করার বা প্রবাস ফেরত কারও সংস্পর্শে আসার কোনও ইতিহাস নেই। এর মানে হলো কমিউনিটিতে এরমধ্যে বেশ অনেকটাই ছড়িয়েছে এই ভ্যারিয়েন্ট। পাশাপাশি, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে উদ্বেগজনক হারে সংক্রমণ বৃদ্ধি ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের কারণে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মহামারির তৃতীয় ঢেউয়ের সুস্পষ্ট আভাস দিচ্ছে।

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট হলো গত কয়েক মাসে, ভারতে উদ্ভূত ভ্যারিয়েন্টগুলোর একটি। অন্য ভ্যারিয়েন্টগুলোর তুলনায় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বেশি সংক্রামক এবং এই ভ্যারিয়েন্টই ভারতের বিশালাকৃতির দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য বেশি দায়ী বলে ধরা হয়। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ইতোমধ্যে ভারতের বাইরেও প্রায় ৬২টি দেশে ছড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যে এ সময় তুলনামূলক বিচারে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণের হারই সবচেয়ে বেশি, যার কারণে দৈনিক মোট আক্রান্তের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কম হলেও, এই ভ্যারিয়েন্টের কারণে নতুন ঢেউয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের সঙ্গে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের পার্থক্য কী? পার্থক্য হলো স্পাইক প্রোটিনে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট এ N501Y বা E484K মিউটেশন নেই যেসব মিউটেশনের কারণে সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট এবং ব্রাজিলিয়ান ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। তাহলে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কেমন হতে পারে, এনিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে অন্যান্য মিউটেশনের পাশাপাশি রয়েছে L452R এবং P681R মিউটেশন।  L452R ইতোপূর্বে ডেনমার্কের মিংক ভ্যারিয়েন্ট এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যারিয়েন্টে পাওয়া গেছে। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখা তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হয়েছে এ’ দুটো মিউটেশনের কারণে ভাইরাসের সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডির কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে । সম্প্রতি ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ফাইজার ভ্যাকসিনের এক ডোজ বা দুই ডোজ নেওয়া ২৫০ জন মানুষের সেরাম দিয়ে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টসহ অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। যে পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয় তাকে বলে সেরাম নিউট্রালাইজেশন টেস্ট।  অর্থাৎ সেরামে থাকা অ্যান্টিবডি ল্যাবরেটরিতে ভাইরাসকে কতটুকু প্রশমিত করতে পারে তা জানতে এই পরীক্ষা। ল্যানসেটে প্রকাশিত এই গবেষণায় বেশিরভাগ সেরাম স্যাম্পলেই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডির কার্যকারিতা পাওয়া গেছে, কিন্তু নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডির টাইটার অর্থাৎ অ্যান্টিবডির পরিমাণ, ইউকে ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় কিছুটা কম। কিন্তু সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডির টাইটার প্রায় সমপরিমাণের। আবার এটাও দেখা গেছে, এক ডোজ নেওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে বা বেশি বয়স্ক ব্যক্তির ক্ষেত্রে নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডির পরিমাণ বেশ কম।

কিন্তু এসব তথ্য থেকে কি প্রমাণিত হয় যে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন কাজ করছে না? মোটেই না। কারণ, নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডি টেস্ট ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দেয় মাত্র।  কারণ, আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা শুধু অ্যান্টিবডির ওপরই নির্ভর করে না। আরও রয়েছে, টি সেল ইমিউনিটিসহ অনেক প্রতিরোধী ব্যবস্থা। ভাইরাস একজন মানুষের মধ্যে কতটুকু রোগ সৃষ্টি করতে পারবে তা এসব কিছুর ওপরই নির্ভর করে, শুধু অ্যান্টিবডি নয়। এ কারণেই ল্যাবরেটরির পরীক্ষার পাশাপাশি যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এপিডেমিওলজিক্যাল সার্ভে এবং তার সঙ্গে ল্যাবরেটরি ডাটা বা ক্লিনিক্যাল ডাটার যোগসূত্র স্থাপন।

এপিডেমিওলজিক্যাল তথ্য বিচারে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট হয়তো আগের ইউকে ভ্যারিয়েন্ট বা সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় বেশি সংক্রমণশালী, যার কারণে এই ভ্যারিয়েন্ট আগের ভ্যারিয়েন্টগুলোকে ক্রমশই সরিয়ে দিয়ে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করছে। কিন্তু ভ্যাকসিন-এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো তথ্য প্রমাণ এখনও তেমন শক্তিশালী নয়। বস্তুত, ল্যানসেটের পেপারের গবেষকরাও এপিডেমিওলজিক্যাল ডাটার সঙ্গে যোগসূত্র ঘটিয়ে এ উপসংহারই টেনেছেন যে, যারা ফাইজারের দুই ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েছেন তাদের বেশিরভাগই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে সুরক্ষা পাবেন। এর আগে ইউকে এবং সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট নিয়েও অনেক আশঙ্কা করা হয়েছিল।  কিন্তু ইসরায়েল ও কাতার থেকে প্রকাশিত দু’দুটো বড় আকারের গবেষণা প্রমাণ করেছে যে ফাইজারের ভ্যাকসিন দুটো ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর। তাই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে সঠিক চিত্র পাওয়ার জন্য শুধু মাত্র ল্যাবরেটরি থেকে পাওয়া প্রাথমিক ডাটার ওপর নির্ভর না করে, পপুলেশন লেভেল-এ গবেষণা বাড়ানো উচিত।

কাজেই এ মুহূর্তে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে আশঙ্কা না করে যত বেশি মানুষকে যত দ্রুত ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসা যায় তার জোর চেষ্টা চালানো প্রয়োজন। নতুন ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাব সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পেতে, জোর দিতে হবে জেনোমিক সার্ভিলেন্সে। ভাইরাসকে শতভাগ  আটকানোর মতো ক্ষমতা পৃথিবীর কোনও দেশেরই নেই। কিন্তু যা আছে তা হলো উন্নত সার্ভেইলেন্স সিস্টেম। যার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে এসব ভ্যারিয়েন্টকে শনাক্ত করে রোগীদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা যায়। ইউনিভার্সাল মাস্কিং, সামাজিক দূরত্ব ও ভ্যাকসিন নিশ্চিত করে এসব ভ্যারিয়েন্টকে বাড়তে না দেওয়া। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট এখন ইন্ডিয়ার বাইরে  অনেক দেশেই শনাক্ত হয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত সেসব দেশ এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। কিন্তু ভারত পারেনি বা পারছে না। কাজেই পার্থক্যটা খুব পরিষ্কার। ভ্যাকসিন কাভারেজ বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা দুদিক দিয়েই দেশটি অনেক পিছিয়ে আছে।

বাংলাদেশে সম্ভাব্য তৃতীয় ঢেউ ঠেকিয়ে রাখার প্রয়োজনে এ মুহূর্তে স্বাস্থবিধি কঠোর আরোপ করা প্রয়োজন। নামকাওয়াস্তে জেনারেল লকডাউন না করে যেসব জেলায় উদ্বেগজনক হরে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে ও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হচ্ছে, সেসব জায়গায় টার্গেটেড লকডাউন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যেসব কর্মকাণ্ডে ঝুঁকি বেশি আর যেসব কর্মকাণ্ডে মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল নয়  সেসব কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তার পাশাপাশি ভ্যাকসিন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটানো অতি জরুরি। একজন ভ্যাকসিন পাওয়া মানুষ আর না পাওয়া মানুষের মধ্যে পার্থক্য হলো আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় যেসব সৈন্যসামন্ত আছে সেসবের দক্ষতা ও ট্রেনিংয়ের পার্থক্য। ভ্যাকসিন পাওয়া মানুষটি সংক্রমিত হলেও আমাদের ট্রেনিং পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসকে আগেভাগেই ঠেকিয়ে দেবে। ভাইরাসকে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে বাধা দেবে। এভাবে অন্যের মাঝে রোগ ছড়াতেও বাধা সৃষ্টি করবে। কাজেই জনসংখ্যার মধ্যে যত বেশি মানুষ ভ্যাকসিন পাবে ভাইরাসটির চারপাশে একটা ব্যারিয়ার তৈরি হবে! এই হলো হার্ড ইমিউনিটি! কিছুটা ভ্যাকসিনের বদৌলতে আর কিছুটা ন্যাচারাল সংক্রমণের মাধ্যমে তৈরি হবে এই হার্ড ইমিউনিটির। সে পর্যন্ত চাই আরও ধৈর্য আরও পরীক্ষা!

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ওয়েল কর্নেল মেডিক্যাল কলেজ, দোহা, কাতার।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

‘তুমি জানো আমি কে?’

‘তুমি জানো আমি কে?’

ইভ্যালি, সেজান জুস ফ্যাক্টরি আর ‘রেফারি’দের কথা

ইভ্যালি, সেজান জুস ফ্যাক্টরি আর ‘রেফারি’দের কথা

ঘটনা সত্য এবং ক্ষতি সামান্য নয়

ঘটনা সত্য এবং ক্ষতি সামান্য নয়

হেপাটাইটিস: অপেক্ষার সময় নেই

হেপাটাইটিস: অপেক্ষার সময় নেই

‘তুমি জানো আমি কে?’

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২১, ১৬:৫০

প্রভাষ আমিন সময়টা ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে। আমি তখন নতুন ঢাকায় এসেছি। টুকটাক লেখালেখির চেষ্টা করি। থাকি যাত্রাবাড়ির এক মেসে। সেখানে একদিন এক ভদ্রলোক অকারণে আমার সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া বাধাতে এলেন। তার আচরণে আমি অবাক। একদম অচেনা একজন মানুষের সঙ্গে কেউ এমন আচরণ করতে পারেন, এটা আমার ভাবনাতেই ছিল না। আমি খুব ঠান্ডামাথায় তাকে বললাম, ভাই আমি আপনাকে চিনি না।

আপনিও তো আমাকে চেনেন না। এমন করছেন কেন? তিনি এটাকে নিলেন হুমকি হিসেবে। তিনি আরও রেগে গেলেন, আপনাকে চিনতে হবে কেন, আপনি কে? আমি অনেক কষ্টে তাকে বোঝাতে পারলাম– আমি মোটেই কেউ নই। আমাকে চেনারও কোনও কারণ নেই। কিন্তু অচেনা কোনও মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করা উচিত নয়, এমন আচরণ করা যায় না। তিনি পরে তার ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। তবে তাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

আমাদের অনেকেই নিজেকে চেনানোর চেষ্টা করি, হুমকি দেই। ইদানীং টিভিতে একটি চায়ের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়। এয়ারপোর্টে এক এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে এক ভদ্রলোক তাড়াহুড়ো করে গেলেন। কাউন্টারের ভদ্র মহিলাকে তিনি হুমকি দেন, ‘তুমি জানো আমি কে?’ প্রাথমিকভাবে ভদ্র মহিলার মন খারাপ হলেও সেই চা খেয়ে তার সাহস অনেক বেড়ে যায়। তিনি লাউড স্পিকারে ঘোষণা দেন, এই ভদ্রলোক জানেন না উনি কে। কেউ যদি তার পরিচয় জানেন, কাউন্টারে যোগাযোগ করুন। আমাদের চারপাশে এখন এই ভদ্রলোকের মতো নিজেকে না জানা লোকের ভিড়। আমরা নিজেকেই চিনি না, তাই নানান পরিচয়ে চেনানোর আকুল চেষ্টা। সত্য-মিথ্যা জানি না, ফেসবুকে একটা সাইনবোর্ড দেখেছি, ‘এই জমির মালিক বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ শহীদুল ইসলামের শ্যালক অমুকের।’ আহারে নিজের জমি রক্ষার কী আকুল চেষ্টা। জমি প্রসঙ্গে একটা পুরনো কৌতুক মনে পড়লো। কৌতুক হলেও ঘটনা সত্য। তখন স্বৈরাচার এরশাদের আমল। তখন জমিতে বেশিরভাগ সাইনবোর্ড দেখা যেত সেনা কর্মকর্তাদের। আমরা তখন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আড্ডা মারি। কেন্দ্রের চার কুতুব ছিলেন আহমেদ মাযহার, লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম ও আসলাম সানী। আমরা তাদের পেছনে ঘুর ঘুর করি। বকাঝকা খাই। আমাদের সবারই নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা। তো একদিন সানী ভাই খুব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ভাবছি সাভারে একটা জমি কিনবো। সেখানে সাইনবোর্ডে লিখবো, ‘এই জমির মালিক লে. ক. আসলাম সানী টিএসসি।’ আমরা তো অবাক সানী ভাই জমি কেনার টাকা পাবেন কোথায়। তারচেয়ে বড় কথা, তিনি সাইনবোর্ডে মিথ্যা কথা লিখবেন। আমাদের বিস্ময়ের জবাবে সানী ভাই বললেন, এখানে কোনও মিথ্যা নেই, লে. ক. মানে হলো লেখক, কবি; আর টিএসসি মানে সারাদিন টিএসসিতে আড্ডা মারে। তবে পাবলিক মনে করবে লেফটেন্যান্ট কর্নেল; আর টিএসসিকে মনে করবে পিএসসির চেয়ে বড় কোনও ডিগ্রি। সানী ভাইয়ের কৌতুকে আমরা সবাই খুব মজা পেলাম। তবে তিন দশকেও এই পরিস্থিতি বদলায়নি, বরং আরও বেড়েছে।

আমরা সবাই ক্ষমতাশালী হতে চাই। ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে চাই। অথচ চাইলে ভালোবেসে এরচেয়ে কম কষ্টে মানুষের হৃদয় জয় করা সম্ভব। ভালোবাসার কষ্ট আমরা করতে চাই না। ক্ষমতার দাপটে সব লন্ডভন্ড করে ফেলতে চাই। ভিকারুননিসা কলেজের প্রিন্সিপালের একটি টেলিফোন কথোপকথন ফাঁস হয়েছে। তাতে তিনি প্রতিপক্ষকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করছেন। নিজে একসময় পিস্তল নিয়ে ঘুরতেন, বালিশের নিচে পিস্তল রেখে ঘুমাতেন, সেই রেফারেন্স দিচ্ছেন। ছাত্রলীগ, যুগলীগ, যুব মহিলা লীগের হুমকি দিয়েছেন। নিজেকে ক্ষমতাশালী প্রমাণের চেষ্টা করছেন। কী অবস্থায় তিনি এমন কথা বলছেন, তাকে কারা উসকানি দিচ্ছেন; সে প্রসঙ্গ ভিন্ন। তিনি একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা, দেশের সবচেয়ে নামি কলেজের প্রিন্সিপাল; অন্যায়ের মোকাবিলা করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু নিজের ক্ষমতার ওপর আস্থা রাখতে না পেরে তিনি রাজনীতি টেনে এনেছেন। অবশ্য বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাই সব ক্ষমতার উৎস। তাই তো সবাই আওয়ামী লীগ হতে চায়। গত এক যুগে বাংলাদেশে প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ বনে গেছেন। বিপদের দিনে যাদের টিকিটিও দেখা যায়নি, তারাই এখন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। চকচকে মুজিব কোট পরে তারা ঘুরে বেড়ান। গোপালগঞ্জের আশপাশের জেলায় বাড়ি হলেও সবাই বলেন বাড়ি গোপালগঞ্জে। অন্য জেলার মানুষ গোপালগঞ্জে গিয়ে একটু জমি কিনে স্থায়ী ঠিকানা গোপালগঞ্জ বানিয়ে ফেলেছেন, এমন উদাহরণও কম নয়। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে এরা নিজেদের বগুড়া বা ফেনীর মানুষ বানানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।

কোনও অপকর্ম করে কেউ ধরা পড়লেই দেখা যায়, তিনি আওয়ামী লীগের কোনও উপ-কমিটির সদস্য বা কোনও আওয়ামী দোকানের নেতা। ক্ষমতাবান লোকজনের সঙ্গে তারও ছবি আছে। রিজেন্ট কেলেঙ্কারির  সাহেদও আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উপ-কমিটির সদস্য ছিলেন। ক্ষমতাবানদের সঙ্গে তার ছবির কোনও অন্ত নেই। ‘আওয়ামী চাকরিজীবী লীগে’র সভাপতির পরিচয় দিয়ে বিপাকে পড়া হেলেনা জাহাঙ্গীরও আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য ছিলেন। বিপাকে পড়ে তিনিও সরকারের মন্ত্রী আর আওয়ামী লীগ নেতাদের কথা বলছেন।

সবার হাতে হাতে ক্যামেরা থাকায় ক্ষমতা দেখানোর আরেক পন্থা হয়েছে ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সেলফি। কোনও সামাজিক বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে গিয়ে এক ফাঁকে হয়তো ওবায়দুল কাদের বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা অন্য কোনও মন্ত্রী-এমপির সঙ্গে একটা সেলফি তুলে নিয়েছেন। ব্যস সেটা ফেসবুকে ব্যাপক প্রচার, বাসার ড্রইং রুমে বড় করে বাঁধাই করে রাখাই হলো ক্ষমতা দেখানোর আরেক কৌশল। নেতাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। একজন রাজনৈতিক নেতা কেউ ছবি তুলতে চাইলে মুখের ওপর না করতে পারেন না।

ক্ষমতা দেখানোর প্রবণতা সর্বত্র। কোনও কাজ বাগাতে, টেন্ডার পেতে, সুবিধা পেতে তিনি কাকে কাকে চেনেন তার ফিরিস্তি দিতে থাকেন। গাড়িতে ‘সাংবাদিক, ডাক্তার, পুলিশ, র‌্যাব, উকিল’ নানা সাইনবোর্ড লেখা থাকে। সবাই এই পরিচয়ে রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশকে ক্ষমতা দেখাতে চান। কয়েক দিন আগে লকডাউনের সময় পুলিশ এক ডাক্তারকে আটকালে তিনি এক মন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। ট্রাফিক পুলিশও এসবে অভ্যস্ত। একাধিকবার আমার গাড়িকে নানা কারণে আটকে মামলা দেওয়া হয়েছে, জরিমানা করা হয়েছে। আমি দ্রুত তা পরিশোধ করেছি। পরে পরিচয় জানতে পেরে তিনি বলেন, আগে বলবেন না আপনি সাংবাদিক। আমি তাকে বলি, যেটা অপরাধ সেটা সবার জন্যই অপরাধ। সাংবাদিকদের জন্য তো আলাদা আইন নেই। অনেকে এসে আমাকে বলেন, অমুককে একটু ফোন করে দেন। এই হলো নম্বর। আমি বলি, ভাই আমি তো তাকে চিনি না। কীভাবে ফোন করবো। তিনি বলেন, চিনতে হবে  না। ফোন করে আপনার পরিচয় দিলেই হবে। আমি তাকে বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়ে বলি, এটা সম্ভব নয়। তিনি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে ফিরে যান। একজন অপরিচিত মানুষকে ফোন করে নিজের পরিচয় দিয়ে কীভাবে কোনও তদবির করা যায়, আমার মাথায়ই ঢোকে না। কিন্তু নিশ্চয়ই এমনটি ঘটে। নইলে তিনি সেটা বলবেন কেন।

শুরুতে যে টিভি বিজ্ঞাপনের সংলাপের কথা বলা হয়েছে, ‘তুমি জানো আমি কে’, এটি আসলে ভদ্রতা করে বানানো। বাস্তবে সবাই মনে মনে বলে, ‘তুই চিনস আমি কে’। যার সত্যি সত্যি দেওয়ার মতো পরিচয় আছে, তিনি কখনও বলেন না, তুমি চেন আমি কে। তার হয়ে অনেক মানুষ পরিচয় বলে দেবে। সূর্যের চেয়ে বালি বেশি গরম হয়। তাই যাদের দেওয়ার মতো পরিচয় নেই, তারাই বেশি হম্বিতম্বি করে। মানুষকে চেনানোর চেষ্টা না করে, আমরা যদি নিজেই আগে নিজেকে চেষ্টা করি, তাহলেই বরং লাভ বেশি, মর্যাদা বেশি। আমরা যেন এমন কর্ম করি, যাতে সবাই বলে, ওই দেখো অমুক যায়; তাহলেই মাথা উঁচু করে থাকা যায়, মর্যাদার সঙ্গে বাঁচা যায়।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আহা জীবন, আহা কলেজ জীবন!

আহা জীবন, আহা কলেজ জীবন!

লকডাউন থামলেও মৃত্যু থামেনি

লকডাউন থামলেও মৃত্যু থামেনি

তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্ক !

তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্ক !

হলি আর্টিজান: জঙ্গিবাদের উত্থান-পতন

হলি আর্টিজান: জঙ্গিবাদের উত্থান-পতন

ইভ্যালি, সেজান জুস ফ্যাক্টরি আর ‘রেফারি’দের কথা

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২১, ১৬:২৩

ডা. জাহেদ উর রহমান ২০১৫ সালে বিশ্ববিখ্যাত জার্মান গাড়ি নির্মাতা ফোক্স ওয়াগনের এক ভয়ংকর জালিয়াতি প্রকাশিত হয়, যা ‘ডিজেলগেট’ বা ‘ইমিশনগেট’ কেলেঙ্কারি হিসেবে পরিচিত পায়। কোম্পানিটি তাদের তৈরি ডিজেলচালিত গাড়িগুলোর পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নাইট্রিক অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড কমিয়ে দেখানোর জন্য জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। তারা তাদের গাড়িতে এমন একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে, যেটি শুধু পরীক্ষার সময় গ্রহণযোগ্য মাত্রায় ওই দুটি গ্যাসের নিঃসরণ দেখায়। বাস্তবে যখন রাস্তায় গাড়িগুলো চলে তখন এই গ্যাসগুলোর নিঃসরণ বহুগুণ বেশি হয়। বিশ্বের অতি বিখ্যাত কোম্পানিটির এই জালিয়াতি নিয়ে আবারও আসবো কলামের শেষ অংশে।

ইভ্যালি নামের ই-কমার্স সাইটটি সাম্প্রতিক সময়ে তুমুল আলোচনার বিষয় হয়েছে। শেষ খবরে দেখা যায় দেশের একটি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠানটিতে বেশ বড় বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত কী হবে সেটা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক সংকটের সুরাহা হয়েছে। এখন এই কোম্পানিটি কীভাবে ব্যবসা করবে জানি না, কিন্তু তার আগের ব্যবসার ধরনে নিশ্চিতভাবেই সমস্যা ছিল।

আমরা এই আলোচনায় আলোচিত বিনিয়োগটির আগের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলি। ইভ্যালির  মালিক চাইতেই পারেন ব্যবসায়িক রীতি-নীতি, রাষ্ট্রীয় আইন না মেনে, এমনকি লুটপাট করে হলেও টাকা বানাতে। এই কোম্পানিটিকে দেখে গজিয়ে ওঠা আলেশামার্ট-সহ অন্যান্য কোম্পানিগুলোর মালিকও সেটা চাইতে পারেন। তারা চাইতে পারেন যেকোনও মূল্যে তাদের প্রফিটকে ‘ম্যাক্সিমাইজ’ করতে।

‘ম্যাক্সিমাইজিং প্রফিট’ বা ‘মুনাফার সর্বোচ্চকরণ’ বাজার অর্থনীতিতে ব্যবসায় খুব আলোচিত একটি কথা। প্রতিটি ব্যবসায়ীর মূল প্রবণতা থাকে তার মুনাফাকে যত বেশি সম্ভব বাড়ানো। যেহেতু এখানে সর্বোচ্চকরণ শব্দটি আছে তাতে এটা বোঝা যায় এর কোনও সীমা নেই। এক টাকা বিনিয়োগে কেউ যদি ১০০ টাকা মুনাফাও করে তবু সেটাকে আরও বাড়ানোর চেষ্টা করবে। এই বাড়ানোর জন্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো করতে পারে যাচ্ছেতাই।

কিছু দিন আগেই বহু মানুষ পুড়ে আক্ষরিক অর্থেই অঙ্গার হয়েছিল সেজান জুস ফ্যাক্টরিতে ঘটা অগ্নিকাণ্ডে। দেখা গেছে সেই ভবনটি অগ্নিকাণ্ড এবং অন্যান্য জরুরি অবস্থার ঝুঁকি মোকাবিলার মতো ন্যূনতম পদক্ষেপও নেয়নি। এমনকি সেই কোম্পানিতে ছিল অনেক শিশু শ্রমিকও। কোম্পানিটির মালিক চাইতে পারেন নিয়ম-নীতি, আইন পালন না করে সেই খাতে ব্যয় অনেক কমিয়ে এবং অনেক কম ব্যয়ে শিশুশ্রমিক রেখে তার ‘প্রফিট ম্যাক্সিমাইজ’ করতে।

ইভ্যালি এবং তার অনুকরণে প্রতিষ্ঠিত আলেশামার্টসহ আরও বেশ কিছু ই-কমার্স সাইট যা করছিল তাতে শুরু থেকেই খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছিল এই কোম্পানিগুলো আসলে কী করতে যাচ্ছে। মূল দামের দুই-তৃতীয়াংশ অর্ধেক কিংবা তারও কম দামে মানুষ যখন নানা মূল্যবান পণ্য পেতে শুরু করলো তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই অনেকেই এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়লো। সাম্প্রতিক অতীতে যুবক, ইউনিপে টু ইউ, ডেসটিনির মতো প্রতিষ্ঠানের কাণ্ড দেখার পরও মানুষ আবার এই কোম্পানিগুলোর ফাঁদে পা দিলো।

সামাজিক মাধ্যমে দেখেছেন অনেকেই ‘লোভী’ মানুষদের ভীষণ গালমন্দ করছেন। সাম্প্রতিক অতীতের উদাহরণগুলো দিয়ে করা এই গালমন্দকে আপাতদৃষ্টিতে যৌক্তিকও মনে হয়। কিন্তু আমরা অনেকেই তলিয়ে দেখি না আলোচিত এই ই-কমার্স সাইটগুলো আদৌ এমন ব্যবসা করতে পারে কিনা। বিশেষ করে ইভ্যালি সারাদেশে যে পরিমাণ বিজ্ঞাপন দিয়ে এই ব্যবসায় নেমেছে, মাসের পর মাস চালিয়ে গেছে, তাতে এটা মনে করার কোনও কারণ নেই এই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক এবং রেগুলেটররা এদের সম্পর্কে জানতেন না। এরা কেউ ‘জিনের বাদশা’ পরিচয় দিয়ে মানুষকে ফোন করে প্রতারণা করে টাকা নেয়নি।

ধরে নেওয়া যাক আলোচিত এই ই-কমার্স সাইটগুলো ইভ্যালির চেয়ারম্যানের ভাষ্য মতো তাদের ব্যবসা শুরুর জন্য বেশ কিছু দিন এরকম অফার করেছে। ধরে নেওয়া যাক এই খাতে তারা কয়েকশ’ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারপর তারা ক্রমান্বয়ে ভর্তুকি কমিয়ে একটা সাধারণ ই-কমার্স সাইটে পরিণত হবে। এবং এটাও মনে করে নেওয়া যাক ক্রেতাদের পণ্য প্রাপ্তিতে কিংবা পণ্য না পেলে টাকা ফেরত পাওয়াতে কোনও রকম সমস্যা হচ্ছে না। মজার ব্যাপার, এই ইউটোপিয়ান পরিস্থিতিতেও এটা একেবারেই বেআইনি, এটা কোনোভাবেই চলতে দেওয়ার কথা ছিল না।

পশ্চিমের অ্যান্টি-ট্রাস্ট ল'-এর আদলে বাংলাদেশেও আইন আছে- প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২। আইনটি নিয়ে বিস্তারিত আলাপের জায়গা এই কলাম না। তবে আইনের নামটি নিশ্চয়ই স্পষ্ট করে এই আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। এই আইনে একটি প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন করার কথা এবং সেটা বাংলাদেশে আছে। আইনে সেই কমিশনের কার্যাবলি যা হবে তাতে প্রথম কথাটি হচ্ছে এটা -

৮.১(ক) বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তারকারী অনুশীলনসমূহকে নির্মূল করা, প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করা ও বজায় রাখা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করা।

হঠাৎ মানুষের টাকা মেরে না দিলেও শত শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে বাজারে এমন একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা ইভ্যালি এবং অন্য ই-কমার্স সাইটগুলো কোনোভাবেই তৈরি করতে পারে না। এমন অফার শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কথা ছিল প্রতিযোগিতা কমিশন সেটিকে বন্ধ করবে। কিন্তু না, এটা চললো এবং চলতেই থাকলো।

এরপর আরও কয়েক মাস আগেই যখন জানা যাচ্ছিল ইভ্যালি মানুষের পণ্য দিতে পারছে না এবং পণ্য না পাওয়া মানুষের টাকাও ফেরত দিচ্ছে না, তখন তো এই কোম্পানির চরিত্র সম্পর্কে দ্বিধার আর কিছুই ছিল না। কিন্তু তখনও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সেই ব্যবসা আরও চলতে দিয়ে বহু মানুষের ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হতে দেওয়া হয়েছে; যত দিন গেছে তত বেশি মানুষ এই জালে জড়িয়েছে।

সেজান জুস ফ্যাক্টরিতে নানারকম অনিয়ম ছিল। দুর্ঘটনার পর ফায়ার ব্রিগেডের পক্ষ থেকে অন-রেকর্ড বলা হয়েছে সেই ভবনে এমনকি একটি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রও ছিল না। সব কারখানায় সব আইন ঠিকঠাক মতো মেনে চলছে কিনা সেটা তদারক করার জন্য পরিদর্শক আছেন। বছর দশেক আগে এদের সংখ্যা খুব কম থাকলেও রানা প্লাজার ঘটনার পর এদের সংখ্যা এখন পর্যাপ্ত। দুর্ভাগ্য আমাদের, রানা প্লাজার ঘটনার পর আমদানিকারকদের চাপে গার্মেন্ট কারখানাগুলোকে কমপ্লায়েন্স রক্ষা করার জন্য ঠিক হতে হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য সেক্টরের বেশিরভাগ কারখানা প্রয়োজনীয় মানের আশপাশেও নেই। এমন দেশে আমরা বসবাস করি যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই নাগরিকদের স্বার্থ দেখা হয় না, নাগরিকদের স্বার্থ যতটুকু নিশ্চিত হয়, ততটুকু হয় বিদেশের চাপে।

শুরুর প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। ফোক্স ওয়াগন-এর মতো বিখ্যাত কোম্পানিও তাদের গাড়িতে জালিয়াতি করছিল। মজার ব্যাপার, এই কোম্পানি তাদের গাড়িগুলো যখন আমেরিকায় পাঠায় তখন ‘ইউনাইটেড স্টেইটস এনভায়রমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সি’ শেষ পর্যন্ত এই জালিয়াতি ধরতে সক্ষম হয়। এতে নিশ্চিত হয় আমেরিকার নাগরিকদের স্বার্থ। এরপর নেওয়া হয়েছে নানা রকম শাস্তিমূলক পদক্ষেপ।

ফোক্স ওয়াগন কেলেঙ্কারি প্রমাণ করে উন্নত পুঁজিতান্ত্রিক পশ্চিমা দেশগুলোতেও এমনকি অতি স্বনামধন্য ব্র্যান্ডগুলোও তাদের প্রোফিট ম্যাক্সিমাইজেশনের জন্য অন্যায় পদক্ষেপ এমনকি জালিয়াতির আশ্রয় নিতে পারে। কিন্তু সেসব দেশে রেগুলেটররা থাকে, যারা জনগণ আর এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে থেকে রেফারির দায়িত্ব পালন করে। তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে উভয়ের মধ্যে যাতে বেআইনি অন্যায় কিছু না ঘটে। সেই রেফারিকে কদাচিৎ কিনে ফেলার ঘটনা সেখানে দেখা যায় না, তা নয়। কিন্তু সেই প্রবণতা খুব কম, আর অন্যায় যোগসাজশের জন্য দায়ী রেগুলেটরদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।

ইভ্যালি বা সেজান জুসের মালিক কিংবা এই দেশের আর সব ব্যবসায়ী ন্যায়ানুগ ব্যবসা করলে সেটা খুব ভালো। কিন্তু একটা রাষ্ট্রের সরকার থাকতে হয় এটা ধরে নিয়ে যে বহু মানুষ বেআইনি কাজ করবে, নিয়ম ভাঙবে। বহু ‘হায় হায় কোম্পানি’ জনগণকে পথে বসিয়ে নিজে ফুলে-ফেঁপে উঠতে চাইবে। জনগণের টাকায় পরিচালিত সরকারের তখনকার কাজ হবে রেফারির ভূমিকা নেমে ‘ফাউল’ বন্ধ করে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। সত্যিকার অর্থে সরকার দরকার এজন্যই; সব মানুষ নিজ থেকে ভালো আচরণ করলে, অন্যের প্রতি অন্যায় না করলে তো সরকারেরই দরকার নেই।

এই রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে, সরকার চালানোর ব্যয় সংস্থান করার একজন করদাতা হিসেবে আমার ক্ষোভ-উষ্মার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সরকারের দায়িত্বশীল মানুষ। এই ক্ষেত্রে রেফারির ভূমিকা পালন করার কথা ছিল। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের স্বার্থ দেখার জন্য। সেই অনেক রেফারি যখন ব্যবসায়ীদের টাকার কাছে বিক্রি হয়ে আপামর জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন সেই মানুষদের শাস্তি হওয়া উচিত ব্যবসার মালিকদের চাইতে বেশি।

এই দেশে একের পর এক ভয়ংকর শিল্প দুর্ঘটনা হয়েছে, রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে, মানুষ সর্বস্ব খুইয়েছে শেয়ার বাজারে কিংবা ভুঁইফোড় ‘হায় হায় কোম্পানি’র হাতে। একটি ঘটনার ক্ষেত্রেও আমরা কি দেখেছি দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থার কারও উল্লেখযোগ্য শাস্তি হয়েছে?

মূল অপরাধীদের আইনের আওতার বাইরে রেখে আর সব পদক্ষেপ আইওয়াশের বেশি কিছু হবে না। আমাদের হয়তো অপেক্ষা করতে হবে কোনও দিন বিদেশি কোনও চাপের...।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনা মোকাবিলায় আমলাই যথেষ্ট, বিশেষজ্ঞ কমিটি কেন?

করোনা মোকাবিলায় আমলাই যথেষ্ট, বিশেষজ্ঞ কমিটি কেন?

সরকার কি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ‘বলির পাঁঠা’ বানাবে?

সরকার কি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ‘বলির পাঁঠা’ বানাবে?

মোটরসাইকেল কিংবা ‘চলমান কফিন’

মোটরসাইকেল কিংবা ‘চলমান কফিন’

পরীমণি ‘ভাগ্যবান’, নাসির-অমি নয়

পরীমণি ‘ভাগ্যবান’, নাসির-অমি নয়

ঘটনা সত্য এবং ক্ষতি সামান্য নয়

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৬:৩০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা আমাদের গ্রামীণ সমাজের মোড়ল আর ইউটিউবের ওয়াজকারীদের নিয়ে অনেক কথা আছে। তাদের অধিকাংশই আধুনিক শিক্ষা থেকে অনেক দূরে রয়েছেন। তারা নানা অবৈজ্ঞানিক কুসংস্কার চর্চা করেন। তাদের শিক্ষিত করে তুলতে না পারলে কুসংস্কারের কবল থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন, এমন সব বুলি আমরা প্রায়ই উচ্চারণ করি।

গ্রামীণ মোড়ল সমাজ অশিক্ষিত, ওয়াজকারীদের দুরভিসন্ধি আছে। কিন্তু যারা নাটক লিখে, নাটকে অভিনয় করে, নাটক পরিচালনা করে এবং যারা প্রচার করে তারা তো শিক্ষিত, তারা আধুনিক। কিন্তু তারাও যখন নাটকের মাধ্যমে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন– প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নেয় বাবা-মায়ের ‘পাপ কর্মের ফলে’, তখন তাদের শিক্ষা নিয়ে যেমন প্রশ্ন ওঠে, প্রশ্ন ওঠে পুরো সমাজের নৈতিক অবস্থান নিয়ে।

ঈদের অনুষ্ঠানমালায় এই নাটকটি একটি চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে, পরবর্তীতে ইউটিউবে আপলোড হয়েছে এবং সমালোচনার মুখে এটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু ‘ঘটনা সত্য’ নাটকের নাট্যকার, পরিচালক, প্রযোজক, শিল্পী এবং কলাকুশলীদের পক্ষ থেকে যে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে তাতে এদের মনমানসিকতার স্তর আরও ভালোভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

তারা বলছেন, এটি অসাবধানতাবশত ঘটেছে। তাহলে ধরে নিই আমাদের নাট্যজগতের লোকজন নাটক লিখেন, প্রচার করেন নাটকে অভিনয় করে অসাবধানে? দায়িত্বশীল জায়গা থেকে সংশ্লিষ্টরা যে অন্যায় বার্তা সমাজকে দিয়েছেন এর জন্য শুধু দুঃখ প্রকাশই যথেষ্ট? অভিনয় শিল্পীসংঘ জানিয়েছে, নাটকটির আপত্তিকর সংলাপের বিষয়ে জানতেন না এর প্রধান দুই শিল্পী আফরান নিশো ও মেহজাবীন চৌধুরী। আশ্চর্য হতে হয় বৈকি!  

টেলিভিশনে নাটক মানুষ দেখে না, তাই টিভি নাটকে প্রচারের পরপরই সেটিকে ইউটিউবে তুলে ধরার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আবার কিছু নাটক বা টেলিফিল্ম বা সিরিজ শুধু ইউটিউবেই প্রচারিত হয়। এমন তড়িঘড়ি ব্যবস্থাপনায় নাটকে কোন বার্তা কীভাবে যাচ্ছে সেটা দেখার ফুরসত কোথায়? মাথার ভেতর থাকে শুধু ‘ভিউ’ কত হলো বা হবে সে চিন্তা। ভিউ যত বেশি আয় তত বেশি। তাই কী বার্তা যায়, কী বক্তব্য থাকে সে নিয়ে ভাবনার সময়ই তো নেই আসলে। মনোজগতে এক নতুন উপনিবেশের নাম – ডিজিটাল ভিউ – অর্থাৎ মানুষকে গোগ্রাসে গেলাতে হবে এবং সেটা করতে পারলেই টাকা আর টাকা।

আমরা নাটকের মানুষদের একসময় যতটা সংবেদনশীল দেখেছি সেই সময় গত হয়েছে। বেশ অনেক দিন হয় কমেডি নাটকের নামে চলছে ভাঁড়ামি আর অশ্লীলতা। ইউটিউবে পুরনো নাটকগুলো দেখি আর ইদানীংকার কিছু দেখি। মনে হবে যন্ত্রণা দেখছি। এসবের অনেকগুলোকে নাটক বলা যায় কিনা সেটা নিয়ে দ্বিধায় পড়তে হয়। টিভি নাটকে একসময় মান ছিল, কারণ সেগুলো প্রিভিউ হয়ে প্রচার হতো। অবাধ ডিজিটাল ভুবনে সেসবের কোনও বালাই নেই। কিন্তু একটা চ্যানেল কী করে এই নাটকটি প্রচার করলো, কোথায় তার প্রিভিউ সিস্টেম?  

ইউটিউব একটি স্বাধীন জায়গা, এখানে অশ্লীলতাকে, ভাঁড়ামিকে পুঁজি করে ‘বেশি ভিউয়ের’ নামে একটি প্রজন্মের চিন্তাভাবনা, রুচিকে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। এই নাটক প্রমাণ করলো শুধু অশ্লীলতা নয়, এখন শুরু হয়েছে কুসংস্কার প্রচার, অবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রচার, পশ্চাৎপদতা প্রচার। এ ছাড়া আঞ্চলিক ভাষার নামে যা প্রচারিত হয় তার অনেকগুলোও চরম মানহানিকর সেই ভাষার মর্যাদার বিবেচনায়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ৩৭-এর ৪ ধারা বলছে, ‘কোন ব্যক্তি পাঠ্যপুস্তকসহ যেকোনও প্রকাশনা এবং গণমাধ্যমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে নেতিবাচক, ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর ধারণা প্রদান বা নেতিবাচক শব্দের ব্যবহার বা ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যঙ্গ করিলে উহা এই আইনের অধীন অপরাধ হইবে এবং তিনি উক্ত অপরাধের জন্য অনধিক তিন বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’  

এবং আরও বেশি অবাক হওয়ার কথা এই যে, নাটকের পক্ষ-বিপক্ষ সংস্কৃতি জগতের লোকজন সব লেখায়, বলায় - বলে চলেছেন ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু’ যা আমাদের আইন পরিপন্থী। কাউকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বলার অধিকার আইন কাউকে দেয়নি। বলা হচ্ছে, বলতে হবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শিশুর বেলায় প্রতিবন্ধী শিশু এবং তারা স্বাভাবিক আমাদের মতোই।  

এই নাটক নিঃসন্দেহে প্রতিবন্ধিতা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের পিতা-মাতাকে ব্যঙ্গ করেছে। দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা খুব কম নয়। এটা ঠিক যে, উপযুক্ত অবকাঠামোর অভাবে প্রতিবন্ধীরা এখনও শাসক বা বিরোধী কোনও দলের কাছে ভোট রাজনীতির অঙ্গ হয়ে উঠতে পারেননি। ভোট ব্যাংক হিসেবে আকর্ষক নন বলে তারা অবহেলিত। ভোট রাজনীতির অঙ্গ হয়ে উঠতে না পারা রাজনৈতিক দলের অবহেলার কারণ, এমন কথা তর্কের খাতিরে মেনে নিলেও, রাজনৈতিক সমাজের বাইরে যে নাগরিক সমাজ, বিশেষ করে সংস্কৃতি জগতের মানুষ, তারা এতটা নেতিবাচক মানসিকতা প্রকাশ করতে পারেন? এর কারণটা অনুসন্ধান করাটা জরুরি।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, কোথায় আমরা প্রতিবন্ধীদের ক্ষমতায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিকরণে সাম্য বা সমতার নিশ্চয়তা বিধানের প্রচেষ্টা নেবো, তা নয়, উল্টো তাদের নিয়ে ব্যঙ্গ করছি।

অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কারকে যারা ফিরিয়ে আনতে চায় তাদের চিনে নিতে হবে। মানুষের মধ্যে থেকে অন্ধবিশ্বাস দূর করতে ভূমিকা রাখে নাটক, চলচ্চিত্র, গান। এটা আমাদের সারা জীবনের লড়াই। এ লড়াই এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। যারা শুদ্ধ সংস্কৃতির চর্চা করেন তারা ভাববেন। কিন্তু লড়াইটা আসলে বৃহত্তর সমাজের।  

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনার উৎসব

করোনার উৎসব

আগুন লাগাই স্বাভাবিক

আগুন লাগাই স্বাভাবিক

মহামারি ছড়াচ্ছে দ্রুত অথচ প্রচেষ্টার গতি কম

মহামারি ছড়াচ্ছে দ্রুত অথচ প্রচেষ্টার গতি কম

তাপস-খোকন দ্বন্দ্ব কেন?

তাপস-খোকন দ্বন্দ্ব কেন?

হেপাটাইটিস: অপেক্ষার সময় নেই

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৩:৫৭

ডা. এ এইচ এম রওশন ‘হেপাটাইটিস চিকিৎসায় আর বিলম্ব নয়। করোনার সন্ধিক্ষণেও প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একজন করে মানুষ হেপাটাইটিস জটিলতায় মারা যাচ্ছেন।’ হেপাটাইটিস বা লিভারের-ইনফেকশন অনেক কারণেই হয়ে থাকে। স্বল্পকালীন হেপাটাইটিস (যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হেপাটাইটিস-এ, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, হেপাটাইটিস-ডি, বা হেপাটাইটিস-ই দিয়ে হয়) সাধারণত কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই ভালো হয়ে যায় কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদী বা ক্রনিক হেপাটাইটিস (যা সাধারণত হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি দিয়ে হয়) থেকে লিভারের সিরোসিস ও ক্যানসার নামক দুটি মারাত্মক অবস্থায় হতে পারে।

ক্রনিক হেপাটাইটিস এই দুটি ভাইরাস ছাড়াও ফ্যাটি লিভার, উইলসনস-ডিজিজ সহ আরও কিছু কারণে হতে পারে। সিরোসিস, লিভারের ক্রনিক হেপাটাইটিসের অপরিবর্তনীয় চূড়ান্ত অবস্থা। সারা পৃথিবীতে ২০১০ সালে ১০ লাখের বেশি মানুষ লিভার সিরোসিসে মৃত্যুবরণ করছে যা সময়ের সাথে বাড়ছে। অন্যদিকে লিভারের ক্যানসার সাধারণত সিরোসিসের পরে হয়, তবে সরাসরি হেপাটাইটিস থেকেও হতে পারে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী পৃথিবীর সকল মৃত্যুর মধ্যে কারণ হিসেবে লিভার ক্যানসারের অবস্থান তৃতীয়। ২০১৭ সালে সারা পৃথিবীতে ৯,৫০,০০০ নতুন মানুষ লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে এবং একই সময়ে ৮০০,০০০ মানুষ এই রোগে মারা গেছে যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং এই সংখ্যা ১৯৯০ সাল থেকে দ্বিগুণ হয়েছে। লিভারের এই রোগসমূহের প্রধানতম কারণ হলো হেপাটাইটিস-‘বি’, বা ‘সি’ ভাইরাস সংক্রমিত হেপাটাইটিস।

বাংলাদেশেও এই রোগ এবং সংক্রমণ কম নয়। ২০১৮ সালের ওয়ার্ল্ড হেলথ প্রোফাইল অনুযায়ী বাংলাদেশে লিভার রোগে মৃত্যু বরণ করেছে মোট ২৩,১৪৫ জন যা মোট মৃত্যুর শতকরা ২.৯৮ ভাগ। অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, এ দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে ৫.৪% এর শরীরে হেপাটাইটিস-‘বি’ এবং ০.২-১% এর শরীরে হেপাটাইটিস-‘সি’ ভাইরাস আছে। এ দেশে হেপাটাইটিস-‘বি’, লিভারের সিরোসিস ও ক্যানসার রোগের প্রধান কারণ (যথাক্রমে ৬০% ও ৬৫%)। হেপাটাইটিস-‘সি’ ও বাংলাদেশ লিভার সিরোসিস (৩০%) ও লিভার ক্যানসারের (১৭%) অন্যতম কারণ।

এ ভাইরাস দুটি সাধারণত ভাইরাস বহনকারী বা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, রক্তরস অথবা অন্য যে কোনও ধরনের শারীরিক রসের মাধ্যমে একজনের শরীর থেকে অন্যজনে ছড়ায়। এছাড়া অপারেশনে ব্যবহৃত সকল প্রকার যন্ত্রপাতি, ইনজেকশনের সিরিঞ্জ, যৌন মিলনে, বিশেষ করে সমকামিতায় এবং একই ক্ষুর বা ব্লেড ব্যবহার করা, সেলুনের মাধ্যমেও এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। গর্ভবতী মায়ের শরীরে হেপাটাইটিস-‘বি’ ভাইরাস থাকলে প্রসবকালীন সময়ে সন্তানের শরীরে সংক্রমণ হতে পারে।

নিরাময় ও চিকিৎসা: স্বল্পকালীন হেপাটাইটিস সাধারণত লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসায় ভালো হয়ে যায়। তবে, হেপাটাইটিস ‘এ’- এর কার্যকরী টিকা আছে যার দুটি ডোজ দিয়ে ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস প্রতিরোধ করতে রক্ত বা রক্তের যে কোনও উপাদান সংবহনের পূর্বে তাতে ভাইরাস আছে কিনা পরীক্ষা করে নিতে হবে। সব রকমের অপারেশন সহ রোগ নির্ণায়ক ও চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত সকল যন্ত্রপাতি ব্যবহারের আগে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। ইঞ্জেকশনের জন্য একবার ব্যবহার করা হয় এমন সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে হবে এবং নিরাপদ যৌন আচরণ করতে এবং অবশ্যই সমকামিতা পরিহার করতে হবে এবং যতটা সম্ভব অনিরাপদ সেলুন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। এসব ব্যবস্থা অবলম্বন করে হেপাটাইটিস ভাইরাসের সংক্রমণ কমানো সম্ভব।

যেহেতু দুটি ভাইরাসই সংক্রমিত হওয়ার পর লিভারের অপরিবর্তনীয় অবস্থা তথা লিভার সিরোসিস বা ক্যানসার হতে অনেক সময় লাগে, তাই কোনোরকম লক্ষণ না থাকলেও যে কেউ শরীরে হেপাটাইটিস-বি এর উপস্থিতি অগ্রিম পরীক্ষা করে শনাক্ত হলে চিকিৎসা নিয়ে ভাইরাসের মারাত্মক পরিণতি থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারে। অপর দিকে হেপাটাইটিস-সি পাওয়া গেলে অবশ্যই চিকিৎসা নিতে হবে। কারণ, হেপাটাইটিস-সি নিরাময়ে বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধ শতকরা ৯৫ থেকে ৯৯ ভাগ কার্যকরী।

হেপাটাইটিস-বি প্রতিরোধে কার্যকরী টিকা আছে, যার তিনটি ডোজ সঠিক ভাবে নিয়ে এই ভাইরাস সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। এই টিকা জন্মের সময় থেকে যে কোনও বয়সেই নেওয়া যায়। তবে নেওয়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে শরীরে কখনও হেপাটাইটিস-বি সংক্রমিত হয় নাই।

এমনিভাবে যে কোনও ব্যক্তি শারীরিক কোনও লক্ষণ না থাকলেও রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এই ভাইরাস দুটির উপস্থিতি জেনে চিকিৎসা অথবা টিকা নিয়ে এই ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট হেপাটাইটিস রোগ এবং তা থেকে উৎপন্ন লিভারের সিরোসিস বা ক্যানসার হওয়া থেকে পরিত্রাণ পেতে পারে।

আর সন্তান জন্মের সময়ে এই ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিহত করতে প্রত্যেক গর্ভবতী মহিলার রক্তে এই ভাইরাস আছে কিনা পরীক্ষা করতে হবে। হেপাটাইটিস পাওয়া গেলে অবস্থা বিশেষে চিকিৎসা দিয়ে এবং না পাওয়া গেলে অন্তস্বত্তা মহিলাকে নির্ধারিত সময়ে দুটি টিকা দিয়ে এই ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা কমানো যায়। মনে রাখতে হবে, এসব ক্ষেত্রে প্রসবকালীন সময়ে সাধারণ জীবাণুমুক্তকরণ ছাড়াও কিছু অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে যেন মায়ের রক্ত বাচ্চার শরীরে না যায়। আর মা হেপাটাইটিস-বি পজেটিভ হলে জন্মের সময়েই নবজাতককে হেপাটাইটিস-বি টিকার প্রথম ডোজ এবং একই দিনে অন্য হাত বা পায়ের মাংস পেশীতে হেপাটাইটিস-বি এর অ্যান্টিবডি ইনজেকশন দিয়ে প্রসবকালীন সংক্রমণ কমানো যায়।

তাই আসুন ২০২১ সালের ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসে’ আমরা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে হেপাটাইটিস-‘বি’ এবং ‘সি’, এর অবস্থা জানি।

হেপাটাইটিস-‘বি’ না থাকলে টিকা নেই। হেপাটাইটিস-‘বি’ বা ‘সি’, যে কোনোটি পাওয়া গেলে যথাযথ চিকিৎসা নেই। ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করি। গর্ভবতী মায়ের হেপাটাইটিস পরীক্ষা করি এবং সংক্রমণ প্রতিহত করণের সব ব্যবস্থা নেই। সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে হেপাটাইটিস নিরাময়ে সম্পৃক্ত করি।

লেখক: অধ্যাপক, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল হেপাটোবিলিয়ারি অ্যান্ড প্যানক্রিয়াটিক ডিসঅর্ডারস (জিএইচপিডি) বিভাগ, বারডেম, ঢাকা।

/এসএএস/

সম্পর্কিত

‘তুমি জানো আমি কে?’

‘তুমি জানো আমি কে?’

ইভ্যালি, সেজান জুস ফ্যাক্টরি আর ‘রেফারি’দের কথা

ইভ্যালি, সেজান জুস ফ্যাক্টরি আর ‘রেফারি’দের কথা

ঘটনা সত্য এবং ক্ষতি সামান্য নয়

ঘটনা সত্য এবং ক্ষতি সামান্য নয়

‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’

‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’

‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ১৮:৫৪
রুমিন ফারহানা এতদিন গর্বের সঙ্গে বলে এসেছি, আমি হলিক্রস স্কুল, ভিকারুননিসা নূন কলেজের ছাত্রী। এই দুই প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক অনাদিকাল থেকেই অম্লমধুর। বোর্ড পরীক্ষার রেজাল্ট, এক্সট্রা কারিক্যুলার অ্যাকটিভিটিজ, বিশেষ করে বিতর্কসহ সব ক্ষেত্রে এই দুই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের মধ্যে চলে তীব্র প্রতিযোগিতা। তাই হলিক্রস স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে একই কলেজে তিন মাস ক্লাস করার পর যখন ঘোষণা দিলাম আমি কলেজ বদলাবো তখন স্বভাবতই প্রচণ্ড অবাক হয়েছিলেন বাবা-মা। আমার মা তখন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের প্রথম নারী মহাপরিচালক। বাংলাদেশের সব মাধ্যমিক স্কুল এবং কলেজ মায়ের সরাসরি অধীনস্থ ছিল। ভিকারুননিসাও তার ব্যতিক্রম নয়।
 
আমার জেদের কারণে বাধ্য হয়ে আম্মা ফোন দেন ভিকারুননিসার তৎকালীন অধ্যক্ষ হামিদা আলীকে। হামিদা আলী আপাকে শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয় করতো না, এমন কেউ ছিল না। আম্মা তার সরাসরি বস হওয়া সত্ত্বেও বিনীতভাবে আপা বলে দেন, ভর্তির সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে, এখন আর সময় নেই, যদি না কোনও ছাত্রী কলেজ পরিবর্তন করে। আমার ভাগ্য সুপ্রসন্নই বলতে হবে, তার মাস খানেকের মাথায় আম্মা আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি যদি চাই কলেজ বদলাতে পারি। হামিদা আলী জানিয়েছেন সিট ফাঁকা হওয়ায় এখন আমাকে তিনি নিতে পারবেন।

পাঠক আশা করি একটা বিষয় লক্ষ করেছেন, আর সব কলেজের মতোই ভিকারুননিসা কলেজও ছিল আমার মায়ের সরাসরি অধীনস্থ। হামিদা আপা খুব ভালো জানতেন এসএসসিতে আমার অতি ভালো ফলাফল সম্পর্কে। তিনি জানতেন আমি আমার মায়ের একমাত্র সন্তান। তারপরও তিনি তার দায়িত্ব পালন করে আমার মায়ের অনুরোধকে নাকচ করে দিয়েছিলেন। আমার মা-ও ন্যূনতম কোনও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেননি। সিট খালি হয়েছে, তারপর আমি ভর্তি হতে পেরেছি। আজকের দিনে ভাবা যায় এই কথা?

হলিক্রস আর ভিকারুননিসার পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। হলিক্রস মিশনারি প্রতিষ্ঠান, ছাত্রী সংখ্যা সীমিত, নিয়ম-কানুন অতিমাত্রায় কড়া, শুধু পড়াশোনা না, একজন মানুষের জীবন গঠনে যা যা প্রয়োজন তার সবকিছুই হলিক্রস শিখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। অন্তত তখন পর্যন্ত তা-ই ছিল, এখন কী অবস্থা জানি না। সেই তুলনায় ভিকারুননিসায় ছাত্রী সংখ্যা অনেক বেশি, সবকিছুতেই হলিক্রসের তুলনায় একটা ঢিলেঢালা ভাব। একটা কথা জোর দিয়ে বলতে পারি, ১০ বছরে হলিক্রস আমাকে যেমন ঋণী করেছে, দেড় বছরের কলেজ জীবনে ভিকারুননিসা তার চেয়ে কম ঋণী করেনি। আমার জীবন গড়ে দিয়েছে এই দু’টি প্রতিষ্ঠান।

আজকে যখন ফেসবুকে ভিকারুননিসার অধ্যক্ষের অডিও ভাইরাল হলো, তখন তার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, বাক্য, বাচনভঙ্গি আমাকে তীব্রভাবে আঘাত করেছে। কী নোংরা, কী ভীষণ নোংরা পুরো কথোপকথন। একটি জাতীয় দৈনিক তাদের কথোপকথনটির পুরোটা প্রকাশ করেছে। এই কথোপকথন এতটাই অশ্লীল যে পত্রিকাটিকে পুরো রিপোর্টে অসংখ্য ‘ডট’-এর ব্যবহার করতে হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক ছাত্রী হিসেবে অনেকের চাইতে আঘাত আমাকে একটু বেশিই করেছে। আমার সময়ের অধ্যক্ষ হামিদা আলী, যিনি সারা দেশের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার ও সম্মানের ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তার সঙ্গে বর্তমান অধ্যক্ষের তুলনা করলে গোটা বাংলাদেশের অবক্ষয়ের একটা চিত্র স্পষ্ট হয়ে যায়।  

কথোপকথনটিতে এটা স্পষ্ট তার বিরুদ্ধে কিছু মানুষ অভিযোগ করেছেন এবং সেটা তদন্তের জন্য কমিটি তৈরির চেষ্টা হয়েছে। কলামের আলোচনার খাতিরে ধরে নিলাম তার বিরুদ্ধে অন্যায় অভিযোগ করা হয়েছে। তো সেই সমস্যা সমাধান তিনি যেভাবে সমাধান করতে চেয়েছেন, সেটা দেখিয়ে দেয় ক্ষমতার দম্ভ এই দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কীভাবে প্রবেশ করেছে।
 
ওনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের উত্তর ওনার পিস্তল, যার দ্বারা কেউ তার পেছনে লাগলে তাকে তিনি কেবল প্রতিষ্ঠান না, দেশছাড়া করবেন এবং তার গোষ্ঠী উদ্ধার করবেন। তিনি আরও বলেন, ‘আর কোনও... বাচ্চা তদন্ত কমিটি করলে আমি কিন্তু দা দিয়ে কোপাবো তারে সোজা কথা’; ‘আমার ... আছে। আমার বাহিনী আছে। আমার ছাত্রলীগ আছে, যুবলীগ আছে, আমার যুব মহিলা লীগ আছে। কিন্তু কিচ্ছু লাগবে না। কাপড় খুইলা রাস্তার মধ্যে পিটাব’; ‘আমি কিন্তু একদম, আমি কিন্তু গুলি করা মানুষ। রিভলবার নিয়া ব্যাগের মধ্যে হাঁটা মানুষ। আমার পিস্তল বালিশের নিচে থাকতো। সারা রাত পিস্তল আমার বালিশের নিচে থাকত।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি কোনও চিন্তা করি না। কারণ, আমি নিজেই শক্তিশালী। কোনও... কথায় আমি চলি না। কোনও... বাচ্চার কথায় আমি চলি না। আমি নিজেই কিন্তু শক্তিশালী। দলটার আমি প্রেসিডেন্ট ছিলাম। মনে রাইখেন এই দলটা এখন সরকারে। যতদিন এই দলটা আছে ততদিন আমার পাওয়ার আছে। আমি কিন্তু ... বাচ্চাদের লেংটা করে রাস্তার মইধ্যে পিটাইতে পারবো। আমার লাগবে না, আমার দলের মেয়েদের ডাকলে দলের ছেলেও লাগবো না। মেয়েরাই ওর চুল-দাড়ি ছিঁইড়া প্যান্ট খুলে নামাইয়া দিবে’।

ওনার এই কথোপকথনটি অনেক বিষয় সামনে নিয়ে আসে।

১। যেকোনও নিয়োগে এখন অত্যাবশ্যকীয় যোগ্যতা ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়। শুধু দলীয় পরিচয় থাকলেই হবে না, তাকে ক্যাডার পালার যোগ্যতা এবং মানসিকতা থাকতে হবে। নিকট অতীতে ভিসিদের ক্ষেত্রেও আমরা তা-ই দেখেছি।

২। এই সরকার দীর্ঘকাল তার কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন চালানোর অবশ্যম্ভাবী ফল ফলেছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রতিটি স্তরে তৈরি হয়েছে ভীষণ রকম অসহনশীলতা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধান চরম কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছেন।      

৩। কোনও পদধারীর বিরুদ্ধে কারও নিয়মতান্ত্রিক কোনও অভিযোগ করা এবং সেটার তদন্ত চাইবার অধিকার নেই সেই প্রতিষ্ঠানের কারও। একটা জবাবদিহিহীন সরকারের মানসিকতা ‘চুইয়ে পড়ে’ নীতিতে  ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি স্তরে।

৪। সরকার তার ক্ষমতার স্বার্থে ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রমাগত দুর্বল করেছে। কিন্তু আমরা এটা দেখলাম ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার সঙ্গে কোনও সরাসরি যোগসূত্র নেই এমন প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার ভেঙে ফেলছে।

৫. ভিকারুননিসার ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। গত কয়েক বছরে সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নগ্ন দলীয়করণের মাধ্যমে ভেঙে ফেলার যে মহোৎসব চলছে, এটা তারই ধারাবাহিকতা মাত্র।  

৬. কথোপকথনের একপর্যায় তিনি বলছিলেন ‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’। আবার হুমকি দিচ্ছিলেন আগের রূপে ফিরে যাওয়ার। এই ক্লাসের বাইরে কি আর একজনও আওয়ামী-ভক্ত পাওয়া যায়নি যিনি যোগ্য? নাকি এই ক্লাসের হওয়াটাই একমাত্র যোগ্যতা? কথায় উঠে এসেছে উনি শিক্ষামন্ত্রীর ‘প্রিয় পাত্রী’। এই তাহলে তাদের প্রিয় হওয়ার মাপকাঠি!

৭. উনি বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার, ওনার চাকরি করার কথা কোনও সরকারি কলেজে। ওনাকে ভিকারুননিসায় দেওয়া হলো কেন? বাণিজ্যের সুযোগ ভালো?

আমি রাজনীতিতে আসি আমার বাবার মৃত্যুর পরে। উনি চেয়েছিলেন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করি। ওনার মতের বিরুদ্ধে যখন আইন পেশায় গেলাম, ওনার প্রত্যাশা ছিল আমি যেন অন্তত বিচারপতি হই। সেই সবকিছুর মুখে ছাই দিয়ে আজকে রাজনীতিকে জীবনের মূল লক্ষ্য করেছি দেখলে উনি কী ভাবতেন কে জানে। উনি যখন রাজনীতি করেছেন তখনও রাজনীতিতে এমন মাফিয়াতন্ত্র কায়েম হয়নি। সৎ, যোগ্য, মেধাবী বহু মানুষ তখনও রাজনীতিতে ছিলেন। মনে প্রশ্ন জাগে, আজ একজন কলেজের অধ্যক্ষের মুখে ‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’ উক্তি শুনলে তিনি আমার রাজনীতি করাটাকে কীভাবে দেখতেন?

সামনের সময়টা ‘আই হেইট পলিটিক্স’ প্রজন্মের। একটা প্রজন্ম জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে এই আবহে। রাজনীতির স্খলন শুরু হয়েছে তারও বেশ আগেই, যদিও এখনকার মতো এত সর্বনাশা ছিল না। আজ সমাজে রাজনীতি একটা ডেরোগেটরি শব্দ, আর রাজনীতিবিদরা ঘৃণ্য মানুষ। আশপাশে কান পাতলেই ফিসফিসানি শুনি - ভদ্রলোক কি রাজনীতি করে? কেউ সামনে কখনও ঠাট্টাচ্ছলে বলেও ফেলে। তখন এমন স্টেরিওটাইপ করার বিরুদ্ধে বড় গলায় প্রতিবাদ করি। এই প্রতিবাদের ‘বড় গলা’ কিছুটা ছোট তো হলোই। একজন রাজনীতি করা মানুষ কাউকে যাচ্ছেতাই হুমকি দেওয়ার জন্য নিজেকে ‘ভদ্র না’ প্রমাণ করতে হয় আর সেটার কারণ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন রাজনীতিকেই। জানি এই অধ্যক্ষের উক্তিটি সব রাজনীতিবিদের দিকেই যাবে ‘ভদ্রলোক কি রাজনীতি করে?’-এর প্রমাণ হিসেবে।
 

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আশ্রয়ণ প্রকল্প: দুর্নীতি কি আর্থিক নাকি ‘তেলবাজি’র?

আশ্রয়ণ প্রকল্প: দুর্নীতি কি আর্থিক নাকি ‘তেলবাজি’র?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী, আপনি দয়া করে চুপ থাকুন!

স্বাস্থ্যমন্ত্রী, আপনি দয়া করে চুপ থাকুন!

‘কাজকাম না থাকলে খাওনও নাই’

‘কাজকাম না থাকলে খাওনও নাই’

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা এনজিও’কে দেওয়া যৌক্তিক নয়

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা এনজিও’কে দেওয়া যৌক্তিক নয়

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

কিউবায় আটক বিক্ষোভকারীদের মুক্তি দাবি ইউরোপীয় ইউনিয়নের

কিউবায় আটক বিক্ষোভকারীদের মুক্তি দাবি ইউরোপীয় ইউনিয়নের

তিউনিসিয়াকে গণতান্ত্রিক পথে ফেরার আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের

তিউনিসিয়াকে গণতান্ত্রিক পথে ফেরার আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের

অগ্নিকাণ্ডের ১৫ দিনেও চালু হয়নি আইসিইউ

অগ্নিকাণ্ডের ১৫ দিনেও চালু হয়নি আইসিইউ

মেঘনায় ট্রলারডুবিতে একজনের মৃত্যু, জীবিত উদ্ধার ১১

মেঘনায় ট্রলারডুবিতে একজনের মৃত্যু, জীবিত উদ্ধার ১১

সংঘর্ষে নিহত নন, তালেবানের হাতে ‘খুন’ হয়েছেন দানিশ সিদ্দিকি

সংঘর্ষে নিহত নন, তালেবানের হাতে ‘খুন’ হয়েছেন দানিশ সিদ্দিকি

হেলেনা জাহাঙ্গীর আটক

হেলেনা জাহাঙ্গীর আটক

রামেবির প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য মাসুম হাবিব আর নেই

রামেবির প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য মাসুম হাবিব আর নেই

গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৫০০ ঘরের বস্তিটি

গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৫০০ ঘরের বস্তিটি

অবিবাহিত বড় ভাই, আত্মহত্যা ছোট ভাইয়ের

অবিবাহিত বড় ভাই, আত্মহত্যা ছোট ভাইয়ের

ভারতকে হারিয়ে ওয়ানডে সিরিজের বদলা নিলো শ্রীলঙ্কা

ভারতকে হারিয়ে ওয়ানডে সিরিজের বদলা নিলো শ্রীলঙ্কা

লেনোভো বাজারে নিয়ে এলো দুটি নতুন ট্যাব

লেনোভো বাজারে নিয়ে এলো দুটি নতুন ট্যাব

জ্বর-শ্বাসকষ্টে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু

জ্বর-শ্বাসকষ্টে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune